থালায় বিষ : সাতক্ষীরার বাজারের ফার্মের মুরগি কতটা নিরাপদ?
আখলাকুর রহমান
‘মাত্র একমাস বয়সেই দেড় কেজি ওজন’ এই দানবীয় বৃদ্ধির রহস্য কি জানেন? সাতক্ষীরার পৌর মাছ মাংসের বাজার থেকে শুরু করে উপজেলার প্রতিটি হাট বাজারে এখন সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া প্রোটিনের নাম ফার্মের ব্রয়লার মুরগি। কলারোয়া, তালা, দেবহাটা কিংবা শহরের কেন্দ্রীয় বাজার, সবখানেই দিনে দিনে বাড়ছে এই মুরগির চাহিদা। দামে সস্তা আর সহজলভ্য বলে মধ্যবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত, প্রায় প্রতিটি পরিবারের পাতেই এখন ব্রয়লারের আধিপত্য। কিন্তু এই সস্তা প্রোটিনের আড়ালে যে নীরবে ঢুকে পড়ছে এক ভয়ংকর বিষ, তা আমরা কজনই বা ভেবে দেখি?
মাত্র আটাশ থেকে পঁয়ত্রিশ দিনের মধ্যে একটি তুলতুলে ছানাকে দেড় থেকে দুই কেজি ওজনের মুরগিতে পরিণত করার পেছনে লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার বাণিজ্যিক বাস্তবতা। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে যে বৃদ্ধি ঘটতে সময় লাগে মাসের পর মাস, সেই বৃদ্ধিকে কৃত্রিমভাবে মাত্র কয়েক সপ্তাহে ঘটিয়ে ফেলা হচ্ছে রাসায়নিকের জোরে। অতিরিক্ত মুনাফার লোভে খামারিরা যেসব রাসায়নিক ও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করছেন, তা সাতক্ষীরার মতো জেলাশহরের সাধারণ ভোক্তাদের জন্যও চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মুরগি দ্রুত বড় করতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক। নিয়ম অনুযায়ী জবাইয়ের অন্তত সাত দিন আগে সব ওষুধ প্রয়োগ বন্ধ করার কথা, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘উইথড্রয়াল পিরিয়ড’। কিন্তু সাতক্ষীরা অঞ্চলের অধিকাংশ ছোট বড় খামারেই এই নিয়ম বিন্দুমাত্র মানা হয় না। বিক্রির ঠিক আগের দিন পর্যন্তও মুরগিকে অ্যান্টিবায়োটিক মেশানো খাবার পানি খাওয়ানো হয়, যাতে ওজন আরেকটু বেড়ে যায়, লাভ আরেকটু বেশি হয়।
ফলে এই মাংস যখন আমরা কিনে এনে রান্না করি, তখন সেই অবশিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক নীরবে ঢুকে পড়ে আমাদের শরীরে। বছরের পর বছর এভাবে অ্যান্টিবায়োটিক সমৃদ্ধ মাংস খাওয়ার ফলে মানুষের শরীরে তৈরি হচ্ছে ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স’, অর্থাৎ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি। সাধারণ সর্দি কাশি বা সামান্য ইনফেকশনে চিকিৎসকের দেওয়া জীবনরক্ষাকারী ওষুধও আর কাজ করছে না শরীরে। যে ওষুধ একসময় মুহূর্তে সংক্রমণ সারিয়ে দিত, আজ সেই একই ওষুধ শরীরে প্রবেশ করেও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না। এই নীরব সংকট ভবিষ্যতে সামান্য অসুখেও কোটি মানুষের প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। শুধু অ্যান্টিবায়োটিকই নয়, দ্রুত দৈহিক বৃদ্ধির জন্য পোল্ট্রি ফিডে মেশানো হয় ক্ষতিকর গ্রোথ হরমোন ও মাত্রাতিরিক্ত ভারী ধাতু। গবেষণায় দেখা গেছে, সস্তা পোল্ট্রি ফিড তৈরিতে অনেক সময় ট্যানারির বর্জ্য ব্যবহার করা হয়, যাতে প্রচুর পরিমাণে থাকে বিষাক্ত ক্রোমিয়াম ও সীসা। চামড়া শিল্পের এই বর্জ্য যা মাটিতে ফেলে দেওয়ার কথা, তা আজ ঘুরপথে ঢুকে যাচ্ছে আমাদের খাদ্যচক্রে। এই ভারী ধাতুগুলো মুরগির হাড়, মাংস এবং চামড়ার মাধ্যমে সরাসরি মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে।
শরীরে ক্রোমিয়াম ও সীসার মতো বিষাক্ত ধাতুর আধিক্য কিডনি বিকল হওয়া, লিভারের কার্যক্ষমতা নষ্ট হওয়া এবং ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধির ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এই ক্ষতিকর হরমোনযুক্ত মাংসের প্রভাব সবচেয়ে বেশি মারাত্মক ও দৃশ্যমান হচ্ছে। বর্তমান সময়ে শিশুদের স্বাভাবিক বয়সের অনেক আগেই বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছে যাওয়া বা অকাল পক্কতার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে এই হরমোন ও স্টেরয়েড সমৃদ্ধ ব্রয়লার মুরগি নিয়মিত খাওয়া। যে শিশুর শরীর এখনো বেড়ে ওঠার কথা প্রকৃতির নিয়মে, তার শরীরেই আজ ঢুকে পড়ছে কৃত্রিম হরমোনের চাপ।
পাশাপাশি, সাতক্ষীরাসহ সারাদেশের বাণিজ্যিক খামারগুলোর অস্বাস্থ্যকর ও ঠাসাঠাসি পরিবেশ মুরগির মাংসের পুষ্টিগুণ সম্পূর্ণ নষ্ট করে ফেলে। হাজার হাজার মুরগিকে মলমূত্রের নোংরা পরিবেশের মধ্যে গাদাগাদি করে রাখা হয়, যেখানে তারা ডানা মেলার বা একটু হাঁটার সুযোগও পায় না। এই চরম মানসিক ও শারীরিক চাপের কারণে মুরগির শরীরে কর্টিসল নামক স্ট্রেস হরমোনের ক্ষরণ ঘটে, যা মাংসের গুণগত মান একদম কমিয়ে দেয়। এই মাংস খাওয়ার ফলে মানুষের মানসিক অবসাদ, মেদভুঁড়ি এবং রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের মতো কার্ডিওভাসকুলার রোগগুলো এখন ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ার পেছনে এই চর্বিযুক্ত ও রাসায়নিক মিশ্রিত মাংসের বড় ভূমিকা রয়েছে।
সাতক্ষীরার মতো একটি জেলা, যা এক সময় পরিচিত ছিল তার নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদ, মাছ, চিংড়ি আর কৃষিপণ্যের জন্য, সেই জেলার মানুষও আজ ধীরে ধীরে এই ভেজাল ও রাসায়নিকনির্ভর খাদ্য সংস্কৃতির শিকার হচ্ছে। বাজারে গিয়ে ক্রেতা যখন মুরগি কেনেন, তখন তার সামনে বিকল্প খুব কম থাকে। দেশি মুরগির দাম কয়েকগুণ বেশি, আর সাধারণ মানুষের হাতে সেই সামর্থ্য নেই। ফলে বাধ্য হয়েই মানুষ প্রতিদিনের প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে এই ঝুঁকিপূর্ণ মাংসের দিকেই ঝুঁকছেন।
খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে এই ভয়াবহ পোল্ট্রি সংস্কৃতির লাগাম টানা এখন সময়ের দাবি। সরকার ও স্থানীয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কঠোর নজরদারির মাধ্যমে পোল্ট্রি ফিডের মান নিয়ন্ত্রণ করা এবং খামারে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার আইন করে বন্ধ করা জরুরি। শুধু আইন করলেই হবে না, বাস্তবায়নের জন্য চাই নিয়মিত পরিদর্শন ও কঠোর জরিমানার ব্যবস্থা। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মাঝেও সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে তারা সম্ভব হলে ব্রয়লারের বিকল্প হিসেবে দেশি মুরগি, হাঁস বা সাতক্ষীরার নিজস্ব প্রাকৃতিক প্রোটিন উৎসের দিকে নজর দেন।
আজ যদি আমরা পোল্ট্রি শিল্পের এই নীরব বিষক্রিয়ার বিরুদ্ধে সচেতন না হই, রুখে না দাঁড়াই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে উঠবে এক পঙ্গু, রোগাক্রান্ত এবং ওষুধপ্রতিরোধী সমাজ হিসেবে। যে মাটির সন্তান আমরা, সেই সাতক্ষীরার আগামী প্রজন্মকে সুস্থ রাখতে হলে আজই আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, থালার প্রতিটি গ্রাসে যেন বিষ না ঢোকে। এই সিদ্ধান্তের মাশুল না দিলে, ভবিষ্যতে তার মূল্য দিতে হবে গোটা জেলাকে, গোটা জাতিকে।











