কদম ফুল গাছেই থাকুক: ক্ষণিকের শখ বনাম প্রকৃতির হাহাকার
তারিক ইসলাম
টুপটাপ বৃষ্টি আর কদম ফুলের সুবাস-বাঙালির বর্ষা উদযাপনের সমার্থক। আষাঢ়ের আগমনে গাছের ডালে ডালে যখন কদম ফুল ডানা মেলে, তখন মানুষের মন নেচে ওঠে ঠিকই, কিন্তু একই সাথে শুরু হয় এক নির্মম উৎসব। ফুলটি দেখার সাথে সাথেই তা ছিঁড়ে নেওয়ার এক অদ্ভুত ও অন্ধ প্রতিযোগিতা দেখা যায় আমাদের মধ্যে। মানুষের এই কয়েক ঘণ্টার সৌখিনতা যে প্রকৃতির পাখপাখালি আর জীববৈচিত্র্যকে এক দীর্ঘমেয়াদী সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে, সেই হিসাব আমরা ক’জনই বা রাখি?
উদ্ভিদ ও প্রাণিবিজ্ঞানীদের গবেষণায় উঠে এসেছে এক চমকপ্রদ তথ্য। কদম গাছ কেবল প্রকৃতির শোভা বর্ধন করে না, এটি আসলে বনের পশুপাখিদের একটি বড় প্রাকৃতিক খাদ্যভান্ডার। বর্ষার এই মরসুমে কদম ফুল ও ফলকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় একটি বিশাল খাদ্যচক্র। কদম ফুলের ভেতরের সুমিষ্ট মধু পানের জন্য ছুটে আসে ঝাঁকে ঝাঁকে মৌমাছি, প্রজাপতি আর হরেক রকমের ছোট পাখি। ফুল ফুটন্ত পর্ব পার হলে এটি পরিণত হয় রসালো ও মাংসল ফলে। বর্ষার স্যাঁতসেঁতে, বৈরী আবহাওয়ায় যখন পাখিদের জন্য অন্য খাবার সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে, তখন এই ফলই হয়ে ওঠে তাদের প্রধান ভরসা। টিয়া, শালিক, বুলবুলি, ঘুঘু থেকে শুরু করে চঞ্চল কাঠবিড়ালির মতো প্রাণীদের ভিটামিন, খনিজ ও পুষ্টির সবচেয়ে বড় জোগানদার এই কদম ফল।
“আমরা অবহেলায় যে ফুলটি ছিঁড়ে ফেলছি, তা আসলে একটি পাখির পুরো মৌসুমের বেঁচে থাকার রসদ।”
আজকাল পথে-ঘাটে, রিকশায় কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ছবির ফ্রেমে কদম ফুল ধরে রাখা একটি ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। আমাদের এই খামখেয়ালিপনা বন্যপ্রাণীদের জন্য তৈরি করছে অস্তিত্বের সংকট। আমরা কি একবারও ভেবে দেখেছি, যে ফুলটি মানুষের হাতে আসার পর মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শুকিয়ে আবর্জনার স্তূপে জমা হয়, সেটি গাছে থাকলে কত পাখির ক্ষুধা মেটাত?
পরিবেশবিদদের মতে, নির্বিচারে ফুল পেড়ে ফেলার কারণে ফুলগুলো আর ফলে রূপান্তরিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। ফলে বনের পাখিরা পড়ছে চরম খাদ্য সংকটে। আর এই তীব্র খাদ্যভাবের কারণেই আজ আমাদের চেনা লোকালয় থেকে চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে অসংখ্য প্রজাতির পাখি।
প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে এখনই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। শুধু আইনি নিষেধাজ্ঞা দিয়ে প্রকৃতির এই ক্ষতি রোখা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন তীব্র সামাজিক জাগরণ।
ফুল না ছেঁড়ার অঙ্গীকার: ‘কদম ফুল গাছেই সুন্দর, তা পাখিদের খাবার’-এই বার্তাটি প্রতিটি মানুষের কাছে, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
সামাজিক প্রতিরোধ: পার্ক বা রাস্তার ধারের কদম গাছ থেকে ফুল ছেঁড়া বন্ধে স্থানীয়ভাবে সচেতনতা ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানের একটি নির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে। কদম ফুল মানুষের ঘরের ফুলদানিতে শুকিয়ে মরার জন্য নয়, বরং গাছের ডালে থেকে বনের পাখিদের জীবন বাঁচানোর জন্য সৃষ্টি হয়েছে। আসুন, প্রকৃতির প্রতি একটু সংবেদনশীল হই; আমাদের খামখেয়ালিপনা বন্ধ করে কদম ফুলকে গাছেই থাকতে দেই, অক্ষুণ্ন রাখি আমাদের চারপাশের জীববৈচিত্র্য।
লেখক: সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি।











