বজ্রের আঘাতে মৃত্যু: সতর্কতার অভাব, নাকি নীরব দুর্যোগ?
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে বৈশাখের আকাশ যখন হঠাৎ কালো হয়ে ওঠে, দূরে কোথাও মেঘ গর্জে ওঠে, তখন প্রকৃতির এই স্বাভাবিক দৃশ্যই মুহূর্তের মধ্যে পরিণত হতে পারে মৃত্যুফাঁদে। বজ্রপাত-যা একসময় ছিল বিচ্ছিন্ন ও অপ্রত্যাশিত একটি প্রাকৃতিক ঘটনা-এখন ক্রমেই রূপ নিচ্ছে নিয়মিত এক দুর্যোগে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় একদিনেই একাধিক প্রাণহানির ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই সংকট আর উপেক্ষা করার মতো নয়। প্রশ্ন উঠছে-এই মৃত্যু কি শুধুই নিয়তির নির্মমতা, নাকি আমাদের প্রস্তুতির ঘাটতির ফল? এক দিনের চিত্র: বহু জীবনের অবসানসম্প্রতি দেশের অন্তত সাতটি জেলায় বজ্রপাতে ১৪ জনের মৃত্যুর ঘটনা সামনে এসেছে। গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, জামালপুর, ঠাকুরগাঁও, বগুড়া, নাটোর ও পঞ্চগড়-এই বিস্তৃত ভূগোল যেন একটাই বার্তা দেয়: বজ্রপাত এখন আর কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের সমস্যা নয়, এটি জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে একসঙ্গে তিন তরুণের মৃত্যু, মাঠে কাজ করতে গিয়ে কৃষকের প্রাণহানি, নদীর চরে গরু চরাতে গিয়ে বজ্রাঘাতে মৃত্যুবরণ-এই ঘটনাগুলো কেবল সংখ্যা নয়, এগুলো বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রামের নির্মম প্রতিচ্ছবি। তাদের অধিকাংশই তখন জীবিকার প্রয়োজনে খোলা আকাশের নিচে ছিলেন-যেখানে বজ্রপাতের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। বজ্রপাতে নিহতদের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে-তারা প্রায় সবাই কৃষক, দিনমজুর, জেলে বা শ্রমজীবী মানুষ। অর্থাৎ যারা দেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তি, তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। এটি কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের চিত্র নয়; এটি সামাজিক বৈষম্যেরও প্রতিফলন।
শহরের মানুষ যখন দালানকোঠায় নিরাপদে থাকেন, তখন গ্রামাঞ্চলের কৃষক খোলা মাঠে কাজ করতে বাধ্য হন। তাদের জন্য কোনো নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র নেই, নেই তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা পাওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা। বিজ্ঞানীদের মতে, বজ্রপাত বৃদ্ধির পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বাড়ার ফলে বায়ুম-লে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার পরিবর্তন ঘটে, যা বজ্রঝড়ের সম্ভাবনা বাড়ায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে বজ্রপাতের সম্ভাবনা প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। বাংলাদেশ, যা জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ, সেখানে এই প্রভাব আরও বেশি দৃশ্যমান হওয়াই স্বাভাবিক। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে: যদি বজ্রপাত বৃদ্ধির পেছনে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন দায়ী হয়, তাহলে এই মৃত্যু কি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক? নাকি এটি আংশিকভাবে মানবসৃষ্ট দুর্যোগ? ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সরকার বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
এর আগে বজ্রপাতে মৃত্যুর কোনো সরকারি হিসাবও রাখা হতো না। এই স্বীকৃতির ফলে অন্তত বিষয়টি রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব পেয়েছে।কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই স্বীকৃতির পরও মাঠপর্যায়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন খুব একটা দৃশ্যমান নয়। বজ্রনিরোধক টাওয়ার স্থাপন, গ্রামভিত্তিক নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, আর্থিং ব্যবস্থার প্রসার-এসব উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও এর কার্যকর বাস্তবায়ন সীমিত। বিশেষজ্ঞরা বারবার বলছেন, বজ্রপাতে মৃত্যুর বেশিরভাগ ঘটনাই প্রতিরোধযোগ্য।
কিছু সাধারণ সতর্কতা মানলেই অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব:বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠে না থাকা, উঁচু গাছ বা বিদ্যুতের খুঁটির নিচে আশ্রয় না নেওয়া, পানিতে অবস্থান না করা, দ্রুত দালান বা ঘরের ভেতরে আশ্রয় নেওয়া, ঘরের ভেতরে ধাতব বস্তু স্পর্শ না করা, এই নির্দেশনাগুলো সহজ, কিন্তু সমস্যা হলো-এগুলো অনেক ক্ষেত্রেই ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায় না। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় সচেতনতার ঘাটতি এখনো বড় বাধা। বজ্রপাত প্রতিরোধে তালগাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ধারণা করা হয়, উঁচু গাছ বজ্রকে মাটিতে নামিয়ে দিতে সাহায্য করে। কিন্তু একটি তালগাছ বড় হতে ১৫-২০ বছর সময় লাগে। এই দীর্ঘ সময়ে কীভাবে বর্তমান ঝুঁকি মোকাবিলা করা হবে? অন্যদিকে বজ্রনিরোধক টাওয়ার স্থাপন একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। কিন্তু এটি ব্যয়বহুল এবং পরিকল্পিত বাস্তবায়ন প্রয়োজন। এখনো দেশের অধিকাংশ গ্রামে এ ধরনের কোনো অবকাঠামো নেই। বজ্রপাতে মৃত্যুর সঠিক পরিসংখ্যান এখনো নির্ভরযোগ্য নয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের ওপর ভিত্তি করে তথ্য সংগ্রহ করা হয়, ফলে অনেক ঘটনাই অজানা থেকে যায়।
এছাড়া আহত হয়ে পরে মারা যাওয়া বা মানসিক ট্রমার কারণে মৃত্যুর ঘটনাগুলোও পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত হয় না। ফলে সমস্যার প্রকৃত গভীরতা আমরা পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারি না। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির ব্যবহার করে বজ্রপাতের আগাম সতর্কতা দেওয়া সম্ভব। আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে বজ্রঝড়ের পূর্বাভাস দেওয়া হয়। কিন্তু এই তথ্য কি মাঠপর্যায়ের কৃষকের কাছে পৌঁছায়? মোবাইলভিত্তিক সতর্কবার্তা, স্থানীয় পর্যায়ে সাইরেন বা মাইকিং ব্যবস্থা-এসব উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে প্রাণহানি অনেক কমানো সম্ভব। বজ্রপাত মোকাবিলায় রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেবল নীতিনির্ধারণ নয়, তার কার্যকর বাস্তবায়নই আসল চ্যালেঞ্জ।
গ্রামভিত্তিক নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, বজ্রনিরোধক টাওয়ার স্থাপন, আর্থিং ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা, সচেতনতা বৃদ্ধি কর্মসূচি জোরদার করা, কৃষকদের জন্য বিশেষ সতর্কতা ব্যবস্থা চালু করা, এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। বাংলাদেশে বজ্রপাতে মৃত্যু প্রায়ই ‘নিয়তি’ বলে মেনে নেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই মৃত্যুর বড় অংশই প্রতিরোধযোগ্য। প্রকৃতি তার নিয়মে চলবে, কিন্তু মানুষের দায়িত্ব হলো সেই ঝুঁকি কমানো। পরিকল্পনার অভাব, সচেতনতার ঘাটতি এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতা-এই তিনটির সমন্বয়েই বজ্রপাত এখন প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। বজ্রপাতের শক্তিকে কাজে লাগানোর স্বপ্ন বিজ্ঞানীরা দেখছেন-এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।
কিন্তু তার আগে প্রয়োজন এই দুর্যোগ থেকে মানুষের জীবন রক্ষা করা। প্রতিটি প্রাণহানি একটি পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়, একটি অর্থনৈতিক ভিত্তি নষ্ট করে দেয়। তাই বজ্রপাতকে আর অবহেলা করার সুযোগ নেই। এখনই সময় এটিকে একটি অগ্রাধিকার জাতীয় ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করা, এবং সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। না হলে প্রতি বৈশাখে আকাশের গর্জনের সঙ্গে আমাদের শুনতে হবে আরও অনেক মৃত্যুর খবর-যা আসলে ছিল প্রতিরোধযোগ্য।
লেখক: সংবাদকর্মী






