সাকিবুর রহমান বাবলা
আমাদের অস্তিত্বের প্রথম এবং শেষ ঠিকানা হলো এই ধরিত্রী। বাতাস গ্রহণ থেকে শুরু করে যে জল পান করে আমরা বেঁচে আছি, তার প্রতিটি ফোঁটার উৎস এই প্রকৃতি। আবহমানকাল থেকেই মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক ছিল পরিপূরকÑ একটি অচ্ছেদ্য সখ্য। কিন্তু আধুনিকতার ছদ্মবেশে অপরিকল্পিত নগরায়ন, যান্ত্রিকায়ন এবং অতিরিক্ত ভোগের মানসিকতা আজ এই সুপ্রাচীন ভারসাম্যকে তীব্র সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। প্রতি বছর ২৮ জুলাই পালিত ‘বিশ্ব প্রকৃতি সংরক্ষণ দিবস’ আমাদের সেই নির্মম সত্যটিই নতুন করে মনে করিয়ে দেয়: প্রকৃতি বাঁচলেই কেবল মানবজাতি বেঁচে থাকবে।
১৯৭২ সনে সুইডেনের স্টকহোমে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের ‘মানব পরিবেশ সম্মেলন’ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিবেশ রক্ষার দাবির প্রথম আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। এই ঐতিহাসিক সম্মেলন থেকেই বৈশ্বিক নীতিনির্ধারকদের মনোযোগ প্রকৃতি সুরক্ষার দিকে আকৃষ্ট হয়। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ ইউনিয়ন এবং সচেতন নাগরিকদের উদ্যোগে দিনটি প্রকৃতি সংরক্ষণের বার্তা প্রচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
আজ পৃথিবীর বুকে মানুষের সংখ্যা আট বিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে এবং তা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বিশাল জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ পড়েছে নজিরবিহীনভাবে। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের বহু অঞ্চল তীব্র পানিসংকটের মুখোমুখি হতে পারে।
বিশ্বের বহু উষ্ণম-লীয় বনাঞ্চল দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে, ফলে কার্বন শোষণের প্রাকৃতিক সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে দেখা দিচ্ছে রেকর্ড ভাঙা দাবদাহ, আকস্মিক বন্যা এবং দীর্ঘস্থায়ী খরা। আইপিবিইএস-এর বৈশ্বিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ১০ লক্ষ প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকির মুখে রয়েছে। বাস্তুতন্ত্রের এই ধস মানবজাতির খাদ্য নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের জন্য সরাসরি হুমকি।
আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য চিরকালই প্রকৃতিকে মায়ের আসনে বসিয়েছে। আবহমান বাংলার লোকায়ত জীবন ও ঐতিহ্যে নদী, বৃক্ষ এবং প্রান্তর কেবল জীবিকার উপাদান নয়, বরং গভীর শ্রদ্ধার বস্তু। গাছকে জীবনদাতা এবং নদীকে মাতৃসম গণ্য করার এই দর্শন আমাদের আত্মস্থ করতে হবে। প্রকৃতি ধ্বংস করা মানে নিজের শেকড় কেটে ফেলাÑএই উপলব্ধিই হতে হবে আমাদের সব কাজের নৈতিক মানদ-। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ এবং ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ আমাদের জন্য প্রকৃতি সংরক্ষণকে বিলাসিতা নয়, বরং টিকে থাকার অপরিহার্য শর্তে পরিণত করেছে।
২০২২ সালে গৃহীত কুনমিং-মন্ট্রিয়ল গ্লোবাল বায়োডাইভারসিটি ফ্রেমওয়ার্ক-এর মূল লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি পুরোপুরি থামানো ও তা পুনরুদ্ধার করা। চলতি ২০২৬ সাল এই বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রার ঠিক মাঝামাঝি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দিবসটির বার্তা মূলত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেÑগাছ লাগানোর পাশাপাশি নদী ও জলাভূমি সংস্কারের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত বাস্তুতন্ত্রকে পুনরুজ্জীবিত করা; জলবায়ু পরিবর্তনের চরম আঘাত মোকাবিলা করার সক্ষমতা অর্জন করা; এবং ব্যক্তি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বর্জ্য হ্রাস ও টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করা।
প্রকৃতি রক্ষা কেবল রাষ্ট্রীয় নীতিমালা বা আন্তর্জাতিক সম্মেলনের খাতায় আটকে থাকার বিষয় নয়; এটি শুরু হতে হবে আমাদের নিজ নিজ ঘর থেকেই। দৈনন্দিন জীবনে কিছু সহজ অভ্যাস পরিবর্তন করেই আমরা বড় পরিবর্তন আনতে পারি: একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্জন—পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে পাটের ব্যাগ, কাপড় বা কাগজের ব্যবহার বাড়ানো।
সম্পদের সদ্ব্যবহার—’আর’ (জবফঁপব, জবঁংব, জবপুপষব) নীতি মেনে চলা এবং পানির কল বন্ধ রেখে বা বিদ্যুৎ অপচয় রোধ করে প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। বৃক্ষরোপণ ও সবুজায়নÑনিজের আঙ্গিনায়, ছাদবাগান বা স্থানীয় বনায়নে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা।
প্রকৃতি আমাদের কোনো সম্পত্তি নয়, বরং এটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের একটি মূল্যবান আমানত। বিশুদ্ধ বাতাস, উর্বর মাটি আর নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা পেতে হলে প্রকৃতির সাথে লড়াই নয়, বরং তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে চলার বিকল্প নেই। বিশ্ব প্রকৃতি সংরক্ষণ দিবসের এই শুভলগ্নে আমাদের পণ হোক—অযথা সম্পদ নষ্ট না করে, আসুন আমরা প্রকৃতিকে পুনরুদ্ধার করি, যাতে আমাদের আগামী দিনগুলো হয় আরও নিরাপদ, সুন্দর ও প্রাণবন্ত।