প্রেমের আগে আত্মগঠন
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
প্রেম মানুষের জীবনের স্বাভাবিক ও সুন্দর একটি অনুভূতি। প্রেম মানুষকে কোমল করে, অন্যের প্রতি যতœশীল হতে শেখায়, জীবনে আনন্দ যোগ করে। কিন্তু প্রশ্ন হলোÑজীবনের কোন সময়ে, কোন মানসিক প্রস্তুতিতে এবং কী উদ্দেশ্যে আমরা প্রেমকে গ্রহণ করছি? কারণ প্রেম নিজে সমস্যা নয়; সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন প্রেম জীবনের লক্ষ্যকে সরিয়ে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে ওঠে। বিশেষ করে কৈশোর ও তারুণ্যের সময়ে এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। এই বয়সে আবেগ তীব্র, কল্পনা প্রবল, অথচ জীবনের বাস্তবতা সম্পর্কে অভিজ্ঞতা সীমিত। ফলে সাময়িক আকর্ষণকে অনেক সময় স্থায়ী ভালোবাসা বলে মনে হয়। একজন মানুষকে ঘিরে তখন ভবিষ্যতের সব স্বপ্ন তৈরি হয়। পড়াশোনা, ক্যারিয়ার, পরিবার, আত্মনির্ভরতাÑসবকিছু যেন দ্বিতীয় হয়ে যায়। অথচ এই সময়টিই একজন মানুষের ভবিষ্যৎ ব্যক্তিত্বের ভিত গড়ে দেওয়ার সময়। তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিতÑপ্রেম করব কি না, তা নয়; বরং প্রেমের আগে নিজেকে কতটা তৈরি করেছি? নিজেকে তৈরি করা বলতে শুধু ভালো ফলাফল বা অর্থ উপার্জনের যোগ্যতা বোঝায় না।
আত্মগঠন অনেক বিস্তৃত একটি বিষয়। নিজের চরিত্র, বিবেক, চিন্তাশক্তি, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, দায়িত্ববোধ, আত্মসম্মান, ধৈর্য এবং অন্য মানুষের প্রতি সম্মানÑসবকিছুর সমন্বয়েই একজন পরিণত মানুষ তৈরি হয়। একজন তরুণ যদি নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না রাখে, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা না করে, আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না শেখে, তাহলে শুধু প্রেমের সম্পর্ক তাকে পরিণত করে তুলবেÑএমন নিশ্চয়তা নেই। বরং অপরিপক্বতার কারণে সম্পর্কটি তার জন্য মানসিক চাপ ও হতাশার কারণ হয়ে উঠতে পারে। আমাদের সমাজে প্রেম নিয়ে দুটি বিপরীত প্রবণতা দেখা যায়। একদিকে কেউ কেউ প্রেমকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন যেন প্রেম ছাড়া জীবন অসম্পূর্ণ। অন্যদিকে অনেকে প্রেমকে সম্পূর্ণ নেতিবাচক হিসেবে দেখেন। দুটো অবস্থানই একপেশে। সুস্থ প্রেম জীবনের সৌন্দর্য বাড়াতে পারে, কিন্তু অসুস্থ সম্পর্ক জীবনকে বিপর্যস্তও করতে পারে। সুতরাং প্রয়োজন নিষেধ নয়, প্রয়োজন সচেতনতা।
একটি সম্পর্ক তখনই সুন্দর হয়, যখন সেখানে দুজন মানুষের ব্যক্তিসত্তার বিকাশের সুযোগ থাকে। ভালোবাসা কাউকে তার পড়াশোনা থেকে দূরে সরিয়ে দেবে না, স্বপ্ন ত্যাগ করতে বাধ্য করবে না, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করবে না কিংবা আত্মসম্মান নষ্ট করবে না। বরং সত্যিকারের ভালোবাসা মানুষকে আরও দায়িত্বশীল, আরও মানবিক এবং আরও ভালো মানুষ হওয়ার অনুপ্রেরণা দেবে। কিন্তু বাস্তবে আমরা অনেক সময় এর বিপরীত চিত্র দেখি। প্রেমের নামে অতিরিক্ত নির্ভরতা, সারাক্ষণ যোগাযোগের চাপ, সন্দেহ, অধিকারবোধ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরদারি, বিচ্ছেদের ভয়Ñএসব ধীরে ধীরে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও আত্মবিশ্বাসকে ক্ষয় করতে পারে। তখন সম্পর্ক ভালোবাসার জায়গা থেকে সরে গিয়ে মানসিক নির্ভরতার জায়গায় দাঁড়ায়। বিশেষ করে তরুণদের মনে রাখা দরকার, কাউকে ভালোবাসা আর নিজের অস্তিত্ব কাউকে দিয়ে দেওয়া এক বিষয় নয়। নিজের স্বপ্নের মালিক নিজেকেই থাকতে হবে। সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু নিজের পরিচয়ও থাকবে। ভালোবাসা থাকবে, কিন্তু আত্মসম্মানও থাকবে। সঙ্গী থাকবে, কিন্তু নিজের লক্ষ্যও থাকবে। কারণ জীবন দীর্ঘ।
তারুণ্যের একটি সম্পর্কই জীবনের শেষ সত্য নয়। মানুষের জীবন বদলায়, মানুষ বদলায়, পরিস্থিতি বদলায়। যে সম্পর্ক আজ অবিচ্ছেদ্য মনে হচ্ছে, কয়েক বছর পর সেটিই হয়তো জীবনের একটি অধ্যায় হয়ে থাকবে। কিন্তু সেই সময়ের মধ্যে অর্জিত শিক্ষা, দক্ষতা, চরিত্র ও আত্মবিশ্বাস সারা জীবন সঙ্গে থাকবে। এই জায়গাতেই আত্মগঠনের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি।
একজন তরুণ যদি নিজের শিক্ষা শেষ করে, কোনো পেশাগত দক্ষতা অর্জন করে, অর্থনৈতিকভাবে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে এবং মানসিকভাবে পরিণত হয়, তাহলে তার সম্পর্কের সিদ্ধান্তও সাধারণত বেশি বাস্তবসম্মত হয়। তখন সে শুধু আবেগ দিয়ে নয়, বিবেচনা দিয়ে মানুষকে মূল্যায়ন করতে শেখে। সে বুঝতে পারেÑশুধু চেহারা, কথার মাধুর্য কিংবা মুহূর্তের আকর্ষণ দিয়ে জীবনসঙ্গী নির্বাচন করা যায় না। মানুষের চরিত্র, দায়িত্ববোধ, মূল্যবোধ, আচরণ ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গিও গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে আত্মগঠনহীন আবেগ অনেক সময় মানুষকে ভুল সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়। শুধু ‘সে আমাকে ভালোবাসে’Ñএই একটি কারণ দিয়ে কোনো সম্পর্ককে নিরাপদ বা উপযুক্ত ধরে নেওয়া যায় না। একজন মানুষ কেমন জীবনযাপন করে, তার মূল্যবোধ কী, সে দায়িত্ব নিতে পারে কি না, অন্যকে সম্মান করে কি নাÑএসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকাও রয়েছে।
তরুণদের প্রেমের বিষয়ে শুধু ভয় দেখানো বা শাসন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণভাবে কথা বলতে হবে। আবেগ কী, আকর্ষণ কী, দায়িত্ব কী, সুস্থ সম্পর্ক কাকে বলেÑএসব বোঝাতে হবে। একই সঙ্গে তাদের সামনে এমন একটি ভবিষ্যৎ তৈরি করতে হবে, যেখানে শিক্ষা, দক্ষতা, খেলাধুলা, সংস্কৃতি, সৃজনশীলতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকবে। কারণ শূন্যতা থেকেই অনেক সময় অতিরিক্ত আবেগের জন্ম হয়। যার নিজের কোনো লক্ষ্য নেই, সে অন্য একজন মানুষকেই হয়তো নিজের পুরো পৃথিবী বানিয়ে ফেলে। তাই তরুণদের বলা দরকারÑনিজেকে ব্যস্ত রাখো, কিন্তু শুধু ব্যস্ত থাকার জন্য নয়; নিজেকে উন্নত করার জন্য।
বই পড়ো, নতুন কিছু শেখো, শরীরচর্চা করো, পরিবারকে সময় দাও, সমাজকে বোঝো, নিজের দক্ষতা বাড়াও। নিজের এমন একটি পরিচয় তৈরি করো, যাতে তোমাকে চিনতে অন্য কারও পরিচয়ের প্রয়োজন না হয়। আত্মগঠন মানুষকে প্রেম থেকে দূরে সরিয়ে দেয় না; বরং প্রেমকে আরও সুস্থ ও সুন্দর করে। কারণ পরিণত মানুষ জানে, ভালোবাসা মানে শুধু কাছে পাওয়া নয়Ñপ্রয়োজনে সম্মান দিয়ে দূরত্বও মেনে নেওয়া।
ভালোবাসা মানে শুধু অধিকার নয়Ñস্বাধীনতার প্রতিও শ্রদ্ধা। ভালোবাসা মানে শুধু আবেগ নয়Ñদায়িত্বও। আমাদের তরুণদের সামনে তাই একটি নতুন জীবনদর্শন তুলে ধরা প্রয়োজনÑ‘আগে নিজেকে গড়ো, তারপর সম্পর্ককে জায়গা দাও।’ আজ যে বয়সে নিজের ভবিষ্যৎ তৈরি করার কথা, সে বয়সে যদি আমরা শুধু সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চিন্তায় ডুবে থাকি, তাহলে ভবিষ্যতের অনেক দরজা নিজেরাই বন্ধ করে দিতে পারি। আবার নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে নেওয়ার পর যে ভালোবাসা জীবনে আসে, সেটি অনেক বেশি সচেতন, দায়িত্বশীল ও স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।
জীবনে প্রেম আসবেই। কখনো তা থাকবে, কখনো থাকবে না। কেউ হয়তো পাশে থাকবে সারাজীবন, কেউ হয়তো মাঝপথে চলে যাবে। কিন্তু নিজের শিক্ষা, দক্ষতা, চরিত্র, আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাসÑএসবই শেষ পর্যন্ত মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ।তাই প্রেমকে ভয় নয়, প্রেমকে বোঝার শিক্ষা দরকার। প্রেমকে অস্বীকার নয়, প্রেমের আগে নিজের ভিত শক্ত করার শিক্ষা দরকার। কারণ যে নিজেকে গড়ে তুলতে পারে, সে শুধু ভালোবাসতে শেখে নাÑসে ভালোবাসার যোগ্য একজন মানুষও হয়ে ওঠে। জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সম্পর্কের জন্য তাই তাড়াহুড়ো নয়। আগে নিজের ভিত তৈরি হোক। নিজের স্বপ্নের সঙ্গে নিজের পরিচয় তৈরি হোক। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর শক্তি তৈরি হোক। তারপর প্রেম আসুকÑজীবনকে পূর্ণ করতে, জীবনকে গ্রাস করতে নয়। প্রেমের আগে আত্মগঠনÑএই হোক তারুণ্যের নতুন অঙ্গীকার।
লেখক: সংবাদকর্মী









