প্রকৃতির ঘড়িতেই আগে পাকছে সাতক্ষীরার আম, এবারও কি বদলাবে আম ক্যালেন্ডার?
পত্রদূত রিপোর্ট: দেশের মানচিত্রে আমের স্বাদ আর গন্ধে সবার আগে যে জেলাটির নাম উঠে আসে, তা হলো সাতক্ষীরা। ভৌগোলিক অবস্থান আর মাটির গুণাগুণের কারণে উত্তরের জেলাগুলোর অন্তত ১৫ দিন আগেই এখানে আম পাকে। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে ‘আম ক্যালেন্ডার’ বা আম পাড়ার নির্ধারিত সময়সীমা নিয়ে চাষি ও প্রশাসনের মধ্যে এক ধরনের স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে আম আগে পেকে গেলেও ক্যালেন্ডারের গেরোয় পড়ে অনেক সময় চাষিদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে, ২০২৬ সালেও কি গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় আম পাড়ার সময় আরও এগিয়ে আসবে?
সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এবার জেলায় আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭০ হাজার মেট্রিক টনেরও বেশি। সাতক্ষীরার আম কেন আগে পাকে-এ নিয়ে কৃষি বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা বেশ পরিষ্কার। তাঁরা বলছেন, এখানকার গড় তাপমাত্রা উত্তরের চেয়ে কিছুটা বেশি এবং মৌসুমি বায়ুর প্রভাবও আগে পড়ে। ফলে আম্রপালি বা হিমসাগর সাতক্ষীরায় যখন পেকে হলদে হয়, তখন রাজশাহীতে তা কেবল আঁটি বাঁধে।
অথচ অপরিপক্ব আমে রাসায়নিক মিশিয়ে বাজারজাত করা রোধে গত কয়েক বছর ধরে প্রশাসন আম পাড়ার একটি নির্দিষ্ট তারিখ ঠিক করে দিচ্ছে। কিন্তু গত তিন বছরের উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ক্যালেন্ডারের সেই তারিখ বারবার প্রকৃতির কাছে হার মেনেছে।
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, প্রতিবছরই আম পাড়ার তারিখ ৪ থেকে ৫ দিন করে এগিয়ে আনতে বাধ্য হচ্ছে প্রশাসন।
২০২৩ সালে স্থানীয় জাতের আম পাড়ার সময় ছিল ১২ মে। ২০২৪ সালে সেই সময় ৩ দিন এগিয়ে নির্ধারণ করা হয় ৯ মে। ২০২৫ সালে আরও ৪ দিন কমিয়ে আনা হয় ৫ মে-তে। পরে আরো এক দফা কমানো হিমসাগর আম পাড়ার সময়।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০২৩ সালে সাতক্ষীরা জেলার আম ক্যালেন্ডার অনুযায়ী গোপালভোগ, বোম্বাই, গোলাপখাস, গোবিন্দভোগ, বৈশাখীসহ স্থানীয় জাতের আম পাড়ার সময় নির্ধারিত ছিল ১২ মে, হিমসাগর ২৫ মে, ন্যাংড়া ১ জুন এবং আম্রপলি ১৫ জুন।
সূত্রমতে, ২০২৪ সালে সময়সীমা আগের বছরের চেয়ে এগিয়ে এনে গোপালভোগ, বোম্বাই, গোলাপখাস, বৈশাখীসহ স্থানীয় জাতের আম পাড়ার সময় নির্ধারণ করা হয় ৯ মে, গোবিন্দভোগ ১১ মে, হিমসাগর ২২ মে, ন্যাংড়া ২৯ মে এবং আম্রপলি ১০ জুন।
সর্বশেষ গত ২০২৫ সালে সময়সীমা আরো এগিয়ে এনে গোপালভোগ, বোম্বাই, গোলাপখাস, গোবিন্দভোগ, বৈশাখীসহ স্থানীয় জাতের আম পাড়ার সময় নির্ধারণ করা হয় ৫ মে থেকে। হিমসাগর ২০ মে, ন্যাংড়া ২৭ মে এবং আম্রপলি পাড়ার সময় নির্ধারণ করা হয় ৫ জুন থেকে। কিন্তু ক্যালেন্ডারের সময়সীমার আগেই বিভিন্নস্থানে গাছের আম পেকে মাটিতে পড়তে থাকে। একপর্যায়ে গত বছর ১৪ মে সন্ধ্যায় সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসন জরুরি সভা ডেকে পরদিন ১৫ মে থেকে হিমসাগর আমর পাড়ার সময় এগিয়ে আনার ঘোষণা দেয়।
তিন বছরের এই আম ক্যালেন্ডার পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রতিবছরই পূর্বের চেয়ে আম পাড়ার সময় এগিয়ে আনা হয়েছে। তারপরও আম নিয়ে সমস্যা থেকেই গেছে।
গত বছর এক নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ক্যালেন্ডার অনুযায়ী হিমসাগর পাড়ার কথা ছিল ২০ মে, কিন্তু গাছে আম পেকে ঝরতে শুরু করায় চাষিদের চাপে ১৪ মে জরুরি সভা ডেকে ১৫ মে থেকে হিমসাগর পাড়ার অনুমতি দেয় জেলা প্রশাসন। অর্থাৎ প্রশাসনের নির্ধারিত ক্যালেন্ডার শেষ পর্যন্ত বাস্তবতার মুখে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়।
চাষিদের মূল উদ্বেগ কেবল আম পাকা নিয়ে নয়, বরং উপকূলে নিয়মিত আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় নিয়ে। এপ্রিল-মে মাস মানেই সাতক্ষীরায় কালবৈশাখী ও সাইক্লোনের আতঙ্ক। চাষিদের দাবি, আম পেকে গেলেও যদি ক্যালেন্ডারের জন্য অপেক্ষা করতে হয়, তবে যেকোনো এক ঝড়ে বছরের সব পরিশ্রম মাটিতে মিশে যেতে পারে। বিশেষ করে তীব্র গরম পড়লে আম দ্রুত পাকে, যা অনেক সময় ক্যালেন্ডার রচয়িতারা বিবেচনায় নেন না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একই জাতের আম এলাকাভেদে পাকার ক্ষেত্রে দুই মাস পর্যন্ত ব্যবধান হতে পারে। এটি আম গাছে মুকুল আসার সময় এবং মাটির তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করে। আবার একটি আমগাছে সম্পূর্ণ মুকুল আসতে প্রায় ২০ দিন সময় লাগে। যে মুকুলটি শুরুতে আসে আর যেটি শেষে আসে-এই দুই মুকুলের আম একসঙ্গে পাকে না। বিজ্ঞানীদের মতে, “জাতের চেয়ে আবহাওয়া ও পরিবেশই আম পাকার মূল কারিগর।” সাতক্ষীরার তপ্ত মাটি আর নোনা বাতাসের ছোঁয়া আমকে আগেভাগেই রসালো করে তোলে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, এ বছর এখনো ক্যালেন্ডার চূড়ান্ত হয়নি। তবে চাষিদের দাবি, তারিখ যেন কেবল খাতা-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে বাগানের বাস্তব পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হয়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, আগামী ২৯ এপ্রিল দেশের কৃষিবিদদের সভা অনুষ্ঠিত হবে। ওই সভায় আম হারবেস্ট বিষয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, “আমি স্থানীয় আমচাষীদের সাথেও কথা বলেছি। তবে এখনো পর্যন্ত জেলার আম পরিপক্ক হয়নি।” ১০ মে নাগাদ আম সংগ্রহ করা যেতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সাতক্ষীরার আমের সুনাম এখন বিশ্বজুড়ে। সেই সুনাম ধরে রাখতে যেমন রাসায়নিকমুক্ত আম নিশ্চিত করা প্রয়োজন, তেমনি প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সঠিক সময়ে আম বাজারজাত করার সুযোগ পাওয়া চাষিদের ন্যায্য অধিকার। প্রশাসনের পরবর্তী সভার দিকেই এখন চেয়ে আছেন জেলার হাজার হাজার আম চাষি ও ব্যবসায়ী।









