অদেখা গ্রামীণ অর্থনীতির মানচিত্র
মোঃ মামুন হাসান
বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন চালিকাশক্তি খোঁজার আলোচনা যখন ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে, তখন একটি প্রশ্ন সামনে আসে। উন্নয়নের জন্য কি সবসময় শত শত কোটি টাকার অবকাঠামো দরকার, নাকি মানুষের জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও প্রকৃতিই হতে পারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল সম্পদ? এই প্রশ্নের একটি বাস্তবসম্মত উত্তর লুকিয়ে আছে সাতক্ষীরার নদী, খাল, মৎস্যঘের, বাঁশের সাঁকো এবং মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ সংস্কৃতির মধ্যে।
বিশ্ব পর্যটন বাজার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। একসময় পর্যটকরা কেবল দর্শনীয় স্থান দেখতে যেতেন, এখন তারা অভিজ্ঞতা কিনতে চান। জাতিসংঘ, বিশ্ব পর্যটন সংস্থা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, অভিজ্ঞতাভিত্তিক পর্যটন, গ্রামীণ পর্যটন ও কমিউনিটি পরিচালিত পর্যটন বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত সম্প্রসারিত পর্যটন খাতগুলোর একটি। পর্যটকেরা এখন পাঁচতারা হোটেলের কৃত্রিম পরিবেশের চেয়ে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে বসে খাবার খাওয়া, কৃষকের সঙ্গে মাঠে কাজ করা, জেলের সঙ্গে নদীতে যাওয়া কিংবা প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকার অভিজ্ঞতাকে বেশি মূল্য দিচ্ছেন।
এই পরিবর্তিত বৈশ্বিক প্রবণতার প্রেক্ষাপটে সাতক্ষীরা বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় অঞ্চল। সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত হলেও জেলার প্রকৃত সম্ভাবনা কেবল বনভিত্তিক পর্যটনে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে রয়েছে শত শত কিলোমিটার নদীপথ, বিস্তীর্ণ চিংড়ি ও কাঁকড়া খামার, গ্রামীণ জীবনধারা, লোকজ সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী খাদ্য এবং তুলনামূলকভাবে দূষণমুক্ত পরিবেশ। এই সম্পদগুলোকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তরের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হতে পারে কমিউনিটি ভিত্তিক পর্যটন ও হোমস্টে মডেল।
এই মডেলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর অর্থনৈতিক গুণক প্রভাব। একটি পর্যটক যখন কোনো গ্রামে রাতযাপন করেন, তখন তার ব্যয় কেবল আবাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তিনি স্থানীয় কৃষকের উৎপাদিত খাদ্য খান, স্থানীয় নৌকা ব্যবহার করেন, স্থানীয় গাইড নিয়োগ করেন, স্থানীয় নারীদের তৈরি পণ্য কিনেন এবং স্থানীয় পরিবহন ব্যবহার করেন। ফলে একই অর্থ বারবার স্থানীয় অর্থনীতির মধ্যে আবর্তিত হয়। অর্থনীতির ভাষায় একে স্থানীয় গুণক প্রভাব বলা হয়।
ধরা যাক, সাতক্ষীরার একটি গ্রামে মাত্র বিশটি পরিবার হোমস্টে কার্যক্রমে যুক্ত হলো। প্রতিটি পরিবার বছরে গড়ে একশ দিন পর্যটক আতিথেয়তা প্রদান করলে এবং প্রতিদিন গড়ে তিন হাজার টাকা আয় করলে শুধুমাত্র আবাসন ও খাদ্যসেবা থেকেই বছরে প্রায় ষাট লাখ টাকার অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি হবে। এর সঙ্গে পরিবহন, গাইডিং, হস্তশিল্প, কৃষিপণ্য, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও অন্যান্য সেবা যুক্ত হলে একটি ছোট গ্রামেই বছরে এক কোটির বেশি টাকার স্থানীয় অর্থনৈতিক প্রবাহ তৈরি হওয়া সম্ভব। জেলার একশটি গ্রামে একই মডেল বাস্তবায়িত হলে এই অর্থনৈতিক কর্মকান্ড কয়েকশ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই আয় সরাসরি তৃণমূল মানুষের হাতে পৌঁছায়। বড় হোটেল বা রিসোর্টভিত্তিক পর্যটনে অধিকাংশ মুনাফা কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়। কিন্তু কমিউনিটি পর্যটনে উপকারভোগী হয় পুরো গ্রাম। এতে নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টি হয়, যুবকদের কর্মসংস্থান বাড়ে এবং গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসনের চাপ কমে।
সাতক্ষীরার জন্য কৃষি পর্যটন, মৎস্য পর্যটন, নদী পর্যটন, লোকসংস্কৃতি পর্যটন, আলোকচিত্র পর্যটন, শিক্ষাভিত্তিক পর্যটন এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান পর্যটনের মতো বিশেষায়িত পণ্য তৈরি করা সম্ভব। শহরের আলোক দূষণ থেকে দূরে সাতক্ষীরার উন্মুক্ত আকাশ জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুরাগীদের জন্য একটি নতুন আকর্ষণ হতে পারে। একইভাবে চিংড়ি ও কাঁকড়া উৎপাদন কেন্দ্রিক অভিজ্ঞতামূলক ভ্রমণ বিদেশি পর্যটকদের জন্য একটি অনন্য পণ্য হয়ে উঠতে পারে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় বিরল।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ জেলা হিসেবে সাতক্ষীরার জন্য এই মডেলের আরেকটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা ও কৃষি উৎপাদনের অনিশ্চয়তার মধ্যে বিকল্প আয়ের উৎস সৃষ্টি করা এখন সময়ের দাবি। কমিউনিটি পর্যটন জলবায়ু অভিযোজনভিত্তিক অর্থনীতির একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। কারণ এখানে প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস না করেই আয় সৃষ্টি করা সম্ভব। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতিগত সহায়তা। গ্রামীণ হোমস্টে নিবন্ধন নীতিমালা, স্বল্পসুদে সবুজ ঋণ, ডিজিটাল বুকিং প্ল্যাটফর্ম, নিরাপত্তা মানদন্ড এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করতে হবে। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার, পর্যটন করপোরেশন, বেসরকারি খাত এবং স্থানীয় জনগণকে সমন্বিত অংশীদারিত্বে কাজ করতে হবে।
এক্ষেত্রে সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করতে পারে। পর্যটক সেবা, আতিথেয়তা ব্যবস্থাপনা, খাদ্য নিরাপত্তা, গাইডিং, ডিজিটাল বিপণন এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন বিষয়ে স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ চালুর মাধ্যমে হাজারো যুবক ও নারীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা সম্ভব। এতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি কেবল ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের ভূমিকায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি কার্যকর কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
আজকের বিশ্বে উন্নয়ন মানে শুধু সেতু, সড়ক কিংবা কংক্রিটের স্থাপনা নয়। উন্নয়ন মানে স্থানীয় সম্পদকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করার সক্ষমতা। সাতক্ষীরার বাঁশের সাঁকো, নদীর পাড়, মৎস্যঘের এবং মানুষের আন্তরিক আতিথেয়তা যদি সঠিক পরিকল্পনা ও নীতিগত সহায়তা পায়, তবে এগুলোই একদিন শত কোটি টাকার টেকসই অর্থনীতির ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। উন্নয়নের ভবিষ্যৎ হয়তো কোনো বহুতল ভবনের কাচের দেয়ালে নয়, বরং সাতক্ষীরার একটি সাধারণ গ্রামে দাঁড়িয়ে থাকা বাঁশের সাঁকোর ওপরই লেখা আছে।
লেখক: ইনস্ট্রাক্টর ও বিভাগীয় প্রধান,ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ,সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।






