শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ২ কার্তিক ১৪৩৩
শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ২ কার্তিক ১৪৩৩

সাতক্ষীরার সংবাদপত্র পাঠকের চাহিদা কতটা পূরণ করে?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৩৬ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরার সংবাদপত্র পাঠকের চাহিদা কতটা পূরণ করে?

আল মুতাসিম বিল্লাহ সুমন

সকালবেলা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে খবরের কাগজের পাতায় চোখ বোলানো আমাদের নাগরিক জীবনের এক চিরচেনা অভ্যাস। একজন সচেতন সাতক্ষীরা বাসী যখন তাঁর নিজের জেলার একটি দৈনিক পত্রিকা হাতে তুলে নেন, তখন তাঁর মনে স্বাভাবিক কিছু প্রত্যাশা থাকে। তিনি জানতে চান, তাঁর শহরের ভাঙা রাস্তাটি কবে মেরামত হবে, শহরের পেটের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রাণসায়ের খালের চারপাশের যানজট কবে কমবে, কিংবা কবে নাগাদ সাতক্ষীরার মাটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শুরু হবে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, পত্রিকার পাতা উল্টাতেই পাঠকের সেই প্রত্যাশা মুহূর্তেই হতাশায় রূপ নেয়। জন দুর্ভোগ বা জেলার উন্নয়নের খবরের বদলে সেখানে জ্বলজ্বল করে বিভিন্ন সভার ফটো সেশন, গুরুত্বহীন খবর আর ব্যক্তিগত প্রচার।

একটি জেলার স্থানীয় সংবাদপত্রগুলো হলো সেই অঞ্চলের দর্পণ বা আয়না। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে সংবাদপত্রের কাজ কেবল ঘটমান তথ্যের পরিবেশন নয়, বরং জনমত গঠন করা, প্রশাসনের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেওয়া এবং এলাকার ন্যায্য দাবিগুলো নীতিনির্ধারকদের কানে নিয়মিত পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু সাতক্ষীরার প্রেক্ষাপটে আমাদের স্থানীয় দৈনিক পত্রিকাগুলো সেই দায়িত্ব কতটুকু পালন করছে? খুব সহজ ও সোজাসাপ্টা ভাষায় উত্তর দিতে গেলে বলতে হয়, সাতক্ষীরার সামগ্রিক উন্নয়নে এখানকার স্থানীয় দৈনিকগুলোর অবদান আজ প্রায় শূন্যের কোঠায়। এক অদ্ভুত উদাসীনতা, দায়সারা ভাব, এবং ব্যক্তি বন্দনার বৃত্তে আটকে পড়েছে আমাদের জেলার সাংবাদিকতা।

সাতক্ষীরা শহরের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করলে সবার আগে যে সমস্যাটি সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুলে ছাড়ছে, তা হলো তীব্র যানজট। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শহরের খুলনা রোড মোড়, পাকাপোল ব্রিজ, নিউ মার্কেট মোড়, কিংবা বড় বাজার, কোথাও স্বস্তিতে এক কদম ফেলার জো নেই। ছোট ও সরু সড়কে অনিয়ন্ত্রিত ইজিবাইক, ভ্যান, অটোরিকশা, ফুটপাত দখল এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার চরম দুর্বলতায় গোটা শহর যেন এক স্থবির জনপদে পরিণত হয়েছে।

অথচ প্রদীপের নিচে অন্ধকারের মতো এই ভয়াবহ নাগরিক সংকটটি সাতক্ষীরার স্থানীয় পত্রিকাগুলোর চোখে যেন তেমনভাবে পড়েই না! সবচেয়ে লজ্জার এবং একই সঙ্গে ভাবনার বিষয় হলো, সাতক্ষীরা শহরের এই অসহনীয় যানজট নিয়ে দেশের কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিক পত্রিকা এবং টেলিভিশন চ্যানেল একাধিকবার সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করলেও সাতক্ষীরার পত্রিকা গুলো এদিক থেকে নির্বিকার। ঢাকা থেকে পরিচালিত গণমাধ্যমগুলো যদি সাতক্ষীরার মানুষের এই প্রতিদিনের যন্ত্রণা বুঝতে পারে এবং তা জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরতে পারে, তবে সাতক্ষীরার মাটিতে বসে প্রকাশিত দৈনিকগুলোর নীরবতার কারণ কী?

জেলায় প্রকাশিত দু-একটি পত্রিকা মাঝেমধ্যে এই যানজট নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগণ্য এবং চরম অনিয়মিত। একটি প্রধান নাগরিক সমস্যা সমাধানের জন্য যে ধরনের ধারাবাহিক বা ফলোআপ রিপোর্টিং প্রয়োজন, তার ছিটেফোঁটাও এদের পাতায় দেখা যায় না। তবু মন্দের ভালো হিসেবে ‘দৈনিক পত্রদূত’-কে কিছুটা সাধুবাদ জানানো যায়, কারণ তারা অন্তত যানজট ও নাগরিক সমস্যা নিয়ে বিভিন্ন সচেতন লেখক ও কলামিস্টদের প্রবন্ধ বা মতামত প্রকাশ করার জায়গা করে দিয়েছে। কিন্তু বাকি পত্রিকাগুলো সেদিক থেকেও যোজন যোজন পিছিয়ে। না আছে তাদের নিজস্ব কোনো জোরালো প্রতিবেদন, না আছে কোনো বিশ্লেষণধর্মী লেখার আয়োজন। যেন শহরের মানুষ যানজটে পিষ্ট হলেও তাতে পত্রিকাগুলোর কিছু যায় আসে না। তাদের কাজ সারাদিন খবরের কপি-পেস্ট করা।

সাতক্ষীরা কেবল একটি সীমান্তবর্তী জেলাই নয়, দেশের অর্থনীতিতে এই জেলার অবদান অপরিসীম। ভোমরা স্থলবন্দর থেকে সরকার প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব পায়। সাদা সোনাখ্যাত চিংড়ি, মধু, আম এবং সুন্দরবনের পর্যটন মিলিয়ে সাতক্ষীরা এক সম্ভাবনাময় জনপদ। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পরেও এই জেলার মানুষ তাদের প্রাপ্য উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত। আর এই বঞ্চনার বিরুদ্ধে সবচেয়ে জোরালো কণ্ঠস্বর হওয়ার কথা ছিল আমাদের স্থানীয় সংবাদপত্রগুলোর।

ধরা যাক সাতক্ষীরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাই। দীর্ঘ আন্দোলনের পর আইন পাস হলেও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের দৃশ্যমান কার্যক্রম আজও ফাইল বন্দি। জমি অধিগ্রহণ, উপাচার্য নিয়োগ কিংবা অস্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর বিষয়ে কোনো অগ্রগতি নেই। একই অবস্থা সাতক্ষীরা বাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন নাভারণ-সাতক্ষীরা রেললাইন প্রকল্পের। বছরের পর বছর শুধু আশ্বাসের বাণী শোনা গেছে, কিন্তু মাটিতে একটি পাথরও পড়েনি।

একসময় সাতক্ষীরার অর্থনীতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ছিল সুন্দরবন টেক্সটাইল মিলস। হাজারো শ্রমিকের কোলাহলে মুখর থাকা সেই মিলটি আজ পরিত্যক্ত, যন্ত্রপাতিতে মরিচা ধরে নষ্ট হচ্ছে। এটি পুনরায় চালু করে কর্মসংস্থান সৃষ্টির দাবিটি কেবল সুশীল সমাজের মানববন্ধনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়, পত্রিকার প্রথম পাতার মূল শিরোনাম হয়ে প্রশাসনের ঘুম ভাঙাতে পারে না। একইভাবে সাতক্ষীরায় একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি নার্সিং কলেজ স্থাপন, আধুনিক ক্রীড়া কমপ্লেক্স নির্মাণ করে তরুণ প্রজন্মকে মাঠমুখী করা, কিংবা শহরের ড্রেনেজ, বিশুদ্ধ পানি, ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন, সুন্দরবন কেন্দ্রিক পর্যটন কেন্দ্র, আধুনিক শিশু পার্কের মতো অত্যন্ত জরুরি ইস্যুগুলো নিয়ে স্থানীয় দৈনিকগুলোর কোনো নিজস্ব এজেন্ডা বা লেখা নেই বললেই চলে।

সাংবাদিকতার একটি মৌলিক কাজ হলো জনগণের করের টাকার সঠিক ব্যবহার হচ্ছে কি না, তার ওপর নজরদারি করা। সাতক্ষীরায় যখন নতুন কোনো সড়ক নির্মাণ বা উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়, তখন সাধারণ মানুষের জানার অধিকার থাকে যে প্রকল্পটির বিস্তারিত তথ্য সম্পর্কে। রাস্তাটি কত কিলোমিটার হবে, এর প্রস্থ কত থাকবে, প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় কত, এবং কবে নাগাদ কাজ শেষ হবে ইত্যাদি তথ্যগুলো মানুষ সংবাদপত্রের মাধ্যমেই জানতে চায়।

কিন্তু সাতক্ষীরার কোনো দৈনিক পত্রিকাকে আজ পর্যন্ত কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের এমন বিস্তারিত বা ব্যবচ্ছেদমূলক তথ্য দিয়ে রিপোর্ট করতে দেখা যায়নি। এলজিইডি, সড়ক ও জনপথ বিভাগ কিংবা পৌরসভার অধীনে কোটি কোটি টাকার কাজ হয়, কিন্তু আমাদের পত্রিকায় তার কোনও খবর আসে না।

সাতক্ষীরা থেকে শ্যামনগর পর্যন্ত নতুন মহাসড়ক নির্মাণ হচ্ছে। এটির তথ্য নিয়ে সাতক্ষীরার কোন পত্রিকা রিপোর্ট করেছে? এই রাস্তার দুর্নীতি ও কাজের অনিয়ম নিয়ে কোন সংবাদপত্র অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছে? কেউ করেনি। পাঁচ শতাধিক কোটি টাকার বিশাল এই প্রকল্প এবং এর বিস্তারিত তথ্য-উপাথ্য নিয়ে সাতক্ষীরার কোনও পত্রিকা আজ পর্যন্ত কোনও রিপোর্ট করেনি।
শোনা যাচ্ছে শহরের পাকাপোল থেকে আলিপুর চেকপোস্ট পর্যন্ত ফোর-লেন হবে। এই সড়ক কবে শুরু হবে, এর ডিজাইন কেমন হবে, এর প্রশস্ততা কত হবে, এর মূল পরিকল্পনা কেমন ইত্যাদি নিয়ে আজ পর্যন্ত কোনও স্থানীয় পত্রিকা কোনও খবর প্রচার করেনি। কোনও পত্রিকা সড়ক ও জনপদ অফিসে গিয়ে এই বিষয়ে বা শহরের সড়ক উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে একটি সাক্ষাতকার প্রকাশ করার মতো উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেনি।

সাতক্ষীরার স্থানীয় পত্রিকাগুলোর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা বা হাস্যকর দিকটি ফুটে ওঠে যখন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, সংসদ সদস্যদের মতবিনিময়, পৌরসভা কিংবা অন্য কোনো সরকারি-বেসরকারি দপ্তরে উন্নয়ন ও নীতিনির্ধারণী সভা অনুষ্ঠিত হয়। একটি গুরুত্বপূর্ণ সভার পর সাধারণ পাঠক পরের দিন পত্রিকা খুলে জানতে চান গতকালের সভায় সাতক্ষীরার মানুষের জন্য কী কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো? কোন সমস্যাটি কবে সমাধান হবে বলে কর্তৃপক্ষ কথা দিয়েছে? সভার আলোচ্য বিষয় কি ছিল? অথচ সাতক্ষীরার পত্রিকা গুলো খুললেই দেখা যায় উক্ত সভায় কে কে উপস্থিত ছিলেন এবং কি তাদের পদ পদবী। সভার মূল কার্যপ্রণালী বা কী সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো, তা এই খবরের মধ্যে পাওয়া যায় না। খবর পড়লে মনে হয় খবরের মাঝে ব্যক্তির প্রচার করায় প্রধান লক্ষ।

আমরা যদি জাতীয় দৈনিকগুলোর দিকে তাকাই, তবে সম্পূর্ণ বিপরীত ও পেশাদার এক চিত্র দেখতে পায়। জাতীয় পর্যায়ে যখন একনেক বৈঠক, মন্ত্রীসভার বৈঠক বা কোনো মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সভা হয়, তখন জাতীয় পত্রিকাগুলো ব্যক্তি প্রচারের ধার ধারে না। সেখানে কেবল প্রধানমন্ত্রী বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর নামটুকু প্রাসঙ্গিক ভাবে উল্লেখ করেই পুরো সংবাদের ৯০ শতাংশ জুড়ে তুলে ধরা হয় সভার কার্যপ্রণালী, গৃহীত সিদ্ধান্ত এবং সেই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের মানুষের কী লাভ বা ক্ষতি হবে তার বিশ্লেষণ। সভায় কোন কোন সচিব, অতিরিক্ত সচিব বা মেম্বার উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের নামের তালিকা ছাপিয়ে জাতীয় পত্রিকাগুলো কাগজের জায়গা নষ্ট করে না। কারণ তারা জানে, পাঠক উপস্থিতির হাজিরা খাতা পড়তে টাকা দিয়ে পত্রিকা কেনেন না, পাঠক কেনেন সিদ্ধান্তের খবর জানতে। সাতক্ষীরার পত্রিকাগুলোর সম্পাদক ও সাংবাদিকরা এই সহজ সত্যটি কবে অনুধাবন করবেন?

সাতক্ষীরার বাইরে দেশের অন্যান্য জেলার দিকে তাকালে আমাদের স্থানীয় সাংবাদিকতার এই দৈন্যদশা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পাশের জেলা খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া কিংবা দেশের অন্যান্য প্রান্তের স্থানীয় দৈনিকগুলো প্রতিদিন নিজেদের এলাকার রাস্তাঘাট, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পৌরসভার অনিয়ম এবং জন দুর্ভোগ নিয়ে একাধিক সমস্যামূলক প্রতিবেদন ও কর্তৃপক্ষের সাক্ষাতকার প্রকাশ করে।

অন্যান্য জেলায় স্থানীয় পত্রিকার সাংবাদিকরা জন দুর্ভোগের পেছনে লেগে থাকেন। একটি ভাঙা কালভার্ট বা একটি অকেজো টিউবওয়েলের খবরও সেখানে গুরুত্ব পায়, যতক্ষণ না প্রশাসন সেটি মেরামত করছে। আর আমাদের সাতক্ষীরায় পত্রিকাগুলোর পাতা ভরে থাকে প্রেস বিজ্ঞপ্তি এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানের অতিথিদের নামের তালিকায়। নিজস্ব উদ্যোগে জন-সমস্যা খুঁজে বের করে প্রতিবেদন তৈরির প্রবণতা এখানে হতাশাজনক ভাবে কম। অবস্থা এমন, সাতক্ষীরার সাংবাদিকরা বাইরে চোখ বন্ধ করে চলেন আর অফিসে এসে অন্যের থেকে খবর কপি-পেস্ট করেন।

সাতক্ষীরার সাধারণ মানুষ তাঁদের নিজেদের জেলার পত্রিকাগুলোকে ভালোবাসতে চান, নিজেদের সুখ-দুঃখের সাথী হিসেবে পেতে চান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই অবাধ তথ্যের যুগে মানুষ এখন অনেক সচেতন। কে কোন সভায় উপস্থিত ছিলেন, সেই ছবি মানুষ ফেসবুকেই দেখে ফেলছে। পরের দিন সকালে মানুষ পত্রিকায় চায় সেই সভার ভেতরের খবর, সিদ্ধান্তের চুলচেরা বিশ্লেষণ এবং উন্নয়নের সঠিক খতিয়ান।

সাতক্ষীরার উন্নয়নে গতি আনতে হলে আমাদের স্থানীয় সংবাদপত্রগুলোকে তাদের চিরচেনা খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হবে। ব্যক্তি বন্দনা, তোষামোদি এবং নামের তালিকা ছাপানোর সংস্কৃতি বাদ দিয়ে জনস্বার্থকে সবার ওপরে স্থান দিতে হবে। শহরের যানজট নিরসন, ফোর লেন সড়কের কাজ দ্রুত ও মানসম্মত ভাবে শেষ করা, বিশ্ববিদ্যালয় ও রেললাইনের দাবিকে রাজপথ থেকে সংসদে পৌঁছে দেওয়া এবং প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে স্থানীয় পত্রিকাগুলোকে প্রতিদিন ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে।

 

সংবাদপত্র যখন তোষামোদ ছেড়ে প্রশ্নের তীর ছুড়তে শুরু করবে, কেবল তখনই প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে এবং সাতক্ষীরা একটি আধুনিক, বাসযোগ্য ও উন্নত জনপদ হিসেবে গড়ে উঠবে। এখনই সময় এসেছে, সাতক্ষীরার সাংবাদিক ও সম্পাদকদের আত্ম-সমালোচনা করার।

লেখক: আল মুতাসিম বিল্লাহ সুমন, রাজারবাগান, সাতক্ষীরা

 

Ads small one

মা-দুর্গার আবির্ভাব ও পূজাপ্রবর্তন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১:০৫ পূর্বাহ্ণ
মা-দুর্গার আবির্ভাব ও পূজাপ্রবর্তন

মনিরুজ্জামান মুন্না
একদা পরমেশ্বরের চিন্তালোকে মর্তালোক সৃষ্টির ভাবনা জাগে। যা বাস্তবায়নে মহামায়া ভূমিকা রাখেন। অর্থাৎ এই মর্তালোক পরমেশ্বরের ইচ্ছার বাস্তব রূপকল্প। যা কার্যতঃ মহামায়ার দ্বারাই রূপায়িত এবং তারই সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতায় সুসংগঠিত, সন্নিবেশিত ও সুসম্পন্ন হয়। সুপরিসর মর্তালোকে উদ্ভাসিত বিভিন্ন প্রয়োজনীয় কার্যাবলীর সুষ্ঠ পরিচালনা ও ভারসাম্য রক্ষায় মহামায়াÑব্রহ্মা, শিব ও বিষ্ণুকে আনেন। গঠন ও নিয়ম তান্ত্রিক ভাবে পরিচালনার জন্য মর্তে যে সমস্ত প্রয়োজনীয় কার্যাবলী সম্পাদন হয়ে থাকে তিনি তার প্রকৃতি ও ধরন অনুসারে তিনটি ভাগে ভাগ করেন। তারপর ঐ তিন জনকে এক একটির দায়িত্ব দেন। পাশাপাশি তিনি তাদের স্ব-স্ব কার্যের যথাযথ দিক নির্দেশনা দেন, অধিকর্তা বানান এবং প্রয়োজনের আনুপাতিকে শক্তি, সাহস, সামর্থ ও স্বাধীনতা দিয়ে পরম ব্রহ্মায় আতœলীন হন (ফিরে যায়)।
মহামায়ার এ তৎপরতায় ব্রহ্মাকে দেওয়া হয় মর্তালোকের সৃষ্টির দায়িত্ব। অর্থাৎ সৃষ্টি/জন্ম সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যাদি ব্রহ্মার কতৃত্বে সম্পাদিত হবে। শিবকে দেওয়া হয় সংহার অর্থাৎ ধ্বংস/মৃত্যু সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যাদির দায়িত্ব সম্পাদনের কতৃত্ব। আর বিষ্ণুকে দেওয়া হয় সৃষ্টি ও ধ্বংসের মধ্যবর্তী কালিন সময়ে পতিপালনের দায়িত্ব সম্পাদনের কতৃত্ব। সুতরাং কে কখন কিভাবে জন্মাবে, ধ্বংস হবে এবং লালিত-পালিত হবে তা পরমেশ্বরের পক্ষ থেকে এই তিন জনের দ্বারাই নির্ধারিত হবে। সর্বোপরি মর্তের যে কেউ ঐশ্বরিক সাধনার সিদ্ধিতে তাহাদের পক্ষ থেকে বর প্রাপ্তও হবেন।
মহামায়ার উদ্যেগ ও সার্থক প্রচেষ্টায় বদৌলতে ব্রহ্ম, শিব ও বিষ্ণুর মাধ্যমে এক কল্প কাল ব্যাপি তেমন কোন গুরুতর বিপর্যয় ছাড়াই মর্তালোক পরিচালিত হতে থাকে। এ প্রসঙ্গে চ-ীর সূত্র ধরে কল্প-কালের একটি হিসাব উল্লেখ করা যেতে পারে। আমরা সেখানে পাই ১৭,২৮,০০০ বছর সত্যযুগ  ১২,৯৬,০০০ বছর ক্রেতা যুগ  ৮,৮৪,০০০ বছর দ্বাপরযুগ  ৪,৩২,০০০ বছর কলীযুগ = মোট ৪৩,২০,০০০ বছরে এক যুগ (দবতাদের ক্ষেত্রে)। এমন ৭১ টি যুগ অর্থাৎ (৪৩,২০,০০০৭১) = ৩০,৬৭,২০,০০০ বছরে এক মনু। ১৪ মনু অর্থাৎ (৩০,৬৭,২০,০০০১৪) = ৪২৯,৪০,৮০,০০০ বছরে এক কল্প। বর্তমানে আমরা দ্বিতীয় কল্পের সময় কালে অবস্থান করছি এবং ইতিমধ্যে তার অনেকগুলো কাল পারও করে দিয়েছি। আর সে পার করে দেওয়ার কালের হিসাবটি প্রায় ৭০,৫৯,২০,০০০ বছর হবে। সুতরাং সাম্প্রতিক সময়ে বৈজ্ঞানিকদের গবেষণায় উঠে আসা পৃথিবীর বয়স ৫০০,০০,০০,০০০ বছর এমন সিদ্ধান্তে সাথে এর যতেষ্ট মিলও আছে। অর্থাৎ ৪২৯,৪০,৮০,০০০ বছর  ৭০,৫৯,২০,০০০ বছর = ৫০০,০০,০০,০০০ বছর।
আমরা এ শাস্ত্রজ্ঞানে জানেছি যে, পৃথিবীর আদিতে মূলতঃ দেউ-দানব, যম-জানোয়ার, দ্বৈত্ব-রাক্ষস ইত্যাদি নানান সৃষ্টির পরস্পরায় মানুষের সৃষ্টি। আর মানুষের প্রয়োজনেই উপস্থাপিত হয় আরও হাজার-হাজার সৃষ্টি। যা একে অপরের পরিপূরক। তাই সকল সৃষ্টির মধ্যে একমাত্র মানুষই জীববৃত্তি + বুদ্ধিবৃত্তি সম্পন্ন, বাকীরা শুধুমাত্র জীববৃত্তি সম্পন্ন এবং তাদের অধিকাংশরাই অপেক্ষাকৃত অনেক শক্তি-সমর্থ ও দীর্ঘায়ু প্রাপ্ত হয়। কিন্তু বুদ্ধি না থাকার কারণে তারা আবার মানুষের কাছে পরাস্থ। আবার যার কর্ম ও আচার-আচরনে মনুষত্বের গুণ বা মানবিকতার বৈশিষ্ঠ্য প্রকাশ পায় না সে দৃশ্যমান অবয়বে মানুষ হলেও প্রকৃত অর্থে পশুর চেয়ে নিকৃষ্ট। তবে কখনো কখনো এসবের মধ্যে এক নিগুঢ় রহস্য থাকে। সুতরাং এহেন কোন সৃষ্টিকে যেমন জন্মকালেই পাপি, পূন্যবান, প্রতারক বা অসুর পরিচয়ে সনাক্ত করা যায় না। কর্মই তাদেরকে পর্যায়ক্রমে অমন গুণ ও বৈশিষ্টের পরিচয়ে পরিচিত করে তোলে। তেমনি আবার পূর্বপুরুষের পাপে-পূণ্যে, আর্শীবাদ-অভিশাপে কাউকে অহেতুক পাপি বা পূণ্যবান সাব্যস্ত করা হয় না। ফলশ্রুতিতে দেবতার উপাসনা সার্বজনিন। আর উপাসনার প্রতিদানও তাই। ধর্মের এই উদার ও স্বচ্ছ নীতির সুবাদে অভিশাপ্ত ও পাপ কূলোদ্ভবের কেউ-কেউ বিভিন্ন দেবতার নিবেদনে সুদীর্ঘকালব্যাপি কঠিনতর উপাসনা, তপস্যা বা সাধনায় ব্রত হওয়ার সুযোগ পায়। এবং সে সাধনার যোগ্য প্রতিদানও পায়। অর্থাৎ সাধনার মাধ্যমে দেবতা অথবা ভগবানকে তুষ্ট করে পাপী পরিচয়ের কেউ কেউ বর প্রাপ্তির সক্ষমতা অর্জন করেন। তখন তার পৈত্রিক সূত্রের উত্তরাধিকারী বদরৃপু ও কুচিন্তার প্রভাবে বিশেষ কোন জটিলতা সৃষ্টির মানসে দেবতাদের বৈশিষ্ঠে বৈশিষ্ঠমান কিংবা মহাশক্তিমান রূপের স্বরূপীয় কোন বরই দেবতাদের কাছে প্রত্যাশা করে। তবে এসব পুজারীদের এমন বর প্রদানের মাধ্যমে কোন বিপদজনক পরিস্থিতি ঘটাতে পারে এমন আশঙ্কায় আশঙ্কিত হলেও প্রতিশ্রুতিশীল দেবতারা তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় অবলীলায় সেসব বর দান করেন। এই প্রক্রিয়ায় এক কল্প কালের বিভিন্ন পর্যায়ে বহু অসুরের উদ্ভব ঘটে এবং তারা নানা প্রকারের মহাশক্তির রব আদায়ে সক্ষম হন।
বেদ, গীতা, চ-ীর ভাষ্যে এসব অসুরেরা তাদের সাধনার সম্বল বা প্রতিদান হিসাবে যে যে বর গ্রহন করে তার অপপ্রয়োগ ঘটিয়ে কালে-কালে মর্তালোকে বিভিন্ন ধরনের উৎপাত, হানাহানি, রক্তপাত, ক্ষয়-ক্ষতি, বিপর্যায়, বিশৃঙ্খলা, অশান্তি ঘটাতে থাকে। এর পাশাপাশি স্বর্গালোকের দেবতাদের উপরও তা প্রয়োগ করে মারাতœক বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে থাকে। এভাবে একে একে সকল অসুরেরা শক্তিমান মন্ত্রবানের প্রভাব খাটিয়ে স্বার্গালোকের অধিপত্য গ্রহনের পায়তারা করে। এই হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থে পরিকল্পিত ভাবে যুগে-যুগে উদ্ভুত সকল অসুরেরা সম্মেলিত হয়ে তাদের বিভিন্ন সময়কালে প্রাপ্ত মন্ত্রবানের (বর) সমন্বিত প্রভাবে স্বর্গ-মর্ত জুড়ে বিশাল অসুর সাম্রাজ্য গঠনের প্রয়াস চালায়। অসুরদের এমন পরিকল্পনা ও তার কার্যকারীতার এক পর্যায়ে দেবতারা স্বর্গরাজ্যের নিয়োন্ত্রন ও কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলে। অতপর সেখান থেকে বিচ্যুত হয়ে দিক-বিদিক ছোটাছুটি করতে থাকে। চরম সংকটময় এ অবস্থায় বিক্ষিপ্ত অসহায়, নিরুপায় ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় দেবতারা অতি সর্ন্তপনে অসুরদের অজান্তে স্বর্গ-মর্তের মধ্যবর্তী মহাশূন্যের কোন এক জায়গায় জরুরী ভিত্তিতে মিলিত হয়ে বিষয়টি নিয়ে মিটিং করে। মিটিং শেষে সিদ্ধান্ত হয় যে, যেহেতু পরমেশ্বরের পক্ষ থেকে মহামায়াই তাদেরকে এনে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দিয়ে স্বর্গ-মর্ত নিয়োন্ত্রনের কতৃত্ব দেন এবং তার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থাপত্র সহ পরিচালনার দায়িত্ব ও সার্বিক স্বাধীনতা দেন। অথচ সে সবের বলে বলিয়ান হয়ে আমাদের স্বীয় কর্তব্যে নানা প্রকার গাফিলতি, আয়স, আনন্দ-বিনোদনে মগ্ন থেকেছি। তাই যেহেতু আমাদের অদূরদর্শিতার কারণেই এমনটি হয়েছে। সেহেতু আমরা সেসব দূর্বলতার দায় স্বীকার করে মহামায়াকে তাদের মাঝে অবির্ভূত হয়ে এ মহা সংকট নিরসনে প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ কামনা করবো। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তক্ষনাৎ স্বর্গ-মর্ত কূলের এ বিপদ থেকে আশুপরিত্রানের জন্য সকলে মহামায়ার আগমন ও তাঁর কৃপা লভে স্তুতি ও পুজা-অর্চনা শুরু করে দেন।
দেবতাদের স্তুতি, আত্মসমার্পন ও পরমেশ্বরের ইচ্ছার করণে উদ্ভুত মহাসংকট নিরসনে মহামায়া কৃপাবশ্য হয়ে মর্তে আবির্ভূত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তবে তিনি পরমেশ্বরের কাছে পূর্বের ন্যায় পরিপূর্ন স্বরূপীয় সত্ত্বায় অবতীর্ন না হয়ে একটি প্রতিকৃতি প্রতিবিম্বে প্রতিফলিত হয়ে স্বকীয় রূপের ক্ষুদ্রমান অনুরূপে উপস্থাপিত হওয়ার অভিপ্রায় ব্যাক্ত করেন। পুজা-অর্চণারত অবস্থার এক পর্য়ায়ে দেবতারা মহাশূন্যে মেঘের কু-লীতে এক বিমূর্ত অবয়ব লক্ষ্য করেন। কু-লী পাকানো সে মেঘ হতে ক্রমশঃ অবয়বটি পরিপূর্ণ মূর্তমান হতে থাকে। এক পর্যায়ে সেটি হিমালয় পর্বতের শীর্ষদেশে এক হুঙ্কারী আওয়াজে অবতরন করেন। অতপর সেখানেই গীরি রাজার মেয়ে হয়ে মর্তালোকে আবির্ভূত হন। সময়টি ছিল বসন্তকাল। আর তাই পুষ্প-পল্লবে সজ্জিত প্রকৃতির স্বাভাবিক বিন্যাস ও বৈচিত্রে সকল সৃষ্টিকূল অপরূপ সুন্দরের অর্ঘে এ শুভাগমনকে স্বম্বর্ধিত করে। মহামায়ার আগমনী বার্তার সে আওয়াজ শুনে সকলেই মহাখুশিতে স্বাগত অভিবাদন জানানোর আনুষ্ঠানিকতায় ব্যাতিব্যস্ত হলেও অসুরেরা কিন্তু ব্যাপারটি নিয়ে রীতিমত হাসা-হাসি, ঠাট্টা-তামাশা, রঙ্গ-ব্যাঙ্গ করতে থাকে। যেহেতু এই মহামায়ার হুবুহু পূর্বের সেই মহামায়া নয়, সেহেতু পরম ব্রহ্মার আদেশে স্বর্গের দেবতারা সম্মেলিতভাবে সার্বিক সমর্থন ও সহযোগিতা দেন। তারা মহামায়ার উপর তাদের শক্তি, সাহস, সামর্থ ও হাতিয়ার আরোপ করেন। মহামায়া তখন দশ দিক নিয়োন্ত্রনের জন্য দশহাতে সম্মেলিত শক্তির আধার হয়ে পার্বতী, সতী, ওমা, চামন্ডা ইত্যাদি বিভিন্ন নামে, গুণে, বৈশিষ্ঠে এবং নানান কলা-কৌশল, সাজ-বেশ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের মাধ্যমে ১০১ বার জন্মে একের পর এক প্রতাপশালী অসুর নিধন করতে থাকে। এক পর্যায়ে পুরোপুরি সফলও হন। আর এ কাজের প্রয়োজনেই তিনি এক এক জন্মে এক এক নামে, গুণে ও বৈশিষ্ঠে ভূষিত হন ও পুজিত হন। তিনি দূরদমনীয় পরাক্রমশালী অসুর বিশেষ করে মহীষাসুরের ন্যায় দূর্গামাসুরকে নিধন করেন বলেই তাঁর নাম হয় দুর্গা। দুর্গার প্রচেষ্টায় স্বর্গ-মর্ত জুড়ে স্বস্থির প্রশান্তি ফিরে আসে। সময়টি ছিলো বসন্ত কাল। তাই বসন্ত একটি সুন্দর সময় বা ঋতু হিসেবে আজও আমাদের কাছে পরিচিত। দূর্গার (মহামায়ার) আগমনের সে সব স্বাগতমী আনুষ্ঠানিকতা অর্থাৎ বসন্তকালীন ঐ পুজা ও লোকাচারকে প্রথাগতভাবে চালু করা হয়। অতী দ্রুত ও নিশ্চিতভাবে এ মিশনকে কার্যকারী করতে মহামায়া রূপী মা দেবী দুর্গা নতুন আঙ্গিকে কিছু দেবতাকে সাথে নেন। এ পর্যায়ের দেবতাদেরকে তিনি গণদেবতায় আখ্যায়িত করেন। স্বর্গ-মর্তে অনুপ্রবেশকারী বহুরূপী ও বহু জন্মী এই মহামায়াকে স্বর্গে স্থায়ীভাবে অবস্থান এবং মর্তের তদারকীর জন্য পরমেশ্বর ব্রহ্মা,বিষ্ণু ও শিবের মধ্যে থেকে যে কোন একজনকে বিয়ে করতে নির্দেশ দেন।
পরমেশ্বরের এ ইচ্ছায় গীরিরাজ (সতী বা দুর্গার জন্য মনোনীত বাবা) মহামায়ার সম্মান, শ্রেষ্ঠত্বের নিদর্শন ও মর্জাদা অক্ষুন্নের জন্য তার পতিত্বের যোগ্যতা যাচাইয়ে এবং পতি নির্বাচনে এক স্বয়ংবরার আয়োজন করেন। যেখানে পরমেশ্বরের নির্দেশিত ঐ তিন জনকে উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও ব্রহ্মা-বিষ্ণু অপারগতা প্রকাশ করে তা এড়িয়ে যান। তখন অগত্যা ঐ তিন জনের মধ্যে শিব উপস্থিত হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেন। স্বয়ংবরার সে আয়োজনে সর্বোচ্চ পরিপাটি, ঠাটবাট ও উন্নত সাজবেশে বিভিন্ন সম্রজ্য থেকে অনেকেই উপস্থিত হন। অথচ শিব বিষয়টিকে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্ব দেন। যেহেতু পরমেশ্বরের ইচ্ছাপুষ্ঠ আশির্বদ তার উপর, সেহেতু সঙ্গত কারণেই খানিকটা নিরুৎসাহী ভঙ্গিমায় একেবারে পিছনে ছাই মেখে মড়ার ন্যায় পড়ে থাকেন। অতিব সাদা-মাটা, দৈন্য-দশা ও অবজ্ঞীত হালে শিবের এ উপস্থাপন দুর্গার মধ্যে ঘৃণার উদ্রেক করে। পাশাপাশি অন্তর-অন্তরালে এক প্রকার আকর্ষণ ও কৌতুহলও জাগায়। দেবী দুর্গা চারেদিকে ঘুরে-ঘুরে সানন্দচিত্তে উপস্থিত অন্যান্য আগন্তুকদের দেখতে থাকেন এবং এক-এক প্রান্তে গিয়ে শিবের দিকেও আবার একবার ফিরে তাকান। তিনি যে দিকেই গিয়ে শিবের দিকে তাকান না কেন, দেখতে পানÑ শিবের অন্য এক-একটি নতুন মুখ লুকোচুরির সে চোরা দৃষ্টি দেখে ফেলার জন্য তার দিকে ফিরে সদা প্রস্তুত আছে। যাহোক শিবের এমন আরও কিছু-কিছু অলৌকিকতায় দেবীর আত্মা বিগলিত ও প্রসন্ন হয়। এর নির্বাচনের নানান পরীক্ষা-নীরিক্ষার ফাঁদ-ফন্দিতে শীব অসাধ্যকে সাধ্য করেন। উপযোগ্য হয়ে মহামায়াকে বিয়ে করেন এবং মহাদেব খেতাবে ভূষিত হন। মহাশক্তিমান মা দুর্গা মহাদেবে’র সাথে স্বর্গে (শ্বশুর বাড়ি) অবস্থান করেন এবং একটি নিয়মতান্ত্রিক নিয়ম ও আনুষ্ঠানিকতায় অর্থাৎ কালের বোধন বসন্ত কালের বাসন্তী পুজায় মর্তালোক (বাপের বাড়ি) পরিভ্রমনে আসেন। তিনি তাঁর এ পরিভ্রমণে এক এক বার এক এক রকম বাহন ব্যবহার করেন। তখন তিনি মাতৃরূপে সরাসরি মর্তের বিভিন্ন সৃষ্টির ভারসাম্যপূর্ন সহঅবস্থান ও প্রার্থনা মঞ্জুরের পর্যালোচনা করেন। পরবর্তীতে রামচন্দ্র কর্তৃক রাবণ নিধন যজ্ঞ (অকালের বোধন/পুজা) অনুষ্ঠিত হয়। আর তারই পরিপেক্ষিতে এই পুজাকে অপেক্ষাকৃত বড় আঙ্গিকে শারদিয়ায় উদ্যাপনের রীতি প্রচালিত হয়।

দূর্গাপূজা ও শারদউৎসব: উৎপত্তি বাংলাদেশে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৫৯ পূর্বাহ্ণ
দূর্গাপূজা ও শারদউৎসব: উৎপত্তি বাংলাদেশে

অরবিন্দ মৃধা
দূর্গবেষ্টনী সৃষ্টি করে শত্রুকে প্রতিরোধ করার হিম্মত দেখিয়ে যিনি দূর্গতদের রক্ষা করেন,তিনি দূর্গা।প্রাচীন যুগ থেকে বিশ্বাসের ভিত্তিতে মানুষ দুষ্টুের দমনকারী মাতৃশক্তি হিসেবে দূর্গাদেবীর পূজার প্রচলন করেছেন।
বাঙালি সমাজে শারদীয় দূর্গাপূজা ও উৎসব শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি এক সুগভীর সামাজিক সম্প্রীতি, সংস্কৃতি’র সেতু বন্ধন। ধর্ম গোত্র, বর্ণ নির্বিশেষ সব শ্রেণীর মানুষের মিলনের উৎসব। সামাজিক তাৎপর্যে শ্রেণীভেদ ও বৈষম্যহীন মিলনমঞ্চ। ইউনেস্কোর মতে, দুর্গাপূজা হলো এমন এক সর্বজনীন উৎসব যেখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও শ্রেণীর ভেদাভেদ মুছে যায়। ম-পে ম-পে সব মানুষের ঢল নামে,মেলবন্ধন তৈরী হয়। এইরূপ মিলন থেকে মেলার উদ্ভব হয়েছে। মেলা থেকে হয়েছে দ্রব্য বিনিময়,শিল্পজাত দ্রব্য সৃষ্টি ও বেচাকেনা।
পারিবারিক পুনর্মিলন: শরৎকালে দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমন ও পিতৃগৃহে আসাকে কেন্দ্র করে প্রবাস থেকে মানুষ নিজ ঠিকানায় ফিরে আসে। এটি পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে সুদৃঢ় বন্ধন তৈরি করে।
প্রতীকী রূপ ও সামাজিক ভারসাম্য: প্রতিমার বিন্যাসে দেবীর চার সন্তান (গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী ও সরস্বতী) মানবজীবনের চর্তুর্বগ ফল (ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ) এবং সমাজের বিভিন্ন স্তর বা শক্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হন।
অর্থনৈতিক ও শিল্প সংস্কৃতির বিকাশ: পূজাকে কেন্দ্র করে মৃৎশিল্পী, বাঁশবেত শিল্প, কাঠ শিল্প, লৌহ শিল্প, মিষ্টি শিল্পদ্রব্য কাজে এবং ঢাকী, আলোকশিল্পী, কারিগরী শ্রমের সাথে জড়িতদের কর্মসংস্থান হয়। ম-প সজ্জা ও প্রতিমা শিল্প বাংলার সৃজনশীল ঐতিহ্যকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরে।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি: ইতিহাস ও বর্তমান সময়ে দুর্গাপূজা কেবল একটি সম্প্রদায়ের গ-িতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ এতে আনন্দ ভাগ করে নেয়, যা সামাজিক সম্প্রীতি, সৌভ্রাত্র ও মানবধর্মের এক অনন্য চিত্র ফুটিয়ে তোলে।
দূর্গাপূজার প্রচলন: হিন্দু-সনাতনী সম্প্রদায়ের প্রধান ও শ্রেষ্ঠ পূজা ও উৎসব এই দূর্গাপূজা। চ-ী ও ব্রহ্মবৈবত্য পুরাণশাস্ত্র মতে, দুর্গাদেবী আদ্যাশক্তি মহামায়া, শক্তির দেবী। তিনি কালী, চ-ী, ভগবতী, বাসন্তী, কাত্যায়নী, জগদ্ধাত্রী, মহিষাসুরমর্দিনী, দূর্গা নামে মানুষের কাছে পরিচিত। দূর্গা দুষ্কৃতিকারীদের দমন এবং নিপিড়ীত, দূর্গতদের রক্ষার করে থাকেন, এমনই বিশ্বাসের ভিত্তিতে প্রাচীন যুগ থেকে শক্তির প্রতীক হিসেবে বাঙালি জাতি’র মধ্যে দূর্গা দেবীর পূজা বা আরাধনা, উৎসবের প্রচলন হয়েছে।
দূর্গার পূজার উৎপত্তি;
শ্রীশ্রী চ-ী গ্রন্থে উল্লেখ আছে,
“মেধাস্ত কথায়ামাস সুরথায় সমাধয়ে
সা কথা কথিতা পশ্চাৎ মার্কন্ডেয়েন ভাগুরৌ।
মার্কন্ডেয় নামে মুনির মাধ্যমে দেবীদূর্গা’র পূজা- মাহাত্ম্য সম্পাদন ও প্রচার হয়।
বাংলাদেশের চট্রগ্রাম জেলার করালডাঙা বোয়ালখালি সন্যাসী পাহাড়ে এই মার্ক-েয় মুনির আশ্রম অবস্থিত।পাহাড়ের পাদদেশ থেকে প্রায় পাঁচশত ফুট উঁচুতে বিস্তর্ণ এলাকা জুড়ে এই আশ্রম,ও দূর্গা মন্দির। ‘মন্দিরের অনতিদূরে পাহাড়ের গায়ে মার্ক-েয় মুনির ধ্যানের আসর ও মার্ক-েয় কুন্ডু এবং আছে সীতা সরোবর’।
আদ্যাশক্তি মহামায়া
মেধস্ মুনির আশ্রম:
দেবী দূর্গার পূজার ফল ও মাহাত্ম্য কথা সঅব প্রথম মেধস: নামক এক মুনি রাজ্য ও সংসার থেকে বিতাড়িত রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধি নামক দু’ব্যক্তি’র নিকট ব্যক্ত করেন এবং তাঁর পরামর্শে আত্মশুদ্ধি,জ্ঞান লাভ,শান্তি ও ফল লাভের আশায় উল্লিখিত মেধস: মুনির আশ্রমে মাটির দূর্গাপ্রতিমা তৈরি করে রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধি পূজা সম্পন্ন করত: ‘বেতসা’ নামক নদীতে দেবীপ্রতিমা বিসর্জন দেন। শ্রীশ্রী চ-ী,পুরাণ গ্রন্থ মতে এই রূপে তান্ত্রিক শক্তির দেবী দূর্গা’র পূজার প্রচলন হয়। অর্থ্যাৎ বেতসা নদীর তীরে মেধস:নামক মুনির আশ্রমে পূজা’র উৎপত্তি হয়। কোথায় এই বেতসা নদী এবং মেধস: মুনির আশ্রম:
স্বামী পরদেবানন্দজী মহারাজ প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী মেধস: মুনি’র আশ্রমের ভৌগলিক অবস্থান চট্রগ্রামের কর্ণফুলি নদী সন্নিহিত অঞ্চলে। তিনি উল্লেখ করেছেন, কামাহ্ম্যা তন্ত্রের ৩৫তম পটলে উল্লেখ রয়েছে-
‘তত্রাস্তি বেতসা না¤œী দিব্যা পূর্ণতোয়ানদী। তত্রৈবাসীন্মুনী শ্রেষ্ঠ মেধস:ঋষিরাশ্রম। অর্থ্যাৎ দক্ষিণে সাগর তীরবর্তী এলাকায় কর্ণফুলি নদী সন্নিহিত স্থানে বেতসা নদী তীরে মেধস: মুনির আশ্রম, (শ্রীশ্রী চ-ী)। এ সব তথ্যের ভিত্তিতেই প্রতীয়মান হয় দ্র্গূাপূজা’র উৎপত্তি বাংলাদেশে হয়েছে। যা কালে কালে যুগ থেকে যুগান্তর বয়ে চলেছে নিরন্তর। শারদীয় দূর্গা পূজা বাঙালি জনজাতির প্রধান উৎসব। বাঙালি অধ্যুসিত বিশ্বের বহু দেশে এই পূজা হয়ে থাকে।কালের পরিবর্তনের সাথে, প্রতিমা, রং, পোশাক, প্যা-ের, ডেকোরেশন
ইত্যাদির পরিবর্তনও হচ্ছে।
অকাল বোধন; ত্রেতা যুগের শ্রীরামচন্দ্র অকালে: দূর্গাপূজা করেছিলেন, তখন ছিল শরৎকাল। তাই এই পূজাকে শারদীয় দূর্গা পূজাও বলা হয়। শাস্ত্র মতে বছরকে দু’টি কালে ভাগ করা হয়, মাঘ থেকে আষাঢ় মাস পর্যন্ত উত্তরায়ণ কাল এবং শ্রাবণ থেকে পৌষ মাস পর্যন্ত দক্ষিণায়ন কাল। উত্তরায়ণ কাল দেবদেবীদের জাগ্রত কাল এবং দক্ষিণায়ন নিদ্রা কাল। কথিত আছে শ্রীরামচন্দ্র রাবণ বধের জন্য আদ্যশক্তি মহামায়াকে দেবীদূর্গা নামে দক্ষিণায়ন কালে(অকালে)আহ্বান ও পুজো করে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। এ জন্য দূর্গাপূজাকে অকাল বোধন পূজা বলা হয়।
বর্তমানে শারদীয় দূর্গাপূজা ও উৎসব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধকালে বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে মহামায়ার পূজা করতে বলেছেন। এই রূপে তন্ত্র সাধকগণ বিশ্বাসের ভিত্তিতে সিদ্ধিলাভের আশায় বিভিন্ন নামে শক্তির দেবদেবীর পূজা আরাধনা করে চলেছেন ।
প্রাচীন যুগ: প্রাক-বৈদিক যুগের শক্তির দেবী দূর্গা। বাংলাদেশের করতোয়া ও ব্রহ্মপুত্র নদ বিধৌত প্রাচীন সভ্য নগরের নাম পু-্রনগর। এটি স্বতন্ত্র ভাবে গড়ে উঠা প্রাচীন পু-্রদেশ বা পু-্র জনপদ নামে পরিচিত যা বর্তমান বাংলাদেশের বগুড়া জেলায় মহাস্থানগড়ে অবস্থিত। এই প্রাচীন নগরের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে প্রতœ নিদর্শন পাওয়া গেছে।
এই মহাস্থানগড় যাদুঘরে রক্ষিত আছে চতুর্ভূজা মহিষমর্দিনী দ্র্গূা মূর্তি।যেটি ওই অঞ্চলের সারিয়াকান্দি’র কোনো গ্রামের প্রাচীন এক মন্দির থেকে উদ্ধার করা হয়। প্রতœত্বত্ত্ববিদ্গণের মতে পু-্রনগরে মৌজ্য, গুপ্ত, পালসহ বিভিন্ন সময়ের প্রতœস্তর আবিস্কৃত হয়েছে। এ থেকে বুঝা যায়, এই পু-্রনগর খ্রীষ্টপূর্ব, মহাভারতীয় যুগের জনপদ। প্রাপ্ত মূর্তিটি সে যুগের চতুর্ভূজ বা চার বাহু বিশিষ্ট দূর্গার মূর্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ভাস্কর্যটি যাদুঘরে সংরক্ষিত হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে কাঠ, লোহা, কাঁসা, পিতলের তৈরি দ্বিভুজ, চতুর্ভূজ, দশভুজ বিশিষ্ট দূর্গা, কালী ও অন্যান্য দেবদেবী মূর্তির নিদর্শন পাওয়া গেছে। এ থেকে বুঝা যায় প্রাচীন পু-্র, বঙ্গাল, অঙ্গজ, কিরাত, সবর ও অন্যান্য জাতির মানুষ দূর্গা পূজা করতেন। মধ্যযুগ: শ্রীচৈতন্য প্রভাবিত মধ্যযুগে বাংলা ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি,ধর্মবোধ বিকশিত হয়েছে। ষোড়শ শতকে পাঠন মোগল আমলে বারো ভুঁইয়াদের অন্যতম রাজশাহীর তাহিরপুরের রাজা কংসনারায়ণ মাটির প্রতিমা তৈরী করে বাংলায় সাড়ম্বরে দূর্গাপূজা ও উৎসব পালন ও প্রচলন করেন। তারই অনুকরণে ভাদুড়িয়ার রাজা জগৎনারায়ণ বহু অর্থ ব্যয় করে বসন্তকালে বাসন্তী পূজা ও উৎসব পালন করেন। এই রূপে জগদ্ধাত্রী, কাত্যায়নী, চ-ী, কালীকা দেবীর পূজার প্রচলন হয়। বারো ভূঁইয়াদের অন্যতম যশোহর রাজ্যের রাজা প্রতাপাদিত্য (১৫৮৭-১৬১০)শক্তির দেবী যশোরেশ্বরী কালী মাতার পূজার প্রচলন করেন।
চাঁচড়ার(যশোর) রাজা মনোহর রায়ের রাজত্ব কালে(১৬৫৮-১৭০৪) খ্রীষ্টাব্দ যশোর অঞ্চলে প্রথম দূর্গাৎসব প্রচলন হয়।সেখানকার দশমহাবিদ্যার(মন্দির) মধ্যে জগদ্ধাত্রী মন্দির ছিল। একই ধারায় মুহাম্মাদপুরের রাজা সীতারাম শক্তিপুজার প্রচলন করেন। কীর্ত্তন যুগের পর রাজা জমিদার শ্রেণী প্রভাবশালীগণ শক্তি পুজোর প্রতি আকৃষ্ট হন। বৃটিশ যুগ; বৃটিশ শাসনামলে অষ্টাদশ শতকের পর থেকে সাহিত্য-শিক্ষাচর্চার পাশাপাশি পূজা-অর্চনায় একটা পরিবর্তন ঘটেছে। এই সময় থেকে প্রভাবশালী ভূঁইয়া, জমিদার,জোতদার,তালুকদার শ্রেণীর পরিবারের অনেকেই পারিবারিক ভাবে জাঁকজমকপূর্ণ দূর্গাপূজা শুরু করেন,তবে সংখ্যায় কম। এ সব পূজা উৎসবকে কেন্দ্র করে মেলা বসেছে, নানা ধরণের কুটির শিল্প উদভব হয়েছে,আজও হচ্ছে। এ ধারা বিশ শতকের মধ্যবর্তী সময় পর্যন্ত অব্যহত ছিল।
ধোঁয়াশা যুগ; ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ জমিদার,জোতদার,প্রভাবশালী শ্রেণীর পরিবার গুলির বৃহৎ অংশ পশ্চিমবঙ্গে চলে যাওয়ায় এবং রাজনৈতিক, সামাজিক,মানসিক অস্থিরতার কারণে বলা যায় ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে দূর্গাপূজা ও উৎসবের একটা ধোঁয়াশা যুগ কেটেছে।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়; স্বাধীনতা পরবর্তী একটা বিধস্ত কাঠামোয় দাঁড়িয়ে সাধ থাকলেও সাধ্যের অভাব ছিল সমাজচিত্রে।তাই দূর্গাপুজায় জৌলুসও তেমন ছিলনা। ১৯৭৫ এর পট পরিবর্তন,অস্থির সময়কাল। ১৯৮০ এর দশকে সামরিক শাসন একনায়কতন্ত্র,ইসলামী রাষ্ট্র ঘোষণা,স্বৈরশাসন, সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতা’র মধ্যে কাটে ফলে গতানুগতিক ভাবে পুরাতন মন্দির, মঠকে কেন্দ্র করে দূর্গাপূজা সম্পন্ন হয়।
বিশ শতকের শেষ দশক থেকে এবং একুশ শতকের শুরু থেকে ‘বারোয়ারী’ ব্যানারে গ্রাম ও শহর পর্যায় পর্যন্ত স্থানীয় ভাবে পূজা উদযাপনের লক্ষ্যে কমিটি’ গঠন করে ম-পে ম-পে দূর্গা পূজার প্রবনতা বৃদ্ধি পায়,পূজা উদযাপন পরিষদ দেশব্যাপী জেলা উপজেলা,ইউনিয়নে,কমিটির মাধ্যমে গ্রাম পর্য্যায় পর্যন্ত ক্রমান্নয়ে সার্বজনীন দূর্গা পূজা চালু করায় পূজার সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে।
সংগৃহীত তথ্য মোতাবেক ১৯৯০এর দশকে: ঢাকার ঐতিহাসিক ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির এবং রামকৃষ্ণ মিশনকে কেন্দ্র করে মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির মাধ্যমে দেশব্যাপী পূজার সমন্বয় কাজ শুরু হয়। এই ১৯৯০-১৯৯৯ দশকে
সারাদেশে আনুমানিক ৪(চার) হাজার থেকে ৬(ছয়) হাজার ম-পে পূজা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯১ সালে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু হওয়ার ফলে প্রতিহিংসার মধ্যেও সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব পালনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।
সুবর্ণ যুগ; ২০০০ সাল থেকে পূজা ম-প বৃদ্ধির ক্রমবর্ধমান দশক হিসেবে ধরা যায়। এই সময় থেকে পারিবারিক পূজার পাশাপাশি সামাজিক(বারোয়ারী) পূজা সম্প্রসারণ শুরু হয় ২০০১ সালে কিছু সহিংসতা, পরিবর্তন,প্রাকৃতিক দূর্যোগ,পরে সিডর,আইলা’র কারণে গ্রামীণ জনপদে পূজায় সাময়িক প্রভাব পড়লেও,পরিস্থিতির পরিবর্তন হওয়ায় প্রতিকূলতার সাথে খাপখাওয়ায়ে এই দশক থেকে সার্ব্বজনীন পূজা ম-প সংখ্যা প্রতিযোগিতামূলক বাড়তে থাকে,এতে বুঝা যায় মানুষের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি পেয়েছে ।২০০৯ সালের তথ্য অনুযায়ী সারাদেশে পূজা ম-পের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৪(চব্বিশ)হাজার+। ২০১০ সালে ২৫হাজার। ২০২০ সালে উন্নীত হয়ে সে সংখ্যা দাঁড়ায় ৩০হাজার ২শত ২৫+টিতে। পরের দশকের ২০২১সালে ৩২হাজার ১শত ১৮টি,ক্রমান্নয়ে ২০২৫ সালে সারাদেশে পূজা ম-প সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৩ হাজার ৩শত ৫৫টি।
(এই তথ্যচিত্র গুগল থেকে সংগৃহীত)
এই সময়ে রাজনৈতিক, সামাজিক,পারিপার্শ্বিক অনুকূল প্রতিকূল পরিবেশে সরকারী ও স্থানীয় সুধীমহলের পৃষ্টপোষকতার মধ্যদিয়ে দ্র্গূা পূজা ও উৎসব পালন হয়েছে। দেশে যখন ক্রোমহ্রাসমান হিন্দু-সনাতনী জনসংখ্যা,তখন ক্রোমবৃদ্ধিমান পূজা ম-পের চিত্র একটা ভিন্ন সমীকরণ দাঁড় করিয়েছে।
পূজামন্ডপ বৃদ্ধি: সর্বজনীন প্রধান উৎসব হিসেবে বাঙালি বিশেষ করে হিন্দু সনাতনীদের কাছে এই পূজা ও উৎসব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নি¤œবিত্ত,মধ্যবিত্ত,উচ্চবিত্ত যার যার মতন করে ভক্তিশ্রদ্ধা নিবেদন,আনন্দ,বিনোদন উপভোগ করতে পারে। সাধারণ মানুষের অংশ গ্রহন থাকে, সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা থাকে,গ্রাম মহল্লার বা গোষ্ঠী ভিত্তিক প্রতিযোগিতা, বিশেষ করে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ উদ্যোক্তা কমিটি দেশব্যাপী দূর্গা পূজা উদযাপন কাজে সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা, সহিষ্ণুতা, সাম্প্রদায়িক সস্প্রীতি রক্ষা, সমন্বয়, ত্যাগ, ধৈর্য, সচেতনতার সাথে সমাজের সব শ্রেণী-পেশার মানুষকে এক কাতারে যুক্ত করার মধ্যদিয়ে সুবর্ণসময় বা যুগ সৃষ্টি করার প্রয়াস গ্রহন করে বলে অতীতের তুলনায় অস্থায়ী দূর্গাপূজা মন্ডপ সংখ্যা বুদ্ধি পেয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।
দূর্গাপূজা বাঙালি সমাজের এক মহামিলন উৎসব।একটি প্রাচীন জনপদ হিসেবে দূর্গাপূজা’র প্রচলন হয়েছে বর্তমান বাংলাদেশে। প্রধান উৎসব হিসেবে বাংলাদেশ সহ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, ওড়িশা, ঝাড়খ-, বিহার ও অন্যান্য দেশে বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলেও শারদীয় দুর্গাপূজা ও উৎসব উদযাপিত হয়। জয়তু মা দূর্গা।

শারদীয় দুর্গোৎসব

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৫৮ পূর্বাহ্ণ
শারদীয় দুর্গোৎসব

অরুণ সান্যাল
শরৎ মেঘের ভেলায় চড়ে মা এসেছেন ঘরে
আনন্দেরই সুর ভেসে যায় প্রতিটি হৃদয়ভরে।
ঢাকের কাঠির মিষ্টি কাড়ায় মাতল চারপাশ
শিউলি ফুলের গন্ধে আকুল নির্মল নীল আকাশ।
কাশফুলের ঐ দোলায় দোলায় মন ছড়ায় গান
মায়ের আগমনে জাগে ব্যাকুল করা প্রাণ।
মাটির প্রতিমায় আজ প্রদীপ জ্বলে আলোয় আলোয়,
সকল দুঃখ ভুলে মেতে উঠি ভালোবাসায় ভালোয়।
চারিদিকে তাই আলো ঝলমল হাসি-আনন্দের মেলা
মায়ের আশীর্বাদে কাটুক এই জীবনের খেলা।