বেগম খালেদা জিয়া মৃত্যুহীন এক মহাকাব্য: জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা
এম. এম হায়দার আলী
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে কিছু নাম কেবল নাম নয়, তারা একেকটি অধ্যায়, একেকটি সংগ্রামের প্রতীক। বেগম খালেদা জিয়া তেমনই এক অবিস্মরণীয় নাম। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপার্সন এবং তাঁর সমর্থকদের কাছে ‘আপোসহীন নেত্রী, যাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা রচিত হয়েছে আন্দোলন, প্রতিকূলতা, ত্যাগ ও দৃঢ়তার অনন্য উপাখ্যানে।
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করেন খালেদা জিয়া। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবির্ভূত হন এমন এক সময়ে, যখন দেশের গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নানা সংকটে আবর্তিত হচ্ছিল। স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তিনি ধীরে ধীরে সক্রিয় রাজনীতিতে এগিয়ে আসেন এবং একসময় বিএনপির নেতৃত্বের কেন্দ্রে অধিষ্ঠিত হন।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি বিজয়ী হলে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। পরবর্তীতেও তিনি একাধিক বার বাংলাদেশের সরকার প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। দেশের অবকাঠামো, শিক্ষা, অর্থনীতি, নারী উন্নয়ন ও সামাজিক অগ্রগতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর সরকারের সময় নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক জীবন কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। রাজপথের আন্দোলন, রাজনৈতিক সংঘাত, কারাবরণ, মামলা, ব্যক্তিগত শোক ও নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েই তাঁকে এগিয়ে যেতে হয়েছে। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল আপোসহীন অবস্থান। সমর্থকদের কাছে সেই কারণেই তিনি হয়ে ওঠেন ‘আপোসহীন নেত্রী। যিনি প্রতিকূলতার সামনে নত না হয়ে নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাস ও অবস্থানকে আঁকড়ে রেখেছিলেন।
খালেদা জিয়ার জীবন কেবল একজন রাজনীতিবিদের জীবন নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকা এক দীর্ঘ সংগ্রামের কাহিনি। কখনো ক্ষমতার কেন্দ্রে, কখনো রাজপথে, কখনো কারাগারের নির্জন প্রহরে, তবুও তাঁর নাম উচ্চারিত হয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ বাঁক গুলোতে। জীবনের শেষ অধ্যায়েও তিনি ছিলেন রাজনৈতিক ভাবে আলোচিত ও প্রভাবশালী এক ব্যক্তিত্ব।
দীর্ঘ অসুস্থতা ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও আদর্শকে ঘিরে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে ছিল গভীর আবেগ ও আনুগত্য। আজ তাঁর জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে স্মরণ করা নয়, বাংলাদেশের রাজনীতির একটি দীর্ঘ অধ্যায়কে স্মরণ করা। তাঁর জীবনের সাফল্য, সংগ্রাম, ভুল-ত্রুটি, অর্জন ও ত্যাগ সবকিছু মিলিয়েই তিনি ইতিহাসের এক অনিবার্য চরিত্র। সময়ের গ্রোত অনেক নামকে বিস্মৃতির অতলে নিয়ে যায়।
কিন্তু কিছু মানুষ সময়কে অতিক্রম করে ইতিহাসের পাতায় থেকে যান। বেগম খালেদা জিয়া তেমনই এক নাম। তাঁর রাজনৈতিক জীবন নিয়ে মত পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ও ঐতিহাসিক ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। প্রিয় নেত্রীর জন্মদিনে তাই উচ্চারিত হোক গভীর শ্রদ্ধার বাণী আপোসহীন সংগ্রামের প্রতীক, গণতান্ত্রিক রাজনীতির এক দীর্ঘ অধ্যায়, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
আপনি স্মৃতিতে নন, ইতিহাসের পাতায় এক অনন্ত উপস্থিতি। বিনম্র শ্রদ্ধা, প্রিয় নেত্রী। আপনার জীবন যেন সত্যিই মৃত্যুহীন এক মহাকাব্য হয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অমর হয়ে থাকে।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট






