আক্রান্ত গণমাধ্যম, আক্রান্ত রাষ্ট্র: নীরবতার কালো কাপড় ও আমাদের গণতন্ত্র
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। ক্যালেন্ডারের পাতায় এটি কেবল একটি দিন, কিন্তু গণতন্ত্রের ইতিহাসে এটি একটি আয়না। যে আয়নায় রাষ্ট্র নিজের মুখ দেখে-তার চরিত্র, তার সহনশীলতা, তার ভয় এবং তার সাহস। একটি রাষ্ট্র কতটা উন্মুক্ত, কতটা সহনশীল, কতটা আত্মবিশ্বাসীÑ তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মানদ- হলো তার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা। কারণ গণমাধ্যম শুধু সংবাদ প্রকাশ করে না; এটি ক্ষমতার হিসাব রাখে, সমাজের আয়না ধরে এবং রাষ্ট্রকে প্রতিদিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
এবারের এই দিনে সাতক্ষীরার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাদদেশে যে দৃশ্য তৈরি হয়েছিল-হাত, মুখ ও চোখে কালো কাপড় বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা সাংবাদিকরাÑ তা নিছক কোনো কর্মসূচি ছিল না। এটি ছিল এক নীরব চিৎকার, এক প্রতীকী বিদ্রোহ, যা শব্দের চেয়েও শক্তিশালী। “সাংবাদিকতা কোনো অপরাধ নয়”, “আক্রান্ত গণমাধ্যম মানেই আক্রান্ত রাষ্ট্র”Ñ এই স্লোগানগুলো নতুন নয়। কিন্তু বাস্তবতার চাপেই এগুলো আজ নতুন অর্থে ভারী হয়ে উঠেছে। কারণ, সত্য বলাই যেখানে সন্দেহের কারণ, সেখানে গণতন্ত্রও ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস হারায়।
নীরবতার প্রতীক: কালো কাপড়ের তিনটি ভাষাসাতক্ষীরার সেই প্রতীকী অবস্থানকে শুধু আবেগ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এটি একটি রাজনৈতিক ভাষা, একটি সামাজিক সংকেত এবং একটি গণতান্ত্রিক সতর্কবার্তা। হাত বাঁধা মানে কাজের স্বাধীনতা নেই। মুখ বাঁধা মানে কথা বলার স্বাধীনতা নেই। চোখ বাঁধা মানে সত্য দেখার অধিকারও সীমিত।এই তিনটি একসঙ্গে একটি ভয়ংকর বাস্তবতা তৈরি করেÑ যেখানে সাংবাদিক আর অনুসন্ধানী নন, বরং হয়ে ওঠেন নিয়ন্ত্রিত তথ্যের নীরব সাক্ষী।
এখানেই প্রশ্নটি সবচেয়ে তীব্র-রাষ্ট্র কি এমন অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে সত্য বলা এখন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ? মামলা, গ্রেপ্তার এবং কারাবন্দী সাংবাদিকদের বাস্তবতা সাম্প্রতিক সময়ে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে তার প্রকৃতি নিয়েও প্রশ্ন। অভিযোগ উঠছে-অনেক মামলা হয়রানিমূলক, অনেক গ্রেপ্তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।কিন্তু সবচেয়ে গভীর সংকট হলো কারাবন্দী সাংবাদিকদের বাস্তবতা। কারাগারে থাকা একজন সাংবাদিক কেবল একজন ব্যক্তি নন; তিনি একটি থেমে যাওয়া প্রতিবেদন, একটি স্তব্ধ অনুসন্ধান, একটি অপ্রকাশিত সত্য।
কারাবন্দী সাংবাদিক মানে-একটি সমাজের তথ্য জানার অধিকার সংকুচিত হওয়াএকটি তদন্ত অসমাপ্ত থাকা। একটি ক্ষমতার প্রশ্ন অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া এবং একটি ভয় তৈরি হওয়া-“কে পরবর্তী?”এই ভয়ই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ এটি শুধু বাইরে থেকে আসে না; এটি ভেতরে ঢুকে যায়Ñ সাংবাদিকদের চিন্তায়, সিদ্ধান্তে, এমনকি শব্দ নির্বাচনে। একজন সাংবাদিক যখন জানেনÑ একটি প্রতিবেদন তাঁকে কারাগারে নিয়ে যেতে পারে-তখন তিনি আর পুরোপুরি স্বাধীন থাকেন না।
আত্মনিয়ন্ত্রণ শুরু হয় প্রকাশের আগেই। প্রশ্নটা তাই নির্মমভাবে সরল-সত্য বলা কি এখন অপরাধ? রাষ্ট্র যদি মনে করে কেউ অপরাধ করেছে, তবে বিচার হতে হবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও দ্রুত। কিন্তু মতপ্রকাশ বা জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ যদি শাস্তিযোগ্য হয়, তাহলে সেটি গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। গণমাধ্যমের ওপর চাপ শুধু আইনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর বাইরে রয়েছে আরও ভয়ংকর বাস্তবতাÑ মব সন্ত্রাস। গণমাধ্যম কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, সাংবাদিকদের শারীরিকভাবে হেনস্তাÑ এসব এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।
এটি একটি বার্তা দেয়-“চুপ থাকো।” সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব ঘটনার অনেক ক্ষেত্রেই বিচার হয় না। বিচারহীনতা অপরাধকে শক্তিশালী করে, আর ভুক্তভোগীকে করে আরও অসহায়। ফলে তৈরি হয় এক ভয়ংকর সমীকরণ-অপরাধ + বিচারহীনতা = স্থায়ী ভয়, এই ভয়ই গণমাধ্যমকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়। গণতন্ত্র কোনো স্থির কাঠামো নয়; এটি একটি চর্চা। আর সেই চর্চার প্রাণশক্তি হলো গণমাধ্যম। স্বাধীন গণমাধ্যম-সরকারকে জবাবদিহির মুখে দাঁড় করায়, নাগরিককে সচেতন করে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করে। কিন্তু যখন গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রিত হয়, তখন-তথ্য একমুখী হয়, সমালোচনা ক্ষীণ হয়, নাগরিক সত্য নয়, ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরশীল হয়, এভাবেই গণতন্ত্র ধীরে ধীরে প্রতীকে পরিণত হয়, বাস্তবে নয়। কারাবন্দী সাংবাদিক: গণতন্ত্রের কঠিন পরীক্ষা।
কারাবন্দী সাংবাদিকের বিষয়টি কেবল মানবাধিকার ইস্যু নয়। এটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সহনশীলতার পরীক্ষা। কারণ, একটি রাষ্ট্র কতটা সমালোচনা সহ্য করতে পারে-তার সবচেয়ে স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায় এই জায়গায়। কারাবন্দী সাংবাদিক মানে কেবল একজন ব্যক্তি নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের ভেতরের গণতান্ত্রিক চাপ। ন্যায়বিচার যদি স্বচ্ছ হয়, তাহলে রাষ্ট্রও দায়মুক্ত। কিন্তু যদি বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো রাষ্ট্রীয় কাঠামো। সাতক্ষীরা একটি প্রান্তিক জেলা হলেও সেখান থেকে উঠে আসা বার্তা কেন্দ্রের জন্য গভীর অস্বস্তির হলেও গুরুত্বপূর্ণ।
সাংবাদিকদের পাশাপাশি লেখক, নাগরিক সমাজ ও বিভিন্ন পেশার মানুষের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে-এটি কেবল পেশাগত দাবি নয়, এটি সামাজিক দাবি। যখন সমাজ একসঙ্গে কথা বলে, তখন পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়। বিশ্বের অভিজ্ঞতা স্পষ্ট-যেখানে গণমাধ্যম স্বাধীন, সেখানে দুর্নীতি কম, প্রশাসন বেশি স্বচ্ছ এবং নাগরিক আস্থা বেশি। আর যেখানে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রিত-তথ্য গোপন থাকে, জবাবদিহি দুর্বল হয়এবং ভয় সংস্কৃতি তৈরি হয়। বাংলাদেশ এই সূচকে সন্তোষজনক অবস্থানে নেই-এটি পরিসংখ্যান নয়, এটি সতর্কবার্তা।
সবচেয়ে বড় সমস্যা আইন নয়, বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতি। সমালোচনাকে শত্রু হিসেবে দেখা, প্রশ্নকে বিরোধিতা হিসেবে চিহ্নিত করাÑ এই মানসিকতা গণমাধ্যমকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে। একটি পরিণত গণতন্ত্রে সমালোচনা শক্তি, দুর্বলতা নয়। প্রথমত, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কারাবন্দী সাংবাদিকদের মামলাগুলো স্বচ্ছভাবে পুনর্বিবেচনা করতে হবে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি নিতে হবে। পঞ্চমত, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সহনশীলতা গড়ে তুলতে হবে। ষষ্ঠত, গণমাধ্যমকেও দায়িত্বশীলতা বজায় রাখতে হবে। নীরবতা কখনো কখনো নিরাপদ মনে হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘ নীরবতা রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক।নীরব গণমাধ্যম মানে নীরব সমাজ।নীরব সমাজ মানে নীরব নাগরিক। নীরব নাগরিক মানে নীরব গণতন্ত্র। সাতক্ষীরার শহীদ মিনারের সামনে কালো কাপড়ে আবৃত সাংবাদিকদের নীরব প্রতিবাদ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় এই নীরবতা ভাঙতে হলে প্রয়োজন ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক সাহস। কারণ গণমাধ্যম স্বাধীন না থাকলে সত্য চাপা পড়ে। আর সত্য চাপা পড়লে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্র নিজেই। “
আক্রান্ত গণমাধ্যম মানেই আক্রান্ত রাষ্ট্র”Ñ এই বাক্যটি তখনই সত্যিকারের অর্থ পাবে, যখন কোনো সাংবাদিক সত্য বলার কারণে আর কারাবন্দী হবেন না এবং কোনো সংবাদ সত্য প্রকাশের কারণে আর ভয় সৃষ্টি করবে না।
লেখক: সংবাদকর্মী









