কয়রায় দুর্যোগ প্রস্তুতিতে সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ের তাগিদ
কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি: সিডর, আইলা, আম্পান, ইয়াস কিংবা রিমালের মতো ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহ স্মৃতি এখনো তাড়া করে ফেরে উপকূলীয় জনপদ কয়রার মানুষকে। এ প্রেক্ষাপটে দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি জোরদার, আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সরকারি-বেসরকারি সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির দ্বি-মাসিক সভায়।
বুধবার (১৩ মে) দুপুরে কয়রা উপজেলা পরিষদের কনফারেন্স রুমে উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা জাগ্রত যুব সংঘের (জেজেএস) সহযোগিতায় এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে সহকারী কমিশনার (ভূমি) জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, কয়রা অত্যন্ত দুর্যোগপ্রবণ এলাকা। সিডর, আইলা ও আম্পানের মতো ঘূর্ণিঝড় আমাদের শিখিয়েছে, দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই। প্রকৃতিকে থামানো সম্ভব না হলেও সঠিক প্রস্তুতির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা যায়।
তিনি আরও বলেন, সরকারি ও বিভিন্ন এনজিও মানুষের কল্যাণে কাজ করলেও অনেক ক্ষেত্রে একই ধরনের কার্যক্রমের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। আগামী সভায় দুর্যোগ সংশ্লিষ্ট সব এনজিওকে তাদের কার্যক্রম উপস্থাপনের আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি প্রতিটি ইউনিয়নে ‘নিড বেইজড’ জরিপের মাধ্যমে প্রকৃত চাহিদা নিরূপণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সমীর কুমার সরকার বলেন, কয়রার ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্যোগ আঘাত হানতে পারে। তাই আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর ধারণক্ষমতা নতুন করে মূল্যায়ন করা জরুরি। শুধু মানুষ নয়, গবাদিপশুর জন্যও নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, দুর্যোগের সময় অনেক আশ্রয়কেন্দ্রে ধারণক্ষমতার বেশি মানুষ আশ্রয় নেয়। ফলে নারী-পুরুষের পৃথক ব্যবস্থা ও স্যানিটেশন সংকট বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। সরকারি-বেসরকারি সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার সম্ভব হবে।
উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যসচিব ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আব্দুল্যাহ আল জাবির বলেন, কিছু এনজিও যথাযথ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির নাম ব্যবহার করে সভা আয়োজন করছে, যা সমন্বিত কার্যক্রমের জন্য ইতিবাচক নয়। তিনি সব কার্যক্রম উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিচালনার আহ্বান জানান।
সভায় জাগ্রত যুব সংঘের প্রকল্প কর্মকর্তা অশোক কুমার জানান, ‘প্রস্তুতি’ প্রকল্পের মাধ্যমে গত দুই বছরে কয়রার নারী ও শিশুদের দুর্যোগ সহনশীল করতে কাজ করা হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় ১২ হাজার ৫৯টি দরিদ্র পরিবার উপকৃত হয়েছে। পাশাপাশি ৩৬টি দুর্যোগ সহনশীল টয়লেট নির্মাণ, ৩৬টি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা স্থাপন এবং ৩৬টি নলকূপের পাটাতন উঁচুকরণ করা হয়েছে। এছাড়া ৫ দশমিক ১৬৮ কিলোমিটার সাইক্লোন শেল্টার সংযোগ সড়ক সংস্কার করা হয়েছে।
সভায় বক্তারা বলেন, শাকবাড়িয়া, কয়রা ও কপোতাক্ষ নদের তীরবর্তী কয়রা উপজেলার প্রায় ৯ কিলোমিটার ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে বা জোয়ারের পানিতে উপচে লোকালয়ে লোনাপানি প্রবেশ করতে পারে। ঝড়-বৃষ্টি ও জোয়ারের সময় এ ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। তাই সম্ভাব্য দুর্যোগের আগেই এসব ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ দ্রুত সংস্কারের দাবি জানান তারা।
সভায় উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ, কয়রা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের কর্মকর্তা আব্দুল আহাদ, কয়রা বাজার কমিটির সভাপতি মো. জুলফিকার আলমসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, এনজিও প্রতিনিধি, শিক্ষক ও সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।












