উপকূলের কৃষিতে সেচ বিদ্যুতের শিল্প হার: সমন্বিত চাষ বাঁচানোর তাগিদ
সম্পাদকীয়
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত সামলে উঠতে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার কৃষকেরা যখন সমন্বিত চাষাবাদের পথ বেছে নিয়েছেন, ঠিক তখনই বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের নতুন শ্রেণিবিভাগ তাঁদের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও তীব্র লবণাক্ততার কারণে একসময় যেখানে বছরে একটিমাত্র ধান উৎপাদন করাই দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছিল, সেখানে ধানের সাথে মাছ ও সবজির সমন্বিত চাষাবাদ হয়ে ওঠে টিকিয়ে থাকার প্রধান সম্বল। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, জলবায়ু অভিযোজনের এই সফল প্রয়াস এখন বিদ্যুৎ সংযোগের অস্পষ্ট নীতিমালা ও ভূতুড়ে চার্জের কারণে বড় ধরনের সংকটে পড়েছে।
মৌসুমি ধান ও সবজি চাষের জন্য সরকার কৃষি সেচে বিশেষ বিদ্যুতায়ন ও ২০ শতাংশ ভর্তুকি সুবিধা প্রদান করে আসছে। কিন্তু একই জমিতে ধান, মাছ ও সবজি চাষের কারণে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি মাঠপর্যায়ে বহু সংযোগকে ‘ক্ষুদ্র শিল্প’ শ্রেণিতে রূপান্তরিত করছে। ফলে যেখানে প্রতি ইউনিট কৃষি সেচের হার ছিল ৪ টাকা ৮০ পয়সা, তা লাফিয়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ টাকা ৪৯ পয়সায়। এক মাসের ব্যবধানে কৃষকদের বিদ্যুৎ বিল চার গুণ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। এ ছাড়া রাতের বেলা মাছের অক্সিজেন সরবরাহ বজায় রাখার এয়ারেশন মেশিনকেও শিল্পের অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, যা কার্যত একটি কৃষিভিত্তিক প্রযুক্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। নোটিশ ছাড়া হঠাৎ ভর্তুকি বন্ধ ও শিল্প খাতের দাম চাপিয়ে দেওয়া উপকূলীয় কৃষকদের ওপর চরম অন্যায়।
সরকারি তথ্যমতেই, সাতক্ষীরায় গত পাঁচ বছরে সমন্বিত চাষের হার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়েছে। সরকারি মৎস্য ও কৃষি দপ্তর যেখানে প্রশিক্ষণ ও বীজ দিয়ে এই সমন্বিত চাষকে উৎসাহ দিচ্ছে, সেখানে বিদ্যুৎ দপ্তরের এমন বৈরী সিদ্ধান্ত জলবায়ু মোকাবিলায় সরকারের নীতিগত উদ্যোগের সঙ্গেই সাংঘর্ষিক। সেচ নীতিমালায় সমন্বিত চাষের জন্য স্পষ্ট দিকনির্দেশনা না থাকাকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে কৃষকদের ওপর এই অতিরিক্ত বোঝার ভার চাপানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
উপকূলীয় গ্রামীণ অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে সমন্বিত চাষকে কোনো অবস্থাতেই ‘শিল্প’ বিবেচনা করা চলবে না। সরকার ও পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের উচিত অবিলম্বে এই অস্পষ্টতার অবসান ঘটানো। কৃষকদের সংযোগ পুনর্মূল্যায়ন করে সেচ ভর্তুকি পুনর্বহাল করা এবং সমন্বিত চাষকে স্পষ্টভাজবে কৃষি সেচ হারের আওতায় আনা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যুদ্ধ করা উপকূলীয় কৃষকদের যদি সুরক্ষিত করা না যায়, তবে তা সামগ্রিক জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক কাঠামোর জন্যই বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।












