সম্পাদকীয়: প্রসঙ্গ: ফসলি জমিতে লোনাপানির দুর্বৃত্তায়ন রুখবে কে?
সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার আটটি গ্রামের কৃষকদের ওপর যে বিপর্যয় নেমে এসেছে, তা কেবল মর্মান্তিক নয়, বরং এটি একটি পরিকল্পিত অপরাধ। রাতের আঁধারে স্লুইসগেটের কপাট তুলে প্রায় ১০ হাজার বিঘা ফসলি জমিতে লোনাপানি ঢুকিয়ে দেওয়ার ঘটনা কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। এটি স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহলের চরম স্বার্থপরতা এবং আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর নিকৃষ্ট উদাহরণ। এই ঘটনায় কেবল হাজার হাজার বিঘা জমির ধান নষ্ট হয়নি, বরং ওই অঞ্চলের পরিবেশ ও দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যনিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
খাজরা ও বড়দল ইউনিয়নের যে গ্রামগুলো প্লাবিত হয়েছে, সেখানে গত তিন বছর পর এবারই প্রথম বোরো ধানের ভালো ফলনের আশা করেছিলেন কৃষকেরা। কিন্তু একদল দুর্বৃত্তের মাছ ধরার লালসায় সেই স্বপ্ন এখন নোনাজলে ভাসছে। লোনাপানির প্রভাবে শুধু ধান নয়, মারা যাচ্ছে গাছপালা, দেখা দিয়েছে গো-খাদ্য ও সুপেয় পানির তীব্র সংকট। বিশেষ করে ধর্মীয় সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় এমন ঘটনা ঘটানো এবং ভয়ভীতির কারণে স্থানীয়দের প্রতিবাদ করতে না পারাÑদেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য এক অশনিসংকেত।
খালের সামান্য মাছ ধরার জন্য ১০ হাজার বিঘা জমির ফসলকে বিসর্জন দেওয়া কোনো সাধারণ অপরাধ হতে পারে না। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী চক্রটি স্কেভেটর মেশিন ব্যবহার করে গেটের কপাট তুলেছে। প্রশ্ন জাগে, একটি স্লুইসগেটের কপাট খোলার মতো বড় কর্মযজ্ঞ প্রশাসনের অগোচরে কীভাবে সম্ভব হলো? স্লুইসগেট সংস্কারের পর কোনো তদারকি কমিটি না থাকা কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতারই বহিঃপ্রকাশ। এই সুযোগটিই নিয়েছে স্বার্থান্বেষী মহল।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পানি উন্নয়ন বোর্ড দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু কেবল লোনাপানি প্রবেশ বন্ধ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। যারা এই পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের নেপথ্যে কারিগর, তাঁদের আইনের আওতায় আনা জরুরি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের জবরদস্তি রুখতে জনসম্পৃক্ত তদারকি কমিটি গঠন করতে হবে।
সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষি এমনিতেই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকির মুখে। সেখানে মানুষের তৈরি এমন কৃত্রিম বিপর্যয় মেনে নেওয়া যায় না। আমরা আশা করি, প্রশাসন কঠোর তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের চিহ্নিত করবে এবং কৃষকের হাহাকার থামাতে দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ নেবে। ফসলি জমিতে লোনাপানির এই বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলা এখন সময়ের দাবি।







