বিদায়, বিচ্ছেদ ও আমরা/ সচ্চিদা নন্দ দে সদয়
সচ্চিদা নন্দ দে সদয়
বিদায় কখনো সহজ নয়। বিশেষ করে যখন বিদায় বলতে হয় এমন কাউকে, যার উপস্থিতি একটি পরিবার, একটি সমাজ কিংবা একটি জনপদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকে। তখন বিদায় শুধু একজন মানুষের প্রস্থান নয়, বরং একটি অভ্যাস, একটি অনুভূতি এবং এক ধরনের নিরাপত্তা বোধেরও অবসান ঘটায়।
ইতিহাস, সাহিত্য ও লোক কাহিনিতে এমন অসংখ্য বিদায়ের গল্প রয়েছে, যা যুগের পর যুগ মানুষকে আবেগ তাড়িত করেছে। কারণ মানুষ যত আধুনিকই হোক, বিচ্ছেদের বেদনা তার চিরন্তন সঙ্গী। প্রিয় মানুষকে হারানোর ভয়, দূরে চলে যাওয়ার কষ্ট কিংবা স্মৃতির ভারÑএসব অনুভূতি সময় ও সমাজের সীমা অতিক্রম করে সব মানুষের জীবনেই কমবেশি উপস্থিত। একটি জনপদের কথা কল্পনা করা যাক, যেখানে একজন তরুণের উপস্থিতি ছিল সবার জীবনের অংশ। তিনি ছিলেন শিশুদের খেলার সাথি, বৃদ্ধদের আনন্দের কারণ, বন্ধুদের নির্ভরতার জায়গা এবং পরিবারের সবচেয়ে আদরের সদস্য। প্রতিদিন সকালে তাঁকে না দেখে কারও দিন শুরু হতো না। মাঠে, নদীর পাড়ে, বাজারে কিংবা গ্রামের পথ ঘাটে তাঁর পদচারণা ছিল পরিচিত দৃশ্য।
হঠাৎ একদিন খবর এল, তাঁকে চলে যেতে হবে। জীবনের নতুন দায়িত্ব, নতুন সংগ্রাম এবং বৃহত্তর বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার সময় এসেছে। হয়তো তিনি নিজেও যেতে চাননি, কিন্তু সময়ের দাবি উপেক্ষা করার সুযোগ ছিল না। খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো এলাকায় এক ধরনের অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল। মানুষ বুঝতে পারছিল না, কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে। কেউ প্রকাশ্যে কিছু বলছিল না, কিন্তু সবার ভেতরেই ছিল এক ধরনের শূন্যতা।
পরিবারের সদস্যদের অবস্থা ছিল সবচেয়ে কঠিন। একজন মা তাঁর সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আনন্দিত হওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু মনের গভীরে জমে থাকা কষ্ট লুকাতে পারেন না। সন্তানের জন্য রান্না করতে করতে হঠাৎ থমকে যান। মনে পড়ে, আর হয়তো প্রতিদিন তাঁর জন্য খাবার পরিবেশন করা হবে না। একজন বাবা বাইরে থেকে নিজেকে দৃঢ় রাখার চেষ্টা করেন। পরিবারের অন্যদের সাহস দেন। কিন্তু একা হলে তাঁর মনেও প্রশ্ন জাগেÑযে সন্তানকে এতদিন নিজের চোখের সামনে বড় হতে দেখেছেন, সে হঠাৎ এত দূরে চলে যাবে কীভাবে?
বন্ধুদের অবস্থাও কম বেদনাদায়ক নয়। প্রতিদিন একসঙ্গে কাটানো সময়, আড্ডা, হাসি-ঠাট্টা, পরিকল্পনাÑসবকিছু যেন এক মুহূর্তে স্মৃতিতে পরিণত হতে শুরু করে। তারা জানে, যোগাযোগ থাকবে, ফোনে কথা হবে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খবর পাওয়া যাবে। তবুও কাছের মানুষকে পাশে না পাওয়ার অভাব কোনো প্রযুক্তিই পূরণ করতে পারে না। বিদায়ের দিন যত ঘনিয়ে আসে, মানুষের আবেগ তত তীব্র হতে থাকে। অনেক সময় দেখা যায়, যাঁরা সাধারণত খুব বেশি আবেগ প্রকাশ করেন না, তাঁরাও সেই মুহূর্তে চোখের জল লুকাতে পারেন না।
বিদায়ের দৃশ্যগুলো প্রায় সব জায়গাতেই একই রকম। কেউ বারবার প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়। কেউ শেষবারের মতো জড়িয়ে ধরে। কেউ ভবিষ্যতের জন্য শুভ কামনা জানায়। আবার কেউ নীরবে দূরে দাঁড়িয়ে থাকে, কারণ তার পক্ষে নিজের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব হয় না। মানুষের জীবনে এমন বিদায়ের ঘটনা নতুন নয়। গ্রাম থেকে শহরে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থী, বিদেশে পাড়ি জমানো শ্রমিক, চাকরির প্রয়োজনে অন্য জেলায় চলে যাওয়া তরুণ কিংবা যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়া সৈনিকÑসবার জীবনেই এমন মুহূর্ত আসে। বাংলাদেশের বাস্তবতাও এর ব্যতিক্রম নয়।
দেশের লাখো মানুষ জীবিকার সন্ধানে পরিবার ছেড়ে দূরে বসবাস করেন। কেউ রাজধানীতে, কেউ শিল্পাঞ্চলে, কেউ বিদেশে। তাঁদের অনেকেই বছরের পর বছর প্রিয়জনদের কাছ থেকে দূরে থাকেন। একজন প্রবাসী শ্রমিক যখন গ্রামের বাড়ি থেকে বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা দেন, তখন তাঁর পরিবারের আবেগ অনেকটা একই রকম থাকে। মা কান্না করেন, বাবা চুপচাপ থাকেন, স্ত্রী ভবিষ্যতের স্বপ্ন আর বিচ্ছেদের কষ্টের মধ্যে দোদুল্যমান থাকেন, সন্তান বুঝতে না পারলেও বাবার অনুপস্থিতি পরে অনুভব করতে শুরু করে। এ ধরনের বিচ্ছেদ শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। অনেক সময় একটি পুরো সমাজও তার প্রভাব অনুভব করে।
একজন জনপ্রিয় শিক্ষক অন্যত্র বদলি হলে শিক্ষার্থীরা মন খারাপ করে। একজন দক্ষ চিকিৎসক চলে গেলে রোগীরা উদ্বিগ্ন হয়। একজন সমাজসেবক কিংবা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অন্যত্র চলে গেলে একটি জনপদ তার অভাব অনুভব করে। কারণ মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কেবল প্রয়োজনের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে না। দীর্ঘদিনের সহাবস্থান, বিশ্বাস, ভালোবাসা ও স্মৃতির সমন্বয়ে একটি অদৃশ্য বন্ধন তৈরি হয়। আর সেই বন্ধনেই বিচ্ছেদ কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, মানুষ স্বভাবগতভাবে সম্পকর্ নির্ভর প্রাণী।
পরিবার, বন্ধু, প্রতিবেশী এবং পরিচিত সামাজিক পরিবেশ তাকে মানসিক নিরাপত্তা দেয়। যখন সেই পরিবেশে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে, তখন মানুষের মনে শূন্যতা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে বিচ্ছেদের একটি ইতিবাচক দিকও রয়েছে। অনেক সময় দূরত্ব মানুষকে সম্পর্কের প্রকৃত মূল্য উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। যাঁকে প্রতিদিন দেখা যায়, তাঁর গুরুত্ব অনেক সময় আমরা বুঝতে পারি না। কিন্তু তিনি দূরে চলে গেলে তাঁর অনুপস্থিতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, তিনি আমাদের জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। এ কারণেই বহু সম্পর্ক বিচ্ছেদের পর আরও গভীর হয়ে ওঠে।
দূরত্ব মানুষকে স্মৃতিময় করে তোলে। অতীতের ছোট ছোট মুহূর্তগুলো তখন নতুন অর্থ পায়। একসঙ্গে হাঁটা, এক কাপ চা ভাগাভাগি করে খাওয়া, বিকেলের আড্ডা, কোনো উৎসবে একত্র হওয়াÑএসব সাধারণ ঘটনা পরবর্তীকালে অমূল্য স্মৃতিতে পরিণত হয়। সাহিত্যে বিচ্ছেদ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলা সাহিত্যেও এর অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে জীবনানন্দ দাশ, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়Ñঅনেক লেখক তাঁদের সৃষ্টিতে বিচ্ছেদের অনুভূতিকে গভীরভাবে তুলে ধরেছেন। কারণ বিচ্ছেদ মানুষের হৃদয়ের এমন একটি অভিজ্ঞতা, যা প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে অনুভব করে।
ফলে পাঠক খুব সহজেই এসব গল্পের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে নিতে পারেন। বর্তমান যুগে যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে। ভিডিও কল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, তাৎক্ষণিক বার্তা আদান-প্রদানÑসবকিছুই মানুষকে আগের তুলনায় অনেক বেশি সংযুক্ত রেখেছে। তবুও বিচ্ছেদের বেদনা কমেনি। কারণ প্রযুক্তি কণ্ঠস্বর পৌঁছে দিতে পারে, ছবি দেখাতে পারে, কিন্তু প্রিয় মানুষের উপস্থিতির অনুভূতি পুরোপুরি পৌঁছে দিতে পারে না। একজন মা ভিডিও কলে সন্তানের মুখ দেখতে পারেন, কিন্তু সন্তানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে পারেন না। একজন বন্ধু অনলাইনে কথা বলতে পারেন, কিন্তু একসঙ্গে বসে চায়ের কাপ ভাগাভাগি করতে পারেন না। এই সীমাবদ্ধতার কারণেই মানুষ আজও সম্পর্কের উষ্ণতাকে মূল্য দেয়।
বিদায়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্মৃতি। মানুষ চলে যায়, কিন্তু স্মৃতি থেকে যায়। কখনো কোনো পথ, কোনো গাছ, কোনো ঘাট কিংবা কোনো পুরোনো বাড়ি একজন মানুষের স্মৃতি বহন করে। অনেক বছর পর সেই জায়গায় গেলে হঠাৎ মনে পড়ে যায়, এখানে একসময় কার সঙ্গে হাঁটা হয়েছিল, কোথায় বসে গল্প করা হয়েছিল, কিংবা কোন মুহূর্তটি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল। স্মৃতি মানুষের জীবনে এক অদ্ভুত শক্তি হিসেবে কাজ করে। এটি একদিকে কষ্ট দেয়, অন্যদিকে সান্ত¡নাও দেয়। কারণ স্মৃতির মধ্যেই মানুষ হারিয়ে যাওয়া সময়কে খুঁজে পায়।সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জীবনের গতি বদলে যায়।
নতুন মানুষ আসে, নতুন সম্পর্ক গড়ে ওঠে, নতুন দায়িত্ব তৈরি হয়। কিন্তু কিছু মানুষ এবং কিছু মুহূর্ত হৃদয়ের গভীরে স্থায়ী আসন গড়ে নেয়। তাঁরা হয়তো শারীরিক ভাবে উপস্থিত থাকেন না, কিন্তু তাঁদের প্রভাব থেকে যায়। একজন শিক্ষকের শিক্ষা, একজন বন্ধুর সহযোগিতা, একজন অভিভাবকের স্নেহ কিংবা একজন প্রিয়জনের ভালোবাসা মানুষের চরিত্র ও জীবন বোধকে দীর্ঘ সময় ধরে প্রভাবিত করে। তাই বিদায়কে সবসময় শেষ হিসেবে দেখা যায় না। অনেক সময় বিদায় একটি নতুন অধ্যায়ের শুরু।
যে তরুণটি একদিন নিজের গ্রাম ছেড়ে বেরিয়ে যায়, সে হয়তো পরে সফল হয়ে ফিরে আসে। যে শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য দূরে যায়, সে অর্জিত জ্ঞান নিয়ে সমাজের কল্যাণে কাজ করে। যে শ্রমিক বিদেশে যায়, সে পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটায়। অর্থাৎ বিচ্ছেদের মধ্যে ভবিষ্যতের সম্ভাবনাও লুকিয়ে থাকে।তবুও মানুষ বিদায়ের মুহূর্তে কাঁদে। কারণ আবেগ যুক্তির চেয়ে শক্তিশালী। হৃদয় জানে, সামনে ভালো কিছু অপেক্ষা করছে; কিন্তু একই সঙ্গে এটাও জানে, পরিচিত সময় আর আগের মতো ফিরে আসবে না। এটাই বিদায়ের সবচেয়ে বড় সত্য। জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা রয়েছে।
শৈশব, কৈশোর, শিক্ষাজীবন, কর্মজীবনÑসবকিছুই একসময় পরিবর্তিত হয়। মানুষকে এগিয়ে যেতে হয়। কিন্তু এগিয়ে যাওয়ার অর্থ অতীতকে ভুলে যাওয়া নয়। বরং অতীতের স্মৃতি, সম্পর্ক ও শিক্ষা নিয়েই মানুষ সামনে এগিয়ে যায়। তাই কোনো প্রিয় মানুষের বিদায় আমাদের কষ্ট দিলেও সেটি জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। তা হলোÑসম্পর্কের মূল্য বুঝতে হলে তাকে যতœ করতে হয়, সময় দিতে হয় এবং কাছে থাকা অবস্থাতেই তার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে হয়। কারণ মানুষ চিরকাল পাশে থাকে না।
সময় একসময় তাকে নতুন পথে নিয়ে যায়। কিন্তু ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও স্মৃতি থেকে যায়। আর সেখানেই বিদায়ের গভীর তাৎপর্য। বিদায় মানে শুধু চলে যাওয়া নয়; বিদায় মানে এমন কিছু রেখে যাওয়া, যা দীর্ঘদিন মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে। কোনো কোনো বিদায় তাই একটি যুগের সমাপ্তি নয়, বরং অসংখ্য স্মৃতির সূচনা। এই কারণেই যুগে যুগে বিচ্ছেদের গল্প মানুষকে কাঁদিয়েছে, ভাবিয়েছে এবং নতুন করে সম্পর্কের মূল্য উপলব্ধি করতে শিখিয়েছে।
লেখক: সংবাদ কর্মী












