বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩
বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩

বুধহাটা বাজারে জলাবদ্ধতা নিরসনে ড্রেন পরিষ্কারের উদ্যোগ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬, ১১:৫৪ অপরাহ্ণ
বুধহাটা বাজারে জলাবদ্ধতা নিরসনে ড্রেন পরিষ্কারের উদ্যোগ

আশাশুনি প্রতিনিধি: আশাশুনি উপজেলার বুধহাটা বাজার এলাকায় ড্রেনেজ সমস্যার কারণে সৃষ্ট জনদুর্ভোগ লাঘবে ড্রেন পরিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পর শুক্রবার বিকেল তিনটার দিকে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগের বিষয়টি নজরে আসার পর সাতক্ষীরা জজকোর্টের এপিপি ও আশাশুনি উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শহিদুল ইসলাম নিজস্ব লোকবল নিয়ে ভেঙে পড়া ড্রেন পরিষ্কারের কাজ শুরু করেন। তাৎক্ষণিকভাবে পানি চলাচলের সাময়িক ব্যবস্থা করায় বাজারের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা ও ভোগান্তি কিছুটা কমেছে।

স্থায়ী সমাধানের বিষয়ে অ্যাডভোকেট শহিদুল ইসলাম জানান, বুধহাটা বাজারের এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে নতুন ড্রেন নির্মাণ ও রাস্তা সংস্কার করা প্রয়োজন। এই বিষয়ে সাতক্ষীরা-৩ আসনের সংসদ সদস্যের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করা হবে। হঠাৎ করে নেওয়া এই কার্যকর উদ্যোগের জন্য স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পথচারীরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

Ads small one

পাইকগাছায় এক বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৮, আহত ৪৯

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৫১ অপরাহ্ণ
পাইকগাছায় এক বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৮, আহত ৪৯

পাইকগাছা (খুলনা) প্রতিনিধি: খুলনার পাইকগাছায় গত এক বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় ৮ জনের মৃত্যু এবং ৪৯ জন আহত হয়েছে। জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) পাইকগাছা উপজেলা শাখা সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান ও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে করণীয় তুলে ধরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সড়ক দুর্ঘটনার এমন চিত্র উঠে এসেছে।

২১ অক্টোবর বুধবার সকালে ষোলআনা ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর হতে ২০২৬ সালের ২০ অক্টোবর পর্যন্ত এলাকার সড়ক দুর্ঘটনার বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেন নিসচা উপজেলা শাখার সড়ক দুর্ঘটনা বিষয়ক সম্পাদক সাংবাদিক এসএম আলাউদ্দিন সোহাগ। নিসচা তথ্য অনুযায়ী গত এক বছরে অত্র উপজেলায় ছোট বড় ৬৩ টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে, এতে ৮ জনের মৃত্যু এবং ৪৯ জন আহত হয়।

সংগঠনের সভাপতি সাংবাদিক এইচ এম শফিউল ইসলামের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক এম ইলিয়াস হোসেনের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ষোলআনা ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি জি এম শুকুরুজ্জামান, রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি সাংবাদিক মিজানুর রহমান, নিসচা সিনিয়র সহ সভাপতি সাংবাদিক মোঃ আব্দুল আজিজ, অ্যাডভোকেট একরামুল ইসলাম, মোঃ হুরায়রা বাদশা, সাংবাদিক স্নেহেন্দু বিকাশ, এসএম বাবুল আক্তার, কাজী সোহাগ, আবু হানিফ মিলন, ফরিদুল ইসলাম প্রমুখ।

ইনানীর আগুন ও আমাদের দায়হীনতার সংস্কৃতি

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৩০ অপরাহ্ণ
ইনানীর আগুন ও আমাদের দায়হীনতার সংস্কৃতি

মো. মামুন হাসান

সমুদ্রের কাছে মানুষ যায় নিজেকে একটু ভুলে থাকতে। ঢেউয়ের শব্দে ক্লান্তি ধুয়ে ফেলতে, নোনা বাতাসে জীবনের ব্যস্ততা কিছুক্ষণের জন্য দূরে সরিয়ে রাখতে। কিন্তু সেই সমুদ্রের তীরেই যদি একটি রাতের ঘুম পরিণত হয় জীবনের শেষ রাতে, তাহলে প্রশ্নটি শুধু একটি অগ্নিকান্ডের থাকে না; প্রশ্ন ওঠে আমাদের পর্যটনচিন্তা, আতিথেয়তার দর্শন এবং মানুষের জীবনের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা নিয়ে।

কক্সবাজারের ইনানীতে অগ্নিকান্ডে দশজন মানুষের প্রাণহানি তাই নিছক একটি দুর্ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের পর্যটন ব্যবস্থাপনার সামনে রাখা একটি কঠিন আয়না। সেই আয়নায় আমরা দেখতে পাচ্ছি, পর্যটককে স্বাগত জানানোর জন্য আমাদের যতটা প্রস্তুতি, তাঁকে নিরাপদে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি তার তুলনায় কতটা দুর্বল।

পর্যটনশিক্ষার একজন শিক্ষক হিসেবে আমি বরাবরই মনে করি, একটি গন্তব্যের সৌন্দর্য তার পাহাড়, সমুদ্র, বন, নদী কিংবা স্থাপত্যে যতটা, তার চেয়ে বেশি নিহিত থাকে মানুষের অভিজ্ঞতায়। একজন পর্যটক একটি গন্তব্যে যান আনন্দের প্রত্যাশা নিয়ে। তিনি সেখানে অর্থ ব্যয় করেন, স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল করেন, মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করেন। বিনিময়ে তাঁর প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। তিনি চান সম্মান, স্বস্তি এবং নিরাপত্তা। পর্যটন শিল্পের ভাষায় এটিই গন্তব্যের মৌলিক প্রতিশ্রুতি।

ইনানীর ঘটনায় সেই প্রতিশ্রুতিই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, গত ১৭ অক্টোবর কক্সবাজারের উখিয়ার পাটুয়ারটেক এলাকায় তুপতুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে আগুন লাগে। ভবনটির নির্মাণে কাঠ ও বাঁশের মতো দাহ্য উপকরণ ব্যবহারের কথা এসেছে। ফায়ার সেফটি সনদ না থাকা এবং ভবনটি আগেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে। আগুনের প্রকৃত কারণ তদন্তেই নিশ্চিত হবে। কিন্তু পর্যটন ব্যবস্থাপনার একজন শিক্ষক হিসেবে আমার কাছে আগুন কোথা থেকে শুরু হয়েছে, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, ঝুঁকি আগে থেকেই জানা থাকলে সেখানে পর্যটকদের থাকার সুযোগ কীভাবে অব্যাহত থাকে? এখানেই দুর্ঘটনা আর অব্যবস্থাপনার পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

মনোবিজ্ঞানী জেমস রিজনের ‘সুইস চিজ মডেল’ আমাদের শেখায়, বড় দুর্ঘটনা সাধারণত একটি ভুলের কারণে ঘটে না। নিরাপত্তাব্যবস্থার একাধিক স্তরে ছোট ছোট দুর্বলতা জমতে জমতেই একসময় সেগুলো একই সরলরেখায় এসে দাঁড়ায়। তখন একটি সামান্য ত্রুটিও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ইনানীর ঘটনাকে এই দৃষ্টিতে দেখলে দেখা যায়, একটি সম্ভাব্য আগুনের উৎসের পাশাপাশি নির্মাণব্যবস্থা, জরুরি বহির্গমন, অগ্নিনিরাপত্তা, তদারকি এবং দ্রুত উদ্ধারব্যবস্থার মতো বহু প্রশ্ন একসঙ্গে সামনে আসে। অর্থাৎ আগুন হয়তো কয়েক মিনিটে ছড়িয়েছে, কিন্তু বিপর্যয়ের ভিত্তি তৈরি হয়েছে অনেক আগে।

সমাজবিজ্ঞানী ডায়ান ভনের ‘নরমালাইজেশন অব ডিভিয়েন্স’ তত্ত্বও এখানে প্রাসঙ্গিক। কোনো নিয়ম একবার ভাঙার পর যদি বড় বিপদ না ঘটে, তখন মানুষ ধীরে ধীরে সেই নিয়মভঙ্গকেই স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শুরু করে। একসময় জরুরি বহির্গমনপথ না থাকাও অস্বাভাবিক মনে হয় না, অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতিও তেমন উদ্বেগ তৈরি করে না, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেও ব্যবসা চলতে থাকে। বিপর্যয় না ঘটার প্রতিটি দিন তখন নিরাপত্তার প্রমাণ বলে মনে হয়। অথচ সেটি নিরাপত্তা নয়, সৌভাগ্য। পর্যটনশিল্প সৌভাগ্যের ওপর চলতে পারে না।

একজন পর্যটক যখন কোনো হোটেল বা রিসোর্টে রাত কাটান, তখন তিনি ধরে নেন প্রতিষ্ঠানটি নিরাপদ। তিনি সাধারণত ভবনের নকশা পরীক্ষা করেন না, ফায়ার সেফটি সনদ দেখতে চান না, জরুরি বহির্গমনপথের প্রকৌশলগত মান যাচাই করেন না। এসব নিশ্চিত করার দায় রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান এবং সেবা প্রদানকারীর। পর্যটক তাঁর অর্থ দিয়ে একটি কক্ষ ভাড়া নেন, নিজের জীবন বন্ধক রাখেন না। এই সত্যটি আমরা যত দ্রুত বুঝব, আমাদের পর্যটন তত বেশি মানবিক হবে।

পর্যটনের অর্থনীতি নিয়ে আমরা অনেক কথা বলি। কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, বৈদেশিক মুদ্রা, স্থানীয় ব্যবসা, পরিবহন, খাদ্যসেবা সবকিছুই পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু পর্যটনের সবচেয়ে অদৃশ্য এবং সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো আস্থা। একজন পর্যটক যদি কোনো গন্তব্য সম্পর্কে মনে করেন সেখানে তিনি নিরাপদ, তাহলে সেই আস্থা অন্য পর্যটককেও সেখানে নিয়ে যায়। আবার একটি বড় দুর্ঘটনা শুধু একটি পরিবারকে শোকাহত করে না; তা একটি গন্তব্যের ভাবমূর্তিতেও দীর্ঘ ছায়া ফেলে।

পর্যটন গবেষণায় ‘ডেস্টিনেশন ইমেজ’ বা গন্তব্যের ভাবমূর্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। মানুষ কোনো জায়গায় যাওয়ার আগে শুধু ছবি দেখে না, সেই জায়গার নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, সেবার মান এবং পূর্ববর্তী পর্যটকদের অভিজ্ঞতাও বিবেচনা করে। ফলে ইনানীর আগুনের খবর শুধু কক্সবাজারের একটি রিসোর্টের খবর হয়ে থাকে না; এটি বাংলাদেশের পর্যটন গন্তব্যের নিরাপত্তা নিয়ে সম্ভাব্য পর্যটকের মনে একটি প্রশ্ন তৈরি করে। আর পর্যটনে একটি প্রশ্ন অনেক সময় একটি সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে।

আমরা যদি সত্যিই বাংলাদেশকে একটি প্রতিযোগিতামূলক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গঙে তুলতে চাই, তাহলে সৌন্দর্যের পাশাপাশি নিরাপত্তাকেও ব্র্যান্ডিংয়ের অংশ করতে হবে। একটি পর্যটনকেন্দ্রের প্রবেশপথে শুধু ‘স্বাগতম’ লেখা থাকলেই হবে না; সেখানে পর্যটককে বোঝাতে হবে, তাঁর নিরাপত্তার জন্য কী ব্যবস্থা রয়েছে। হোটেল বা রিসোর্টের বুকিংয়ের সঙ্গে খাবারের তালিকা, কক্ষের ছবি ও মূল্যতালিকার মতোই নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্যও দৃশ্যমান হওয়া উচিত।

প্রযুক্তি এখানে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানের ফায়ার সেফটি অবস্থা, লাইসেন্স, জরুরি বহির্গমনপথ এবং সর্বশেষ নিরাপত্তা পরিদর্শনের তথ্য কিউআর কোডের মাধ্যমে পর্যটকের সামনে তুলে ধরা যেতে পারে। কোনো প্রতিষ্ঠান ঝুঁকিপূর্ণ হলে অনলাইন বুকিং প্ল্যাটফর্মে তার সতর্কতাও দৃশ্যমান করা যেতে পারে। এতে নিয়ন্ত্রণের একটি অংশ পর্যটকের হাতেও চলে আসবে।

তবে বাজারের শক্তির ওপর সব দায় ছেড়ে দিলে চলবে না। রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক ভূমিকা আরও শক্তিশালী করতে হবে। পর্যটনকেন্দ্রিক এলাকায় বিভিন্ন সংস্থার বিচ্ছিন্ন তদারকির পরিবর্তে সমন্বিত নিরাপত্তাব্যবস্থা দরকার। ফায়ার সার্ভিস, স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ কর্তৃপক্ষ, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান সবার কাজের মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে। কারণ দুর্ঘটনার পর ‘এটি আমার দায়িত্ব ছিল না’ ধরনের বক্তব্য একটি প্রাণও ফিরিয়ে আনতে পারে না।

দূরবর্তী পর্যটন এলাকায় আরও একটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। যেখানে একটি পূর্ণাঙ্গ ফায়ার স্টেশন থেকে দ্রুত পৌঁছানো কঠিন, সেখানে স্থানীয় পর্যায়ে ছোট জরুরি উদ্ধারকেন্দ্র, পর্যাপ্ত পানি, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম এবং প্রশিক্ষিত কর্মী থাকা দরকার। পর্যটনের ভাষায় এটিই হবে ‘কমিউনিটি বেসড ট্যুরিজম সেফটি’। স্থানীয় মানুষকে শুধু পর্যটন অর্থনীতির অংশীদার করলে হবে না, তাঁদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অংশীদারও করতে হবে।

এখানে পর্যটন শিক্ষারও একটি নতুন দায়িত্ব তৈরি হয়েছে। আমাদের শিক্ষার্থীরা যেন শুধু হোটেলের ফ্রন্ট অফিসে অতিথিকে স্বাগত জানাতে শেখে, তা যথেষ্ট নয়। তাঁদের জানতে হবে কীভাবে জরুরি অবস্থায় একজন অতিথিকে বের করে আনতে হয়, কীভাবে আতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, কীভাবে আগুনের প্রাথমিক প্রতিরোধ করতে হয় এবং কীভাবে একটি নিরাপদ আতিথেয়তা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে হয়। কারণ আধুনিক আতিথেয়তা শুধু হাসিমুখে সেবা দেওয়ার নাম নয়; এটি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনারও একটি পেশা।

দার্শনিক হান্স জোনাসের ‘দায়িত্বের নীতি’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের জীবন ও ভবিষ্যতের প্রতি দায়বদ্ধতা কোনো ঐচ্ছিক নৈতিকতা নয়। পর্যটন ব্যবসার ক্ষেত্রেও এই দর্শন প্রযোজ্য। একটি রিসোর্টের মালিকের কাছে কাঠের নকশা হয়তো ব্যবসার সৌন্দর্য, কিন্তু একজন অতিথির কাছে সেটি নিরাপত্তার প্রশ্ন। একজন উদ্যোক্তার কাছে একটি সিঁড়ি নির্মাণের খরচ হয়তো ব্যয়, কিন্তু আগুনের মুহূর্তে সেটিই হতে পারে একজন মানুষের জীবনের সঙ্গে মৃত্যুর পার্থক্য। এই উপলব্ধিটিই আমাদের পর্যটন দর্শনের কেন্দ্রে আনতে হবে।

রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ আমাদের মানুষকে কোনো হিসাবের অঙ্কে পরিণত না করে মানুষ হিসেবেই দেখতে শেখায়। পর্যটকও তাই। তিনি কোনো ‘কাস্টমার নম্বর’ নন, কোনো ‘বুকিং আইডি’ নন। তিনি একজন মানুষ, যাঁর সঙ্গে তাঁর পরিবারের ভালোবাসা, প্রত্যাশা ও ভবিষ্যৎ জড়িয়ে আছে। তাঁকে নিরাপদ রাখা তাই ব্যবসায়িক কর্তব্যের পাশাপাশি মানবিক কর্তব্যও।

ইনানীর আগুনে হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলো আর ফিরবেন না। তাঁদের পরিবারের শূন্যতা কোনো তদন্ত প্রতিবেদন পূরণ করতে পারবে না। কিন্তু তাঁদের মৃত্যু যদি আমাদের পর্যটন ব্যবস্থাপনার দর্শন বদলে দেয়, যদি একটি রিসোর্টের নকশা থেকে একটি পর্যটন এলাকার নিরাপত্তা পরিকল্পনা পর্যন্ত নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে, তাহলে সেই শোক ভবিষ্যতের বহু প্রাণ রক্ষার কারণ হতে পারে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, পর্যটন মানে মানুষকে কোথাও নিয়ে যাওয়া নয়; পর্যটন মানে মানুষকে একটি অভিজ্ঞতার কাছে নিয়ে যাওয়া। আর সেই অভিজ্ঞতার প্রথম শর্ত আনন্দ, শেষ শর্ত নিরাপদ প্রত্যাবর্তন। আমরা পর্যটককে সমুদ্র দেখাতে পারি, সূর্যাস্ত দেখাতে পারি, পাহাড়ের মেঘ দেখাতে পারি, সুন্দরবনের নীরবতা শোনাতে পারি। কিন্তু তাঁর ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা দিতে না পারলে আমাদের সব আতিথেয়তা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

ইনানীর আগুন তাই শুধু একটি রিসোর্ট পোড়ায়নি; এটি আমাদের পর্যটনচিন্তার একটি অন্ধকার দিকও উন্মোচিত করেছে। এখন আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা কি আগুন নিভিয়ে আবার আগের মতো ফিরে যাব, নাকি এই আগুনের আলোয় নিজেদের ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো নতুন করে দেখতে শিখব? কারণ একজন পর্যটককে আমন্ত্রণ জানানো সহজ। তাঁকে নিরাপদে ঘরে ফিরিয়ে দেওয়াই আসল আতিথেয়তা।

মো. মামুন হাসান, বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।

 

জীবনানন্দের ‘বনলতা’র খোঁজে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:১৪ অপরাহ্ণ
জীবনানন্দের ‘বনলতা’র খোঁজে

তারিক ইসলাম

‎‘সব পাখি ঘরে আসে- সব নদী- ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন;/ থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।’

‎বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে তীব্র এক আবেশের নাম ‘বনলতা সেন’। মাত্র বারো লাইনের একটি কবিতা, অথচ আট দশকেরও বেশি সময় ধরে বাঙালি পাঠকের হৃদয়ে তা বুনে চলেছে এক চিরন্তন রূপকথা। জীবনানন্দ দাশের কাব্যে হাজার বছর ধরে পথ হাঁটা ক্লান্ত এক পথিকের একমাত্র আশ্রয় হয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন নাটোরের এই নারী। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কে এই বনলতা সেন? তিনি কি কবির কল্পনার কোনো মানসকন্যা, নাকি রক্ত-মাংসের কোনো বাস্তব চরিত্র? নাকি রূপক অর্থে জীবনানন্দের পরম প্রশান্তির রূপায়ণ?

‎সাহিত্য গবেষকদের মধ্যে বনলতা সেনের পরিচয় নিয়ে কৌতুহলের শেষ নেই। কবির ব্যক্তিগত খাতা ও ডায়েরি থেকে জানা যায়, তাঁর জীবনে বেশ কয়েকজন নারীর উপস্থিতি ছিল। কেউ বলেন, বরিশাল ব্রজমোহন কলেজের দিনগুলোতে কবির পরিচিত কোনো তরুণীই পরবর্তীতে নাটোরের প্রেক্ষাপটে রূপ পেয়েছেন। আবার অনেক গবেষকের মতে, শোভনা বা ‘ওয়াই’ ছদ্মনামের যে নারীর উল্লেখ কবির ডায়েরিতে বারবার এসেছে, তিনিই হয়তো এই বনলতা। তবে তথ্য-উপাত্তের চেয়ে বড় সত্য হলো, জীবনানন্দ তাঁকে নির্দিষ্ট কোনো ভৌগোলিক বা ঐতিহাসিক পরিচয়ে আটকে রাখেননি।

‎বরিশাল থেকে কলকাতা কিংবা দিল্লির নির্জন জীবনপথে কবি বহন করেছেন এক গভীর একাকিত্ব। পৃথিবীর কোলাহল, সিংহল সমুদ্র থেকে মালয় সাগর ঘুরে আসা পথশ্রান্তি শেষে তিনি যে আশ্রয়ের খোঁজ করেছিলেন, বনলতা সেন মূলত সেই শান্তির প্রতীক। নাটোর শহর যেমন ঐতিহাসিক সমৃদ্ধি ও নীরবতার জন্য পরিচিত, তেমনি ‘নাটোরের বনলতা’ যেন এক চিরন্তনী রূপক, যা স্পর্শ করলে মুছে যায় সমস্ত জরা ও ক্ষয়।

‎আজকের দ্রুতগতি, প্রযুক্তি নির্ভর ও মানসিক অস্থিরতার যুগে দাঁড়িয়ে আমরা প্রত্যেকেই এক একজন শ্রান্ত পথিক। চারপাশের অনিশ্চয়তা, প্রতিযোগিতা ও নিঃসঙ্গতার মাঝে আমরাও যেন প্রতিনিয়ত একটু নির্ভেজাল প্রশান্তি খুঁজে ফিরি। তাই একুশ শতকে এসেও বনলতা সেনের আবেদন সামান্যতমও কমেনি। তিনি কেবল ১৯৪২ সালে প্রকাশিত একটি কবিতার চরিত্র নন; বরং আধুনিক মানুষের বুকে লুকিয়ে থাকা গভীর এক স্বস্তির আকুলতা।

‎জীবনানন্দ দাশ তাঁর এই কালজয়ী সৃষ্টির মধ্য দিয়ে আমাদের মনে করিয়ে দেন, জীবনের সব হিসেব-নিকেশ ও লেনদেন শেষে মানুষের আসল প্রাপ্তিটুকু থাকে ভালোবাসায় এবং আত্মিক শান্তিতে। বনলতার চোখের সেই ‘পাখির নীড়ের মতো’ ছায়া আজও আমাদের ডেকে যায়। তাই বনলতা সেনের খোঁজে কবির যে যাত্রা, তা আসলে একাকী কোনো কবিপুরুষের নয়-তা আমাদের সবারই নিজের ভেতরে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক চিরন্তন প্রয়াস।

লেখক: তারিক ইসলাম, ‎সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি।