অবহেলা ও সংরক্ষণের অভাবে অস্তিত্ব সংকটে বুধহাটার দ্বাদশ শিব ও কালীমন্দির
সচ্চিদানন্দ দে সদয়, আশাশুনি: সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বুধহাটা বাজারের অদূরে বেতনা নদীর তীরে অবস্থিত প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো দ্বাদশ শিব ও কালীমন্দির। একসময় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল ১২টি শিবমন্দির। প্রতিটি মন্দিরে ছিল কষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গ। কিন্তু সময়ের বিবর্তন, অবহেলা ও যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে ঐতিহ্যের বড় অংশ হারিয়ে গেছে। বর্তমানে ১২টি মন্দিরের মধ্যে ছয়টি এবং ১২টি শিবলিঙ্গের মধ্যে মাত্র দুটি টিকে আছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। অবশিষ্ট স্থাপনাগুলোও সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় প্রবীণ শিক্ষক সাধন কুমার দে ও এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিদের কাছ থেকে জানা যায়, বাংলা ১১৪৬ সালে খুলনার পাইকগাছা উপজেলার রাড়ুলি গ্রামের জমিদার রাজা রাজবংশী মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময় বুধহাটায় তাঁর কাছারি ছিল। জমিদারি খাজনা আদায়ের কাজে তিনি নৌকা বা বজরা নিয়ে সেখানে আসতেন।
স্থানীয়ভাবে প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, একবার খাজনা আদায়ের কাজে এসে তিনি রাতে কাছারিতে ঘুমিয়ে পড়েন। স্বপ্নে দেবী তাঁকে বুধহাটায় মন্দির প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন। গভীর রাতে ঘুম ভেঙে তিনি নদীতে একটি সাজানো পূজার ঘট ভাসতে দেখেন। দিনটি ছিল চৈত্র মাসের শেষ মঙ্গলবার। তিনি ঘটটি তুলে এনে পূজা করেন এবং সেখানে মন্দির প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। স্থানীয়দের বিশ্বাস, সেই উদ্যোগ থেকেই দ্বাদশ শিব ও কালীমন্দিরের গোড়াপত্তন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মন্দিরের পূজা-অর্চনা ও পরিচালনার জন্য জমিদার রাজা রাজবংশী ৭৪ একর জমি দান করেছিলেন। তবে সময়ের সঙ্গে সেই সম্পত্তি কমে বর্তমানে মাত্র ২ দশমিক ০৩ একর অবশিষ্ট রয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। মন্দিরের জমির একাংশে গরুর হাট বসে। কিন্তু ওই হাট থেকে মন্দির পরিচালনা কমিটি কোনো আয় পায় না বলে অভিযোগ রয়েছে।
মন্দিরের সম্পত্তির সঠিক হিসাব নিরূপণ, জমির সীমানা নির্ধারণ এবং বেদখল হয়ে থাকলে তা উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাঁদের মতে, সম্পত্তি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা গেলে মন্দিরের নিয়মিত পূজা-পার্বণ ও সংস্কারকাজ পরিচালনা সহজ হবে।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মন্দিরটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্বাধীনতার পরও দীর্ঘদিন এর উল্লেখযোগ্য সংস্কার হয়নি। ১৯৭৬ সালের দিকে নওয়াপাড়ার দিনবন্ধু সরকার এবং মহাজনপুরের কার্তিক দেবনাথ ও রমেশ দেবনাথ নিজেদের অর্থায়নে সংস্কারকাজ শুরু করেন। তবে প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে সেই উদ্যোগ বেশি দূর এগোয়নি।
পরবর্তী সময়ে আত্মচৈতন্য সংঘের প্রতিষ্ঠাতা বিল্বমঙ্গল দেবনাথ এবং নবজাগরণী সাংস্কৃতিক সংঘের সাধারণ সম্পাদক ও সাংবাদিক সচ্চিদানন্দ দে সদয়ের তত্ত্বাবধানে মন্দিরটি রক্ষা ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিভিন্ন সময়ে সংগঠনের পক্ষ থেকে মন্দিরের অবস্থা তুলে ধরে সংস্কারের জন্য সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। ২০২১ সালে হিন্দুধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের পক্ষ থেকে ১০ লাখ টাকা অনুদান পাওয়া যায়।
মন্দিরের পুরোহিত অসীম ব্যানার্জী জানান, এখানে প্রতিদিন নিত্যপূজা, সাপ্তাহিক হরিবাসর এবং চৈত্র মাসজুড়ে শিবপূজা ও জল ঢালার আয়োজন করা হয়। এ ছাড়া প্রতিবছর শিবরাত্রি, জন্মাষ্টমী, নামযজ্ঞ, জগদ্ধাত্রী পূজা ও সরস্বতী পূজাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়। তবে মন্দিরের উন্নয়ন ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবে ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনায় নানা অসুবিধা হয়।
বিশিষ্ট ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও ভাগবতীয় আলোচক বিল্বমঙ্গল দেবনাথ বলেন, “বুধহাটার দ্বাদশ শিব ও কালীমন্দির শুধু একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, এটি বহু শত বছরের ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের স্মারক। এমন একটি প্রাচীন মন্দির অবহেলা ও অযত্নে পড়ে থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। মন্দিরটির জরুরি সংস্কার ও সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এ জন্য সরকার, হিন্দুধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট, স্থানীয় প্রশাসন ও বিত্তবান ধর্মপ্রাণ মানুষের সম্মিলিত সহযোগিতা দরকার।”
মন্দিরের সভাপতি সচ্চিদানন্দ দে সদয় বলেন, “এই মন্দির শুধু পূজা-অর্চনার স্থান নয়, এটি কয়েক শত বছরের ইতিহাস ও সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে। একসময় এখানে ১২টি মন্দির ও ১২টি শিবলিঙ্গ ছিল। আজ তার অধিকাংশই হারিয়ে গেছে। ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিক উদ্যোগে যতটুকু সম্ভব হয়েছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য। মন্দিরটির পূর্ণাঙ্গ সংস্কার ও সংরক্ষণে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা প্রয়োজন।”
মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক অজয় পাইন বলেন, “এই মন্দির সংরক্ষণ করা গেলে এলাকার ইতিহাস ও ধর্মীয় ঐতিহ্য রক্ষা পাবে। নতুন প্রজন্মও জানতে পারবে তাদের পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া সম্পদের কথা। মন্দিরের জমি জরিপ করে সঠিক সীমানা নির্ধারণ, বেদখল হয়ে থাকলে জমি উদ্ধার এবং দ্রুত সংস্কারের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি মন্দিরটিকে সরকারি স্বীকৃতি দিয়ে সংরক্ষণের আওতায় আনা প্রয়োজন।”
এদিকে মন্দিরটির উন্নয়ন ও ধর্মীয় কার্যক্রম সম্প্রসারণে ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিক উদ্যোগে নতুন কিছু কাজ শুরু হয়েছে। মন্দির প্রাঙ্গণে রাধাগোবিন্দ মন্দির নির্মাণের কাজ চলছে। পাশাপাশি ভক্তদের রাত্রিযাপনের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণ, জগদ্ধাত্রী মন্দির ও গ্রহরাজ মন্দির প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও রয়েছে। উদ্যোক্তাদের লক্ষ্য, মন্দির প্রাঙ্গণকে একটি পূর্ণাঙ্গ তীর্থস্থান ও ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা।
তবে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজন বিপুল অর্থ। এ জন্য সরকারি সহায়তার পাশাপাশি হিন্দুধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট, সংশ্লিষ্ট দপ্তর, দেশ-বিদেশে বসবাসরত সনাতন ধর্মাবলম্বী, ভক্ত ও বিত্তবান ব্যক্তিদের সহযোগিতা কামনা করেছেন উদ্যোক্তারা। তাঁদের মতে, সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে মন্দিরের অবশিষ্ট স্থাপনা রক্ষা, সংস্কার ও নতুন অবকাঠামো নির্মাণ সম্ভব হবে।
সাতক্ষীরা শহর থেকে আশাশুনি সড়ক ধরে প্রায় ১৪ থেকে ১৬ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে বুধহাটা বাজারে পৌঁছানো যায়। বাজারের কাছেই বেতনা নদীর তীরে মন্দিরটির অবস্থান। আশাশুনি সদর থেকেও সড়কপথে সেখানে যাওয়া যায়।
প্রায় তিন শত বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য বহনকারী বুধহাটার দ্বাদশ শিব ও কালীমন্দির এখন সংরক্ষণের অপেক্ষায়। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সরকারি উদ্যোগ, ধর্মীয় সংগঠন ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত সহযোগিতায় মন্দিরটির অবশিষ্ট স্থাপনা রক্ষা এবং হারানো ঐতিহ্যের স্মৃতি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টিকে থাকবে এ অঞ্চলের ইতিহাস ও ধর্মীয় সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।










