ভারতীয় ভিসা: সহজ স্লট, জেলাভিত্তিক সেবা চালু হোক
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
ভারতে যাওয়ার প্রয়োজন, পাসপোর্ট আছে, ভিসার আবেদনও প্রস্তুত। কিন্তু আবেদন জমা দেওয়ার স্লট নেই। দিনের পর দিন অনলাইনে চেষ্টা করেও অনেকে কাঙ্ক্ষিত স্লট পাচ্ছেন না। কেউ চিকিৎসার জন্য, কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে, আবার কেউ পর্যটনের উদ্দেশ্যে ভারতে যেতে চান। অথচ ভ্রমণের প্রস্তুতির চেয়ে ভিসার স্লট পাওয়ার চেষ্টাই তাঁদের কাছে বড় ভোগান্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্ন হলো, ভিসার আবেদন করতে গিয়ে একজন সাধারণ নাগরিককে এতটা ছোটাছুটি করতে হবে কেন?
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মানুষের যাতায়াতের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। চিকিৎসা, ব্যবসা, শিক্ষা, আত্মীয়তার বন্ধন ও পর্যটনের কারণে প্রতিবছর বহু বাংলাদেশি ভারতে যান। কিন্তু ভিসার আবেদন জমা দেওয়ার স্লট পেতে অনিশ্চয়তা, অনলাইন ব্যবস্থার জটিলতা এবং অর্থ পরিশোধের নানা সমস্যায় অনেক আবেদনকারীকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিশেষ করে গ্রাম ও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জন্য এই ভোগান্তি আরও বেশি।
সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগরের একজন বাসিন্দার কথাই ধরা যাক। তাঁকে যদি ভারতীয় ভিসার আবেদনসংক্রান্ত কাজে ঢাকায় যেতে হয়, তাহলে যাতায়াতের খরচ, সময় ও শারীরিক কষ্ট—সবই বহন করতে হবে। প্রতাপনগর থেকে সাতক্ষীরা, সেখান থেকে খুলনা কিংবা সরাসরি ঢাকায় যাতায়াতের ধকল সামলানো সবার পক্ষে সহজ নয়। পরিবারের কোনো অসুস্থ সদস্যকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য ভারতে যাওয়ার প্রয়োজন হলে এই ভোগান্তি আরও বাড়ে। শুধু একটি আবেদন জমা দেওয়া বা প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করার জন্য এত দূর যাতায়াত কি সত্যিই অপরিহার্য?
ভিসার স্লট পাওয়ার জন্য আবেদনকারীদের বারবার অনলাইনে চেষ্টা করতে হয়। কখন স্লট পাওয়া যাবে, কীভাবে আবেদন জমা দিতে হবে কিংবা অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়ায় কীভাবে জটিলতা এড়ানো যাবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা না থাকলে অনেকে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। প্রযুক্তিগত জটিলতায় আবেদন আটকে গেলে কিংবা অর্থ পরিশোধে সমস্যা হলে তাঁদের দুর্ভোগ আরও বাড়ে।
এই পরিস্থিতিতে স্লট পাইয়ে দেওয়ার নামে অতিরিক্ত টাকা চাওয়ার অভিযোগও সামনে আসে। কেউ কেউ মধ্যস্থতাকারীর সহায়তা নিতে বাধ্য হন বলে জানান। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যথাযথভাবে যাচাই করা জরুরি। প্রমাণ ছাড়া কাউকে দোষী বলা যায় না। কিন্তু স্লটের সংকট ও প্রক্রিয়ার জটিলতা যদি মধ্যস্বত্বভোগীদের সুযোগ তৈরি করে, তাহলে তা বন্ধ করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
ভিসার জন্য নির্ধারিত ফি দেওয়ার পরও আবেদনকারীকে যদি স্লট সংগ্রহ, অর্থ পরিশোধ কিংবা আবেদন জমা দেওয়ার জন্য বাড়তি খরচ ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে হয়, তাহলে ব্যবস্থাটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
এই সমস্যার একটি বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে জেলা পর্যায়ে ভিসা আবেদনসংক্রান্ত সেবা সহজলভ্য করা। যেসব জেলায় আবেদনকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য, সেখানে প্রয়োজন ও সক্ষমতা যাচাই করে ভিসা আবেদনকেন্দ্র বা অনুমোদিত সেবাকেন্দ্র চালুর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এসব কেন্দ্রে আবেদনপত্র জমা, কাগজপত্র যাচাই, প্রয়োজনীয় বায়োমেট্রিক তথ্য গ্রহণ এবং অর্থ পরিশোধসংক্রান্ত নির্দেশনা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবেন।
সাতক্ষীরার মানুষের জন্য সাতক্ষীরাতেই সেবা পাওয়ার সুযোগ তৈরি করা গেলে প্রতাপনগর, আশাশুনি, শ্যামনগর, কালীগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের ঢাকামুখী ছোটাছুটি অনেকটাই কমতে পারে। একইভাবে খুলনা, যশোরসহ অন্যান্য জেলার আবেদনকারীদের জন্যও স্থানীয় পর্যায়ে সেবার সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
অবশ্য ভিসা আবেদনকেন্দ্র চালু করা আর ভিসা অনুমোদন দেওয়া এক বিষয় নয়। ভিসা অনুমোদনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। জেলা পর্যায়ের কেন্দ্রগুলো আবেদন গ্রহণ ও প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়ার দায়িত্ব পালন করতে পারে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট ভারতীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
ভিসার স্লট পাওয়ার প্রক্রিয়া আরও সহজ, স্বচ্ছ ও ব্যবহারবান্ধব করা জরুরি। আবেদনকারীরা যেন নির্ভরযোগ্য ওয়েবসাইটে স্লটের প্রাপ্যতা সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পান, সে ব্যবস্থা থাকতে হবে। স্লট কখন খোলা হবে, কীভাবে আবেদন করতে হবে এবং অর্থ পরিশোধ সম্পন্ন না হলে কী করণীয়—এসব নির্দেশনা সহজ বাংলায় প্রকাশ করা প্রয়োজন।
অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থাও হতে হবে সহজ ও নির্ভরযোগ্য। অনুমোদিত ব্যাংকিং চ্যানেল, অনলাইন পেমেন্ট কিংবা বৈধ ডিজিটাল পেমেন্টের সুযোগ যেখানে প্রযোজ্য, সেখানে তা আরও ব্যবহারবান্ধব করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। অর্থ পরিশোধের পর লেনদেন সফল হয়েছে কি না, তার তাৎক্ষণিক নিশ্চিতকরণ এবং ব্যর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে অর্থ ফেরত বা অভিযোগ নিষ্পত্তির স্পষ্ট নিয়ম থাকা দরকার।
একই সঙ্গে আবেদনকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য ও অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। স্লটের নামে অননুমোদিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে টাকা দেওয়ার ঝুঁকি কমাতে সরকারি নির্দেশনা নিয়মিত প্রচার করা প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, স্লট পাওয়া মানেই ভিসা পাওয়া নয়। তাই স্লট নিশ্চিত করার নামে কেউ ভিসার নিশ্চয়তা দিলে সতর্ক থাকা জরুরি।
ভারতীয় ভিসা শুধু পর্যটনের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে চিকিৎসা, পারিবারিক সম্পর্ক, ব্যবসা এবং দুই দেশের মানুষের নিয়মিত যোগাযোগ। ভিসার আবেদনপ্রক্রিয়া যত সহজ ও স্বচ্ছ হবে, বৈধ ভ্রমণকারীরা তত উপকৃত হবেন। অন্যদিকে দীর্ঘ অপেক্ষা, অনিশ্চিত স্লট এবং বাড়তি যাতায়াতের ব্যয় মানুষের ভ্রমণ পরিকল্পনাকে নিরুৎসাহিত করতে পারে।
তাই আবেদনকারীদের ভোগান্তিকে নিছক ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি সেবা ব্যবস্থাপনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত আবেদনকারীদের চাপ ও চাহিদা পর্যালোচনা করে স্লটের ব্যবস্থা উন্নত করা, জেলা পর্যায়ে সেবা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা যাচাই করা এবং অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়ার জটিলতা দূর করা।
সবচেয়ে বড় কথা, একজন নাগরিককে ভিসার আবেদন জমা দেওয়ার সুযোগ পেতে দিনের পর দিন চেষ্টা করতে হবে কেন? প্রতাপনগরের একজন মানুষকে একটি প্রয়োজনীয় কাজের জন্য ঢাকায় ছুটতে হবে কেন? প্রযুক্তির যুগে যেখানে ঘরে বসে অনেক কাজ করা সম্ভব, সেখানে আবেদনকারীদের জন্য সহজ ও নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা কি অসম্ভব?
ভিসা দেওয়া সংশ্লিষ্ট দেশের সার্বভৌম অধিকার। কিন্তু আবেদন গ্রহণের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করা, স্লটের প্রাপ্যতা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য দেওয়া এবং আবেদনকারীদের অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। জেলাভিত্তিক সেবা চালু, সহজ অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা এবং স্লট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে সাধারণ মানুষের দালাল বা মধ্যস্থতাকারীর ওপর নির্ভরশীল হওয়ার ঝুঁকিও কমানো যেতে পারে।
ভারতীয় ভিসার স্লট যেন আর সাধারণ মানুষের ছোটাছুটি ও অনিশ্চয়তার নাম না হয়। আবেদনপ্রক্রিয়া হোক সহজ, অর্থ পরিশোধ হোক স্বচ্ছ, আর জেলা পর্যায়েই মিলুক প্রয়োজনীয় সেবা—এটাই প্রত্যাশা।
লেখক: সচ্চিদানন্দ দে সদয়, সংবাদকর্মী।









