দুই ভাইকে লাইসেন্স প্রদানসহ অর্থ লেনদেনের দাবি
শ্যামনগর প্রতিনিধি: শ্যামনগরে সরকারি সার ডিলারের লাইসেন্স বণ্টন নিয়ে রাজনৈতিক স্বজনপ্রীতি, নিয়ম লঙ্ঘন ও অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক দলের সক্রিয় পদে থাকা আপন দুই ভাইয়ের একই সঙ্গে ডিলারশিপ পাওয়া এবং মোটা অঙ্কের টাকার লেনদেনের অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বিএনপির একাংশ ও সাধারণ ব্যবসায়ীরা।
কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত তালিকায় শ্যামনগর উপজেলার একটি পৌরসভা ও ১১টি ইউনিয়নের জন্য মোট ১২ জন ডিলারের নাম চূড়ান্ত করা হয়। তালিকা প্রকাশের পর থেকেই স্থানীয় নেতাকর্মী ও বঞ্চিত আবেদনকারীদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মনোনীত ডিলারদের মধ্যে শ্যামনগর পৌরসভার জন্য ‘মেসার্স ফাহাদ এন্টারপ্রাইজ’-এর মালিক শামসুদ্দোহা টুটুল এবং তাঁর বড় ভাই আবু এহিয়া মোর্তজার মালিকানাধীন ‘ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ’ লাইসেন্স পেয়েছে। তাঁদের মধ্যে শামসুদ্দোহা টুটুল পৌর বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব এবং আবু এহিয়া মোর্তজা জামায়াতের রোকন। ভিন্ন মেরুর রাজনীতি করলেও একই পরিবার থেকে দুজনকে ডিলারশিপ না দেওয়ার বিধান লঙ্ঘন করে ব্যবসায়িক স্বার্থে দুটি লাইসেন্স বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগ রয়েছে, আবেদনের নির্ধারিত সময়সীমা (১০ সেপ্টেম্বর বিকেল চারটা) পার হওয়ার পরদিন প্রভাব খাটিয়ে আবেদনপত্র জমা দেন শামসুদ্দোহা টুটুল। কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করে তালিকার এক নম্বরে নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করান তিনি। নকিপুর গ্রামের বাসিন্দা মেহেদী হাসান জানান, নির্দিষ্ট সময়ে আবেদন জমা নেওয়ার পর কর্মকর্তা রেজিস্টারের ছবি তুলে রাখলেও পরদিন অনৈতিক উপায়ে শামসুদ্দোহার আবেদন গ্রহণ করে রাজনৈতিক সুপারিশ নিশ্চিত করা হয়। অন্যদিকে বাদঘাটার বাসিন্দা রানা অভিযোগ করেন, কায়িক শ্রম ও সব শর্ত পূরণ সত্ত্বেও সাধারণ ব্যবসায়ীদের বঞ্চিত করে দুই ভাইকে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। তবে এসব বিষয়ে কথা বলতে ফোন করা হলে দুই ভাইয়ের কেউই সাড়া দেননি।
এদিকে স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাদের একাংশের দাবি, উপজেলা বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সুপারিশ এবং জেলা কমিটির অনুমোদনে অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে বিতর্কিত ব্যক্তিদের চূড়ান্ত তালিকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সব শর্ত পূরণ করা সত্ত্বেও ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে ২ লাখ ২০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী ও পদধারীদের ডিলারশিপ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী, শ্যামনগর পৌরসভায় সামছুজ্জোহা টুটুল, পদ্মপুকুরে ইউনিয়ন বিএনপির সদস্যসচিব এস এম কামরুজ্জামান, গাবুরায় জেলা কৃষক দলের সভাপতি সালাউদ্দীন লিটন এবং ঈশ্বরীপুরে ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আবুল কালাম মনোনীত হয়েছেন। তবে ভুরুলিয়া ইউনিয়নে মনোনীত হয়েছেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সম্পাদক ও ৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ফয়সাল হোসেন আলভি। কৈখালী ও বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নেও ডিলারশিপের বিনিময়ে তিন লাখ টাকা দাবি করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আসিফ মাহমুদ রিপন ও শ্যামনগর উপজেলা জাসাসের যুগ্ম আহ্বায়ক আল আমিন হোসেন। রিপন জানান, একাধিক মামলায় কারাবরণ করার পরও অনৈতিক সুবিধা দিতে না পারায় তাঁকে বাদ দিয়ে ২ লাখ ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে মনিরুল ইসলাম নামের একজনকে সুপারিশ করা হয়েছে। আল আমিন জানান, সব শর্ত পূরণ করে আবেদন করলেও শীর্ষ নেতাদের হস্তক্ষেপে ফয়সাল হোসেনকে মনোনীত করা হয়।
সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য জিএম লিয়াকত আলী বলেন, ডিলারশিপের ক্ষেত্রে নূন্যতম প্রাধান্য না দিয়ে অর্থের বিনিময়ে ও স্বজনপ্রীতি করা হয়েছে, যা ত্যাগী কর্মীরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। ভুরুলিয়া ইউনিয়ন থেকে ১৪ জন আবেদন করলেও বিএনপি নেতারা তালিকার ১ নম্বরে এবং তাঁর বোনকে ৩ নম্বরে রেখে সুপারিশ পাঠান।
জেলা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক শাহিন ইসলাম জানান, আংশিক ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে জেলা প্রশাসক চূড়ান্ত সুপারিশ অনুমোদন করে থাকতে পারেন। অনিয়মের মাধ্যমে তালিকায় স্থান পাওয়া সুবিধাভোগীদের বাদ দিয়ে দ্রুত নতুন তালিকা তৈরি করা না হলে রাজপথে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শ্যামনগর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক সোলায়মান কবির। তিনি দাবি করেন, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ায় ডিলারদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। টাকা লেনদেন বা অর্থের বিনিময়ে সুপারিশ করার দাবি পুরোপুরি মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।