শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩

ঘুরে এলাম সাদা পাথর আর দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ, নিয়ে এলাম জলবায়ু পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৪৭ অপরাহ্ণ
ঘুরে এলাম সাদা পাথর আর দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ, নিয়ে এলাম জলবায়ু পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা

আসাদুজ্জামান সরদার: শ্রীহট্ট, দুই পাতা এক কুঁড়ির দেশ কিংবা হযরত শাহজালাল (রহ.) ও শাহ পরান (রহ.)-এর পুণ্যভূমি-যে নামেই ডাকি না কেন, সবাই একনামে চেনে সুরমা পাড়ের পাথুরে সিলেটকে। দক্ষিণ-পশ্চিমের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা থেকে উত্তর-পূর্বের জেলা সিলেটের দূরত্ব ৪৬০ কিলোমিটার। সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর থেকে সিলেটের তামাবিল স্থলবন্দর পর্যন্ত বাইসাইকেল চালিয়ে অতিক্রম করার অভিযানকে অনেক সাইক্লিস্ট ‘ক্রসকান্ট্রি’ নাম দিয়েছেন। তবে আমাদের যাত্রার প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন।

পাহাড়-মেঘ, নদীর স্বচ্ছ জলরাশি, পাথর আর সবুজের মেলবন্ধনে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অবলোকনের মাধ্যমে সুন্দরবন অঞ্চলের সাথে সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য খুঁজতে এবং জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করতে এবং প্রকৃতির অভিজ্ঞতা নিতে সাতক্ষীরা সাংবাদিক কেন্দ্রের উদ্যোগে তরুণ সাংবাদিকদের ১৪ জনের একটি দল সম্প্রতি ঘুরে এলাম সিলেটে। এর আগে প্রায় ৯-১০ বছর পূর্বে একবার এখানে আসার সুযোগ হয়েছিল। দীর্ঘদিন পর এসে যেমন প্রকৃতির সৌন্দর্য মুগ্ধ করেছে, তেমনি জলবায়ু পরিবর্তন ও অবহেলার ছাপ দেখে কিছু বিষয়ে হতাশও হতে হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব যে শুধু সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকায় সীমাবদ্ধ তা নয়, পাহাড় আর সবুজে ঘেরা সিলেটেও তার স্পষ্ট ছাপ পরিলক্ষিত হয়। এবার সাতক্ষীরায় যখন ভারী বৃষ্টিতে চারপাশ তলিয়ে গেছে, সিলেটে এসে আমরা বৃষ্টির দেখা পর্যন্ত পাইনি।

ভ্রমণের যাত্রা শুরু: সাতক্ষীরা শহরের সঙ্গীতা মোড় থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৫টায় মামুন পরিবহনের বাস ছেড়েছিল সিলেটের উদ্দেশ্যে। রাত সাড়ে ৮টায় যশোরের মনিহার সিনেমা হলের সামনে হালকা বিরতি, এরপর গোপালগঞ্জের দাসের হাটে “এভারগ্রীন হাইওয়ে ইন”-এ রাতের খাবার শেষ করে বাস ছুটে চলে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে। রাতের অন্ধকারে পদ্মা সেতু পার হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ গ্যাস ফিল্ডের আলো এবং ভোরের আলোয় হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জের দৃষ্টিনন্দন মিনারযুক্ত মসজিদ ও ওভারব্রিজ পার হয়ে আমরা প্রবেশ করি সিলেটে।

সিলেটে ঢোকার মুখেই সুরমা নদীর সৌন্দর্য এবং নদীর ওপর নির্মিত লন্ডনের নকশায় সুরমা দক্ষিণ বাস টার্মিনাল নজর কাড়ে সবার। হোটেলে উঠে আধঘণ্টা পরে আমাদের মূল ভ্রমণ শুরু হয়।

প্রথমে সিলেট শহরের একটি হোটেল থেকে হালকা নাস্তা সেরে সকাল ৯টায় আমরা রওনা হই লালাখালের উদ্দেশ্যে। সেখান থেকে নৌকা নিয়ে লালাখালের উদ্দেশ্যে রওনা হই।
এরপর প্রথমেই নৌকায় করে লালাখালের সৌন্দর্য উপভোগ করি। লালাখালের স্বচ্ছ নীল জলধারা, পাহাড় ও আশেপাশের চা বাগানের সবুজ সৌন্দর্য আমাদের মুগ্ধ করে। এর আগে একবার লালাখাল গেলেও সন্ধ্যা নামার কারণে আমরা অল্প একটু গিয়ে ফিরে আসি। এবার আমরা লালাখালের বাংলাদেশী শেষ প্রান্তে নেমে পাহাড়ি চা বাগান দেখতে যাবো, তখন আমাদের আগে যাওয়া পর্যটকরা যেতে নিষেধ করেন। কারণ সেখানে নাকি অনেক জোঁক আছে। আমরা তাদের নিষেধ অমান্য করে সেখানে যাই। সাংবাদিক রাহাত রাজার পায়ে জোঁক লাগবে এমন সময় আমি টের পেয়ে যাই। সে অল্পের জন্য রক্ষা পেলো। কিন্তু আমাদের সাথে থাকা একমাত্র আইনজীবী সাংবাদিক বিপ্লব ভাই জোঁকের হামলার শিকার হন। ছোট ভাই ইব্রাহিম খলিল, হোসেন আলী এবং মিলনসহ বেশ কয়েকজন সহকর্মী চা বাগানের উপর পর্যন্ত উঠেছিল। আমি আর হাবিবুল হাসান ভাই মালতী দেবী নামের একজন পাহাড়ি নারীর বাড়িতে গেলাম, তিনি আমাদের ঘুরে ঘুরে দেখাচ্ছিলেন। ভারতীয় বিএসএফ বাহিনী টহল দিচ্ছে সেটাও দেখান। সেখান থেকে ফেরার পথে দেখা হয় হরি মাস্টার নামে একজনের সাথে। হরি মাস্টারের চা পান করি এবং স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি শুনেছিলাম। তিনি সিলেট সরকারি কলেজ থেকে পাস করে লালাখাল এলাকার একটি স্কুলে পড়াতেন, এখন অবসর নিয়েছেন, চা বিক্রি করেন। সেখান থেকে তপ্ত দুপুরে ফিরে উঠে পড়ি আমাদের রাঙ্গা ভাইয়ের চার চাকার যানে, রওনা হই জাফলং ও ডাউকি সীমান্তের দিকে।
জুম্মার নামাজের বিরতি শেষে আমরা যাই গোয়াইনঘাটের বিখ্যাত জাফলং-এ। তবে গোয়াইন নদীতে পানি অনেক কম থাকায় হেঁটেই নদী অতিক্রম করতে হয়। গতবার নদীতে পানি ছিল, নৌকায় করে গিয়েছিলাম, সেই জায়গায় এবার হেঁটে যেতে হলো। গতবারের তুলনায় পাথর নেই বললেই চলে। এটা দেখে রীতিমতো হতাশ হয়েছিলাম।

খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ পানি ও পাথুরে সৌন্দর্য উপভোগ করেন সাংবাদিকরা। ডাউকি সীমান্তের কাছে ভারতীয় বর্ডার গার্ডের (বিএসএফ) উপস্থিতি সত্ত্বেও স্বচ্ছ পানিতে গোসল করার আনন্দ মিস করিনি আমরা।

ফেরার পথে আগুন পাহাড় মিস করিনি আমরা। আমাদের যাত্রায় সবচেয়ে সিনিয়র পার্সন মোশারফ ভাই আগুন নিয়ে খেলেছিলেন।

সন্ধ্যায় আমরা আধ্যাত্মিক নগরীর মহান সাধক হযরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করে সেখান থেকে হোটেলে ফিরি। সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি ও বাংলা নিউজের বিভাগীয় প্রতিনিধি নাসির উদ্দীন ভাইয়ের আপ্যায়নে মুগ্ধ হই। আমাদের ভ্রমণ সফল হওয়ার ক্ষেত্রে তার অনেক বড় অবদান ছিল। পরে রাতে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে যাই এবং জিয়ারত করি। হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে ঐতিহ্যবাহী জালালী কবুতর, দীঘির গজার মাছ এবং খ্যাতনামা চলচ্চিত্র অভিনেতা প্রয়াত সালমান শাহর (চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন) কবর প্রত্যক্ষ করি। রাতের আহার শেষে শেখ তানজির আহমেদ, বিপ্লব হোসেন, হাবিবুর রহমান সোহাগ, রাহাত রাজা, রেজাউল করিমসহ আমরা ৬ জন দুই রিকশায় বেরিয়ে পড়ি ঐতিহাসিক কিন ব্রিজ ও আলী আমজাদের ঘড়ির উদ্দেশ্যে। রাত ১০:৪৫-এর দিকে সুরমা নদীর তীরে চাঁদনীঘাটের ঐতিহাসিক আলী আমজাদের ঘড়ি এবং ১৯৩৬ সালে নির্মিত স্টিলের ঐতিহ্যবাহী ‘কিন ব্রিজ’ পরিদর্শন করে প্রথম দিনের মতো হোটেলে ফিরি।

দ্বিতীয় দিনে ভোলাগঞ্জ ‘সাদা পাথর’ ও সোয়াম্প ফরেস্ট ‘রাতারগুল’ ভ্রমণ:
ভারতের মেঘালয় রাজ্য ও শিলং পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ধোলাই নদীর তীরে অবস্থিত ভোলাগঞ্জ ‘সাদা পাথর’। ট্রলারে চেপে সাদা পাথরে গিয়ে দেখা গেল এক অপূর্ব দৃশ্যÑএকপাশে সবুজ পাহাড়, আকাশে মেঘের খেলা, আর নিচে সাদা পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া কাঁচের মতো স্বচ্ছ পানির ধারা। পানির তলদেশ পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যায়। জাফলংয়ের পানি দেখতে না পাওয়ার দুঃখ দূর হয় সবার। কাঁচের মতো স্বচ্ছ পানির ধারা আর নিচের পাথর দেখে কেউ বসে থাকতে পারেনি। সবাই গোসলে নেমে পড়েন। আমরা সেখানে ১ থেকে দেড় ঘণ্টা গোসল করি এবং মেঘালয় রাজ্যের শিলং পাহাড়ের সাথে মেঘের মিতালী উপভোগ করতে থাকি। আমাদের ভ্রমণসঙ্গী আলী মুক্তাদা হৃদয়ের আহ্বানে সাড়া দেওয়া তার সহকর্মী কালের কণ্ঠের ডিজিটাল বিভাগের সিলেট ব্যুরো প্রধান কবির হোসেনের আতিথেয়তা আমাদের সকলকে মুগ্ধ করে।

পরে বিকেলে আমরা যাই দেশের একমাত্র জলজ বন বা সোয়াম্প ফরেস্ট রাতারগুলে। তবে রাতারগুল ভ্রমণকালে তীব্র গরম ও অনিয়মিত বৃষ্টির কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের স্পষ্ট প্রভাব চোখে পড়ে। ছবি বা ভিডিওতে যেমন দেখা যায়, তার কোন কিছুই চোখে পড়েনি।

ফিরে আসার পালা: ভ্রমণ শেষে আমরা দেশের প্রথম চা বাগান ‘মালনীছড়া’ পরিদর্শনে যাই এবং সিলেটের বিখ্যাত ‘পানসী’ রেস্তোরাঁয় ভূরিভোজ সেরে মামুন পরিবহন কাউন্টারে এসে আমাদের ব্যাগ রেখে আমি, রাহাত রাজা, রেজাউল এবং হোসেন আলী বেরিয়ে পড়ি সিলেট দক্ষিণ সুরমা বাস টার্মিনাল দেখতে। রাজার ড্রোন দেখে অনেকেই ঘিরে ধরে তাকে, তাদের কাউন্টার কেমন দেখা যাচ্ছে পাখির চোখে সেটা দেখতে। তবে তাদের টার্মিনাল সম্পর্কে কেউ কথা বলতে রাজি হচ্ছিল না, কারণ কিছুদিন আগে দুই গ্রুপের মারামারি হয়েছে সে কারণে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রায় ৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাস টার্মিনালটি নজর কেড়েছে আমাদের। পরে সন্ধ্যা ৬টায় সাতক্ষীরায় উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে সকাল ৭টায় সাতক্ষীরায় পৌঁছাই।

সফরকারী দলে নেতৃত্ব দেন সাতক্ষীরা সাংবাদিক কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক আহসান রাজীব (এখন টিভি/জাগোনিউজ), সাংগঠনিক সম্পাদক মো. হোসেন আলী (এনপিবি/ঢাকাটাইমস), নির্বাহী সদস্য (অর্থ) বিপ্লব হোসেন (মানবজমিন), মোশারফ হোসেন (কালের কণ্ঠ), তানজির কচি (বাংলানিউজ), আসাদুজ্জামান (বাংলা ট্রিবিউন), রাহাত রাজা (গ্লোবাল টিভি), হাবিবুর রহমান সোহাগ (স্বদেশ প্রতিদিন), রিজাউল করিম (দ্য এডিটরস), ইব্রাহিম খলিল (ঢাকা পোস্ট), মিলন রুদ্র (টাইমস টুডে), মৃত্যুঞ্জয় রায় (বার্তা ২৪), আলী মুক্তাদা হৃদয় (হৃদয় বার্তা) ও হাবিবুল হাসান (পত্রদূত)।

ভ্রমণকালে সাতক্ষীরা সাংবাদিক কেন্দ্রের সদস্য ও স্থানীয় সাংবাদিকদের পর্যটন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সিলেটের কৃষি সম্ভাবনা নিয়ে নানা মতামত উঠে আসে:
সাতক্ষীরা সাংবাদিক কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক আহসানুর রহমান রাজিব বলেন, জলবায়ুর পরিবর্তন এখন দেশজুড়ে রূপ ধারণ করেছে। ৫-১০ বছর আগে এখানকার পাহাড়ি ঝিরি ও নদ-খালে যে প্রাকৃতিক পানির ধারাবাহিক প্রবাহ ছিল, স্থানীয়দের মতে এখন তা নেই। এখন বর্ষা মৌসুমেও আগের মতো নিয়মিত পাহাড়ি ঢল নামে না; হঠাৎ পানি এসে আবার হঠাৎ নেমে যায়। ফলে সুপেয় পানির সংকট তৈরি হচ্ছে।

এছাড়া শ্রাবণ-ভাদ্রের বর্ষা মৌসুমেও এখানে গ্রীষ্মকালের চেয়ে তীব্র তাপমাত্রা অনুভূত হচ্ছে। পর্যটকদের ছাতা মাথায় দিয়ে স্পটগুলোতে ঘুরতে হচ্ছে। পর্যটন স্পটগুলোতে ছায়াদার বৃক্ষরোপণ এবং বসার ভালো ব্যবস্থা করলে পর্যটকদের ভোগান্তি অনেকাংশে কমবে।”
তিনি আরো বলেন, কয়েক বছর আগের তুলনায় এবার এসে দেখলাম পর্যটন স্পটগুলোর তিন ভাগের দুই ভাগ পাথরই গায়েব হয়ে গেছে, অল্প কিছু পাথর অবশিষ্ট আছে। পাশাপাশি ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সংস্কার কাজ চলায় বেশ কিছু স্থানে বড় গর্ত ও খানাখন্দের কারণে যাতায়াতে বেশ ভোগান্তি হয়েছে। সড়কটি দ্রুত উন্নত হলে পর্যটন বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। তবে দক্ষিণ উপকূলের লবণাক্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে সিলেটের মিষ্টি পানি, পাহাড়ি ঝিরি ও এখানকার বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি এক ভিন্ন আমেজ ও ভালো লাগা উপহার দেয়।

সাতক্ষীরা সাংবাদিক কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক আরো বলেন, সাতক্ষীরার মতো কৃষিপ্রধান অঞ্চলের মানুষের চোখে সিলেটের বিপুল পরিমাণ অনাবাদি জমি এক বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। সিলেটে সারা বছর প্রাকৃতিক মিষ্টি পানির উৎসের সুবিধা থাকা সত্ত্বেও হাজার হাজার একর জমি পতিত পড়ে আছে। উপকূলের লবণাক্ততার আগ্রাসনের সাথে তুলনা করলে সিলেটে সুপেয় পানির প্রাচুর্যকে কাজে লাগিয়ে ব্যাপক ‘কৃষি বিপ্লব’ ঘটানো সম্ভব। পতিত জমিগুলোকে পরিকল্পিত সেচের আওতায় এনে ফসল চাষে উদ্বুদ্ধ করতে পারলে একদিকে যেমন এই অঞ্চলের খাদ্যে আত্মনির্ভরশীলতা বাড়বে, তেমনি জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় সিলেট বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।”
সাংবাদিক তানজির আহমেদ বলেন, “সফরকারীদের জেলা সাতক্ষীরার মানুষের জীবন ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার মতো দুর্যোগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। সেই উপকূল থেকে সিলেটের পাহাড়, নদী ও জলাবনের ভিন্ন পরিবেশে এই সফর সাংবাদিকদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে।

তিনি আরো বলেন, ভোলাগঞ্জের সাদা পাথরে সবুজ পাহাড়, মেঘ আর স্বচ্ছ জলধারার যে মেলবন্ধনÑতা দেখলে মনের সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। এখানে শত শত মানুষের উল্লাস-উচ্ছ্বাস চোখে পড়ার মতো। পানির স্বচ্ছতা এতই বেশি যে তলের প্রতিটি পাথর গুনে নেওয়া যায়।
বাংলানিউজ২৪-এর সিলেট বিভাগীয় প্রতিনিধি নাসির উদ্দীন বলেন, “প্রাচীন জনপদ সিলেট কেবল ‘শ্রীহট্ট’ বা ‘জালালাবাদ’ নামে নয়, এটি একটি আধ্যাত্মিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহ পরান (রহ.) সহ ৩৬০ আউলিয়ার স্মৃতি বিজড়িত এই মাটিতেই রয়েছে শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর স্মৃতিধন্য তীর্থস্থান।

পাহাড়ি টিলা আর দিগন্ত বিস্তৃত চা বাগান সিলেটকে সবুজে ঢেকে রেখেছে। সুরমা নদীর ওপর কিন ব্রিজ, চাঁদনীঘাটের সিঁড়ি ও আলী আমজাদের ঘড়িকে কেন্দ্র করে তো সেই বিখ্যাত আঞ্চলিক প্রবাদটি আজও লোকমুখে ফেরেÑ’চাঁদনীঘাটের সিঁড়ি, আলী আমজাদের ঘড়ি, বঙ্কুবাবুর দাড়ি, জিতুমিয়ার বাড়ি’। মরমী কবি হাছন রাজা, রাধারমণ দত্ত, আরকুম শাহ, দূরবীন শাহ ও শাহ আব্দুল করিমের গানের সুর আজও সিলেটের আকাশে-বাতাসে ভেসে বেড়ায়।”

তিনি আরো বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আমাদের এখানেও পড়েছে। বৃষ্টি হলেও তাপমাত্রা ৩৫-এর নিচে নামে না। হঠাৎ রোদ-বৃষ্টি তো আছেই। জলবায়ুর পরিবর্তন আর কিছু প্রশাসনিক উদাসীনতা সত্ত্বেও সিলেটের রূপ ও মাধুর্য আজও অনন্য। তবে প্রাকৃতিক সম্পদ ও পাথর রক্ষা, বৃক্ষরোপণ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার দ্রুত উন্নতি ঘটালে দুটি পাতা একটি কুঁড়ির এই দেশ দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য আরও আকর্ষণীয় ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।”

Ads small one

কেন সমঝোতায় পৌঁছাতে পারছে না যুক্তরাষ্ট্র-ইরান

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৫০ পূর্বাহ্ণ
কেন সমঝোতায় পৌঁছাতে পারছে না যুক্তরাষ্ট্র-ইরান

যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাধান চান যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন ও ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র উভয়পক্ষই এমন দাবি করছে। তবে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতায় পৌঁছানোর পথ ক্রমশ আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। আলোচনায় অচলাবস্থার পেছনে রয়েছে সময়ের ভিন্ন ধারণা, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পার্থক্য এবং গভীর অবিশ্বাস।

গত ১৮ মাসে দুই দফা ব্যর্থ আলোচনা যুদ্ধের দিকে গড়িয়েছে। জুনের সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ কয়েক দিনের মধ্যেই ভেঙে পড়ে এবং আবারও উত্তেজনা বাড়ে। বর্তমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও যদি অচলাবস্থায় শেষ হয় তবে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আবার সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার ব্যর্থতার একটি কারণ হলো, দুইপক্ষ আলোচনার সময়সীমাকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দেখে।

কার্নেগি এনডাওমেন্টের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক করিম সাজাদপুরের মতে, ট্রাম্প দ্রুত একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চান। আলোচনা ধীরগতির হলে তিনি অধৈর্য ও হতাশ হয়ে পড়েন। অন্যদিকে ইরানের আলোচনার ধরন অনেক ধীর এবং তারা সময়ক্ষেপণকে কৌশল হিসেবে দেখে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ট্রাম্প আলোচনার জন্য ৬০ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন। ইরান এটিকে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও অবাস্তব সময়সীমা হিসেবে দেখেছিল। ইরানি কর্মকর্তারা মনে করেছিলেন, ট্রাম্প ৬০ দিনের সময়সীমা নিয়ে বাস্তবে এতটা কঠোর ছিলেন না।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির আলোচনাও প্রায় তিন সপ্তাহ স্থায়ী হয়েছিল। এত অল্প সময়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা প্রায় শূন্য ছিল বলে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। ট্রাম্প রাজনৈতিকভাবে আলোচিত বড় ধরনের চুক্তি পছন্দ করেন। তার লক্ষ্য এমন একটি চুক্তি, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনবে।

অন্যদিকে ইরান অপেক্ষাকৃত সীমিত ও লেনদেনভিত্তিক চুক্তি চায়। তারা সরাসরি আলোচনার বদলে পরোক্ষ আলোচনা কিংবা যতটা সম্ভব কম প্রচারের মধ্যে সমঝোতা করতে আগ্রহী। করিম সাজাদপুর বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন নিজেদের চুক্তি সম্পাদনকারী হিসেবে দেখে। বিপরীতে ইরানের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আপসকারীর ধারণাটিকে নেতিবাচকভাবে দেখা হয়।

তার মতে, ইরানের নেতারা ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকে বসতে কখনোই আগ্রহী ছিলেন না। সরাসরি আলোচনা হলে পরিস্থিতির ফল ভিন্ন হতে পারত বলেও তিনি মনে করেন। দুই দেশের আলোচনায় সবচেয়ে মৌলিক বাধা হলো পারস্পরিক অবিশ্বাস। ইরানের দাবি, আলোচনার মাঝখানে দুইবার তাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির অনেক কর্মকর্তা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা আসলে আকস্মিক হামলার প্রস্তুতি আড়াল করার একটি কৌশল হতে পারে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, জুন ২০২৬-এর সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কয়েক দিন পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা চালিয়ে ইরানই চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি এবং সরকারের ভেতরের কট্টরপন্থিরা কোনও চুক্তি মেনে চলবে কিনা, তা নিশ্চিত করা কঠিন।

আলোচনাকে ঘিরে দুই দেশেই রয়েছে তীব্র অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ। ইরানের আলোচনাকারী দল এবং সরকারের ভেতরের চুক্তি-সমর্থকরা দেশে নিয়মিত সমালোচনার মুখে পড়ছেন। এতে আলোচনার টেবিলে তাদের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে।

অন্যদিকে ট্রাম্প ও তার আলোচনাকারীরাও ডানপন্থীদের কাছ থেকে চুক্তি না করার চাপ পাচ্ছেন। একই সঙ্গে বামপন্থীদের সমালোচনার মুখে পড়ছেন। বিশেষ করে এমন কোনও চুক্তি হলে, যা যুদ্ধের আগের পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনে অথবা সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির মতো হয়। এই রাজনৈতিক সমালোচনার কারণে গত ১৮ মাসে ট্রাম্প কয়েকবার তুলনামূলক নমনীয় অবস্থান থেকে সরে এসেছেন।

হোয়াইট হাউসের দূত স্টিভ উইটকফ, জ্যারেড কুশনার ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এখনও কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে রয়েছেন। তবে ট্রাম্প নিজে এ বিষয়ে আগের তুলনায় বেশি সংশয়ী বলে তার সাম্প্রতিক বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ‘টাইম’ ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরান যে পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত, তা তার কাছে যথেষ্ট নয়। তিনি আরও বলেন, ইরানের সঙ্গে কখনোই শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে কিনা, তা নিয়ে তিনি সন্দিহান। মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর বড় ধরনের সামরিক অভিযান আবার শুরু করার বিষয়টিও তিনি বিবেচনা করছেন বলে জানান।

অন্যদিকে বৃহস্পতিবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার পক্ষে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ইরান কখনও সংলাপ থেকে পালায়নি এবং ভবিষ্যতেও পালাবে না। তবে জুনের সমঝোতা স্বাক্ষরের পরও যুক্তরাষ্ট্র তিনবার ইরানে হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার ভাষায়, সন্ত্রাসের মাধ্যমে ইরানকে নতজানু করার ধারণা যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিতে হবে।

টেক্সাস এ অ্যান্ড এম ইউনিভার্সিটির বুশ স্কুল অব গভর্নমেন্ট অ্যান্ড পাবলিক সার্ভিসের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আয়াতুল্লাহি তাবার ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ সাময়িকীতে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরান ক্রমাগত উত্তেজনা বৃদ্ধি ও আক্রমণাত্মক কৌশল গ্রহণ করছে।

সূত্র: অ্যাক্সিওস

মিটিয়ে দেব সব

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৩৯ পূর্বাহ্ণ
মিটিয়ে দেব সব

জিয়াউদ্দিন লিটন
তুমি এসো-
যেভাবে সন্ধ্যা নামলেই
আমাদের সেই পুরোনো গলিটা
অকারণে তোমার বাড়ির দিকে বাঁক নিত,
আর আমি জানতামÑ
আজও তোমার ফেরার কোনো খবর নেই।
সঙ্গে করে নিয়ে এসো সেই বিকেলটা,
যেদিন গাছটার নিচে বসে
তুমি আমার হাতের ওপর হাত রেখে বলেছিলে,
এখান থেকে কোথাও যেও না।
অথচ চলে গিয়েছিলেÑ
শুধু কথাটা থেকে গিয়েছিল।
আমি জানি,
তুমি কোনো দিন নওÑ
তুমি সেই অসমাপ্ত কথোপকথন,
যার শেষ বাক্যটি
আজও ঘুম ভাঙার পর
মনে পড়ে না।

তোমাকে হারানোর পর
আমার ঘরটা ঠিক আগের মতোই আছেÑ
শুধু জানালার পাশে রাখা চেয়ারটিতে
কেউ আর বসে না।
রাত গভীর হলে মাঝে মাঝে মনে হয়,
তুমি বুঝি এসে বসেছÑ
শুধু আমাকে ডাকছ না।

তুমি এলে
তোমার চুলের কাছে মুখ নিয়ে
খুঁজব সেই পরিচিত গন্ধ,
যা কোনো সুগন্ধির বোতলে ছিল নাÑ
ছিল তোমার শরীরের সঙ্গে মিশে থাকা
একটি সম্পূর্ণ বিকেল।

আমার বুকের ভেতর
এতদিন যে কথাগুলো
কাউকে বলা হয়নি,
সেগুলো তোমার হাতের মুঠোয়
নিঃশব্দে রেখে দেব।

যদি পৃথিবী জিজ্ঞেস করেÑ
তুমি কে?

বলবে,
আমি সেই দিন,
যেদিন কোনো বিশেষ কারণ ছাড়াই
তুমি প্রথম আমার পাশে বসেছিলে
আর একটি সাধারণ বিকেল
আমাদের দুজনের হয়ে গিয়েছিল।

আর যদি আমি জিজ্ঞেস করিÑ
এত দেরি হলো কেন?

তুমি হয়তো হাসবে,
তারপর বলবেÑ
দেরি হয়নি।
তুমি যেখানে আমাকে শেষবার ছেড়ে গিয়েছিলে,
আমি সেখানেই ছিলামÑ
শুধু তুমি ফিরে তাকাওনি।

তারপর কোনো শপথ নয়,
কোনো নতুন শুরুর ঘোষণা নয়।
শুধু সেই পুরোনো গাছটার নিচে
দুজন পাশাপাশি বসবÑ
এবার ভবিষ্যতের দিকে নয়,
একে অন্যের দিকে তাকিয়ে।

তুমি এসোÑ
মিটিয়ে দেব সব।

শুধু ভালোবাসার যে ঋণ
তুমি না জেনেই আমার ভেতর রেখে গিয়েছিলে,
তার কোনো হিসাব রাখব না।

কিছু ঋণ শোধ হয়ে গেলে
মানুষের ভেতর থেকে
একটা প্রিয় প্রতীক্ষাও মরে যায়।

 

তুমি এলে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৩৭ পূর্বাহ্ণ
তুমি এলে

মিটিয়ে দেব সবÑ
কোনো হিসাবের খাতা খুলব না।
শুধু তোমার চোখের নিচে জমে থাকা
ক্লান্তির ছায়ায় হাত রাখব,
আমার এতদিনের নীরবতা
তোমার সামনে বসিয়ে দেব।
আমাদের মাঝখানে যে দূরত্ব
ধীরে ধীরে মানুষ হয়ে উঠেছিল,
তার পাশে দুজন
আরেকবার দাঁড়াব।