অন্ধ উন্মাদনা : গণপিটুনির আড়ালে আমরা কোথায় যাচ্ছি?
তারিক ইসলাম
সম্প্রতি সাতক্ষীরায় পর পর দুটি নৃশংস ঘটনা দেশের সচেতন বিবেককে স্তব্ধ করে দিয়েছে।সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে বাড়ি ঘেরাউ করে গণপিটুনিদিয়ে ১ম দফায় আহত করারপর হাসপাতাল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে এক যুবককে দুই দফায় পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। নিহতের পরিবার ও স্থানীয় ও জাতীয় প্রত্রিকার খবর—তিনি কিছুটা মানসিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন।
অপরদিকে, সাতক্ষীরার তালায় মাছ চুরির সন্দেহে এক ঘের ব্যবসায়ীকে গাছে বেঁধে, নির্দয়ভাবে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে। দুটি ঘটনার প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও অন্তর্দাহ ও পরিণতি একই—আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এবং মানুষ হিসেবে মৌলিক মানবিক অনুভূতির চরম অবক্ষয়।
এই নৃশংসতা কেবল দুটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি আমাদের সামাজিক মনস্তত্ত্ব, অনুভূতির অন্ধ চরমপন্থা এবং আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার চরম দুর্বলতার একটি করুণ প্রতিফলন।
১. সামাজিক মনস্তত্ত্ব : গুজবের জয় ও মানবিক অবক্ষয়
বর্তমানে আমাদের সমাজে যেকোনো অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের আগেই ‘জনতা’ হিংস্র হয়ে ওঠার এক প্রবণতা তৈরি হয়েছে। কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অডিও, ভিডিও বা গুজব মুহূর্তেই গণ-উন্মাদনায় রূপ নিচ্ছে। যুক্তি, সহমর্মিতা ও আইনি বিচারকে পাশ কাটিয়ে একশ্রেণির মানুষ নিজেদের বিচারক ও জল্লাদ হিসেবে ঘোষণা করছে। ক্ষোভ উসকে দিয়ে দলবদ্ধ হিংসার সুযোগ নেওয়া—যাকে আমরা ‘মব কালচার’ বলছি—তা সমাজকে এক অন্ধকার গহ্বরে ঠেলে দিচ্ছে। অন্যের প্রাণ কেড়ে নিয়ে বিচারিক তৃপ্তি খোঁজার এই মনস্তত্ত্ব একটি অসুস্থ সমাজব্যবস্থার লক্ষণ।
২. ধর্মীয় চেতনা: বিশ্বাসের অবক্ষয় নাকি অপব্যবহার?
ধর্ম প্রতিটি মানুষকে ক্ষমা, সহনশীলতা, শান্তি ও ন্যায়ের শিক্ষা দেয়। যেকোনো ধর্মে অন্যায় বা অপপ্রচারের বিচারের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে প্রতিষ্ঠিত আইনি ও বিচার কাঠামোর ওপর। কিন্তু যখন ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে বা হাসপাতালের ভেতরে ঢুকেও মুমূর্ষু মানুষকে পিটিয়ে মারা হয়, তখন কি সত্যিই ধর্মের মর্যাদা রক্ষা পায়? উগ্রতার আড়ালে হিংসা চরিতার্থ করা ধর্মীয় অনুভূতির মূল চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। কোনো গুজবের ভিত্তিতে একজন মানুষকে বিচার ছাড়া হত্যা করা কোনো সুস্থ বিশ্বাস বা ধর্মের নির্দেশ হতে পারে না।
৩. আইনশৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা
আইনশৃঙ্খলার অবস্থা এই ঘটনাগুলোতে অত্যন্ত করুণভাবে উন্মোচিত হয়েছে। পুলিশ প্রথম দফায় দেবহাটায় যুবকটিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করলেও তাণ্ডবকারীরা হাসপাতাল থেকে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় এবং হত্যা করে। হাসপাতালের মতো একটি স্পর্শকাতর ও নিরাপদ স্থানে গিয়ে তাণ্ডব চালানোর সাহস গণ-উত্তেজিত জনতা কীভাবে পায়, সেই প্রশ্ন আজ এড়ানো অসম্ভব। আইনের প্রতি ভয় ও শ্রদ্ধা কমে যাওয়ার ফলেই বারবার এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে চলেছে। কোনো দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হলে ও অপরাধীরা পার পেয়ে গেলে সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা বলতে আর কিছু থাকে না।
উত্তরণের পথ কি?
এই পরিস্থিতির থেকে রেহাই পেতে হলে আমাদের তিনটি প্রধান বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে:
আইনের কঠোর প্রয়োগ: দেবহাটা ও তালার প্রতিটি অপরাধীকে দ্রুত চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কেবল ‘উদ্ধারকারী’ নয়, বরং প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রস্তুত ও সক্ষম হতে হবে।
গুজব প্রতিরোধ ও সোশ্যাল মিডিয়া সচেতনতা: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো তথ্য না যাচাই করে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যে মারাত্মক অপরাধ হতে পারে, সে ব্যাপারে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।
সামাজিক ও সামাজিক-ধর্মীয় সচেতনতা: আলেম-ওলামা, শিক্ষক, এবং সমাজনেতাদের এগিয়ে এসে এটি স্পষ্ট করতে হবে যে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া ধর্ম ও সমাজ—উভয়ের দৃষ্টিতেই মারাত্মক অপরাধ।
একটি সভ্য সমাজে অপরাধীর বিচার করার একমাত্র অধিকার দেশের আদালতের। যদি চুরির সন্দেহ বা কোনো মন্তব্যের জেরে মানুষ নিজেই আইন ও বিচারব্যবস্থার স্থান দখল করে নেয়, তবে রাষ্ট্রের অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়ে। সাতক্ষীরার এই দুটি রক্তক্ষরণী ঘটনা আমাদের জন্য শেষ সতর্কবার্তা। এখনো যদি আমরা সচেতন না হই এবং আইনি শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা না করি, তবে এই অন্ধ উন্মাদনার আগুন কাল আমাদের প্রত্যেকের দরজায় এসে পৌঁছাবে।
লেখক : তারিক ইসলাম
সভাপতি,সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি।









