এক বছর বিচারকশূন্য সাতক্ষীরা নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনাল
অনলাইন ডেস্ক: সুন্দরবনের শ্যালক চর ও নারকেলবাড়িয়া এলাকায় আশ্রয় নেওয়া জেলে বহর হানা দিয়ে একটি ফিশিং ট্রলারসহ ৫ জেলেকে অপহরণ করে বনদস্যু বড় জাহাঙ্গীর বাহিনী। শনিবার (২২ আগস্ট) দিবাগত রাত ১০টার দিকে এ অপহরণের ঘটনা। তবে রবিবার (২৩ আগস্ট) বিকেলে অপহরণের বিষয়টি জানাজানি হয়।
অপহৃত জেলেরা হলেন, বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলা দক্ষিণ রাজাপুর গ্রামের জাহাঙ্গীর হাওলাদার (৩৮), শিহাব হাওলাদার (৩৫), সাব্বির হাওলাদার (৩০), রিপন হাওলাদার (২৮) এবং উত্তর রাজাপুর গ্রামের জাকির হাওলাদার (৪০)। অপহরণের পর জেলেরা কোথায় এবং কী অবস্থায় আছেন তা নিশ্চিত করতে পারেননি বন বিভাগ ও মহাজনরা।
অপহৃত জেলেদের মহাজন বাবুল মাঝি জানান, অপহরণের পর দস্যুরা এখন পর্যন্ত কোনো যোগাযোগ করেনি। জেলেদেরকে বনের কোথায় নিয়ে গেছে তাও জানা সম্ভব হয়নি। অপহরণের খবর শুনে জেলেদের পরিবারে উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে।
সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের শ্যালার চর টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারণে সাগর থেকে উঠে বেশ কয়েকটি ট্রলার নিয়ে জেলেরা শ্যালার চরের কালামিয়া ও নারকেলবাড়িয়া এলাকায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। রাত ১০ টার দিকে বনদস্যু বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর সশস্ত্র দস্যুরা এসে হানা দেয় জেলে বহরে। এসময় অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে মৎস্য ব্যবসায়ী বাবুল মাঝির একটি ট্রলারসহ তিন জেলেকে এবং অপর দুটি ট্রলার থেকে আরও দুই জেলেসহ মোট পাঁচ জনকে তুলে নিয়ে যায়। জেলে অপহরণের খবর পেয়ে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, জেলেদের অপহরণের কথা আমরা শুনেছি। আমরা প্রতিনিয়ত খোঁজখবর রাখছি। বিষয়টি কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনকে জানানো হয়েছে। হঠাৎ করে বনদস্যুদের উৎপাত বেড়ে যাওয়ায় কোস্টগার্ড ও বনবিভাগ যৌথভাবে টহল জোরদার করেছে।
পাটকেলঘাটা প্রতিনিধি: পাটকেলঘাটায় এনজিও ঋণের কিস্তির টাকা দিকে না পারায় গ্রেপ্তার হয়েছে এক নারী। রবিবার দিবাগত রাতে পাটকেলঘাটা থানার পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার নারীর নাম মমতাজ বেগম। তিনি পাটকেলঘাটার তৈলকুপি গ্রামের শাহাজাহান সরদারের স্ত্রী।
জানা গেছে, নিয়মিত কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে না পারায় মমতাজ বেগম এর বিরুদ্ধে এনজিও উন্নয়ন প্রচেষ্টা আদালতে মামলা দায়ের করে। এ মামলায় থানা পুলিশ গতকাল রাতে তার বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করেছে।
মো. মামুন হাসান
মানচিত্রে সাতক্ষীরাকে খুঁজলে চোখ থমকে যায় দেশের একেবারে দক্ষিণ পশ্চিম কোণে, যেখানে বাংলাদেশের ভূখণ্ড শেষ হয়ে মিশে গেছে ভারতের সীমান্তে আর সুন্দরবনের অসীম সবুজে। ভৌগোলিক অবস্থানের এই প্রান্তিকতাই দীর্ঘদিন সাতক্ষীরাকে চিনিয়েছে কেবল একটি সীমান্ত জেলা হিসেবে, উন্নয়নের মানচিত্রে যার অবস্থান প্রায়ই থেকে গেছে প্রান্তিক। কিন্তু পরিসংখ্যান আর সাম্প্রতিক নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো ভিন্ন এক গল্প বলছে, এই জেলা সীমান্ত নয়, বরং সম্ভাবনার এক অব্যবহৃত ভাণ্ডার।
সাদা সোনার অর্থনীতি দিয়েই শুরু করা যাক। সাতক্ষীরা প্রাকৃতিক সম্পদ, কৃষি, মৎস্য ও মানবসম্পদের কারণে দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে, যেখানে চিংড়ি রপ্তানি থেকে শুরু করে কৃষিক্ষেত্রে নতুন প্রযুক্তি প্রয়োগ, সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন শিল্প ও প্রবাসী আয় মিলিয়ে এই অঞ্চল দেশের অর্থনৈতিক ভান্ডার হিসেবে বিবেচিত। সংখ্যার ভাষায় এই সম্ভাবনা আরও স্পষ্ট, সাতক্ষীরায় প্রতিবছর হাজার কোটি টাকার মাছ ও চিংড়ি রপ্তানি হয়, যা বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি বড় উৎস, এবং জেলার লবণাক্ততা সহিষ্ণু কৃষি প্রযুক্তি ইতিমধ্যে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। যে লবণাক্ততাকে আমরা এতদিন কেবল সংকট হিসেবে দেখেছি, সেই একই লবণাক্ততার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া বাগদা চিংড়ি চাষ আজ জেলার অর্থনীতির মেরুদণ্ড।
নীতিগত স্বীকৃতির দিক থেকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরে গেছে সাতক্ষীরার ভাগ্যে। সরকারি সিদ্ধান্তে জেলাটিকে ঘোষণা করা হয়েছে অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে, অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণার ফলে উৎপাদিত পণ্যের অভ্যন্তরীণ বাজার যেমন বিস্তৃত হবে, তেমনি বৈদেশিক বাণিজ্যও বাড়বে, পরিকল্পিত উপায়ে শিল্প কারখানা গড়ে উঠবে এবং কাঁচামাল আমদানিতে বন্দরের গুরুত্বও বাড়বে, যার ফলে এ জেলার মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়বে এবং বেকারত্ব কমবে। এই একটি প্রশাসনিক স্বীকৃতি আসলে একটি ঘোষণাপত্র, যা বলছে, সাতক্ষীরা আর কেবল কৃষি বা মৎস্যনির্ভর প্রান্তিক জেলা থাকবে না, বরং হয়ে উঠতে পারে একটি পরিকল্পিত শিল্প ও বাণিজ্যকেন্দ্র।
তবে এই সম্ভাবনার পথে বাধাও কম নয়, প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও সাতক্ষীরা দীর্ঘদিন ধরে থেকে গেছে অবহেলিত।অবকাঠামোগত ঘাটতি, যার মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের অবহেলার শিকার সাতক্ষীরা শ্যামনগর মহাসড়কের নির্মাণকাজ দ্রুত সম্পন্ন করা, বাগদা চিংড়িসহ রুই কাতলা ভেটকি ও পারশে মাছ সংরক্ষণ ও রপ্তানির জন্য একটি আধুনিক মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ জোন প্রতিষ্ঠা করা, এবং মাদক নিয়ন্ত্রণ ও চোরাচালান রোধে সীমান্ত এলাকায় স্থায়ী সড়ক নির্মাণ করা। এই তিনটি দাবিই আসলে একটি অভিন্ন বার্তা দেয়, সাতক্ষীরার সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে পারছে না অবকাঠামোর অভাবে, সম্পদের অভাবে নয়।
এই আলোচনায় সুন্দরবনের ভূমিকাকেও পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার। সাতক্ষীরা কেবল একটি কৃষি বা মৎস্য জেলা নয়, এটি বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনের প্রবেশদ্বারও বটে। সুন্দরবনের ভৌগোলিক অবস্থান পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার একটি বড় হাতিয়ার হতে পারে। যদি মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিকল্পিত শিল্পায়ন আর সুন্দরবনকেন্দ্রিক ইকো ট্যুরিজম একসঙ্গে একটি সমন্বিত উন্নয়ন কাঠামোয় গাঁথা যায়, তবে সাতক্ষীরা হয়ে উঠতে পারে দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার, যেখানে রপ্তানি বাণিজ্য, কৃষি উদ্ভাবন আর পর্যটন একসঙ্গে একটি নতুন অর্থনৈতিক বাস্তুতন্ত্র গড়ে তুলবে।
শেষ পর্যন্ত সাতক্ষীরার গল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় শিক্ষা দেয়। সীমান্তবর্তী অবস্থান কোনো জেলাকে প্রান্তিক করে রাখার কারণ হতে পারে না, বরং সঠিক পরিকল্পনায় সেই একই অবস্থান হয়ে উঠতে পারে কৌশলগত সুবিধা। অর্থনৈতিক অঞ্চলের স্বীকৃতি ইতিমধ্যে দরজা খুলে দিয়েছে, এখন প্রয়োজন সড়ক, বন্দর সুবিধা আর প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামোর মাধ্যমে সেই দরজা দিয়ে প্রকৃত বিনিয়োগ আর কর্মসংস্থান প্রবেশ করানো। সাতক্ষীরা তাই আক্ষরিক অর্থে দেশের সীমান্ত হলেও, তার সম্ভাবনার কোনো সীমানা নেই, প্রয়োজন কেবল সেই সম্ভাবনাকে চেনার আর লালন করার সাহস।
লেখক: মো. মামুন হাসান, ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান,ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।