বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬, ১৭ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬, ১৭ আষাঢ় ১৪৩৩

অদেখা গ্রামীণ অর্থনীতির মানচিত্র

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬, ৭:২১ অপরাহ্ণ
অদেখা গ্রামীণ অর্থনীতির মানচিত্র

মোঃ মামুন হাসান

বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন চালিকাশক্তি খোঁজার আলোচনা যখন ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে, তখন একটি প্রশ্ন সামনে আসে। উন্নয়নের জন্য কি সবসময় শত শত কোটি টাকার অবকাঠামো দরকার, নাকি মানুষের জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও প্রকৃতিই হতে পারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল সম্পদ? এই প্রশ্নের একটি বাস্তবসম্মত উত্তর লুকিয়ে আছে সাতক্ষীরার নদী, খাল, মৎস্যঘের, বাঁশের সাঁকো এবং মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ সংস্কৃতির মধ্যে।

বিশ্ব পর্যটন বাজার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। একসময় পর্যটকরা কেবল দর্শনীয় স্থান দেখতে যেতেন, এখন তারা অভিজ্ঞতা কিনতে চান। জাতিসংঘ, বিশ্ব পর্যটন সংস্থা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, অভিজ্ঞতাভিত্তিক পর্যটন, গ্রামীণ পর্যটন ও কমিউনিটি পরিচালিত পর্যটন বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত সম্প্রসারিত পর্যটন খাতগুলোর একটি। পর্যটকেরা এখন পাঁচতারা হোটেলের কৃত্রিম পরিবেশের চেয়ে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে বসে খাবার খাওয়া, কৃষকের সঙ্গে মাঠে কাজ করা, জেলের সঙ্গে নদীতে যাওয়া কিংবা প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকার অভিজ্ঞতাকে বেশি মূল্য দিচ্ছেন।

এই পরিবর্তিত বৈশ্বিক প্রবণতার প্রেক্ষাপটে সাতক্ষীরা বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় অঞ্চল। সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত হলেও জেলার প্রকৃত সম্ভাবনা কেবল বনভিত্তিক পর্যটনে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে রয়েছে শত শত কিলোমিটার নদীপথ, বিস্তীর্ণ চিংড়ি ও কাঁকড়া খামার, গ্রামীণ জীবনধারা, লোকজ সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী খাদ্য এবং তুলনামূলকভাবে দূষণমুক্ত পরিবেশ। এই সম্পদগুলোকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তরের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হতে পারে কমিউনিটি ভিত্তিক পর্যটন ও হোমস্টে মডেল।

এই মডেলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর অর্থনৈতিক গুণক প্রভাব। একটি পর্যটক যখন কোনো গ্রামে রাতযাপন করেন, তখন তার ব্যয় কেবল আবাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তিনি স্থানীয় কৃষকের উৎপাদিত খাদ্য খান, স্থানীয় নৌকা ব্যবহার করেন, স্থানীয় গাইড নিয়োগ করেন, স্থানীয় নারীদের তৈরি পণ্য কিনেন এবং স্থানীয় পরিবহন ব্যবহার করেন। ফলে একই অর্থ বারবার স্থানীয় অর্থনীতির মধ্যে আবর্তিত হয়। অর্থনীতির ভাষায় একে স্থানীয় গুণক প্রভাব বলা হয়।

ধরা যাক, সাতক্ষীরার একটি গ্রামে মাত্র বিশটি পরিবার হোমস্টে কার্যক্রমে যুক্ত হলো। প্রতিটি পরিবার বছরে গড়ে একশ দিন পর্যটক আতিথেয়তা প্রদান করলে এবং প্রতিদিন গড়ে তিন হাজার টাকা আয় করলে শুধুমাত্র আবাসন ও খাদ্যসেবা থেকেই বছরে প্রায় ষাট লাখ টাকার অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি হবে। এর সঙ্গে পরিবহন, গাইডিং, হস্তশিল্প, কৃষিপণ্য, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও অন্যান্য সেবা যুক্ত হলে একটি ছোট গ্রামেই বছরে এক কোটির বেশি টাকার স্থানীয় অর্থনৈতিক প্রবাহ তৈরি হওয়া সম্ভব। জেলার একশটি গ্রামে একই মডেল বাস্তবায়িত হলে এই অর্থনৈতিক কর্মকান্ড কয়েকশ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই আয় সরাসরি তৃণমূল মানুষের হাতে পৌঁছায়। বড় হোটেল বা রিসোর্টভিত্তিক পর্যটনে অধিকাংশ মুনাফা কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়। কিন্তু কমিউনিটি পর্যটনে উপকারভোগী হয় পুরো গ্রাম। এতে নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টি হয়, যুবকদের কর্মসংস্থান বাড়ে এবং গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসনের চাপ কমে।

সাতক্ষীরার জন্য কৃষি পর্যটন, মৎস্য পর্যটন, নদী পর্যটন, লোকসংস্কৃতি পর্যটন, আলোকচিত্র পর্যটন, শিক্ষাভিত্তিক পর্যটন এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান পর্যটনের মতো বিশেষায়িত পণ্য তৈরি করা সম্ভব। শহরের আলোক দূষণ থেকে দূরে সাতক্ষীরার উন্মুক্ত আকাশ জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুরাগীদের জন্য একটি নতুন আকর্ষণ হতে পারে। একইভাবে চিংড়ি ও কাঁকড়া উৎপাদন কেন্দ্রিক অভিজ্ঞতামূলক ভ্রমণ বিদেশি পর্যটকদের জন্য একটি অনন্য পণ্য হয়ে উঠতে পারে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় বিরল।

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ জেলা হিসেবে সাতক্ষীরার জন্য এই মডেলের আরেকটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা ও কৃষি উৎপাদনের অনিশ্চয়তার মধ্যে বিকল্প আয়ের উৎস সৃষ্টি করা এখন সময়ের দাবি। কমিউনিটি পর্যটন জলবায়ু অভিযোজনভিত্তিক অর্থনীতির একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। কারণ এখানে প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস না করেই আয় সৃষ্টি করা সম্ভব। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতিগত সহায়তা। গ্রামীণ হোমস্টে নিবন্ধন নীতিমালা, স্বল্পসুদে সবুজ ঋণ, ডিজিটাল বুকিং প্ল্যাটফর্ম, নিরাপত্তা মানদন্ড এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করতে হবে। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার, পর্যটন করপোরেশন, বেসরকারি খাত এবং স্থানীয় জনগণকে সমন্বিত অংশীদারিত্বে কাজ করতে হবে।

এক্ষেত্রে সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করতে পারে। পর্যটক সেবা, আতিথেয়তা ব্যবস্থাপনা, খাদ্য নিরাপত্তা, গাইডিং, ডিজিটাল বিপণন এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন বিষয়ে স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ চালুর মাধ্যমে হাজারো যুবক ও নারীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা সম্ভব। এতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি কেবল ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের ভূমিকায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি কার্যকর কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।

আজকের বিশ্বে উন্নয়ন মানে শুধু সেতু, সড়ক কিংবা কংক্রিটের স্থাপনা নয়। উন্নয়ন মানে স্থানীয় সম্পদকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করার সক্ষমতা। সাতক্ষীরার বাঁশের সাঁকো, নদীর পাড়, মৎস্যঘের এবং মানুষের আন্তরিক আতিথেয়তা যদি সঠিক পরিকল্পনা ও নীতিগত সহায়তা পায়, তবে এগুলোই একদিন শত কোটি টাকার টেকসই অর্থনীতির ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। উন্নয়নের ভবিষ্যৎ হয়তো কোনো বহুতল ভবনের কাচের দেয়ালে নয়, বরং সাতক্ষীরার একটি সাধারণ গ্রামে দাঁড়িয়ে থাকা বাঁশের সাঁকোর ওপরই লেখা আছে।

লেখক: ইনস্ট্রাক্টর ও বিভাগীয় প্রধান,ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ,সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।

Ads small one

সাতক্ষীরা সীমান্তে বিজিবির অভিযানে চব্বিশ লক্ষাধিক টাকার ভারতীয় মালামাল আটক

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬, ৫:৫৪ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরা সীমান্তে বিজিবির অভিযানে চব্বিশ লক্ষাধিক টাকার ভারতীয় মালামাল আটক

পত্রদূত রিপোর্ট: বৃহস্পতিবার (০২ জুলাই ২০২৬) সাতক্ষীরা ৩৩ বিজিবি ব্যাটালিয়ন এর অধীনস্থ পদ্মশাখরা, তলুইগাছা, ভোমরা, কালিয়ানী, কাকডাঙ্গা ও মাদরা বিওপি এবং ঝাঁউডাঙ্গা বিশেষ ক্যাম্প এর টহলদল দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় মাদকসহ চোরাচালান বিরোধী বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে ভারতীয় মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশ, ঔষধ এবং মদ আটক করেছে।

সাতক্ষীরা ৩৩ বিজিবি ব্যাটালিয়ন হেডকোয়াটার জানায়, পদ্মশাখরা বিওপির আভিযানে সাতক্ষীরা সদর থানার হাড়দ্দাহ হতে ১ লাখ ৪৯ হাজার টাকার ভারতীয় মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশ আটক করে। কালিয়ানী বিওপির আভিযানে সাতক্ষীরা সদর থানার ছয়ঘরিয়া পাকা রাস্তার মোড় হতে ৬৪ হাজার ৮০০ টাকার ভারতীয় মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশ আটক করে। ভোমরা বিওপির আভিযানে সাতক্ষীরা সদর থানার লক্ষীদাড়ি দক্ষিণ পাকা রাস্তা হতে ৪ হাজার ৭৫০ টাকার ভারতীয় মদ আটক করে।

 

তলুইগাছা বিওপির আভিযানে সাতক্ষীরা সদর থানার শাল বাগান হতে ৬ লাখ ৪ হাজার ৮০০ টাকার ভারতীয় মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশ আটক করে। কাকডাঙ্গা বিওপির পৃথক দুইটি আভিযানে কলারোয়া থানার কেড়াগাছি ও ভাদিয়ালি হতে ১০ লাখ ৮২ হাজার টাকার ভারতীয় মোবাইলে ফোনের যন্ত্রাংশ ও ঔষধ আটক করে। মাদরা বিওপির আভিযানে কলারোয়া থানাধীন চান্দা হতে ২ লাখ ১০ হাজার টাকার ভারতীয় ঔষধ আটক করে।

এছাড়াও, ঝাঁউডাঙ্গা বিশেষ ক্যাম্প এর আভিযানে সাতক্ষীরা সদর থানার কামারবাইসা হতে ৩ লাখ ১৪ হাজার ৩০০ টাকার ভারতীয় মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশ আটক করে। আটক পন্যের সর্বমোট মূল্য ২৪ লাখ ২৯ হাজার ৬৫০ টাকা।

বিজিবি আরো জানায়, চোরাকারবারী কর্তৃক বর্ণিত মালামাল শুল্ককর ফাঁকি দিয়ে অবৈধভাবে ভারত হতে বাংলাদেশে পাচার করায় জব্দ করা হয়। এভাবে ভারতীয় দ্রব্য সামগ্রী মাদক ও চোরাচালানের কারণে দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্থ হবার পাশাপাশি দেশ উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আয় হতে বঞ্চিত হচ্ছে।

 

দেশের রাজস্ব ফাঁকি রোধ করে স্থানীয় শিল্প বিকাশে বিজিবি’র এরূপ দেশপ্রেমিক ও জনস্বার্থে পরিচালিত অভিযানে উপস্থিত স্থানীয় জনগন সাধুবাদ জ্ঞাপন করে এ ধরণের অভিযান অব্যাহত রাখার জন্য অনুরোধ করেন।

দেবহাটার মাঝ সখিপুর থেকে ১,০৩৫ বোতল ফেন্সিডিলসহ এক ব্যক্তি গ্রেপ্তার

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬, ৫:৩৫ অপরাহ্ণ
দেবহাটার মাঝ সখিপুর থেকে ১,০৩৫ বোতল ফেন্সিডিলসহ এক ব্যক্তি গ্রেপ্তার

পত্রদূত রিপোর্ট: সাতক্ষীরার দেবহাটা থানার মাঝ সখিপুর এলাকা থেকে ১ হাজার ৩৫ বোতল ফেন্সিডিল উদ্ধার করেছে র‌্যাব-৬ সাতক্ষীরা ক্যাম্পের সদস্যরা। বৃহস্পতিবার (০২ জুলাই ২০২৬) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে উক্ত ফেন্সিডিল উদ্ধার করা হয়। এসময় আটক করা হয়, দেবহাটা থানার মাঝ সখিপুর গ্রামের নওসের আলী সরদারের ছেলে মোঃ কবির হোসেন (৩৮) নামক এক ব্যক্তিকে।

র‌্যাব-৬, সিপিসি-১, সাতক্ষীরা ক্যাম্প জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে দেবহাটা থানার মাঝ সখিপুর এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। এসময় অবৈধ মাদক ১ হাজার ৩৫ বোতল ফেন্সিডিলসহ আসামি মোঃ কবির হোসেনকে গ্রেপ্তার করে। পরবর্তীতে গ্রেপ্তারকৃত আসামির বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে নিয়মিত মামলা রুজু পূর্বক উদ্ধারকৃত মাদক ও আসামিকে সাতক্ষীরা জেলার দেবহাটা থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।

র‌্যাব-৬ সাতক্ষীরার কোম্পানি কমান্ডার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জায়েন উদ্দীন মুহাম্মদ যিয়াদ জানান, অবৈধ অস্ত্র, মাদকদ্রব্য ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে র‌্যাবের অভিযান চলমান থাকবে।

শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়তে প্রয়োজন পরিকল্পিত কর্মসংস্থান

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬, ৪:৫৫ অপরাহ্ণ
শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়তে প্রয়োজন পরিকল্পিত কর্মসংস্থান

এম.এম হায়দার আলী

বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে। বিগত সরকারের আমলে দৃষ্টিনন্দন ব্রিজ, কালভার্ট, সড়ক-মহাড়ক, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ নানা অবকাঠামোগত উন্নয়ন দেশের অগ্রগতির সাক্ষ্য বহন করছে। কিন্তু এই অগ্রযাত্রার মাঝেও একটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে, আর সেটা হলো বেকারত্ব। কর্মক্ষম হয়েও যখন একজন মানুষ কাজের সুযোগ পান না, তখন তা শুধু একটি ব্যক্তিগত সংকট নয়; এটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্যও গভীর উদ্বেগের বিষয়।

 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে বেকারের সংখ্যা আনুমানিক ২৭ থেকে ২৮ লাখ। এর মধ্যে পুরুষ প্রায় ১৭ থেকে ১৮ লাখ এবং নারী প্রায় ১০ লাখ। উচ্চশিক্ষা অর্জনের পরও অসংখ্য তরুণ-তরুণী বছরের পর বছর চাকরির অপেক্ষায় রয়েছেন। অন্যদিকে অনেকে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও উপযুক্ত কাজ না পেয়ে হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন। বেকারত্ব কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি সামাজিক অবক্ষয়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। দীর্ঘদিন কর্মহীন থাকলে অনেকেই হতাশা, মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তায় ভুগতে থাকেন।

 

এই পরিস্থিতিতে কিছু মানুষ মাদকাসক্তি, জুয়া, অনৈতিক কর্মকান্ড কিংবা অন্যান্য সমাজ বিরোধী কাজে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকেন। যদিও এসব অপরাধের পেছনে নানা সামাজিক ও ব্যক্তিগত কারণও থাকে। তবুও কর্মসংস্থানের অভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়। আমাদের সমাজে প্রচলিত প্রবাদ আছে, অলস মস্তিষ্ক শয়তানের বাসা, এই বাস্তবতারই প্রতিফলন। তাই দেশের প্রতিটি জেলায় শিল্পকারখানা, কৃষিভিত্তিক শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, তথ্যপ্রযুক্তি খাত এবং দক্ষতা উন্নয়ন ভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা এখন সময়ের দাবি।

 

রাজধানী কেন্দ্রিক উন্নয়নের পরিবর্তে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে স্থানীয় পর্যায়েই লাখো মানুষের কর্মসংস্থান সম্ভব হবে। এতে শহরমুখী জনগ্রোতও কমবে এবং আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস পাবে। বিশেষ করে নারীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ, সহজ ঋণ এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে তরুণদের আধুনিক প্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কৃষি উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় প্রশিক্ষণ দিয়ে আত্মকর্মসংস্থানে উৎসাহিত করতে হবে।

 

সরকার, বেসরকারি খাত এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সমন্বিত উদ্যোগ নিলে বেকারত্ব উল্লেখযোগ্য ভাবে কমানো সম্ভব। পরিকল্পিত শিল্পায়ন, স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা, বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাই হতে পারে এই সংকট উত্তরণের কার্যকর পথ। একটি কর্মসংস্থান শুধু একজন মানুষের আয়ের পথ খুলে দেয় না; এটি একটি পরিবারের মুখে হাসি ফোটায়, সমাজে স্থিতিশীলতা আনে এবং অপরাধপ্রবণতা কমাতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন, মাদক, জুয়া, চুরি-ছিনতাই, ডাকাতিসহ বিভিন্ন সমাজ বিরোধী কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও অনেক ক্ষেত্রে হ্রাস পেতে পারে।

 

এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার ব্যবস্থার ওপরও, মামলার চাপ কমলে তারা আরও দক্ষতার সঙ্গে জনগণের সেবা দিতে পারবেন। ফলে দেশের প্রতিটি জেলায় সন্তোষজনক কর্মসংস্থানের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারলেই সত্যিকার অর্থে শান্তির সুবাতাস বইবে। সমৃদ্ধ, নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হতে পারে সবার জন্য মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান। সর্বোপরি মনে রাখতে হবে, বেকারত্ব দূর করা শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশ্ন নয়, এটি একটি মানবিক, নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ার অন্যতম পূর্বশর্ত। একটি চাকরি শুধু একজন মানুষের জীবন বদলে দেয় না,বদলে দেয় একটি পরিবার, একটি সমাজ, এমনকি একটি জাতির ভবিষ্যৎ ও…।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট