সম্পাদকীয়/ আজ ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর
১৯৭১ সালে অগুণতি আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল, তার মূল চেতনা ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার। কিন্তু স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই দেশজুড়ে তৈরি হয় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থব্যবস্থার স্থবিরতা এবং সহিংস মেরুকরণে যখন জাতীয় অস্তিত্বই হুমকির মুখে, ঠিক তখনই ইতিহাসের বাঁক বদলে সামনে আসে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নম্বরের ভূমিকা কোনো সাময়িক ঘটনার ফ্রেমে বন্দী নয়; বরং এটি ছিল দীর্ঘমেয়াদি ও সুদূরপ্রসারী এক যুগান্তকারী মুহূর্ত। ৩ নভেম্বরের সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সেনাবহিনী ও রাষ্ট্রের ভেতরে যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছিল, ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার অভাবনীয় ঐক্যের মাধ্যমে তার অবসান ঘটে। খালেদ মোশাররফ ও কর্নেল আবু তাহেরের রাজনৈতিক সমীকরণ ও কৌশলের বিপরীতে সাধারণ সিপাহি ও জনগণের আস্থার ঠিকানা হয়ে ওঠেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। এ দিন দেশবাসী যেন নিজেদের হারানো বিশ্বাস ও স্বকীয়তা পুনর্র্নিধারণের পথ খুঁজে পায়।
৭ নভেম্বরের মাধ্যমে ক্ষমতার দৃশ্যপটে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বাংলাদেশে সূচনা হয় এক অভূতপূর্ব জাতীয় ঐক্যের। তৎকালীন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়—ল্যাটিন আমেরিকা, আফ্রিকা কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যারা ক্ষমতায় এসেছিলেন, তারা দীর্ঘকাল লৌহকপাট শাসনের বন্দিদশায় রেখেছিলেন নিজ নিজ দেশকে। কিন্তু সামরিক পথ ধরে দায়িত্বে এসেও জিয়াউর রহমান ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি অতি দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে রাষ্ট্রকে গণতন্ত্রের সুগম পথে চালিত করেন এবং রাজনীতিকে সর্বস্তরের মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেন।
জিয়াউর রহমানের এই যুগান্তকারী যাত্রায় অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও আসে বিরাট পরিবর্তন। উদার উন্মুক্ত বাজার অর্থনীতির দুয়ার খুলে দেওয়া হয়। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ সহজীকরণ, বেসরকারি খাতের বিকাশ এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) ও ক্ষুদ্রঋণের প্রচার-প্রসারের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের বিশাল ক্ষেত্র তৈরি হয়। এতে একদিকে যেমন ক্ষয়িষ্ণু অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আসে, অন্যদিকে দেশের আর্থ-সামাজিক চিত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে।
রাজনীতির ক্ষেত্রেও তিনি প্রদর্শন করেন এক অনন্য প্রজ্ঞা। রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর পতাকাতলে সবাইকে একতাবদ্ধ করে ধ্বংসস্তূপ থেকে নতুন জাতি গঠনে সবাইকে যুক্ত করেন। বাকশালে নিষিদ্ধ ও বিলুপ্ত রাজনৈতিক দলগুলো আবার প্রকাশ্যে রাজনীতি চর্চার সুযোগ পায়, যা বহুদলীয় গণতন্ত্রের বিকাশকে ত্বরান্বিত করেছিল।
মূলত, ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষ আবারও যে একটি ইস্পাতদৃঢ় রাজনৈতিক ও জাতীয় ঐক্যে শামিল হতে পেরেছিল, তা সম্ভব হয়েছিল ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার ঐতিহাসিক সংহতির কারণেই। সার্বভৌমত্ব রক্ষা, আত্মমর্যাদাশীল অর্থব্যবস্থা গঠন এবং প্রকৃত গণতন্ত্রের ভিত পুনর্নির্মাণের যে সূচনা সেদিন হয়েছিল, তা-ই আজকের আধুনিক বাংলাদেশের শক্ত সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর মূল ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে বিবেচিত।






