পহেলা জুন থেকে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত টানা তিন মাসের জন্য সুন্দরবনে মানুষের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে বনবিভাগ। এই সময়ে বনের ভেতর মাছ ও কাঁকড়া শিকার, মধু আহরণ যেমন বন্ধ থাকবে, তেমনি বন্ধ থাকবে সব ধরনের পর্যটনও। মূলত জুন থেকে আগস্টÑএই তিন মাস সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী ও মৎস্য সম্পদের প্রজনন মৌসুম। প্রকৃতির নিয়মেই এই সময়ে নিভৃত পরিবেশ প্রয়োজন। তাই সুন্দরবনকে মানুষের আগ্রাসন থেকে সাময়িক মুক্তি দিয়ে যে ‘বিশ্রাম’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং প্রশংসনীয়।
সুন্দরবন কেবল আমাদের অহংকার নয়, এটি উপকূলীয় অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস কিংবা সিডর-আইলার মতো প্রলয়ংকরী প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে এই বন বুক চিতিয়ে লাখো মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করে। কিন্তু বছরের বাকিটা সময় এই বনের ওপর মানুষের যে চাপ থাকে, তা এককথায় নির্মম। তথ্যমতে, বছরে শুধু বৈধভাবেই লাখাধিকবার বনজীবীরা সুন্দরবনে প্রবেশ করেন, যার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে হাজার হাজার পর্যটকের আনাগোনা। মানুষের এই অতি-উপস্থিতি, কোলাহল এবং যান্ত্রিক নৌযানের শব্দ বনের ভেতরের প্রাণীদের স্বাভাবিক প্রজনন ও বিচরণকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করে। এই প্রেক্ষাপটে, বছরের নির্দিষ্ট একটা সময়ে বনের দরজা বন্ধ রাখা প্রকৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য অপরিহার্য।
তবে এই প্রশংসনীয় উদ্যোগের মুদ্রার ওপিঠে রয়েছে একটি মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট। সুন্দরবনের ওপর সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ৩০ হাজার বনজীবী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। এই তিন মাস মাছ, কাঁকড়া বা মধু সংগ্রহ বন্ধ থাকায় এই বিশাল জনগোষ্ঠী হুট করেই পুরোপুরি কর্মহীন হয়ে পড়বে। অভাবের তাড়নায় এই সময়ে পরিবারগুলো যাতে মহাজনদের চড়া সুদের ঋণের ফাঁদে না পড়ে, কিংবা জীবিকার তাগিদে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বনে অনুপ্রবেশ না করে-সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি।
সরকারের পক্ষ থেকে এই নিষেধাজ্ঞা চলাকালে নিবন্ধিত জেলে ও বনজীবীদের জন্য যে খাদ্য সহায়তা (ভিজিএফ চাল) দেওয়া হয়, তা যেন প্রকৃত ভুক্তভোগীদের কাছে সময়মতো এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে পৌঁছায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। শুধু চাল দেওয়াই যথেষ্ট নয়, পাশাপাশি এই তিন মাস তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের কোনো সুযোগ তৈরি করা যায় কি না, তাও ভেবে দেখা দরকার।
পরিশেষে বলা যায়, সুন্দরবন বাঁচলে বাঁচবে উপকূল, আর উপকূল বাঁচলে বাঁচবে বাংলাদেশ। সুন্দরবনকে সাময়িক বিশ্রাম দেওয়ার এই উদ্যোগ তখনই শতভাগ সফল হবে, যখন বনের সুরক্ষার পাশাপাশি এর ওপর নির্ভরশীল মানুষগুলোর পেটের ভাত নিশ্চিত করা যাবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং মানবিক সংকটের টেকসই সমাধানÑএই দুইয়ের সমন্বয়েই সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য আবার তার আপন রূপ ফিরে পাক, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।