সাকিবুর রহমান বাবলা
বিশ্বে বর্তমানে বন্য পরিবেশে প্রায় ৫,৫০০ বাঘ রয়েছে এবং বাংলাদেশে ১২৫টি বাঘের উপস্থিতি দক্ষিণ এশিয়ার সংরক্ষণ সাফল্যের একটি আশাব্যঞ্জক উদাহরণ। তবুও বাঘ আজও বিশ্বের অন্যতম বিপন্ন বৃহৎ স্তন্যপায়ী প্রাণি। প্রকৃতির বিস্ময়কর সৃষ্টিগুলোর মধ্যে বাঘ এমন এক প্রাণি, যার উপস্থিতি শক্তি, সৌন্দর্য, সাহস এবং বন্যতার এক অনন্য প্রতীক হিসেবে মানবসভ্যতাকে যুগ যুগ ধরে মুগ্ধ করে এসেছে। পৃথিবীর বৃহত্তম বিড়ালজাতীয় প্রাণি হিসেবে বাঘ শুধু একটি শিকারি প্রাণি নয়; এটি একটি সুস্থ বন, সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য এবং ভারসাম্যপূর্ণ বাস্তুতন্ত্রের অন্যতম নির্দেশক। তাই বাঘ রক্ষা মানে শুধু একটি প্রাণিকে বাঁচিয়ে রাখা নয়, বরং একটি সম্পূর্ণ পরিবেশব্যবস্থাকে সংরক্ষণ করা।
এই উপলব্ধি থেকেই প্রতি বছর ২৯ জুলাই বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক ব্যাঘ্র দিবস। ২০১০ সালে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ব্যাঘ্র সম্মেলনে বিশ্বনেতারা বাঘ সংরক্ষণের লক্ষ্যে এক ঐতিহাসিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তখন পৃথিবীতে বন্য পরিবেশে বাঘের সংখ্যা নেমে এসেছিল আশঙ্কাজনক পর্যায়ে। সেই সংকট মোকাবিলায় বাঘের আবাসস্থল রক্ষা, অবৈধ শিকার বন্ধ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই দিবসের সূচনা হয়।
একসময় এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে বাঘের বিচরণ ছিল। কিন্তু বন উজাড়, আবাসস্থল ধ্বংস, জলবায়ু পরিবর্তন, অবৈধ শিকার এবং বন্যপ্রাণি পাচারের কারণে বাঘের সংখ্যা দ্রুত কমতে থাকে। অতীতে পৃথিবীতে বাঘের মোট ৯টি উপপ্রজাতি ছিল, যার মধ্যে বালিনিজ, জাভানিজ ও কাস্পিয়ান বাঘ ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বর্তমানে প্রকৃতিতে টিকে আছে ৬টি উপপ্রজাতি। এর মধ্যে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানে; সাইবেরিয়ান বাঘ রাশিয়ায়; সুমাত্রান বাঘ ইন্দোনেশিয়ায়; ইন্দো-চায়নিজ বাঘ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এবং মালয়ান বাঘ মালয় উপদ্বীপে বাস করে। অন্যদিকে সাউথ চায়না টাইগার বন্য পরিবেশ থেকে কার্যত বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং বর্তমানে কেবল বন্দিদশায় সীমিত সংখ্যায় টিকে রয়েছে।
পরিবেশবিজ্ঞানের ভাষায় বাঘ একটি শীর্ষ শিকারি। খাদ্যশৃঙ্খলের সর্বোচ্চ স্তরে অবস্থান করে এটি হরিণ, বুনো শুকরসহ বিভিন্ন তৃণভোজী প্রাণির সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখে। ফলে বনাঞ্চলে উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বজায় থাকে। যদি বাঘ বিলুপ্ত হয়ে যায়, তাহলে খাদ্যশৃঙ্খলের ভারসাম্য ভেঙে পড়তে পারে। তৃণভোজী প্রাণির সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়ে বনভূমির ক্ষতি করবে, যা শেষ পর্যন্ত জলবায়ু, মাটি, পানি এবং অন্যান্য জীবের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এ কারণেই বাঘকে অনেক বিজ্ঞানী “ছাতা প্রজাতি” বলে অভিহিত করেন; কারণ বাঘের আবাস রক্ষা করলে একই সঙ্গে অসংখ্য প্রাণি ও উদ্ভিদও সুরক্ষা পায়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাঘের গুরুত্ব আরও গভীর। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়; এটি উপকূলীয় পরিবেশের প্রাকৃতিক ঢাল, জীববৈচিত্র্যের ভা-ার এবং লাখো মানুষের জীবিকার উৎস। এই বনভূমির প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। সুন্দরবনের বাঘ পৃথিবীর অন্য অঞ্চলের বাঘের তুলনায় কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। নদী, খাল ও জোয়ার-ভাটার পরিবেশে অভিযোজিত হয়ে তারা অসাধারণ সাঁতারুতে পরিণত হয়েছে। প্রয়োজনে তারা দীর্ঘ দূরত্ব সাঁতরে এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে যেতে পারে।
আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সুন্দরবনে এখন পর্যন্ত তিনবার পূর্ণাঙ্গ বাঘশুমারি পরিচালিত হয়েছে। প্রথম বৈজ্ঞানিক জরিপে ২০১৫ সালে সুন্দরবনে ১০৬টি বাঘের উপস্থিতি শনাক্ত হয়। ২০১৮ সালের জরিপে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১১৪টিতে এবং সর্বশেষ শুমারির ফলাফল অনুযায়ী ২০২৪ সালে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেয়ে ১২৫টিতে পৌঁছেছে। এর আগে ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশে বাঘের সংখ্যা আনুমানিক ৩০০-৪০০টি বলে ধারণা করা হতো এবং ১৯৯৬-৯৭ ও ২০০৪ সালের জরিপে যথাক্রমে ৩৫০-৪০০ ও ৪৪০টি বাঘের কথা উল্লেখ করা হলেও সেসব হিসাব মূলত পায়ের ছাপ ও অনুমাননির্ভর ছিল। ফলে আধুনিক ক্যামেরা ট্র্যাপিং পদ্ধতিতে পরিচালিত জরিপগুলোই বর্তমানে সুন্দরবনের বাঘের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃত।
তবে চ্যালেঞ্জ এখনও কম নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার বিস্তার, ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বৃদ্ধি, বনাঞ্চল সংকুচিত হওয়া এবং মানব-বাঘ সংঘাত সংরক্ষণ প্রচেষ্টার জন্য বড় হুমকি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণি পাচার চক্র এখনও উদ্বেগের কারণ। তাই বাঘ সংরক্ষণকে শুধু বন বিভাগের দায়িত্ব হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি হতে হবে রাষ্ট্র, গবেষক, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, পরিবেশবাদী সংগঠন এবং সাধারণ নাগরিকের সম্মিলিত উদ্যোগ। বিশ্বব্যাপী প্রকৃতি সংরক্ষণের আধুনিক দর্শন বলছে, মানুষ প্রকৃতির বাইরে নয়; বরং প্রকৃতিরই অংশ। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী বাঘ সংরক্ষণ মানে মানবকল্যাণ নিশ্চিত করা। কারণ সুস্থ বন জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ করে, কার্বন শোষণ করে, দুর্যোগের ঝুঁকি কমায় এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে। বাঘ সেই সুস্থ বনের প্রতীক ও রক্ষক।
আন্তর্জাতিক ব্যাঘ্র দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়Ñপ্রকৃতির প্রতিটি প্রাণির অস্তিত্বের পেছনে রয়েছে একটি বৃহত্তর পরিবেশগত তাৎপর্য। বাঘকে হারানো মানে শুধু একটি প্রাণিকে হারানো নয়; বরং একটি বন, একটি বাস্তুতন্ত্র, একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদকে হারানো। তাই আজকের দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক—বাঘের জন্য বন, বনের জন্য বাঘ এবং প্রকৃতির জন্য মানুষের দায়িত্বশীল সহাবস্থান নিশ্চিত করা। কারণ সুন্দরবনের প্রহরী রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার বেঁচে থাকলে বেঁচে থাকবে বন, বেঁচে থাকবে জীববৈচিত্র্য, আর নিরাপদ থাকবে আমাদের পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ।