নাগরিক অধিকার ও সাংবাদিকতায় জিএম নূর ইসলাম ছিলেন এক আলোর বাতিঘর
পত্রদূত রিপোর্ট: শ্রাবণ গড়িয়ে ভাদ্রের সূচনাÑআকাশে মেঘ-রোদের লুকোচুরি আর বাতাসের আর্দ্রতায় যেন এক বিষাদময় সুর। বিকেলের নিভে আসা আলোয় শহরের ম্যানগ্রোভ সভাঘর তখন থমথমে। এক ঋতু বদলের মোড়ে দাঁড়িয়ে জেলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সাংবাদিকতার প্রাণপুরুষেরা মুখোমুখি হয়েছিলেন এক শূন্যতার। সাতক্ষীরার সংবাদপত্র জগতের পথিকৃৎ, নাগরিক অধিকার আন্দোলনের অকুতোভয় কণ্ঠস্বর এবং দৈনিক দৃষ্টিপাত-এর সম্পাদক ও প্রকাশক সদ্যপ্রয়াত জিএম নূর ইসলামের স্মরণে ৩১ আগস্ট বিকেলে আয়োজন করা হয় এই স্মরণসভার। সাতক্ষীরা সাংবাদিক কেন্দ্রের উদ্যোগে আয়োজিত এ সভায় উঠে আসে এক নিরহংকার, আপসহীন ও ক্ষুরধার সৃজনশীল জীবনের বেদনাবিধুর উপাখ্যান।
সভার সূচনায় নীরবতার প্রহর। এক মিনিটের সেই নিস্তব্ধতার মধ্যে যেন ভেসে উঠছিল একটি জীবনÑযে জীবন উৎসর্গিত ছিল মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে। নীরবতা ভেঙে স্মৃতিচারণ শুরু হলে ম্যানগ্রোভ সভাঘর ছুঁয়ে যায় স্মৃতিকাতরতার হাওয়া। বক্তারা অশ্রুসজল চোখে স্মরণ করেন, জি এম নূর ইসলাম কেবল কোনো পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন না, তিনি ছিলেন সাধারণ মানুষের শোষিত ও বঞ্চিত কণ্ঠের প্রতিধ্বনি। সংবাদপত্রকে তিনি ব্যবসার বস্তু করেননি, বানিয়েছিলেন নাগরিক অধিকার আদায়ের ধারালো হাতিয়ার। অন্যায়ের মুখে তাঁর লেখনী যেমন ছিল অকম্পিত ও আপসহীন, ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন তেমনই বিনয়ী, নির্লোভ ও পরম স্নেহশীল।
সাতক্ষীরা সাংবাদিক কেন্দ্রের সভাপতি আব্দুস সামাদের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক আহসানুর রহমান রাজীবের স্বাগত বক্তব্যে সভার সূচনা হয়। স্মৃতির অ্যালবাম মেলে ধরে বক্তারা বলেন, সাতক্ষীরার সাংবাদিকতায় নতুন ধারার প্রবর্তন করেছিলেন তিনি। সংবাদপত্রকে কেবল খবরের চৌকাঠে আটকে না রেখে মানুষের সমস্যা, বঞ্চনা ও সম্ভাবনার মুখপত্র করে তুলেছিলেন। কলমের আঁচড়ের পাশাপাশি রাজপথের মিছিলেও তিনি ছিলেন অগ্রজ। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক অধিকার ও উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভাপতি হিসেবে নাগরিক দুর্ভোগ ও জেলার অবকাঠামোগত উন্নয়নে সোচ্চার ছিলেন এই দূরদর্শী মানুষটি। পেশাগত জীবনের হাজারো ঝড়ি-ঝাপটা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও মেধা ও সাহসের যে স্বাক্ষর তিনি রেখে গেছেন, তা জেলার সাংবাদিকতা ও নাগরিক আন্দোলনে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।
স্মরণসভায় এক বিষাদময় আবেশ ছড়িয়ে স্মৃতিচারণ করেন জেলা নাগরিক অধিকার ও উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি আবুল কালাম বাবলা, জেলা নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক আইনজীবী আজাদ হোসেন বেলাল, সদস্যসচিব আবুল কালাম আজাদ, দক্ষিণের মশালের সম্পাদক অধ্যক্ষ আশেক ই এলাহী, জেলা নাগরিক অধিকার ও উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মশিউর রহমান বাবু, সনাক-সাতক্ষীরার সভাপতি তৈয়ব হাসান বাবু, সিনিয়র আইনজীবী মোস্তফা আসাদুজ্জামান দিলু, সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সহসভাপতি আবুল কালাম, সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী সুজন ও মোজাফ্ফর রহমান, দৃষ্টিপাতের নির্বাহী সম্পাদক আবু তালেব মোল্লা, বার্তা সম্পাদক জিএম আদম সফিউল্লাহ, বৈশাখী টিভির শামীম পারভেজ, একাত্তর টিভির বরুণ ব্যানার্জী, দৈনিক পত্রদূতের বার্তা সম্পাদক এসএম শহীদুল ইসলাম, মানবাধিকারকর্মী লুইস রানা গাইন, সাতক্ষীরা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ডা. মহিদার রহমান, পাটকেলঘাটা প্রেসক্লাবের সভাপতি আব্দুল মোমিন, স্বপ্নসিঁড়ির সভাপতি নাজমুল হক, চ্যানেল নাইনের কৃষ্ণ মোহন ব্যানার্জী, বাংলা ট্রিবিউনের আসাদুজ্জামান সরদার, প্রথম আলোর ইমতিয়াজ উদ্দিন, স্টার নিউজের গাজী ফরহাদ, গ্লোবাল টিভির রাহাত রাজা ও আলোর পরশের মফস্বল বার্তা সম্পাদক গাজী হাবিব।
মনোজ্ঞ ও করুণ এই আয়োজনে আরও উপস্থিত ছিলেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আবু আফফান রোজ বাবু, উন্নয়নকর্মী জি এম মনিরুজ্জামান, সাতক্ষীরা সাংবাদিক কেন্দ্রের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. হোসেন আলী, নির্বাহী সদস্য (অর্থ) এস এম বিপ্লব হোসেন, নির্বাহী সদস্য (দপ্তর) এসএম জিন্নাহ, রেড ক্রিসেন্টের সাবেক যুব প্রধান মো. ইলিয়াস হোসেন, ভিবিডি সাতক্ষীরার তানজীল আলম, করিমন নেছা শান্তা, আবু তাহের, জালাল উদ্দীন, উম্মে ফোয়ারা রানী, তানজির কচি, হাবিবুর রহমান সোহাগ, রিজাউল করিম, নাজমুস সাহাদাৎ জাকির, ইব্রাহিম খলিল, মিলন রুদ্র, মৃত্যুঞ্জয় রায় অপূর্ব, আলী মুক্তাদা হৃদয়, এসএম তৌহিদুজ্জামান, কিশোর কুমার, জাহাঙ্গীর হোসেন, হাবিবুল হাসান, মেহেদী হাসান শিমুল ও ইকরামুল কবির।
বিকেলের সোনাঝরা আলো যখন সায়াহ্নের অন্ধকারে মেলাচ্ছিল, ঠিক তখনই শেষ হয় স্মৃতিচারণের অধ্যায়। পরিশেষে প্রয়াত জিএম নূর ইসলামের রুহের মাগফিরাত ও অনন্ত শান্তির জন্য ব্যাকুল প্রার্থনায় মহান আল্লাহর দরবারে হাত তোলেন উপস্থিত সকলে।












