মো: মামুন হাসান
একটি অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নির্ভর করে তার আয়ের উৎসের বৈচিত্র্যের ওপর। বাংলাদেশের বহির্খাত দীর্ঘদিন দুটি স্তম্ভে দাঁড়িয়ে আছে, তৈরি পোশাক রপ্তানি আর প্রবাসী আয়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও বৈশ্বিক অস্থিরতা এখন দুটিকেই একসঙ্গে চাপে ফেলেছে। জ্বালানি ও জাহাজভাড়া বেড়েছে, পশ্চিমা ক্রেতারা ক্রয়াদেশ ধরে রাখছেন, আর শ্রমিকদের বিদেশযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। এই সংকটে একটি প্রশ্ন গুরুত্ব পাচ্ছে: যে খাত আমাদের নদী, সমুদ্র, বন আর আতিথেয়তাকে সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রায় রূপান্তর করতে পারে, সেই পর্যটন কি হতে পারে পরবর্তী অর্থনৈতিক শক্তি?
বিশ্ব অর্থনীতির হিসাব এ প্রশ্নের পক্ষে জোরালো যুক্তি দেয়। ডব্লিউটিটিসির তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালে ভ্রমণ ও পর্যটন খাত বিশ্ব অর্থনীতিতে রেকর্ড ১১.৬ ট্রিলিয়ন ডলার যোগ করেছে, যা বৈশ্বিক জিডিপির ৯.৮ শতাংশ। খাতটির প্রবৃদ্ধি ছিল ৪.১ শতাংশ, যেখানে বিশ্ব অর্থনীতি বেড়েছে ২.৮ শতাংশ হারে। এই খাত বিশ্বজুড়ে ৩৬ কোটি ৬০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান জুগিয়েছে এবং নতুন সৃষ্ট প্রতি তিনটি চাকরির একটি এসেছে এখান থেকে। ইউএন ট্যুরিজমের হিসাবে ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক পর্যটক ছিলেন প্রায় ১৫২ কোটি, পর্যটকদের খরচ ১.৯ ট্রিলিয়ন ডলার এবং পরিবহন যোগ করলে পর্যটনের মোট রপ্তানি আয় ২.২ ট্রিলিয়ন ডলার। দৃষ্টান্ত হিসেবে স্পেনে পর্যটন জাতীয় জিডিপির ১৫.৩ শতাংশ, আর সেখানে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের ব্যয় ১৩০ বিলিয়ন ডলার। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে খাতটির প্রবৃদ্ধি ছিল ৮.১ শতাংশ, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। অর্থাৎ বিশ্ববাজার শুধু বড় নয়, আমাদের অঞ্চলেই সবচেয়ে দ্রুত বাড়ছে।
এই বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো বিনয়ী। সরকারি ভাষ্যে জিডিপিতে পর্যটনের অবদান প্রায় ৩ শতাংশ, যা ৬ থেকে ৭ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য ঘোষিত হয়েছে। ডব্লিউটিটিসির হিসাবে ২০২৩ সালে খাতটির অর্থনৈতিক অবদান ছিল প্রায় ৯.৫ বিলিয়ন ডলার এবং কর্মসংস্থান ছিল প্রায় ২১ লাখ ৪০ হাজার, যা মোট কর্মসংস্থানের ৩ শতাংশ। অবদান জিডিপির ৬ শতাংশে পৌঁছালে, বর্তমান ভিত্তি ধরে মোটা দাগে বছরে আরও ৯ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক কার্যক্রম তৈরি হয়। এটি একটি সরল প্রক্ষেপণ মাত্র, পূর্বাভাস নয়। তবে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের দিকটি আরও লক্ষণীয়। বিশ্বব্যাংকের তথ্যে ২০১৯ সালে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পর্যটন আয় ছিল মাত্র ৩৯১ মিলিয়ন ডলার, আর ২০২০ সালে তা নেমে আসে ২১৮ মিলিয়নে। এর বিপরীতে ২০২৫ সালে প্রবাসী আয় এসেছে রেকর্ড ৩২.৮ বিলিয়ন ডলার। পর্যটনের প্রত্যক্ষ বৈদেশিক আয় এখনো প্রবাসী আয়ের ২ শতাংশেরও কম। এই ব্যবধানই সম্ভাবনার পরিমাপ। একটি সহজ হিসাব ধরা যাক: বছরে যদি আরও ১০ লাখ বিদেশি পর্যটক এসে গড়ে হাজার ডলার করে খরচ করেন, তবে অতিরিক্ত ১ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আসে, যা ২০১৯ সালের মোট পর্যটন আয়ের আড়াই গুণেরও বেশি।
পর্যটনকে “অদৃশ্য রপ্তানি” বলা হয়, কারণ এখানে ভোক্তা পণ্যের কাছে যান না, পণ্যই ভোক্তার কাছে আসে। এতে বন্দরজট, জাহাজভাড়া বা সামুদ্রিক পথের ঝুঁকি নেই। বর্তমান সংকটের প্রেক্ষাপটে এই বৈশিষ্ট্য মূল্যবান। দেশের রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি এখনো তৈরি পোশাকনির্ভর, আর সেই খাতই এখন চাপে। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে পোশাক রপ্তানি কমেছে ৫.৫১ শতাংশ, মার্চে মোট রপ্তানি আয় আগের বছরের মার্চের চেয়ে কমেছে ১৮.০৭ শতাংশ। বিজিএমইএর হিসাবে জুলাই থেকে মে পর্যন্ত পোশাক রপ্তানি ৩৫.৩১ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ৩.৪১ শতাংশ কম। পোশাক শিল্পের মুনাফার হারও ৪ শতাংশের নিচে, ফলে খরচ বাড়লে তা শোষণের সক্ষমতা সীমিত। প্রবাসী আয়েও ঝুঁকি আছে। ২০২৪- ২৫ অর্থবছরে মোট প্রবাসী আয়ের ৪৫.৪ শতাংশ, অর্থাৎ ১৩.৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি এসেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। এডিবি সতর্ক করেছে, সংঘাতে অঞ্চলটির শ্রমবাজার দুর্বল হলে এই আয় চাপে পড়তে পারে। তুলনায় পর্যটনে আমদানিনির্ভর কাঁচামালের প্রয়োজন কম, ফলে আয়ের বড় অংশ দেশের ভেতরেই থাকে। হোটেলের খাবার, পরিবহন, হস্তশিল্প, নৌযান, গাইড ও স্থানীয় বাজারে এই অর্থ ঘুরে গুণক প্রভাব তৈরি করে। এভাবে এক ডলারের বৈদেশিক ব্যয় অর্থনীতিতে একাধিকবার হাত বদলায় এবং কারখানাহীন উপকূল, হাওর ও পাহাড়ি জনপদে আয় ও কর্মসংস্থান ছড়িয়ে দেয়।
তবে বিপুল সম্ভাবনাকে আয়ে রূপ দিতে হলে কয়েকটি কাঠামোগত বাধা সরাতে হবে। পর্যটনের প্রথম শর্ত আস্থা, আর বিদেশি পর্যটকের কাছে নিরাপত্তার অর্থ শুধু অপরাধ না থাকা নয়। হয়রানি, প্রতারণা, অস্বচ্ছ ভাড়া, ভাষাগত বাধা ও জরুরি সহায়তার নিশ্চয়তাও এর অংশ। এর সঙ্গে আছে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি, জটিল ভিসা প্রক্রিয়া, উচ্চ বিমানভাড়া ও কর, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানের অভাব। সবচেয়ে অবহেলিত সমস্যা দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি। ভালো হোটেল গড়া সহজ, ভালো আতিথেয়তা গড়া কঠিন। শিক্ষক হিসেবে দেখি, শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগসূত্র এখনো দুর্বল।
এসব সমস্যার সমাধানে প্রয়োজন প্রচলিত পথের বাইরের ভাবনা। প্রথমত, নিরাপত্তাকে প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করে একটি ডিজিটাল ট্যুরিস্ট পাস চালু করা যায়। এক কিউআর কোডে নিবন্ধন, সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা, বহুভাষিক সহায়তা এবং জরুরি নাম্বারের মাধ্যমে ট্যুরিস্ট পুলিশের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ থাকবে। এতে পর্যটকের ঝুঁকিবোধ কমবে, আর সরকার পাবে রিয়েল টাইম পর্যটন তথ্য, যা পর্যটন স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট তৈরির ভিত্তি হবে। দ্বিতীয়ত, বিপণনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাজে লাগানো যায়। বিদেশে থাকা পরিবারগুলো ইতিমধ্যে দেশের সঙ্গে আবেগে যুক্ত, তাই তাঁদের জন্য “দেশে ছুটি” প্যাকেজ এবং বিদেশি বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে আসার প্রণোদনা কম খরচে বড় বাজার তৈরি করতে পারে। প্রবাসী আয়ের একটি অংশ পর্যটন অবকাঠামোয় টানতে একটি ডায়াসপোরা ট্যুরিজম বন্ডও ভাবা যায়। তৃতীয়ত, ঋতুভিত্তিক চাহিদার ঢেউ সামলাতে গতিশীল মূল্যনির্ধারণ ও অফ সিজন প্রণোদনা দরকার। কক্সবাজারে বর্ষায় ও হাওরে শুষ্ক মৌসুমে আবাসন ফাঁকা থাকে। সম্মেলন পর্যটন ও ইভেন্ট আয়োজনে সারা বছরের আয়ের ধারা তৈরি করা যায়, যা বিনিয়োগকারীর প্রত্যাশিত প্রতিদান বাড়ায়।
চতুর্থত, পর্যটককে ভোক্তা থেকে স্থানীয় শিল্পের ক্রেতায় রূপান্তর করা জরুরি। জামদানি, নকশিকাঁথা, শীতলপাটি, চা ও মৎস্যজাত পণ্যকে বাংলাদেশ ব্র্যান্ডের অধীনে আনলে পর্যটকের ব্যয়ের বড় অংশ স্থানীয় মূল্য সংযোজনে যাবে। বিদেশি পর্যটকদের কেনাকাটায় আগমনকালীন কর ফেরত চালু করলে হস্তশিল্পের বিক্রি বাড়বে। হোটেল ও রিসোর্টে স্থানীয় কৃষিপণ্য কেনা বাধ্যতামূলক বা প্রণোদনার আওতায় আনলে কৃষির সঙ্গে পর্যটনের পশ্চাৎ সংযোগ শক্ত হবে। পঞ্চমত, সুন্দরবন, হাওর ও পাহাড়ের মতো পরিবেশগতভাবে মূল্যবান এলাকায় কমিউনিটি মালিকানাধীন হোমস্টে ও ইকো লজ গড়া যায়, যেখানে আয়ের একটি অংশ স্থানীয় সমবায়ের হাতে যাবে। পরিবেশ সংরক্ষণে একটি সবুজ উপকর বসিয়ে তার পুরো অর্থ ওই এলাকার সংরক্ষণেই ব্যয় করলে পরিবেশ ও অর্থনীতির মধ্যে টেকসই ভারসাম্য থাকবে। ম্যানগ্রোভ ও বনভিত্তিক কার্বন ক্রেডিটের আয় এই তহবিলের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব।
ষষ্ঠত, আকাশপথ ও ভিসা নীতি বিনিয়োগের নিয়ামক। নির্বাচিত বাজারের জন্য অনলাইন ও আগমনকালীন ভিসা, মৌসুমি চার্টার ফ্লাইটে প্রণোদনা এবং বিমান জ্বালানির ওপর করের যৌক্তিকীকরণ আনলে আসনপ্রতি খরচ কমবে। ডিজিটাল নোম্যাড ভিসার মতো দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের সুযোগ দিলে অবস্থানকালভিত্তিক মাথাপিছু আয় বাড়বে, কারণ পর্যটন অর্থনীতিতে পর্যটকের সংখ্যার চেয়ে মাথাপিছু ব্যয় ও থাকার মেয়াদ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সপ্তমত, বিনিয়োগে সরকারি বেসরকারি অংশীদারিত্ব ও আমদানি শুল্ক সুবিধার মাধ্যমে ঝুঁকি ভাগাভাগি করা যায়। সবশেষে মানবসম্পদে বিনিয়োগ, অর্থাৎ পলিটেকনিক ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানে আতিথেয়তা শিক্ষা সম্প্রসারণ, হোটেল ও ট্যুর অপারেটরদের সঙ্গে সরাসরি শিক্ষানবিশি চুক্তি এবং ভাষাশিক্ষার ওপর জোর। মানসম্মত সেবা দিতে পারলে একই গন্তব্য থেকে বেশি মূল্য আদায় করা যায়, যা সরাসরি লাভজনকতা বাড়ায়।
সরকার জাতীয় পর্যটন পরিষদ গঠন করেছে, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি মহাপরিকল্পনার কাজ চলছে। কাঠামো তৈরি হয়েছে, এখন চাই ধারাবাহিক বাস্তবায়ন। পর্যটন রাতারাতি পোশাক খাতের বিকল্প হবে না, হওয়ার প্রয়োজনও নেই। কিন্তু আজকের অনিশ্চিত বিশ্বে অর্থনীতির শক্তি নিহিত তার বৈচিত্র্যে। যে দেশ শুধু কারখানা আর প্রবাসী শ্রমের ওপর নির্ভর করে, সে প্রতিটি আন্তর্জাতিক সংকটে কাঁপে। সুপরিকল্পিত পর্যটন নীতি, নিরাপদ পরিবেশ ও স্থানীয় মূল্য সংযোজনের সমন্বয়ে পর্যটন হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্য অদৃশ্য রপ্তানি খাত।