মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩

বর্ষাকাল উপকূলীয় মানুষের জন্য বিপদসংকুল সময়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬, ৪:০১ অপরাহ্ণ
বর্ষাকাল উপকূলীয় মানুষের জন্য বিপদসংকুল সময়

প্রকাশ ঘোষ বিধান

বর্ষাকাল বাংলাদেশের উপকূলীয় মানুষের জন্য অত্যন্ত বিপদসংকুল ও ঝুঁকিপূর্ণ সময়। সমুদ্র উত্তাল থাকে এবং পূর্ণিমা ও অমাবস্যার জোয়ারের প্রভাবে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উচ্চতার জোয়ারের পানি উপকূলীয় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত করে। সক্রিয় মৌসুমী বায়ু, ভারী বৃষ্টিপাত এবং সমুদ্রের বৈরী পরিবেশের কারণে এই সময়ে উপকূলের জনজীবনে চরম ভোগান্তি ও বিপর্যয় নেমে আসে।

বর্ষাকালে বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ ও সাইক্লোন সৃষ্টি হয়, যা বিশাল জলোচ্ছ্বাস নিয়ে উপকূলে আঘাত হানে। জরাজীর্ণ বেড়িবাঁধগুলো পানির তীব্র চাপে ভেঙে যায় এবং মাইলের পর মাইল এলাকা প্লাবিত হয়। ভৌগোলিক অবস্থান এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগের চরম আঘাত এই সময়ে উপকূলের বাসিন্দাদের নানামুখী তীব্র সংকটের মুখোমুখি হতে হয়।

বর্ষায় বাংলাদেশের উপকূলবর্তী এলাকার মানুষের জীবন হয়ে ওঠে চরম সংকটাপন্ন ও বিপর্যস্ত। মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে নিয়মিত বৃষ্টি, পূর্ণিমার অস্বাভাবিক জোয়ার, এবং ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের কারণে প্রতি বছর উপকূলীয় জনপদের হাজার হাজার মানুষকে সীমাহীন ভোগান্তি পোহাতে হয়। এই সময়ে সাগরে সৃস্ট ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নড়বড়ে বেড়িবাঁধের সাথে যুদ্ধ করে তাদের টিকে থাকতে হয়। বর্ষার আগমনে উপকূলের মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক।

বর্ষায় আকাশের কালো মেঘ এবং উপকূলের কান্না এক আবেগঘন দৃশ্য। আকাশে কালো মেঘ জমে প্রকৃতির রূপ যেমন থমথমে ও বিষণœ হয়ে ওঠে, তেমনি উপকূলের কান্না প্রকৃতির দুর্যোগ বা মানুষের দুঃখ-দুর্দশার প্রতীক। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষত আর উপকূলের কান্না ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস বা অবিরাম বর্ষণে উপকূলবাসীর ঘরবাড়ি ও জীবনের যে ক্ষতি হয়, তাকে বোঝায়। বর্ষায় এ অভিগজ্ঞতা উপকূলবাসীর জন্য নতুন কিছু নয়।

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের কাছে বর্ষায় কালো মেঘ সবসময়ই আতঙ্কের নাম। আকাশজুড়ে যখন ভারী কালো মেঘ জমে, তখন চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসে এবং শুরু হয় অঝোর বৃষ্টি। ঝড়-বৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস আর বাঁধ ভাঙা নদীর রূপ তাদের জীবনে নিয়ে আসে কান্না ও হাহাকার। উত্তাল সমুদ্রের গর্জন, উপকূলের ভেঙে যাওয়া বেড়িবাঁধ আর বর্ষার দুর্যোগে তাদের ঘরবাড়ি হারানোর ভয়, সব মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠে উপকূলের মানুষের দীর্ঘশ্বাসের প্রতিচ্ছবি।

গ্রীষ্মের দাবদাহ শেষে যখন আকাশ ভারী কালো মেঘে ঢেকে যায়, তখন চারপাশ এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ছেয়ে যায়। কালো মেঘের আড়ালে বিদ্যুতের চমকানি আর গর্জনে প্রকৃতি যেন তার রুদ্র রূপ প্রকাশ করে। মেঘলা দিনের এই থমথমে রূপ মানুষের মনে লুকানো বিষাদ ও গভীর আবেগ জাগিয়ে তোলে। সাগরের উত্তাল ঢেউ আর উপকূলের ভাঙন যেন মানুষের না বলা কষ্টের কান্না। বর্ষার মেঘের মতোই উপকূলের মানুষের হাহাকার আর অশ্রু মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসরত লাখ লাখ মানুষের জীবনপ্রবাহ প্রতি মুহূর্তে জলবায়ু পরিবর্তন এবং ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে লড়াই করে টিকে থাকতে হয়। অতিবৃষ্টি ও প্রবল বাতাসে কাঁচা ঘরবাড়ি ভেঙে পড়ে। অনেক পরিবারকে পলিথিন টাঙিয়ে বা অন্যের বাড়িতে মানবেতর জীবন কাটাতে হয়। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার মতো স্থায়ী সমস্যাগুলো তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী।

অধিকাংশ উপকূলীয় এলাকায় বেড়িবাঁধ অত্যন্ত নাজুক বা জরাজীর্ণ। বর্ষার জোয়ারের পানি ও প্রবল বৃষ্টিতে এই বাঁধ ভেঙে বা উপচে লোকালয় ও ফসলি জমি তলিয়ে যায়, যার ফলে ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষতি হয়। জোয়ারের নোনা পানি বাড়ির আঙিনা ও পুকুরে ঢুকে পড়ে। এর ফলে বর্ষার সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দেয় এবং পানিবন্দী মানুষদের মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়। বছরের এ সময়টাতে উপকূলীয় এলাকায় ডায়রিয়া, আমাশয় ও চর্মরোগের প্রকোপ বাড়ে। বিশুদ্ধ পানির অভাব এবং স্যাঁতসেঁতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বিশেষ করে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলে।

 

বর্ষায় নদী উত্তাল থাকায় জেলেরা মাছ ধরতে যেতে পারেন না। এছাড়া জলোচ্ছ্বাসের পানিতে ভেসে যায় চিংড়ি ঘের ও ফসলি জমি। এতে কর্মহীন হয়ে পড়া নিম্ন আয়ের মানুষের ঘরে ঘরে তীব্র খাদ্যসংকট দেখা দেয়। ভাঙনপ্রবণ এলাকায় বর্ষা এলেই নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করে। অনেক পরিবার চোখের পলকে ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়।

সিডর, আইলা, আম্ফান বা রেমালের মতো প্রবল শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়গুলো বারবার আঘাত হেনে উপকূলের বেড়িবাঁধ ভেঙে তছনছ করে দিয়েছে। ফলে জোয়ারের নোনা পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে, ফসল ও মাছের ঘের তলিয়ে যায়। দুর্যোগের পরে সবচেয়ে বড় দুর্ভোগ দেখা দেয় বিশুদ্ধ পানির। লবণাক্ত পানির কারণে চর্মরোগ ও পানিবাহিত রোগ মহামারি আকার ধারণ করে। লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে কৃষিজমি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে স্থানীয় কৃষকরা ফসল ফলাতে পারে না। ফলে পেশা হারিয়ে বাধ্য হয়ে অনেকে পরিবেশগত উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়।

জরাজীর্ণ বেড়িবাঁধ এবং প্রয়োজনের তুলনায় সাইক্লোন সেন্টারের স্বল্পতার কারণে মানুষ চরম আতঙ্কে থাকে। দুর্যোগের পর ত্রাণ সহায়তা পৌঁছাতেও নানাবিধ আমলাতান্ত্রিক ও পরিবহন জটিলতা দেখা দেয়, যার ফলে ভুক্তভোগীরা দীর্ঘমেয়াদী কষ্টের মধ্যে পড়েন। উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য ম্যানুয়াল পদ্ধতি ও উন্নত প্রযুক্তির সমন্বয়ে টেকসই কংক্রিটের বেড়িবাঁধ নির্মাণ, নিরাপদ পানির স্থায়ী ব্যবস্থা এবং কার্যকরী সাইক্লোন সেন্টার তৈরি করা সবচেয়ে জরুরি।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

Ads small one

দক্ষিণবঙ্গের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ: সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬, ৬:৩৯ অপরাহ্ণ
দক্ষিণবঙ্গের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ: সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ

মাসুদ রানা

নদী, প্রকৃতি, ইতিহাস আর সংস্কৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা দক্ষিণ-পশ্চিমের ঐতিহ্যবাহী জেলা সাতক্ষীরা। আর এই জেলার শিক্ষার আলো ছড়াতে যে প্রতিষ্ঠানটি গত আট দশক ধরে বাতিঘর হিসেবে কাজ করছে, তা হলো সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ। ‘জ্ঞানী শক্তি’-এই মহৎ বাণীকে বুকে ধারণ করে ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই বিদ্যাপীঠটি আজ দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ও জাতীয়করণ:সাতক্ষীরা জেলার প্রথম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১৯৪৬ সালে এই কলেজের যাত্রা শুরু হয়। তৎকালীন শিক্ষানুরাগীদের অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়ে ওঠা এই বিদ্যাপীঠটি পরবর্তীতে ১ মার্চ ১৯৮০ সালে জাতীয়করণ করা হয়। জেলা শহরের রাজারবাগান এলাকায় অবস্থিত ৩০ একরের বিশাল এই ক্যাম্পাসটি সাতক্ষীরার শিক্ষার ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।

চোখ জুড়ানো সবুজ ও দৃষ্টিনন্দন ক্যাম্পাস: ৩০ একরের এই বিশাল ক্যাম্পাসে পা রাখলেই মন জুড়িয়ে যায়। কলেজের মূল ফটক বা প্রবেশদ্বার রয়েছে দুটি। প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশ করতেই ডান পাশে চোখে পড়বে এক বিশাল আকৃতির শিশু গাছ, যা মূল ভবনের সামনের বিস্তৃত খালি জায়গাকে সবসময় মায়াবী ছায়ায় আবৃত করে রাখে। এছাড়া পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে রয়েছে অসংখ্য ফলজ ও বনজ গাছপালা।

ক্যাম্পাসের ভেতরে রয়েছে: মনোরম লেক ও মিঠা পানির পুকুর,যা ক্যাম্পাসের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
শহীদ মিনার: কলেজের অধ্যক্ষের কার্যালয়ের ঠিক সামনেই বীর শহীদদের স্মরণে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন শহীদ মিনারটি অবস্থিত।
আরসিসি ঢালাই রাস্তা: কলেজের মসজিদের পাশ এবং বিজ্ঞান ভবনের সামনে দিয়ে একটি দীর্ঘ ও আঁকাবাঁকা আরসিসি ঢালাই রাস্তা চলে গেছে সরাসরি ছাত্রী হোস্টেলের সামনে।

অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা: সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ শুধুমাত্র পড়াশোনাতেই নয়, শিক্ষার্থীদের আবাসন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাতেও স্বয়ংসম্পূর্ণ। ছাত্রদের আবাসিক হোস্টেল ২টি, ছাত্রীদের আবাসিক হোস্টেল ১টি, লাইব্রেরী ও ১টি দৃষ্টি নন্দন মসজিদ, বিস্তৃত ও উন্মুক্ত মাঠ, সুপরিসর সাইকেল ও মোটরসাইকেল শেড।

নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার স্বার্থে কলেজ কর্তৃপক্ষ থেকে প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রীকে কলেজ অনুমোদিত ডিজিটাল আইডি কার্ড প্রদান করা হয়।

শিক্ষা কার্যক্রম ও শিক্ষার্থী সংখ্যা: বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত এই স্নাতকোত্তর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ১৫,০০০ (পনের হাজার) শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত আছেন। উচ্চশিক্ষার বিস্তারে এখানে রয়েছে, অনার্স (স্নাতক) কোর্স ১৬টি বিষয়ে,মাস্টার্স (স্নাতকোত্তর) কোর্স ১৫টি বিষয়ে
সহ-শিক্ষা কার্যক্রম ও সংস্কৃতি চর্চা: লেখাপড়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ ও দেশপ্রেম জাগ্রত করতে কলেজটিতে নিয়মিত সহ-শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এখানে রয়েছে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি) এবং রোভার স্কাউট-এর সক্রিয় ইউনিট।

এছাড়াও প্রতি বছর ক্যাম্পাসে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সপ্তাহ, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, বাঙালির প্রাণের উৎসব ‘পহেলা বৈশাখ’ বা বাংলা নববর্ষ বরণ
যুগের পর যুগ ধরে সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ এই অঞ্চলের মেধা ও মননশীলতা গঠনে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। জ্ঞানালোক ছড়ানোর পাশাপাশি একটি আদর্শ ও আধুনিক ক্যাম্পাস হিসেবে এই কলেজটি সমগ্র দক্ষিণবঙ্গের গর্বের প্রতীক হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

 

 

 

ইছামতির বাঁকে বাঁকে: জল ও জীবনের লড়াই

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬, ৬:৩৩ অপরাহ্ণ
ইছামতির বাঁকে বাঁকে: জল ও জীবনের লড়াই

দীপঙ্কর বিশ্বাস

নদীমাতৃক বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এক চিরচেনা ও ঐতিহাসিক নদী ইছামতি। এই নদীকে ঘিরেই যুগ যুগ ধরে গড়ে উঠেছে কতশত জনপদ, সভ্যতার বিকাশ আর হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকা। বিশেষ করে ইছামতির দুই পাড়ে বসবাসকারী মৎস্যজীবীদের কাছে এই নদী কেবলই একটি জলধারা নয়; এটি তাদের অন্নদাতা, তাদের সুখ-দুঃখের পরম সঙ্গী। কিন্তু সময়ের আবর্তে আজ কেমন আছে ইছামতির সেই মৎস্যজীবীরা? তাদের জীবন-জীবিকার হালচালই বা কী?

ভোর হওয়ার আগেই যখন চারপাশ কুয়াশায় বা মৃদু অন্ধকারে ঢাকা থাকে, তখনই ইছামতির বুকে শোনা যায় বৈঠার শব্দ। ছৈওয়ালা নৌকায় বসে জাল গোছাতে গোছাতে মৎস্যজীবীরা জপতে থাকেন এক অজানা প্রার্থনা-আজ যেন নদীর বুক থেকে কিছু রূপালি ফসল ঘরে তোলা যায়।

বংশপরম্পরায় এই পেশায় টিকে থাকা জলদাস বা মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের জীবন ইছামতির জোয়ার-ভাটার মতোই চঞ্চল। খেপলা জাল, কারেন্ট জাল কিংবা ঝাঁকি জাল ছুঁড়ে দিয়ে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন। মাছ বলতে কখনো চিংড়ি, আবার কখনো বেলে, ট্যাংরা বা পারশে। এই মাছ বিক্রি করেই চলে তাদের সংসারের চাল-ডাল কেনা, সন্তানের স্কুলের খরচ আর বুড়ো মা-বাবার ওষুধের টাকা।

সংকটের চোরাবালি: বিপন্ন ইছামতি, বিপন্ন জীবন
সোনালী অতীতের গল্প এখন রূপকথা মনে হয়। বর্তমান সময়ে ইছামতির মৎস্যজীবীরা নানামুখী সংকটের মুখোমুখি। সাংবাদিক হিসেবে মাঠপর্যায়ে তাকালে কয়েকটি বড় ধাক্কা স্পষ্ট চোখে পড়ে,

১. নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ফলে আগের মতো গভীরতা নেই, ২.কমে গেছে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র। ৩. কৃষিজমিতে ব্যবহৃত অতিরিক্ত কীটনাশক ধুয়ে এসে পড়ছে ইছামতিতে। ফলে মাছের মড়ক এখন নিত্যদিনের ব্যাপার। ৪. ইছামতির একটি বড় অংশ বাংলাদেশ ও ভারতের সীমানা নির্ধারণ করে। সীমানা জটিলতা ও কড়া নজরদারির কারণে মৎস্যজীবীরা অনেক সময় স্বাধীনভাবে মাছ ধরতে পারেন না। অনিচ্ছাকৃত সীমান্ত লঙ্ঘনের ভয়ে আতঙ্কে কাটে তাদের দিন।

যখন নিষেধাজ্ঞার মেঘ নামে
মাছের বংশবৃদ্ধির জন্য বছরের নির্দিষ্ট কিছু সময়ে সরকারিভাবে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। ইলিশের প্রজনন মৌসুম বা জাটকা রক্ষার এই উদ্যোগ পরিবেশের জন্য দারুণ হলেও, বিকল্প কর্মসংস্থানহীন মৎস্যজীবীদের পেটে তখন চড়া চাবুক পড়ে। সরকারের দেওয়া চালের বরাদ্দ অনেক সময় প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল কিংবা পৌঁছাতে দেরি হয়। ফলে দাদন ব্যবসায়ী বা মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হন তারা। এই ঋণের জাল থেকে তারা আর সহজে বের হতে পারেন না।
“নদী আমাদের মা। মা কি কখনো সন্তানকে না খেয়ে মারে? নদী ঠিকই মাছ দিত, কিন্তু মানুষই তো নদীটারে মেরে ফেলল।” -একজন প্রবীণ মৎস্যজীবীর আক্ষেপ।

বাঁচিয়ে রাখার দায় আমাদেরই
ইছামতি নদী এবং এর ওপর নির্ভরশীল মৎস্যজীবীদের জীবন বাঁচাতে হলে এখনই সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:

১. শিল্পবর্জ্য নদীতে ফেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে এবং আইন অমান্যকারীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

২. মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময়ে মৎস্যজীবীদের জন্য পর্যাপ্ত ও সঠিক সময়ে সহায়তা পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি তাদের বিকল্প আয়ের (যেমন- হাঁস-মুরগি পালন, কুটির শিল্প) প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন।

৩. মহাজদের কবল থেকে বাঁচাতে সরকারি ব্যাংক বা সমবায় সমিতির মাধ্যমে মৎস্যজীবীদের স্বল্প সুদে বা সুদহীন ঋণের ব্যবস্থা করা উচিত।

ইছামতি নদী শুধু এক ফালি জলরেখা নয়, এটি হাজার হাজার মৎস্যজীবী পরিবারের ধমনী। এই ধমনী শুকিয়ে গেলে কিংবা দূষিত হলে থমকে যাবে একটি আস্ত জনপদের জীবনস্পন্দন। ইছামতির রূপালি মাছ আর মৎস্যজীবীদের মুখের অমলিন হাসি টিকিয়ে রাখতে হলে নদীকে ভালোবাসতে হবে, নদীকে বাঁচাতে হবে। কারণ, ইছামতি বাঁচলে, বাঁচবে মৎস্যজীবী; আর মৎস্যজীবী বাঁচলে টিকে থাকবে আমাদের চিরন্তন বাংলার রূপ।

 

 

পাটকেলঘাটায় জামিয়া আরাবিয়া সিদ্দিকিয়া কওমিয়া মাদ্রাসার নতুন উপদেষ্টা ও কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬, ৬:২৮ অপরাহ্ণ
পাটকেলঘাটায় জামিয়া আরাবিয়া সিদ্দিকিয়া কওমিয়া মাদ্রাসার নতুন উপদেষ্টা ও কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন

সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটায় অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া আরাবিয়া সিদ্দিকিয়া কওমিয়া মাদ্রাসার ২০২৬ সালের জন্য নতুন উপদেষ্টা মন্ডলী ও কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (৩০ জুন) দুপুর ২টায় মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত সাধারণ সভায় সর্বসম্মতিক্রমে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়।
নবগঠিত কমিটিতে সাতক্ষীরা জেলা পরিষদের প্রশাসক হাবিবুল ইসলাম হাবিব সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। সেক্রেটারি হয়েছেন মাদ্রাসার মুহতামিম আলহাজ্ব মুফতি মনিরুল হক। সিনিয়র সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন ব্যবসায়ী আলহাজ্ব সালাউদ্দীন এবং সহ-সেক্রেটারি হয়েছেন ইঞ্জিনিয়ার আলমগীর হোসেন। কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব পেয়েছেন আলহাজ্ব আওলাদ হোসেন। শিক্ষক প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন মাদ্রাসার নায়েবে মুহতামিম মাওলানা মোশাররফ হুসাইন।

সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন আলহাজ্ব আকবর হোসেন, আলহাজ্ব মীর আসাদুজ্জামান, আলহাজ্ব মুজিবুর রহমান সরদার, আসাদুজ্জামান আসাদ এবং মো. বাবলুর রহমান।

চার সদস্যের উপদেষ্টা মন্ডলীতে রয়েছেন আলহাজ্ব আব্দুল আলীম মাহমুদ (মদনপুর), আলহাজ্ব আব্দুল কালাম বাবলা (সাতক্ষীরা), আলহাজ্ব আবুল ইফতেখার (ঈমান গ্লাস স্টোর, সাতক্ষীরা) এবং আলহাজ্ব মীর শাহিন হোসেন (পাটকেলঘাটা)।
এছাড়া কমিটিতে সিনিয়র সদস্য হিসেবে আলহাজ্ব সিরাজুল ইসলাম, মুশফিকুল আলম বিশ্বাস, শেখ অহিলুর রহমান, আলহাজ্ব রেজাউল ইসলাম (বাবু), আলহাজ্ব শেখ মাহমুদুল ইসলাম, আলহাজ্ব নাজিম উদ্দীন, মকবুল হোসেন এবং মাস্টার আব্দুর রব পলাশ-সহ মোট ১৪ জন স্থান পেয়েছেন। সাধারণ সদস্য হিসেবে আলহাজ্ব লুৎফর রহমান, প্রিন্সিপাল রফিকুল ইসলাম, সাংবাদিক আব্দুল মোমিন ও ডা. মামুনুর রশিদ-সহ মোট ২৬ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়েছে।

নবনির্বাচিত সভাপতি হাবিবুল ইসলাম হাবিব বলেন, “পাটকেলঘাটার জামিয়া আরাবিয়া সিদ্দিকিয়া কওমিয়া মাদ্রাসা সাতক্ষীরা জেলার অন্যতম প্রাচীন ও স্বনামধন্য দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে অসংখ্য শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন কওমিয়া মাদ্রাসাসহ নানা প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করছেন। নবগঠিত কমিটি মাদ্রাসার সার্বিক উন্নয়ন এবং দ্বীনি শিক্ষার প্রসারে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করবে বলে আমি আশাবাদী।” প্রেসবিজ্ঞপ্তি