আশাশুনিতে অবৈধ আর্থিক জাল, ঝুঁকিতে মানুষের কষ্টার্জিত সঞ্চয়
সচ্চিদানন্দ দে সদয়, আশাশুনি: সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলায় ‘সমবায়’ নামটি আজ অনেকের কাছে আস্থার নয়, বরং আতঙ্কের প্রতীক হয়ে উঠছে। নিবন্ধিত সমবায়ের আড়ালে কিংবা একেবারেই নিবন্ধনবিহীনভাবে গড়ে ওঠা অসংখ্য সমিতি ও মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছে অবৈধ আর্থিক কার্যক্রম-যার শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অধিক মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান গ্রামগঞ্জের সহজ-সরল মানুষদের কাছ থেকে সঞ্চয় সংগ্রহ করছে।
ব্যাংকের চেয়েও বেশি লাভের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা আমানত নিচ্ছে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই অর্থের নিরাপত্তা বা ফেরতের কোনো নিশ্চয়তা নেই। সুযোগ বুঝে অনেক প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের কোটি কোটি টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যাচ্ছে। জেলা সমবায় অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আশাশুনি উপজেলায় নিবন্ধিত সমবায় সমিতির সংখ্যা ১৭৯টি। এর মধ্যে সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় রয়েছে ১২টি। নিবন্ধিত এসব সমিতি সরকারি নিয়ম মেনে সদস্যদের মধ্যে সঞ্চয় ও ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করার কথা। তবে বাস্তবে চিত্র ভিন্ন। হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অনেকেই নিয়ম ভেঙে সদস্যের বাইরের মানুষদের কাছ থেকেও অর্থ সংগ্রহ করছে।
অন্যদিকে, বুধহাটা, পাইথলী, কুল্যা, গুনাকরকাটি, বাহাদুরপুরসহ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের পাড়া-মহল্লা ও বাজার এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য অনিবন্ধিত সমবায় সমিতি। ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা এসব প্রতিষ্ঠানের নেই কোনো বৈধ অনুমোদন, নেই কার্যক্রমের স্বচ্ছতা। অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু ব্যক্তি প্রথমে আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি ও ছবি সংগ্রহ করে নামমাত্র কমিটি গঠন করেন। পরে সেই কমিটির আড়ালে ‘সমবায় সমিতি’ বা ‘মাল্টিপারপাস’ প্রতিষ্ঠানের নামে কার্যক্রম শুরু করেন।
অনেক ক্ষেত্রে সমবায় অফিসের অসাধু কিছু কর্মচারীর সঙ্গেও তাদের সখ্য গড়ে ওঠে, যার ফলে নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে এসব প্রতিষ্ঠান নির্বিঘেœ চালিয়ে যায় অবৈধ লেনদেন। সমবায়ের নিয়ম অনুযায়ী, একটি সমিতি তার নির্দিষ্ট এলাকার সদস্যদের মধ্যেই সঞ্চয় ও ঋণ কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখবে। কিন্তু আশাশুনির বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ সমিতিই সেই নিয়ম মানছে না। তারা সদস্য বহির্ভূত ব্যক্তিদের কাছ থেকেও চেক বা পাসবইয়ের মাধ্যমে আমানত নিচ্ছে এবং নির্ধারিত এলাকার বাইরেও ঋণ বিতরণ করছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো-এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো কার্যকর তদারকি নেই। বিশেষ করে বুধহাটা বাজারে একাধিক অনিবন্ধিত সমবায়ের কার্যক্রম প্রকাশ্যেই চললেও তা দেখার যেন কেউ নেই। ফলে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত প্রতারণার ঝুঁকিতে পড়ছেন। এরই মধ্যে বুধহাটা বাজারের ‘প্রগতি ঋণদান সমবায় সমিতি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কয়েক কোটি টাকার আমানত নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীরা জানান, তাদের জীবনের সঞ্চয় হারিয়ে তারা এখন দিশেহারা।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দিয়েও তারা কোনো কার্যকর প্রতিকার পাচ্ছেন না। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, আমানতের টাকা ফেরত দেওয়ার সময় হলে প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ নানা অজুহাত দেখিয়ে সময়ক্ষেপণ করে। কখনো তারা গা-ঢাকা দেয়, আবার কখনো ফিরে এসে ‘দিচ্ছি, দেব’ বলে গ্রাহকদের ঘুরিয়ে রাখে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন মূলত নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ, যারা স্বপ্ন দেখেছিলেন সামান্য সঞ্চয় থেকে কিছু লাভের।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত সমবায় কার্যক্রম শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির কারণ নয়, বরং সামগ্রিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার জন্যও হুমকিস্বরূপ। তারা মনে করেন, দ্রুত এসব ভুয়া সমবায় চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। সুধী মহল বলছেন, সমবায় অধিদপ্তরের নজরদারি বাড়ানো, নিয়মিত অডিট নিশ্চিত করা এবং অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালানো এখন সময়ের দাবি।
পাশাপাশি গণমাধ্যম ও প্রশাসনের সমন্বয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে সাধারণ মানুষ প্রতারণার ফাঁদে না পড়ে। সমবায়ের মূল দর্শন ছিল পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমৃদ্ধি। কিন্তু সেই দর্শনকে পুঁজি করে যদি প্রতারণার জাল বিস্তার করা হয়, তবে তা শুধু একটি ব্যবস্থার ব্যর্থতা নয়-এটি সমাজের জন্যও এক গভীর সংকেত।









