আগের দিনটাই ভালো ছিল!/ শেখ আমিনুর রহমান কাজল
শেখ আমিনুর রহমান কাজল
একটা সময় ছিল, যখন আনন্দ মানেই ছিল একসাথে থাকা। প্রযুক্তি ছিল কম, কিন্তু মানুষের মধ্যে হৃদ্যতা ছিল অনেক বেশি। আজ সবকিছু হাতের মুঠোয় চলে এসেছে, কিন্তু সেই প্রাণখোলা আনন্দ, সেই মিলেমিশে থাকার উষ্ণতা যেন কোথাও হারিয়ে গেছে।
আগে টিভি ছিল গ্রামের বা পাড়ার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। একটা-দুটো বাড়িতে টিভি থাকত, আর সন্ধ্যা নামলেই আশেপাশের মানুষজন সেখানে জড়ো হতে শুরু করত। কেউ মাদুর নিয়ে আসত, কেউ চাটাই, কেউবা একটা ছোট্ট টুল। ঘরের ভেতর জায়গা না হলে উঠোনে বসেই টিভি দেখা হতো। টিভির পর্দার চেয়ে বেশি প্রাণবন্ত ছিল মানুষের মুখের হাসি, গল্প আর উচ্ছ্বাস।
বিশ্বকাপ ফুটবল এলে পুরো পাড়া যেন উৎসবের নগরীতে পরিণত হতো। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স, মেক্সিকো কিংবা ক্যামেরুন—প্রতিটি দলেরই আলাদা সমর্থক ছিল। খেলা শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই চলত তর্ক-বিতর্ক, ভবিষ্যদ্বাণী আর খুনসুটি।
কারো বাড়ির ছাদে উড়ত ব্রাজিলের পতাকা, কারো উঠোনে আর্জেন্টিনার। জার্মানির সমর্থকরা নিজেদের দলকে সবচেয়ে শৃঙ্খলাবদ্ধ বলে গর্ব করত, ইতালির সমর্থকরা বলত তাদের রক্ষণভাগের তুলনা নেই। ফ্রান্সের সমর্থকরা তারকাদের নিয়ে আলোচনা করত, আর ক্যামেরুন বা মেক্সিকোর সমর্থকরা নিজেদের দলকে আন্ডারডগ হিসেবে সাহস দিত।
খেলা চলাকালে গোল হলে পুরো পাড়া কেঁপে উঠত। ব্রাজিল গোল দিলে একদল লাফিয়ে উঠত, আর্জেন্টিনা গোল দিলে আরেকদল আনন্দে চিৎকার করত। কেউ বাঁশি বাজাত, কেউ পটকা ফুটাত, কেউ আবার দৌড়ে গিয়ে বন্ধুদের খোঁচা দিত। পরাজয়ের পরও মন খারাপের মাঝেও ছিল এক ধরনের আনন্দ, কারণ পরদিন আবার নতুন করে তর্ক শুরু হবে।
রাত জেগে খেলা দেখার সেই দিনগুলো ছিল অন্যরকম। মাঝরাতে চা বানানো হতো, মুড়ি, চানাচুর, বিস্কুট আর বাদাম ভাগাভাগি করে খাওয়া হতো। কারো চোখে ঘুম চলে এলে পাশের জন ধাক্কা দিয়ে বলত, “এই ওঠ! খেলার আসল মজা এখন শুরু!” মনে হতো পুরো বিশ্বকাপটাই যেন আমাদের পাড়ার মাঠে হচ্ছে।
শুধু খেলা নয়, পিকনিকের আনন্দও ছিল অসাধারণ। শীতের সকালে ট্রাক বা বাস ভাড়া করে সবাই মিলে পিকনিকে যাওয়া হতো। রান্নার দায়িত্ব একদল, খেলাধুলার দায়িত্ব আরেকদল। কেউ মাংস কাটছে, কেউ সবজি ধুচ্ছে, কেউ আগুন জ্বালাচ্ছে। রান্না শেষ হওয়ার আগেই সবাই দশবার জিজ্ঞেস করত, “খাওয়া কবে হবে?”
খাওয়ার পর শুরু হতো গান, কৌতুক, লটারির খেলা, দৌড় প্রতিযোগিতা আর দলবেঁধে ছবি তোলা। তখন ছবি তুলতে মোবাইলের শত শত ক্যামেরা ছিল না, কিন্তু প্রতিটি ছবির পেছনে ছিল শত শত স্মৃতি।
ঈদ, পূজা, নববর্ষ কিংবা যে কোনো উৎসব মানেই ছিল একসাথে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া। বিকেলে মাঠে আড্ডা, রাতে গল্প, আর ছোট ছোট বিষয় নিয়েই অনেক বড় আনন্দ।
তারপর ধীরে ধীরে সময় বদলালো। ঘরে ঘরে টিভি এলো। এরপর এলো স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, ইউটিউব, ফেসবুক আর অসংখ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এখন খেলার স্কোর মোবাইলে, সিনেমা মোবাইলে, খবর মোবাইলে, বিনোদন মোবাইলে। এমনকি অনেক সময় সম্পর্কও এখন মোবাইলের পর্দার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
আগে মানুষ মানুষকে খুঁজত, এখন খোঁজে ওয়াই-ফাইয়ের পাসওয়ার্ড। আগে বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে খেলা দেখা হতো, এখন একই বাড়িতে থেকেও সবাই আলাদা আলাদা স্ক্রিনে ব্যস্ত।
আগে বিশ্বকাপের ফাইনাল মিস হয়ে গেলে কষ্ট লাগত। এখন সবাই বলে, “সমস্যা কী? পরে হাইলাইটস দেখে নেব।” কিন্তু হাইলাইটস কি সেই উত্তেজনা ফিরিয়ে দিতে পারে? সেই একসাথে চিৎকার করা, সেই বুক ধড়ফড় করা মুহূর্তগুলো কি আর ফিরে আসে?
প্রযুক্তি আমাদের অনেক সুবিধা দিয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। কিন্তু সেই সঙ্গে অজান্তেই কে যেন আমাদের কাছ থেকে কিছু মূল্যবান জিনিস নিয়ে গেছে—একসাথে বসে হাসার সময়, গল্প করার সময়, সম্পর্কের উষ্ণতা আর প্রাণখোলা আনন্দ।
আগে টিভি কম ছিল, কিন্তু মানুষ বেশি ছিল। এখন টিভি বেশি, মোবাইল বেশি, ইন্টারনেট বেশি—কিন্তু একসাথে বসে আনন্দ করার মানুষ যেন একটু কমে গেছে।
আজও যখন কোনো পুরোনো বিশ্বকাপের কথা মনে পড়ে, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার সেই তর্কের কথা মনে পড়ে, জার্মানি-ইতালির সমর্থকদের উল্লাস মনে পড়ে, পিকনিকের সেই হাসির শব্দ কানে ভেসে আসে—তখন মনটা অদ্ভুত এক নস্টালজিয়ায় ভরে ওঠে।
তখন সত্যিই মনে হয়Ñ আগের দিনগুলোতে হয়তো প্রযুক্তি কম ছিল, কিন্তু জীবনটা ছিল অনেক বেশি জীবন্ত। সুবিধা কম ছিল, কিন্তু সুখ ছিল বেশি। বিনোদনের মাধ্যম কম ছিল, কিন্তু আনন্দ ছিল অফুরন্ত।
তাই আজও হৃদয়ের গভীর থেকে একটি কথাই বারবার ভেসে আসেÑ “আগের দিনটাই ভালো ছিল; কারণ তখন মানুষ একে অপরের অনেক বেশি কাছাকাছি ছিল।”
লেখক: শিক্ষক












