বিল ডাকাতিয়ার স্থায়ী জলাবদ্ধতা; কৃষকের কান্না
প্রকাশ ঘোষ বিধান
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিল ডাকাতিয়ার স্থায়ী জলাবদ্ধতা কৃষকদের জন্য এক চরম অভিশাপ ও কান্নার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শৈলমারী, ভদ্রা ও হামকুড়া নদী পলি ভরাট এবং ত্রুটিপূর্ণ পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমি ও মাছের ঘের পানির নিচে তলিয়ে থাকে।
বিল ডাকাতিয়া হলো খুলনা ও যশোর জেলার ছয়টি উপজেলার প্রায় ৩০ হাজার একর জমি নিয়ে গঠিত বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম একটি বিল। এটি খুলনা মহানগরীর খানজাহান আলী ও আড়ংঘাটা থানা, ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলা এবং যশোরের কেশবপুর, মণিরামপুর ও অভয়নগর উপজেলার অংশবিশেষ নিয়ে বিস্তৃত। এটি গাঙ্গেয় জোয়ারভাটা বিধৌত বদ্বীপীয় সমভূমির একটি অংশ। আশির দশকে ভুল পোল্ডারিং বা সমুদ্র থেকে ভূমি উদ্ধারের অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের কারণে এই অঞ্চলে স্থায়ী জলাবদ্ধতা ও জলনিষ্কাশন সমস্যা তৈরি হয়। অতিরিক্ত বৃষ্টি ও পানি নিষ্কাশনের অভাবে কৃষিজমি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এই বিল স্থানীয় মানুষের জন্য একরকম অভিশাপে পরিণত হয়েছে। ১৯৮০-এর দশক থেকে বিল ডাকাতিয়া অববাহিকায় তীব্র স্থায়ী জলাবদ্ধতা শুরু হয়, যা স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তোলে।
খুলনা জেলার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলায় অবস্থিত বিল ডাকাতিয়ার স্থায়ী জলাবদ্ধতা বর্তমান সময়ে কৃষকদের চাষাবাদ ধ্বংস করে তাদের জীবনযাত্রাকে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে তুলেছে। ডুমুরিয়া, ফুলতলা ও আশেপাশের এলাকার এই বিশাল বিলটি একসময় সোনার ফসলে ভরা থাকলেও আজ তা পানিবন্দি এক জনপদে পরিণত হয়েছে। এক সময়ের আশীর্বাদ ধন্য এই বিশাল বিলটি এখন বছরের পর বছর ধরে পানির নিচে তলিয়ে থাকায় স্থানীয় লক্ষাধিক মানুষ চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কৃষকদের কষ্টার্জিত আমন ও বোরো ধান মাঠেই পচে নষ্ট হচ্ছে। শুধু কৃষি নয়, অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে কোটি কোটি টাকার মাছের ঘের ভেসে গিয়ে মৎস্য চাষিরাও পথে বসেছেন। চড়া সুদে বা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করা কৃষকেরা ফসল হারিয়ে এখন পুরোপুরি সর্বস্বান্ত।
বিলের প্রায় ৩০ হাজার একর চাষাবাদযোগ্য জমি বছরের পর বছর পানির নিচে তলিয়ে থাকে। ধান ও শীতকালীন সবজি চাষ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কৃষকেরা তাদের পৈত্রিক পেশা হারাচ্ছেন এবং পরিবার নিয়ে চরম অর্থসংকটে পড়েছেন। চাষাবাদ করতে না পেরে পেটের দায়ে অনেক কৃষক নিজের পেশা পরিবর্তন করছেন। তারা এখন রিকশা চালানো, দিনমজুরি বা শাপলা তোলার মতো কাজ করে কোনোমতে জীবিকা নির্বাহ করছেন। নৌকাই এখন একমাত্র ভরসা, যা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে থামিয়ে দিয়েছে।
স্থায়ী জলাবদ্ধতার মূল কারণ সমূহ হলো নদী ভরাট ও নাব্যতা সংকট। বিলের পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম শোলমারী, হামকুড়া ও ভদ্রা নদী পলি পড়ে ভরাট হয়ে গেছে। নদীর তলদেশ উঁচু হওয়ায় বিলের পানি আর নদীতে নামতে পারছে না। পানি নিয়ন্ত্রণের জন্য তৈরি করা স্লুইসগেটগুলো সঠিকভাবে কাজ করে না বা অকেজো হয়ে পড়ে আছে। বিলের ৯০টির বেশি স্লুইস গেটের মুখে পলি জমে সেগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। বিলের মধ্যে যত্রতত্র অপরিকল্পিত মাছের ঘের এবং বেড়িবাঁধ তৈরির ফলে পানি চলাচলের স্বাভাবিক পথ বা চ্যানেলগুলো বন্ধ হয়ে গেছে।
কৃষি মন্ত্রণালয় ও বিএডিসি কিছু খাল খনন এবং পাওয়ার পাম্প বসিয়ে পানি নিষ্কাশনের অস্থায়ী চেষ্টা করেছে, তা স্থায়ী সংকটের তুলনায় খুবই সামান্য। ভুক্তভোগীরা চায় নদীগুলো পুনরায় খনন করে পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী ও টেকসই ব্যবস্থা করা হোক।
এলাকাবাসী ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা বিল ডাকাতিয়াকে বন্যাদুর্গত এলাকা হিসেবে ঘোষণা এবং দ্রুত নদী পুনঃখনন ও পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী ব্যবস্থার দাবি জানিয়ে আসছেন। সরকারের বিভিন্ন সময়ে নেওয়া খ-িত প্রকল্প ও খাল খনন কাজের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, ফলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনা।
বিল ডাকাতিয়ার স্থায়ী জলাবদ্ধতা খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা অঞ্চলের কৃষকদের জন্য এক চরম অভিশাপ এবং কান্নার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই বিলে বছরের পর বছর ধরে পানি জমে থাকায় হাজার হাজার একর আবাদি জমি এখন চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
খুলনার বিল ডাকাতিয়ার স্থায়ী জলাবদ্ধতা লাখো কৃষকের জীবনকে এক চরম অভিশাপ ও কান্নার সাগরে পরিণত করেছে। এক সময়ের আশীর্বাদখ্যাত দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই বিলটি এখন অত্র অঞ্চলের মানুষের দুঃখের প্রধান কারণ। ভুক্তভোগী কৃষকদের বাঁচাতে এবং বিল ডাকাতিয়ার সোনালি অতীত ফিরিয়ে আনতে দ্রুত একটি বড় ও স্থায়ী সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা জরুরি। লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট









