আখলাকুর রহমান
খুব সকালে যখন সাতক্ষীরা শহরের পিটিআই মাঠের পাশ দিয়ে হুসহুস করে মোটরসাইকেল, সাইকেল কিংবা যাত্রী বোঝাই ভ্যানগুলো ছুটে চলে, তখন ইঞ্জিনের কর্কশ শব্দের আড়ালে একটা অদ্ভুত চাকার ঘূর্ণন শব্দ ঢাকা পড়ে যায়। চলতি পথে তীব্র গতির এই ব্যস্ত পিচঢালা রাস্তার ঠিক ধারেই হঠাৎ চোখ আটকে যায় সারি সারি সাজানো মাটির সানকি, কলস, আর ছোট ছোট লালচে খেলনা হাঁড়ি-পাতিলের ওপর। চারপাশের আধুনিক কোলাহল আর যানবাহনের এই তীব্র গতির মাঝে জায়গাটা যেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কবি’ উপন্যাসের সেই থমকে যাওয়া কোনো এক আদিম জনপদ। এটি আমাদের চেনা শহরের আড়ালের সেই ঐতিহ্যবাহী কুমোর পাড়া বা পালপাড়া।
আজ হয়তো মোটরসাইকেল বা ভ্যানের গতি একটু কমিয়ে জানালার বাইরে তাকালে সেখানে হাতেগোনা মাত্র কয়েকটা ঘর চোখে পড়ে, যারা চরম দারিদ্র্য আর প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়ামের দাপটের মাঝেও বুক দিয়ে আঁকড়ে ধরে রেখেছে তাদের বাপ-দাদার এই আদিম পেশাকে। কিন্তু এই জীর্ণতার পেছনে লুকিয়ে আছে এক সমৃদ্ধ ইতিহাস, যার সূত্রপাত হয়েছিল আজ থেকে প্রায় দেড়শ বছর আগে, সাতক্ষীরার প্রাণস্পন্দন ‘প্রাণসায়র’ খালের হাত ধরে।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে যখন জমিদার প্রাণনাথ রায়চৌধুরী এই অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে পলিমাটি কেটে ‘প্রাণসায়র’ খাল খনন করেন, তখন ইছামতি নদী থেকে এই জলপথ ধরে দূর-দূরান্তের বণিকেরা আসত। বিভূতিভূষণের উপন্যাসের কোনো মায়াবী নদীর মতো খালের সেই জোয়ারের জলের টানেই তৎকালীন নদীয়া, চব্বিশ পরগনা এবং খুলনার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দক্ষ মৃৎশিল্পীরা এসে এই খালের কূলে বসতি স্থাপন করেন।
মৃৎশিল্পের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল ভালো মানের আঠালো কাঁদা মাটি এবং তৈরি জিনিসপত্র দূর-দূরান্তে সহজে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সুলভ জলপথ। প্রাণসায়রের তীরের এই ভূখন্ডটি ছিল তাদের জন্য এক স্বর্গভূমি, কারণ খালের তলদেশের উর্বর পলিমাটি দিয়ে তৈরি হতো চমৎকার সব তৈজসপত্র, আর খালের ঘাট থেকেই নৌকায় করে তা চলে যেত দূরবর্তী হাট-বাজারে। দেখতে দেখতে পিটিআই মাঠের এই বিস্তীর্ণ এলাকাটি মুখরিত হয়ে উঠেছিল ‘পাল’ উপাধির শত শত কারিগরের কোলাহলে, যা কালের নিয়মে নাম পায় পালপাড়া।
সময় বদলেছে, জোয়ারের সেই প্রমত্তা প্রাণসায়র খাল আজ বদ্ধ, শীর্ণ এক প্রৌঢ়ার মতো নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। প্রকৃতি নিয়মরক্ষা করে দিনে হয়তো দুবার জোয়ার-ভাটা ঠিকই বয়ে নিয়ে আসে, কিন্তু সেই জলে আর আগের মতো লাবণ্যতা নেই, নেই কোনো প্রাণের স্পন্দন। যে খালের বুক চিরে একসময় বড় বড় মহাজনী নৌকা আর ধোঁয়া ওড়ানো স্টিমার দাপিয়ে বেড়াত, আজ সেখানে শুধুই জমাট বাঁধা কচুরিপানার স্তব্ধতা। কোনো এক রূপকথার অভিশাপে যেন এই নৌপথের সমস্ত বাণিজ্যিকতা আজ একদম বন্ধ হয়ে গেছে।
খালের জলের সাথে সাথে যেন পালপাড়ার জৌলুসও শুকিয়ে গেছে, শত পরিবারের সেই বিশাল পাড়াটি আজ সংকুচিত হতে হতে মাত্র কয়েকটি ঘরে এসে ঠেকেছে। নতুন প্রজন্ম আর মাটির চাকার পেছনে সময় নষ্ট করতে চায় না, কিন্তু প্রবীণ যে দু-চারজন কারিগর এখনো টিকে আছেন, তাদের কাছে এটি কেবল জীবিকা নয়। এটি তাদের ধমনীতে বহমান বংশানুক্রমিক রক্ত আর ঐতিহ্য। প্রতিদিন ভোরবেলা তারা যখন কাদা মাখানো চাকাটি ঘোরান, তখন চাকার প্রতিটি ঘূর্ণনে যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রাণসায়রের পুরনো ইতিহাস।
লেখা : আখলাকুর রহমান, উদ্যোক্তা ও স্বপ্নদ্রষ্টা : আসিফা