নিউ ইয়র্ক টাইমসে বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা উন্মাদনার গল্প
চার বছর পরপর ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই ক্রিকেটপ্রেমী বাংলাদেশ যেন বদলে যায় আর্জেন্টিনার সমর্থকদের দেশে। রাজধানী ঢাকার দোকান, বাসাবাড়ি ও ভবনের ছাদে উড়তে থাকে নীল-সাদা আর্জেন্টিনার পতাকা। বিভিন্ন এলাকায় বসানো হয় বড় পর্দা, আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আয়োজিত ওয়াচ পার্টিতে জড়ো হন হাজারো দর্শক। বিশ্বকাপ এলেই বিশ্বের বিভিন্ন শীর্ষ গণমাধ্যম ও মিডিয়া বাংলাদেশে ছুটে আসে ফুটবল উন্মাদনা নিয়ে। এবার সেই সাড়িতে যুক্ত হলো যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস।
নিউ ইয়র্ক টাইমস তার প্রতিবেদনে লিখেছে, প্রায় ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের দেশ বাংলাদেশ কখনও ফুটবল বিশ্বকাপে খেলতে পারেনি। তবে বিশ্বকাপ চলাকালে হাজার হাজার মাইল দূরের আর্জেন্টিনাকেই নিজেদের দল হিসেবে বেছে নেন অনেক বাংলাদেশি। একই সময়ে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজ খেললেও বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দল অনেকটাই আড়ালে চলে যায়।
বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ১৯৮২ সালে টেলিভিশনে সরাসরি বিশ্বকাপ ফুটবল সম্প্রচার করা হয়। তিন দশকের বেশি সময় ধরে ক্রীড়া সাংবাদিকতা করা শামীম চৌধুরীর মতে, তখন থেকেই বিশ্বকাপের প্রতি বাংলাদেশের ভালোবাসার শুরু।
তবে তার বিশ্বাস, ১৯৮৬ বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনার অসাধারণ নৈপুণ্যই বাংলাদেশের মানুষের আর্জেন্টিনাপ্রীতির ভিত্তি গড়ে দেয়। ওই আসরে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল আর্জেন্টিনা।
ইতিহাসবিদদের মতে, সাবেক ব্রিটিশ উপনিবেশ অঞ্চলের অংশ হওয়ায় ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জয়কে বাংলাদেশের অনেক মানুষ প্রতীকী গুরুত্ব দিয়েও দেখেছিলেন।
রাজনীতির বাইরে শামীম চৌধুরীর ভাষায়, লাতিন আমেরিকার ফুটবলারদের ড্রিবলিং বাংলাদেশের মানুষের বেশি পছন্দ। ম্যারাডোনা যেমন করতেন, মেসিও তাই করছেন। সুন্দর ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা থেকেই আর্জেন্টিনার প্রতি এই টান তৈরি হয়েছে।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনার শিরোপা জয় এবং চলতি আসরে দলটির ফাইনালে ওঠার পর সেই ভালোবাসা আরও বেড়েছে বলে মনে করেন তিনি।
এই সমর্থনের বহিঃপ্রকাশও দেখা যায় নানা আয়োজনে। ঢাকার শিক্ষার্থী নাফিজ মাহমুদ আলিফ জানান, গত দুই বিশ্বকাপে তিনি ও তার বন্ধুরা ২০০ ফুট দীর্ঘ আর্জেন্টিনার পতাকা তৈরি করেছিলেন। তবে সেটি দেশের আরও বড় পতাকার ভিড়ে আলাদা করে নজর কাড়তে পারেনি।
এবার তাই তারা এক মাস পরিকল্পনা করে ৪০ ফুট উঁচু ও ৩০ ফুট চওড়া একটি বিশাল আর্জেন্টিনার জার্সি তৈরি করেন। সেটি দুটি ১০ তলা ভবনের মাঝখানে টাঙিয়ে দেওয়া হয়। আলিফের দাবি, এটি দেখতে হাজারো সমর্থকের পাশাপাশি ঢাকায় নিযুক্ত আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূতও তার প্রতিনিধিদলের সদস্যদের নিয়ে সেখানে গিয়েছিলেন।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার শিরোপা জয়ের পর বাংলাদেশের বিপুল ফুটবল সমর্থকের প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে দেশটি ঢাকায় তাদের দূতাবাস পুনরায় চালু করে। ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনার সামরিক শাসনামলে দূতাবাসটি বন্ধ করা হয়েছিল।
আলিফ জানান, তার বাবাসহ পরিবারের বড়দের কাছ থেকেই তিনি আর্জেন্টিনার সমর্থক হয়ে উঠেছেন। তার বাবা ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার খেলায় অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।
নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা ৪৮ বছর বয়সী মঈনুদ্দিন দেওয়ানও ছোটবেলা থেকেই আর্জেন্টিনার সমর্থক। চলতি বিশ্বকাপে তিনি পরিবারের শিশুদের জন্য আর্জেন্টিনার জার্সি কিনে দিয়েছেন। তিনি বলেন, আর্জেন্টিনা আমার শৈশবের ভালোবাসা। তাদের হার আমি সহ্য করতে পারি না।
মিসরের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে আর্জেন্টিনা দ্বিতীয় গোল হজম করার পর নিজের এলাকার ওয়াচ পার্টি ছেড়ে বাড়ি ফিরে যান তিনি। তার ভাষায়, দল বিদায় নেবে এই আশঙ্কা তিনি সহ্য করতে পারছিলেন না। পরে আর্জেন্টিনা সমতায় ফিরে ম্যাচ জেতার পর আবার উদযাপনে যোগ দেন।
ইংল্যান্ডকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা ফাইনাল নিশ্চিত করার পর নিজের গ্রামে বিজয় মিছিলের নেতৃত্ব দেন দেওয়ান। তার দাবি, সেই মিছিলে ৪০০ থেকে ৫০০ মানুষ অংশ নেন। এছাড়া আশপাশে আরও অন্তত পাঁচটি মিছিল বের হয়, যেখানে ‘মেসি, মেসি’ ও ‘আর্জেন্টিনা, আর্জেন্টিনা’ স্লোগান দেওয়া হচ্ছিল।
বাংলাদেশে ব্রাজিলেরও বিপুলসংখ্যক সমর্থক রয়েছে। আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও তীব্র। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা গোল হজম করার পর প্রতিবেশী ব্রাজিল সমর্থকেরা তাকে খোঁচা দিয়েছিলেন বলে জানান দেওয়ান। তবে আর্জেন্টিনা জয়ের পর তাদের আর দেখা যায়নি।
সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস






