আলো ও উৎসবের এক মহামিলন দীপাবলি
প্রকাশ ঘোষ বিধান
দীপাবলি বা দেওয়ালি হলো আনন্দ, আলো ও উৎসবের এক মহামিলন। এটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ও জনপ্রিয় ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক উৎসব। সংস্কৃত ‘দীপ’ (আলো) এবং ‘আবলি’ (সারি) শব্দ দুটি মিলে ‘দীপাবলি’ শব্দের উৎপত্তি, যার শাব্দিক অর্থ প্রদীপের সারি। হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে, কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে এই উৎসব উদযাপিত হয়। এই উৎসব মূলত আধ্যাত্মিক অন্ধকার দূর করে আলোর প্রতিষ্ঠা, মন্দের ওপর ভালোর জয় এবং অজ্ঞতার ওপর জ্ঞানের বিজয়ের প্রতীক।
বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে অন্যতম আকর্ষণীয় ও দেদীপ্যমান উৎসব হলো দীপাবলি। শরৎ ও হেমন্তের সন্ধিক্ষণে, যখন চারদিকে প্রকৃতিতে হিমেল হাওয়া ও মৃদু অন্ধকার নেমে আসে, তখন কোটি কোটি প্রদীপের আলোয় মর্ত্যভূমিকে স্বর্গীয় আভায় রাঙিয়ে তোলে এই উৎসব। বর্ণিল আলোকসজ্জা, আতশবাজির রোশনাই এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্যের মাধ্যমে এই দিনটি আবালবৃদ্ধবনিতাকে এক অনাবিল আনন্দে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
দীপাবলি উৎসবের পেছনে একাধিক ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। উত্তর ভারতীয় হিন্দুদের বিশ্বাসমতে, রাক্ষসরাজ রাবণকে বধ করে ১৪ বছরের বনবাস শেষে এই দিনেই শ্রীরামচন্দ্র, সীতা ও লক্ষ্মণসহ অযোধ্যায় ফিরে এসেছিলেন। তাঁদের স্বাগত জানাতে অযোধ্যাবাসী সমগ্র নগরী ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালিয়ে আলোকময় করে তুলেছিলেন।
দক্ষিণ ভারতে বিশ্বাস করা হয়, এই দিনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অত্যাচারী অসুর নরকাসুরকে বধ করে মর্ত্যবাসীকে স্বস্তি দিয়েছিলেন। শুধু হিন্দুধর্মেই নয়, জৈনধর্মাবলম্বীদের মতে, ৫২৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে এই দিনে মহাবীর মোক্ষ বা নির্বাণ লাভ করেন। আবার শিখদের ষষ্ঠ গুরু হরগোবিন্দ ৫২ জন রাজপুত্রসহ এই দিনে কারামুক্ত হয়েছিলেন বলে শিখ সম্প্রদায় দিনটিকে ‘বন্দী ছোড় দিবস’ হিসেবে উদযাপন করে।
দীপাবলি সাধারণত পাঁচ দিনব্যাপী একটি উৎসব, যার প্রতিটি দিনের আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। উৎসবের মূল দিনটিতে ঘরবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে মাটির তৈরি প্রদীপ, মোমবাতি এবং আধুনিক নানা ধরনের আলোকসজ্জায় পুরো বাড়ি সাজানো হয়। দরজার সামনে রঙিন গুঁড়ো বা আবির দিয়ে তৈরি করা হয় দৃষ্টিনন্দন আলপনা বা রঙ্গোলি। বাঙালি সমাজে দীপাবলির আগের দিন ভূত চতুর্দশী উপলক্ষে ১৪টি প্রদীপ জ্বালানো এবং ১৪ শাক খাওয়ার নিয়ম রয়েছে। দীপাবলির রাতে পশ্চিমবঙ্গে অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে শ্রীশ্রী কালীপূজা অনুষ্ঠিত হয়। ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে দেবী লক্ষ্মী ও গণেশের পূজা করা হয়। আনন্দ ভাগ করে নিতে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের মধ্যে মিষ্টি ও উপহার বিতরণ করা হয়।
দীপাবলি জাতি, ধর্ম ও বর্ণনির্বিশেষে মানুষকে একত্রিত করে। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বহু দেশে এই উৎসবের সার্বজনীন রূপ দেখা যায়। অনেক দেশে এ উপলক্ষে সরকারি ছুটিও থাকে। এটি কেবল বাহ্যিক আলোর প্রদর্শনী নয়; মানুষের অন্তরের কুসংস্কার, হিংসা ও বিদ্বেষ দূর করে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির আলো জ্বালানোর এক মহান বার্তা বহন করে।
উপনিষদের সেই অমর বাণী—‘তমসো মা জ্যোতির্গময়’, অর্থাৎ অন্ধকার থেকে আমাদের আলোতে নিয়ে যাও—দীপাবলির মূল চেতনাকে ধারণ করে। আধুনিক আলোকসজ্জা বা আতশবাজির চেয়েও দীপাবলির প্রকৃত সার্থকতা লুকিয়ে আছে মানুষের মনের অন্ধকার দূর করে সমাজে শান্তি, ভালোবাসা ও মানবিকতার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার মধ্যে।
দীপাবলি জাতি, ধর্ম ও বর্ণনির্বিশেষে সর্বজনীন সম্প্রীতির এক অনন্য উৎসব। মাটির টিমটিমে প্রদীপের ঐতিহ্য আজ আধুনিক চিনে আলোর ঝলকানিতে কিছুটা রূপ পাল্টালেও এর অন্তর্নিহিত আবেদন চিরন্তন। বর্তমান বিশ্বে পরিবেশের কথা মাথায় রেখে শব্দবাজিমুক্ত, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব দীপাবলি উদযাপনের চেতনা ছড়িয়ে পড়ছে। প্রদীপের আলো যেমন চারপাশের অন্ধকার দূর করে দেয়, তেমনি দীপাবলির আলো প্রতিটি মানুষের জীবনকে সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি ও অনাবিল আনন্দে ভরিয়ে তুলুক—এটাই হোক এই উৎসবের প্রার্থনা।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট








