সোমবার, ১ জুন ২০২৬, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
সোমবার, ১ জুন ২০২৬, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

পর্যটনের জোয়ারে সাতক্ষীরা: এখন প্রয়োজন দক্ষ জনশক্তি ও টেকসই পরিকল্পনা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১ জুন, ২০২৬, ১০:১২ অপরাহ্ণ
পর্যটনের জোয়ারে সাতক্ষীরা: এখন প্রয়োজন দক্ষ জনশক্তি ও টেকসই পরিকল্পনা

মো. মামুন হাসান
একজন জেলে একদিন সমুদ্রতীরে বসে জাল মেরামত করছিলেন। পাশ দিয়ে যাওয়া এক ব্যবসায়ী তাকে বললেন, আরও বড় নৌকা কিনুন, আরও বেশি মাছ ধরুন, আরও বেশি অর্থ উপার্জন করুন। জেলে জানতে চাইলেন, তারপর কী হবে? ব্যবসায়ী বললেন, একসময় আপনি নিশ্চিন্তে বসে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করবেন। জেলে মৃদু হেসে বললেন, আমি তো এখনই সেটাই করছি।

এই ছোট্ট গল্প আমাদের একটি বড় সত্যের সামনে দাঁড় করায়। প্রকৃতি নিজেই একটি সম্পদ, তবে সেই সম্পদকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ মানবসম্পদ এবং টেকসই ব্যবস্থাপনা। সাতক্ষীরা আজ সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।

সম্প্রতি ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটিকে কেন্দ্র করে সাতক্ষীরার পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে যে বিপুল পর্যটক সমাগম ঘটেছে, তা শুধু একটি মৌসুমি ঘটনা নয়; বরং এটি জেলার অর্থনৈতিক সম্ভাবনার একটি শক্তিশালী বার্তা। সুন্দরবন, রূপসী ম্যানগ্রোভ, মোজাফফর গার্ডেন, সীমান্তভিত্তিক পর্যটন এলাকা, ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থাপনাগুলোয় দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় প্রমাণ করেছে যে সাতক্ষীরা ধীরে ধীরে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হচ্ছে।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে পর্যটনকে বলা হয় ধোঁয়াবিহীন শিল্প। কারণ একটি পর্যটক যখন কোনো এলাকায় ভ্রমণ করেন, তখন তিনি শুধু একটি টিকিট কেনেন না; বরং পরিবহন, আবাসন, খাদ্য, বিনোদন, স্থানীয় পণ্য, সংস্কৃতি এবং অসংখ্য ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার অর্থনীতিকে সচল করেন। ফলে পর্যটনের প্রতিটি টাকা বহু মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের উৎস হয়ে ওঠে।

সাতক্ষীরার ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে। পর্যটক বৃদ্ধির ফলে স্থানীয় পরিবহন, নৌযান, রেস্তোরাঁ, আবাসিক হোটেল, ক্ষুদ্র ব্যবসা, হস্তশিল্প, মধু, গোলপাতা, কাঁকড়াসহ বিভিন্ন পণ্যের বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার হচ্ছে। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে স্থায়ী অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে হলে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দক্ষ জনবল।

আজকের পর্যটক শুধু একটি সুন্দর জায়গা দেখতে চান না। তিনি চান উন্নত সেবা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, তথ্যসমৃদ্ধ গাইড, নিরাপদ ভ্রমণ, মানসম্পন্ন আতিথেয়তা এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনা। আর এখানেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ।
এই বিভাগ থেকে শিক্ষার্থীরা পর্যটন ব্যবস্থাপনা, হোটেল অপারেশন, ফ্রন্ট অফিস ম্যানেজমেন্ট, ট্যুর গাইডিং, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, খাদ্য ও পানীয় সেবা, গ্রাহকসেবা, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং পর্যটন উদ্যোক্তা উন্নয়ন বিষয়ে কারিগরি জ্ঞান অর্জন করছে। ফলে তারা শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, বরং চাকরি সৃষ্টিকারী উদ্যোক্তা হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।

সাতক্ষীরার পর্যটন খাতকে এগিয়ে নিতে কয়েকটি ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল তৈরির বিশেষ সুযোগ রয়েছে। প্রথমত, সুন্দরবনভিত্তিক প্রশিক্ষিত ইকো ট্যুর গাইড তৈরি করা। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় যুবকদের মাধ্যমে হোমস্টে ও কমিউনিটি বেইজড ট্যুরিজম পরিচালনা করা। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক মানের হোটেল ও রিসোর্ট ব্যবস্থাপনার জন্য দক্ষ কর্মী তৈরি করা। চতুর্থত, স্থানীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও খাদ্যভিত্তিক পর্যটন উদ্যোক্তা গড়ে তোলা। পঞ্চমত, ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাণ ও পর্যটন বিপণনের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী সাতক্ষীরাকে পরিচিত করা।

বিশ্বের বহু দেশ তাদের প্রাকৃতিক সম্পদের চেয়ে মানবসম্পদকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। কারণ দক্ষ মানুষই সম্পদকে সম্পদে রূপান্তর করে। সাতক্ষীরার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সুন্দরবন আমাদের রয়েছে, নদী রয়েছে, জীববৈচিত্র্য রয়েছে, ঐতিহ্য রয়েছে। এখন প্রয়োজন এসব সম্পদকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করার জন্য দক্ষ ও পেশাদার জনশক্তি।

তবে শুধু পর্যটক বাড়লেই হবে না। টেকসই পর্যটনের বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশ দূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য, অপরিকল্পিত স্থাপনা, যানজট এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি এখন থেকেই বিবেচনায় নিতে হবে। পর্যটন উন্নয়ন এবং পরিবেশ সংরক্ষণকে একই সূত্রে গাঁথতে না পারলে ভবিষ্যতে এই সম্ভাবনা হুমকির মুখে পড়তে পারে।

এজন্য প্রয়োজন জেলা পর্যায়ে একটি সমন্বিত পর্যটন মহাপরিকল্পনা। যেখানে অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি, বিনিয়োগ আকর্ষণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে পর্যটন শিল্পের চাহিদার সঙ্গে কারিগরি শিক্ষার সমন্বয় ঘটাতে হবে, যাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বের হওয়া শিক্ষার্থীরা সরাসরি কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হতে পারে।

সাতক্ষীরার সামনে আজ একটি ঐতিহাসিক সুযোগ এসে দাঁড়িয়েছে। একদিকে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার, অন্যদিকে সীমান্তভিত্তিক বাণিজ্য, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার সম্ভার। সঠিক পরিকল্পনা ও দক্ষ মানবসম্পদ নিশ্চিত করা গেলে আগামী এক দশকে সাতক্ষীরা দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম পর্যটন অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

পর্যটনের এই জোয়ারকে যদি আমরা সাময়িক উৎসব হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক আন্দোলনে রূপ দিতে পারি, তবে সাতক্ষীরার হাজারো তরুণের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে এবং জেলার অর্থনীতিতে সূচিত হবে এক নতুন অধ্যায়। সেই লক্ষ্যেই আজ প্রয়োজন পর্যটন শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং টেকসই পর্যটন ব্যবস্থাপনার সমন্বিত যাত্রা। লেখক: ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট

 

 

 

Ads small one

সাতক্ষীরায় যুবদলের উদ্যোগে শহীদ জিয়ার শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে দোয়া ও খাদ্য বিতরণ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১ জুন, ২০২৬, ১১:৪৫ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরায় যুবদলের উদ্যোগে শহীদ জিয়ার শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে দোয়া ও খাদ্য বিতরণ

 

নিজস্ব প্রতিনিধি: শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে সাতক্ষীরায় দোয়া মাহফিল ও খাদ্য বিতরণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। জেলা যুবদলের উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতারা অংশ নেন।
সোমবার (১ জুন) দুপুরে সাতক্ষীরা শহরের বাস টার্মিনাল এলাকায় অনুষ্ঠিত কর্মসূচিতে শহীদ জিয়াউর রহমানের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হয়। পরে অসহায় ও দুস্থ মানুষের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শেখ তারিকুল হাসান, জেলা যুবদলের সমন্বয়ক আইনাল ইসলাম নান্টা, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট কামরুজ্জামান ভূট্টু, জেলা ছাত্রদলের সভাপতি আবু রায়হানসহ বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।
এ সময় বক্তারা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কর্মময় জীবন, স্বাধীনতার সংগ্রামে তাঁর ভূমিকা এবং দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদানের কথা তুলে ধরেন। তাঁরা বলেন, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
বক্তারা নতুন প্রজন্মের কাছে শহীদ জিয়ার দেশপ্রেম, নেতৃত্বগুণ ও উন্নয়ন ভাবনা তুলে ধরার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাঁর আদর্শ অনুসরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। দোয়া মাহফিলে দেশ ও জাতির কল্যাণ, শান্তি, সমৃদ্ধি এবং গণতন্ত্রের অগ্রগতি কামনা করা হয়।

কমনওয়েলথ গেমসে যাচ্ছেন সাতক্ষীরার কৃতি সন্তান শিরিন আক্তার: জেলা প্রশাসকের শুভেচ্ছা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১ জুন, ২০২৬, ১১:৪৪ অপরাহ্ণ
কমনওয়েলথ গেমসে যাচ্ছেন সাতক্ষীরার কৃতি সন্তান শিরিন আক্তার: জেলা প্রশাসকের শুভেচ্ছা

নিজস্ব প্রতিনিধি: স্কটল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া আসন্ন ‘কমনওয়েলথ গেমস ২০২৬’-এ বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন দেশসেরা স্প্রিন্টার ও দ্রুততম মানবী শিরিন আক্তার। আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনের এই মেগা ইভেন্টে তার অংশগ্রহণের বিষয়টি সাতক্ষীরা জেলা তথা সমগ্র বাংলাদেশের জন্য বয়ে এনেছে এক অনন্য গৌরব।
জানা গেছে, কমনওয়েলথ গেমসে অংশ নিতে স্কটল্যান্ড যাত্রার পূর্বে বাংলাদেশের এই চৌকস অ্যাথলেট সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসকের সাথে এক সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎকালে তিনি জেলা প্রশাসকের কাছে দোয়া ও আশীর্বাদ কামনা করেন।
এ সময় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুততম মানবী শিরিন আক্তারকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানানো হয়। সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক শিরিন আক্তারের এই গৌরবময় অর্জনের প্রশংসা করে বলেন, শিরিন আমাদের গর্ব। তিনি কেবল সাতক্ষীরা নয়, পুরো বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। আমাদের প্রত্যাশা, কমনওয়েলথ গেমসে তিনি বিজয়ের লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়ে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবেন। সাক্ষাৎকালে জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ এবং ক্রীড়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে শিরিন আক্তারও তার এই অগ্রযাত্রায় জেলা প্রশাসনসহ দেশবাসীর সার্বিক সহযোগিতা ও দোয়া চেয়েছেন, যাতে তিনি দেশের জন্য সেরা সাফল্যটি ছিনিয়ে আনতে পারেন।

সম্পাদকীয়: সুন্দরবনের তিন মাসের বিশ্রাম ও উপকূলের প্রস্তুতি

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১ জুন, ২০২৬, ১০:৪৫ অপরাহ্ণ
সম্পাদকীয়: সুন্দরবনের তিন মাসের বিশ্রাম ও উপকূলের প্রস্তুতি

পহেলা জুন থেকে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত টানা তিন মাসের জন্য সুন্দরবনে মানুষের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে বনবিভাগ। এই সময়ে বনের ভেতর মাছ ও কাঁকড়া শিকার, মধু আহরণ যেমন বন্ধ থাকবে, তেমনি বন্ধ থাকবে সব ধরনের পর্যটনও। মূলত জুন থেকে আগস্টÑএই তিন মাস সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী ও মৎস্য সম্পদের প্রজনন মৌসুম। প্রকৃতির নিয়মেই এই সময়ে নিভৃত পরিবেশ প্রয়োজন। তাই সুন্দরবনকে মানুষের আগ্রাসন থেকে সাময়িক মুক্তি দিয়ে যে ‘বিশ্রাম’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং প্রশংসনীয়।

সুন্দরবন কেবল আমাদের অহংকার নয়, এটি উপকূলীয় অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস কিংবা সিডর-আইলার মতো প্রলয়ংকরী প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে এই বন বুক চিতিয়ে লাখো মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করে। কিন্তু বছরের বাকিটা সময় এই বনের ওপর মানুষের যে চাপ থাকে, তা এককথায় নির্মম। তথ্যমতে, বছরে শুধু বৈধভাবেই লাখাধিকবার বনজীবীরা সুন্দরবনে প্রবেশ করেন, যার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে হাজার হাজার পর্যটকের আনাগোনা। মানুষের এই অতি-উপস্থিতি, কোলাহল এবং যান্ত্রিক নৌযানের শব্দ বনের ভেতরের প্রাণীদের স্বাভাবিক প্রজনন ও বিচরণকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করে। এই প্রেক্ষাপটে, বছরের নির্দিষ্ট একটা সময়ে বনের দরজা বন্ধ রাখা প্রকৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য অপরিহার্য।

তবে এই প্রশংসনীয় উদ্যোগের মুদ্রার ওপিঠে রয়েছে একটি মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট। সুন্দরবনের ওপর সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ৩০ হাজার বনজীবী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। এই তিন মাস মাছ, কাঁকড়া বা মধু সংগ্রহ বন্ধ থাকায় এই বিশাল জনগোষ্ঠী হুট করেই পুরোপুরি কর্মহীন হয়ে পড়বে। অভাবের তাড়নায় এই সময়ে পরিবারগুলো যাতে মহাজনদের চড়া সুদের ঋণের ফাঁদে না পড়ে, কিংবা জীবিকার তাগিদে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বনে অনুপ্রবেশ না করে-সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি।

সরকারের পক্ষ থেকে এই নিষেধাজ্ঞা চলাকালে নিবন্ধিত জেলে ও বনজীবীদের জন্য যে খাদ্য সহায়তা (ভিজিএফ চাল) দেওয়া হয়, তা যেন প্রকৃত ভুক্তভোগীদের কাছে সময়মতো এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে পৌঁছায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। শুধু চাল দেওয়াই যথেষ্ট নয়, পাশাপাশি এই তিন মাস তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের কোনো সুযোগ তৈরি করা যায় কি না, তাও ভেবে দেখা দরকার।

পরিশেষে বলা যায়, সুন্দরবন বাঁচলে বাঁচবে উপকূল, আর উপকূল বাঁচলে বাঁচবে বাংলাদেশ। সুন্দরবনকে সাময়িক বিশ্রাম দেওয়ার এই উদ্যোগ তখনই শতভাগ সফল হবে, যখন বনের সুরক্ষার পাশাপাশি এর ওপর নির্ভরশীল মানুষগুলোর পেটের ভাত নিশ্চিত করা যাবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং মানবিক সংকটের টেকসই সমাধানÑএই দুইয়ের সমন্বয়েই সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য আবার তার আপন রূপ ফিরে পাক, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।