রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ১৩ বৈশাখ ১৪৩৩
রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ১৩ বৈশাখ ১৪৩৩

আশাশুনিতে অবৈধ আর্থিক জাল, ঝুঁকিতে মানুষের কষ্টার্জিত সঞ্চয়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০২৬, ৩:১৭ অপরাহ্ণ
আশাশুনিতে অবৈধ আর্থিক জাল, ঝুঁকিতে মানুষের কষ্টার্জিত সঞ্চয়

সচ্চিদানন্দ দে সদয়, আশাশুনি: সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলায় ‘সমবায়’ নামটি আজ অনেকের কাছে আস্থার নয়, বরং আতঙ্কের প্রতীক হয়ে উঠছে। নিবন্ধিত সমবায়ের আড়ালে কিংবা একেবারেই নিবন্ধনবিহীনভাবে গড়ে ওঠা অসংখ্য সমিতি ও মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছে অবৈধ আর্থিক কার্যক্রম-যার শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অধিক মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান গ্রামগঞ্জের সহজ-সরল মানুষদের কাছ থেকে সঞ্চয় সংগ্রহ করছে।

 

ব্যাংকের চেয়েও বেশি লাভের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা আমানত নিচ্ছে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই অর্থের নিরাপত্তা বা ফেরতের কোনো নিশ্চয়তা নেই। সুযোগ বুঝে অনেক প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের কোটি কোটি টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যাচ্ছে। জেলা সমবায় অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আশাশুনি উপজেলায় নিবন্ধিত সমবায় সমিতির সংখ্যা ১৭৯টি। এর মধ্যে সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় রয়েছে ১২টি। নিবন্ধিত এসব সমিতি সরকারি নিয়ম মেনে সদস্যদের মধ্যে সঞ্চয় ও ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করার কথা। তবে বাস্তবে চিত্র ভিন্ন। হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অনেকেই নিয়ম ভেঙে সদস্যের বাইরের মানুষদের কাছ থেকেও অর্থ সংগ্রহ করছে।

 

অন্যদিকে, বুধহাটা, পাইথলী, কুল্যা, গুনাকরকাটি, বাহাদুরপুরসহ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের পাড়া-মহল্লা ও বাজার এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য অনিবন্ধিত সমবায় সমিতি। ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা এসব প্রতিষ্ঠানের নেই কোনো বৈধ অনুমোদন, নেই কার্যক্রমের স্বচ্ছতা। অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু ব্যক্তি প্রথমে আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি ও ছবি সংগ্রহ করে নামমাত্র কমিটি গঠন করেন। পরে সেই কমিটির আড়ালে ‘সমবায় সমিতি’ বা ‘মাল্টিপারপাস’ প্রতিষ্ঠানের নামে কার্যক্রম শুরু করেন।

 

অনেক ক্ষেত্রে সমবায় অফিসের অসাধু কিছু কর্মচারীর সঙ্গেও তাদের সখ্য গড়ে ওঠে, যার ফলে নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে এসব প্রতিষ্ঠান নির্বিঘেœ চালিয়ে যায় অবৈধ লেনদেন। সমবায়ের নিয়ম অনুযায়ী, একটি সমিতি তার নির্দিষ্ট এলাকার সদস্যদের মধ্যেই সঞ্চয় ও ঋণ কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখবে। কিন্তু আশাশুনির বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ সমিতিই সেই নিয়ম মানছে না। তারা সদস্য বহির্ভূত ব্যক্তিদের কাছ থেকেও চেক বা পাসবইয়ের মাধ্যমে আমানত নিচ্ছে এবং নির্ধারিত এলাকার বাইরেও ঋণ বিতরণ করছে।

 

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো-এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো কার্যকর তদারকি নেই। বিশেষ করে বুধহাটা বাজারে একাধিক অনিবন্ধিত সমবায়ের কার্যক্রম প্রকাশ্যেই চললেও তা দেখার যেন কেউ নেই। ফলে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত প্রতারণার ঝুঁকিতে পড়ছেন। এরই মধ্যে বুধহাটা বাজারের ‘প্রগতি ঋণদান সমবায় সমিতি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কয়েক কোটি টাকার আমানত নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীরা জানান, তাদের জীবনের সঞ্চয় হারিয়ে তারা এখন দিশেহারা।

 

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দিয়েও তারা কোনো কার্যকর প্রতিকার পাচ্ছেন না। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, আমানতের টাকা ফেরত দেওয়ার সময় হলে প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ নানা অজুহাত দেখিয়ে সময়ক্ষেপণ করে। কখনো তারা গা-ঢাকা দেয়, আবার কখনো ফিরে এসে ‘দিচ্ছি, দেব’ বলে গ্রাহকদের ঘুরিয়ে রাখে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন মূলত নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ, যারা স্বপ্ন দেখেছিলেন সামান্য সঞ্চয় থেকে কিছু লাভের।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত সমবায় কার্যক্রম শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির কারণ নয়, বরং সামগ্রিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার জন্যও হুমকিস্বরূপ। তারা মনে করেন, দ্রুত এসব ভুয়া সমবায় চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। সুধী মহল বলছেন, সমবায় অধিদপ্তরের নজরদারি বাড়ানো, নিয়মিত অডিট নিশ্চিত করা এবং অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালানো এখন সময়ের দাবি।

 

পাশাপাশি গণমাধ্যম ও প্রশাসনের সমন্বয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে সাধারণ মানুষ প্রতারণার ফাঁদে না পড়ে। সমবায়ের মূল দর্শন ছিল পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমৃদ্ধি। কিন্তু সেই দর্শনকে পুঁজি করে যদি প্রতারণার জাল বিস্তার করা হয়, তবে তা শুধু একটি ব্যবস্থার ব্যর্থতা নয়-এটি সমাজের জন্যও এক গভীর সংকেত।

Ads small one

তালায় অপ্রতিরোধ্য মাটিখেকো গ্রুপ, আইন-কানুন মানছে না কেউ!

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০২৬, ৩:২৬ অপরাহ্ণ
তালায় অপ্রতিরোধ্য মাটিখেকো গ্রুপ, আইন-কানুন মানছে না কেউ!

সংবাদদাতা: সাতক্ষীরা তালা উপজেলায় নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করেই বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে ইটভাটা। ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইনকে বৃদ্ধাঙ্গলি দেখিয়ে একের পর এক বা একাধিক ফসলি জমি ও কপোতাক্ষ বেঁড়িবাধের মাটি গিলছে ভাটাগুলো। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনুমোদন ছাড়াই চালু থাকা ইটভাটায় প্রশাসনের দৃশ্যমান তৎপরতা না থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ আর শঙ্কা।

সূত্রে জানাযায়, তালা উপজেলায় বিভিন্ন ভাটায় মাটি সরবারহ করতে সক্রিয় রয়েছে একটি মাঠিখোগো সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের অন্যতম কাজ হলো কৃষকদের ভুল বুঝিয়ে ফসলি জমির উর্বর অংশ কেটে ভাটায় পৌছে দেওয়া। এছাড়া ৫৩১ কোটি টাকা ব্যয়ে খননকৃত কপোতাক্ষ বেঁড়িবাধের মাটি কেটে ভাটায় বিক্রি করা। রাত যতই গভীর হয় ততই সক্রিয় হয় সিন্ডিকেট। রাতের আধারে কিংবা কখনো দিনের বেলায় প্রকাশ্য দানব গাড়ীতে কপোতাক্ষের বিভিন্ন স্থান থেকেই মাটি বহন করে তারা। কেউ প্রতিবাদ কিংবা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করলে তাদের বলা হয় তাদের কাছে প্রশাসনের অনুমতি আছে।

ভাগবাহ গ্রামের সুনীল দাশ জানান, এলাকায় ভাটা নির্মাণের শুরু থেকেই নিজের ক্ষমতা জাহির শুরু করেন ভাটার মালিক। এলাকাটি জনবসতিপূর্ণ ও ফসলি জমি এলাকা হওয়ায় প্রথম থেকে সেখানে ভাটা নির্মাণে বাধা দিয়েছিল এলাকাবাসি। তবে কোন বাধাই আটকাতে পারেনি ইটভাটা নির্মাণ কার্যক্রম। ভাটা এলাকায় একটি মন্দির থাকায় স্থানীয় সনাতন ধর্ম্বাবলম্বীরা উপজেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিল। কিন্তু অদৃশ্য ক্ষমতার বলে ভাটা স্থাপনে সফলতো হয়েইছিল, উপারন্তু অভিযোগকারীরা সংখ্যলঘু সম্প্রদায়ের হওয়ায় তাদের দেশছাড়া করবার হুমকি দেওয়া হয়।

 

২০২০ সালে কপোতাক্ষ নদের তীরে রাখা ভাটার মাটির চাপে বেঁড়িবাধের প্রায় ৫০০ মিটার অংশ ভেঙ্গে নদী গর্ভে চলে যায়। সে সময় বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় এসব নিয়ে লেখালেখি হলেও কিছুই হয়নি। পরবর্তীতে সেই মাটি উত্তোলনের নামে বেঁড়িবাধের আরও ৫০০ মিটার অংশের মাটি কেটে ভাটার কাজে ব্যবহার করা হয়। চলতি বছরেই এর ব্যাতায় ঘটেনি। কপোতাক্ষ নদের বেঁড়িবাধের বিভিন্ন অংশের মাটি ভাটায় ব্যবহার করার পাশাপাশি সিন্ডিকেট তৈরি করে মাটির ব্যবসায় নেমেছে একটি চিহ্নিত মহল। এসকল অপকর্মের বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনকে জানিয়েও কোন ফল পাওয়া যায় না।

পাটকেলঘাটা এলাকার স্বাধীন নামের এক ব্যক্তি জানান, গভীর রাতের শুরু হয় কপোতাক্ষ বেঁড়িবাধের মাটি কাটার কর্মযজ্ঞ। শত শত মাটি বহরকারী ডাম্পার গাড়ীতে মাটি পরিবহন করায় শব্দে আমরা ঘুমাতে পারি না। প্রতিবাদ করতে গেলে তাদের লোকেরা হুমকি দিয়ে বলে প্রশাসনের অনুমতি পেয়ে সবকিছু করছি। আমাদের বিরুদ্ধে কথা বলে লাভ হবে না। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এই একই ধরনের ঘটনা ঘটেই চলেছে।

বিষয়টি নিয়ে তালা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর ব্যবহ্নত মোবাইল নাম্বারে যোগাযোগ করার চেষ্টা হলে তিনি ফোনটি রিসিভ করেননি। সংবাদদাতা: আজমল হোসেন জুয়েল

 

অনাবৃষ্টিতে পুড়ছে জনপদ: দেবহাটায় তীব্র তাপদাহে জনজীবন বিপর্যস্ত

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০২৬, ৩:২২ অপরাহ্ণ
অনাবৃষ্টিতে পুড়ছে জনপদ: দেবহাটায় তীব্র তাপদাহে জনজীবন বিপর্যস্ত

Oplus_131072

কে এম রেজাউল করিম, দেবহাটা: দীর্ঘদিনের অনাবৃষ্টিতে যেন আকাশ থেকে আগুন ঝরছে। উপকূলীয় জনপদ দেবহাটায় বইছে তপ্ত লু হাওয়া, আর সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে তাপমাত্রা। প্রখর রোদ আর অসহনীয় গরমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের জনজীবন। প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের হওয়া যেন একপ্রকার কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সকাল থেকেই সূর্যের তীব্র তাপ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে। খেটে খাওয়া মানুষ-বিশেষ করে দিনমজুর, কৃষক ও শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী-পড়েছেন চরম দুর্ভোগে। রাস্তাঘাটে মানুষের উপস্থিতি কমে গেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। অনেকেই কাজের প্রয়োজনে বের হলেও খুঁজছেন ছায়া আর স্বস্তির সামান্য আশ্রয়।

উপজেলার সখিপুর এলাকার রাজমিস্ত্রির শ্রমিক রবিউল ও শফিকুল, এবং কৃষি শ্রমিক রশিদ, ওসমান ও বাজ্জাক বলেন, “এই তীব্র গরমে কাজ করা খুবই কষ্টকর হয়ে পড়েছে।

এদিকে, তীব্র গরমের কারণে শিশু ও বয়স্কদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েই চলেছে। চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত তাপদাহে হিটস্ট্রোক, ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতার মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও মারাত্মক হতে পারে।

অন্যদিকে, দীর্ঘ অনাবৃষ্টির ফলে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট। অনেক স্থানে নলকূপে পানি উঠছে না, ফলে দুর্ভোগ আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।

এ পরিস্থিতিতে সচেতনতার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা পরামর্শ দিয়েছেন-প্রচন্ড রোদে অপ্রয়োজনে বাইরে বের না হওয়া, পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি পান করা, হালকা ও ঢিলেঢালা পোশাক পরিধান করা এবং শিশু ও বয়স্কদের বিশেষ যতœ নেওয়া জরুরি।

প্রকৃতির এই রুদ্ররোষ থেকে রক্ষা পেতে সবাইকে সচেতন ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগ। পাশাপাশি দ্রুত বৃষ্টিপাতের আশায় দিন গুনছেন দেবহাটার মানুষ।

উলাশী খাল: ইতিহাসের পথে নতুন পুনর্জাগরণ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০২৬, ২:৪৮ অপরাহ্ণ
উলাশী খাল: ইতিহাসের পথে নতুন পুনর্জাগরণ

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

যশোরের শার্শা উপজেলার উলাশী-যদুনাথপুর খাল বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়ন ইতিহাসে একটি বিশেষ নাম। এটি কেবল একটি জলপথ নয়-বরং একটি সময়, একটি রাজনৈতিক দর্শন এবং একটি সামাজিক অংশগ্রহণের প্রতীক। ১৯৭৬ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজ হাতে কোদাল তুলে যে খাল খননের সূচনা করেছিলেন, সেটি পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে গভীর পরিবর্তন আনে। প্রায় পাঁচ দশক পর সেই খাল আবার আলোচনায় এসেছে। কারণ, দীর্ঘদিন অবহেলা ও পলি জমে এটি প্রায় মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে।

 

এখন পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এতে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব মাননীয প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর সম্পৃক্ততা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কিন্তু এই গল্প কেবল রাজনীতির নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতি, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়ন দর্শনেরও গল্প। একটি খালের জন্ম: সময়ের প্রয়োজনীয়তা ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ১৯৭০-এর দশকে শার্শা অঞ্চল ছিল ভৌগোলিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত। অঞ্চলটির উত্তরাংশে বিস্তৃত বিল এলাকা-প্রায় ২২ হাজার একর কৃষিজমি-বছরের বড় অংশ পানিতে ডুবে থাকত। এর ফলে-একফসলি জমি অনাবাদি পড়ে থাকত, কৃষকরা ঋণগ্রস্ত থাকত, খাদ্য ঘাটতি ছিল নিয়মিত, দারিদ্র্য ছিল কাঠামোগত এই বাস্তবতায় একটি সমন্বিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। সেই প্রয়োজন থেকেই উল্লাশী-যদুনাথপুর খাল খননের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।

 

তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ব্যক্তিগতভাবে এই প্রকল্পে সম্পৃক্ত হন-যা বাংলাদেশের উন্নয়ন ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর তিনি সরাসরি মাঠে উপস্থিত হয়ে খনন কাজের সূচনা করেন। স্থানীয় মানুষ, কৃষক, শ্রমিক এবং স্বেচ্ছাসেবীরা একত্রিত হয়ে শুরু করেন এক অভূতপূর্ব শ্রমযজ্ঞ। উলাশী খালের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল এর অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন মডেল। সেখানে-হাজার হাজার মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে অংশ নেয়, কোনো আর্থিক পারিশ্রমিক ছিল না, কাজের বিনিময়ে সামান্য রুটি ও গুড় দেওয়া হতো, শ্রমকে দেখা হতো দায়িত্ব হিসেবে-এই ধরনের অংশগ্রহণ আজকের উন্নয়ন কাঠামোতে বিরল।

 

স্থানীয় প্রবীণদের স্মৃতিতে এখনও জীবন্ত সেই সময়-যখন রাষ্ট্রপ্রধান নিজে কোদাল হাতে মাটি কাটছেন, আর সাধারণ মানুষ তার পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করছে। এই দৃশ্য শুধু প্রতীকী ছিল না; এটি ছিল একটি সামাজিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ। খাল খননের পরবর্তী সময়টি ছিল শার্শার জন্য এক অর্থনৈতিক পরিবর্তনের যুগ। প্রধান পরিবর্তনগুলো ছিল-বৃষ্টির পানি দ্রুত বের হয়ে যাওয়ায় জমি চাষযোগ্য হয়। সেচ সুবিধা তৈরি হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমেও ধান চাষ শুরু হয়। একসময় অনাবাদি থাকা জমি থেকে একাধিক ফসল উৎপাদন সম্ভব হয়। কৃষকরা ঋণমুক্ত হয়ে তুলনামূলক স্থিতিশীল অর্থনৈতিক অবস্থায় আসে। এই পরিবর্তন শুধু কৃষি নয়, স্থানীয় বাজার, শ্রমবাজার এবং সামাজিক কাঠামোকেও প্রভাবিত করে।

 

উলাশী খাল শুধু কৃষি নয়, সমাজকেও বদলে দিয়েছিল কর্মসংস্থান বৃদ্ধিগ্রামীণ অর্থনীতিতে গতিশীলতা, স্থানীয় বাজার সম্প্রসারণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় পরোক্ষ উন্নতি গ্রামীণ সমাজে তখন একটি নতুন আশাবাদ জন্ম নেয়-“পানি নিয়ন্ত্রণ মানেই জীবন নিয়ন্ত্রণ।” যে অবকাঠামো একসময় উন্নয়নের প্রতীক ছিল, তা সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে অবহেলিত হয়ে পড়ে। খালের বর্তমান অবস্থার পেছনে প্রধান কারণগুলো- পলি জমে ভরাট হওয়া, নদী ও বৃষ্টির পানি থেকে আসা পলি ধীরে ধীরে খাল ভরাট করে ফেলে। নিয়মিত খনন বা ড্রেজিং না হওয়ায় প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। খালের কিছু অংশ ব্যক্তিগত ব্যবহারের আওতায় চলে যায়।

 

স্থানীয় পানি ব্যবস্থাপনা কাঠামো কার্যকরভাবে কাজ করেনি। ফলে যে খাল একসময় জীবনদায়ী ছিল, তা ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। বর্তমানে খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে নেতৃত্ব ও উপস্থিতির বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে আলোচিত হলেও মূল গুরুত্ব থাকা উচিত এর বাস্তব প্রয়োগে। মাননীয প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর মাধ্যমে এই পুনঃখনন কর্মসূচি উদ্বোধনের ঘোষণা স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। তবে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা কেবল উদ্বোধন নয়, বরং-দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা নিরসন,টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা।

 

উলাশী-যদুনাথপুর খাল শুধু একটি কৃষি অবকাঠামো নয়, এটি একটি পরিবেশগত ব্যবস্থা। তাই এর পুনঃখননকে কেবল উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে দেখলে ভুল হবে; বরং এটি একটি নদী-খাল-জলাভূমি সমন্বিত পরিবেশ ব্যবস্থার পুনর্গঠন হিসেবে দেখা জরুরি। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই ভূখ-, বিশেষ করে যশোর এবং আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল, বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের চাপে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। গত দুই দশকে এই অঞ্চলে তিনটি বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে-বৃষ্টি কখনও অতি বেশি, আবার কখনও দীর্ঘ খরা।

 

এই অনিশ্চয়তা কৃষি পরিকল্পনাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। অপরিকল্পিত সড়ক, বাঁধ এবং ভরাট হওয়া খালগুলো পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে বর্ষায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন বাড়ায় পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। এই তিনটি সংকট একসাথে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। এ অবস্থায় উলাশী খালের মতো একটি জলপথ পুনরায় সচল করা কেবল ঐতিহ্য নয়, বরং একটি পরিবেশগত প্রয়োজন। বর্তমান উন্নয়ন নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো-প্রাকৃতিক খাল ব্যবস্থা কি আধুনিক অবকাঠামোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে?

 

অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে-রাস্তা নির্মাণে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়, ড্রেনেজ ব্যবস্থা খালের সঙ্গে সমন্বিত নয়, নগরায়ন ও কৃষিজমি ব্যবস্থাপনার মধ্যে সমন্বয় নেই, ফলে প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। উলাশী খালের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। একসময় যে খাল ছিল জীবন্ত জলপথ, তা ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে বিচ্ছিন্ন জলাশয়ে। খাল ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা প্রযুক্তি নয়, বরং প্রশাসনিক ধারাবাহিকতার অভাব। প্রধান সমস্যা-একবার খনন করে দায়িত্ব শেষ মনে করা হয়।

 

নতুন প্রকল্পে অর্থ থাকলেও পুরোনো প্রকল্প রক্ষণাবেক্ষণে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়। গ্রাম পর্যায়ে কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনা কমিটি অনেক জায়গায় নিষ্ক্রিয়। খাল দখল বা ভরাট এই কাঠামোগত দুর্বলতা গুলোই উলাশী খালকে ধীরে ধীরে মৃতপ্রায় অবস্থায় নিয়ে গেছে। উলাশী খালের পরিবেশগত ভূমিকা বহুমাত্রিক-বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি সরিয়ে কৃষিজমি রক্ষা করা। খাল পানির প্রাকৃতিক রিচার্জ সিস্টেম হিসেবে কাজ করে। খাল ও এর আশপাশে মাছ, জলজ উদ্ভিদ ও পাখির আবাস তৈরি হয়। জলাধার স্থানীয় মাইক্রোক্লাইমেট নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। অর্থাৎ, খাল কেবল কৃষির জন্য নয়, পুরো পরিবেশ ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

 

মাননীয প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর উপস্থিতিতে উলাশী খাল পুনঃখননের উদ্যোগ স্থানীয়ভাবে আশার সঞ্চার করেছে। তবে এই উদ্যোগ সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে কয়েকটি বাস্তব শর্তের ওপর-খালের গভীরতা, ঢাল ও সংযোগ নদীর সঙ্গে সঠিকভাবে পরিকল্পিত হতে হবে। বেতনা নদী-এর প্রবাহ ঠিক না থাকলে খাল কার্যকর হবে না। স্থানীয় পর্যায়ে একটি শক্তিশালী পানি ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন জরুরি। প্রতি বছর বা নির্দিষ্ট সময় পর খনন ও পলি অপসারণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। খালের দুই পাশ দখলমুক্ত রাখতে প্রশাসনিক নজরদারি প্রয়োজন। বাস্তবতা বনাম প্রত্যাশা: সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি গ্রামীণ মানুষের প্রত্যাশা খুব সহজ-খাল সচল হোক, পানি জমে ফসল নষ্ট না হোক, সেচ সহজলভ্য হোক, উৎপাদন বাড়ুক, তাদের কাছে উন্নয়ন মানে জটিল নীতি নয়, বরং মাঠে বাস্তব পরিবর্তন। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা তাদের শেখায়-উদ্বোধন অনেক হয়েছে, কাজ কম টেকসই হয়েছে।

 

উলাশী খালের পুনঃখনন প্রকল্প কেবল একটি অবকাঠামো উদ্যোগ নয়; এটি একটি পরীক্ষা-আমরা কি ইতিহাস থেকে শিখতে পারি? জলবায়ু পরিবর্তন, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং সামাজিক অংশগ্রহণ-এই তিনটি বিষয় যদি একসঙ্গে সমাধান না করা হয়, তাহলে যে কোনো খাল খনন প্রকল্প কাগজে সফল হলেও বাস্তবে ব্যর্থ হতে পারে। উলাশী-যদুনাথপুর খাল পুনঃখনন এখন আর কেবল একটি স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি পরিণত হয়েছে একটি রাজনৈতিক, সামাজিক এবং উন্নয়ন-দর্শনের প্রতীকে। পাঁচ দশক আগে যে খালকে ঘিরে একটি কৃষি বিপ্লব ঘটেছিল, আজ তা আবার আলোচনায় এসেছে নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। ফলে প্রশ্ন উঠছে-এটি কি কেবল উন্নয়ন প্রকল্প, নাকি উন্নয়নের ভাষায় রাজনৈতিক বার্তাও? বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়ন ইতিহাসে প্রায় সব বড় অবকাঠামো প্রকল্পের সঙ্গে রাজনীতি গভীরভাবে যুক্ত।

 

উলাশী খালের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়। ১৯৭৬ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সরাসরি মাঠে নেমে যে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছিলেন, তা ছিল রাষ্ট্রীয় উন্নয়নে জনগণের অংশগ্রহণের এক প্রতীকী রূপ। আজ আবার যখন সেই খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এতে তারেক রহমান-এর উপস্থিতি ও সম্পৃক্ততা আলোচনায় এসেছে, তখন বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক গুরুত্ব পাচ্ছে। কিন্তু উন্নয়ন বিশ্লেষণের প্রশ্ন হলো-এই রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা কি উন্নয়নকে শক্তিশালী করে, নাকি কখনও কখনও তা প্রতীকের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলে? ১৯৭৬ সালের খাল খনন ছিল এই ধারার একটি শক্তিশালী উদাহরণ।

 

যেখানে-পরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদি, রক্ষণাবেক্ষণ কাঠামো শক্তিশালী, রাজনৈতিক পরিবর্তনের বাইরে টেকসই ব্যবস্থা থাকে, বর্তমান সময়ে উলাশী খালের টেকসই ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই দ্বিতীয় ধারার ওপর। উলাশী খাল পুনঃখনন সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক পরিবর্তন ঘটতে পারে-পানি নিষ্কাশন ও সেচ ব্যবস্থার উন্নতি হলে-একাধিক ফসল উৎপাদন সম্ভব হবেবোরো ধানের আবাদ আরও বিস্তৃত হবে, কৃষকের আয় বৃদ্ধি পাবে। খাল পুনঃখনন ও পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণ কাজে-স্থানীয় শ্রমিকদের কাজের সুযোগ বাড়বে, মৌসুমি কর্মসংস্থান তৈরি হবে। অতিরিক্ত উৎপাদন-চালকল, কৃষি-প্রসেসিং, বাজার সম্প্রসারণ, এসব খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে। অর্থনীতির ভাষায়, একটি খাল পুনঃখনন শুধু কৃষিতে সীমাবদ্ধ থাকে না।

 

এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে-পরিবহন খাতে, স্থানীয় বাজারে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়, এমনকি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও। যখন কৃষকের আয় বাড়ে, তখন তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে, যা পুরো গ্রামীণ অর্থনীতিকে সক্রিয় করে। বাংলাদেশের বহু উন্নয়ন প্রকল্পের অভিজ্ঞতা বলে-প্রকল্প শুরু হওয়া সহজ, কিন্তু টিকিয়ে রাখা কঠিন। উলাশী খালের ক্ষেত্রেও সম্ভাব্য ঝুঁকি রয়েছে-নতুন সরকার এলে অনেক প্রকল্পের অগ্রাধিকার বদলে যেতে পারে। প্রথম খননের পর নিয়মিত পরিচর্যা না হলে খাল আবার ভরাট হবে। খালের জায়গা ধীরে ধীরে দখল হয়ে যেতে পারে। বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য স্থায়ী বাজেট না থাকলে প্রকল্প দুর্বল হয়ে পড়বে।

 

উলাশী খালকে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর রাখতে হলে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন-শুধু উলাশী খাল নয়, পুরো বেতনা নদী-নির্ভর পানি ব্যবস্থাকে একসঙ্গে পরিকল্পনা করতে হবে। প্রবাহ, পলি ও পানি স্তর পর্যবেক্ষণে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। গ্রাম পর্যায়ে জনগণকে সরাসরি ব্যবস্থাপনায় যুক্ত করতে হবে। খাল দখল বা দূষণ করলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। উলাশী খালের ইতিহাস আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়-উন্নয়ন কি কেবল উদ্বোধনের ছবি, নাকি ধারাবাহিক ব্যবস্থাপনার প্রক্রিয়া? ১৯৭৬ সালে খাল খনন ছিল অংশগ্রহণমূলক উন্নয়নের এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

 

আজকের চ্যালেঞ্জ হলো সেই অংশগ্রহণকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া। উলাশী খাল পুনঃখনন প্রকল্প সফল হলে এটি হতে পারে-কৃষি পুনর্জাগরণের প্রতীক, জলবায়ু অভিযোজনের মডেল, গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন চালিকা শক্তি, কিন্তু ব্যর্থ হলে এটি যোগ করবে আরেকটি অধ্যায়-যেখানে ইতিহাসের একটি উদ্যোগ সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেছে অবহেলায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর উপস্থিতিতে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং স্থানীয় অংশগ্রহণের ওপর। উলাশী খাল আমাদের মনে করিয়ে দেয়-উন্নয়ন কোনো একক ঘটনার নাম নয়, এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। কোদাল দিয়ে শুরু হতে পারে, কিন্তু শেষ হয় ব্যবস্থাপনা, নীতি এবং মানুষের অংশগ্রহণে। ইতিহাস আমাদের পথ দেখায়, কিন্তু ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে হয় দায়িত্বশীল বাস্তবায়নের মাধ্যমে।

লেখক: সংবাদকর্মী