ভিউ বাণিজ্যের দৌরাত্ম্য ; সংকটে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা
প্রকাশ ঘোষ বিধান
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইন পোর্টালের যুগে ভিউ বাণিজ্যের দৌরাত্ম্য বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার জন্য একটি মারাত্মক হুমকি। সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা, সত্যতা ও জনগুরুত্বের চেয়ে ভিউ, লাইক ও শেয়ারই এখন প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে সাংবাদিকতার মূল আদর্শ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
অধিক ভিউ পাওয়ার অর্থই হলো বেশি রেভিনিউ বা বিজ্ঞাপন থেকে আয়, আর এই বাণিজ্যিক লোভের কারণেই তথ্যের সত্যতা ও গুণগত মান আজ উপেক্ষিত। ভিউ-বাণিজ্যের অনৈতিক দৌরাত্ম্যের কারণে বর্তমান ডিজিটাল যুগে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা মারাত্মক সংকটের মুখে পড়েছে।
অনলাইন মাধ্যমে ভিউ, ক্লিক ও বিজ্ঞাপনের আয় বাড়ানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতাই হলো ভিউ বাণিজ্য। এই প্রবণতা বস্তুনিষ্ঠ ও স্বাধীন সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় হুমকি। ভিউয়ের পেছনে ছুটতে গিয়ে গণমাধ্যমের মূল দায়িত্ব, অর্থাৎ তথ্যের সত্যতা যাচাই ও জনস্বার্থ রক্ষা, চাপা পড়ে যাচ্ছে। ডিজিটাল ও সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে ভিউ বাণিজ্যের দৌরাত্ম্য বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংবাদ প্রচারের মূল লক্ষ্য যেখানে সত্য উদ্ঘাটন এবং জনমত গঠন, সেখানে ক্লিক বা ভিউনির্ভর প্ল্যাটফর্মগুলোতে চটকদার শিরোনাম ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশের প্রবণতা বাড়ছে।
ভিউ বাণিজ্যের প্রভাব ও সংকটে চটকদার শিরোনাম দেখে বিভ্রান্তিতে পাঠক। পাঠক টানতে শিরোনামে অতিরঞ্জিত তথ্য বা মিথ্যা উত্তেজনার আশ্রয় নেওয়া হয়, যা ভেতরের খবরের সাথে মেলে না। পেশাদারিত্বের সংকটে শিকারি সাংবাদিকতা বাড়ছে। ব্যক্তিগত আক্রমণ, ভিত্তিহীন খবর বা ট্রল করার মাধ্যমে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়। পেশাদার সাংবাদিকদের পাশাপাশি অনেক ভুঁইফোঁড় ও অপেশাদার অনলাইন পোর্টালের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। লাভের আশায় যারা শুধু ভিউ বা অনৈতিক সুবিধা আদায়ের জন্য কাজ করে।
সংবাদের মূল বিষয়ের সাথে মিল না রেখে শুধু পাঠক বা দর্শককে আকৃষ্ট করতে অতিরঞ্জিত বা মিথ্যা শিরোনাম ব্যবহার করা হচ্ছে। সংবাদের ভেতরের চেয়ে ক্লিক-বেইট বা বিভ্রান্তিকর শিরোনামকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, যা হলুদ সাংবাদিকতা হিসেবে পরিচিত। তথ্য যাচাই না করেই শুধুমাত্র ভাইরাল করার উদ্দেশ্যে মনগড়া সংবাদ প্রকাশ করা হয়। ভিউ বাণিজ্যের ফলে সমাজে অনেক সময় ভুয়া তথ্য ও গুজব ছড়িয়ে পড়ে, যা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে। ভিউ বাণিজ্যের লোভে নেতিবাচক প্রভাব চটকদার শিরোনাম ও হলুদ সাংবাদিকতা বাড়ছে।
নামসর্বস্ব কিছু অনলাইন বা আইপিটিভির কারণে প্রকৃত ও পেশাদার সাংবাদিকতা তার মর্যাদা হারাচ্ছে। ভিউয়ের নামে গুজব ও চাঁদাবাজি রোধে গণমাধ্যমের জন্য উপযুক্ত আইনি কাঠামো ও নীতিমালা প্রয়োজন। দর্শক ও পাঠকদের চটকদার খবরের বদলে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ভিউয়ের দাসত্ব থেকে বেরিয়ে গণমাধ্যমকে গুণগত মান ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের ওপর জোর দিতে হবে।
ভিউ বাণিজ্যের নেতিবাচক প্রভাবে চটকদার শিরোনাম সংবাদের ভেতরের মূল বিষয়ের সাথে মিল না রেখে আকর্ষণীয়, বিভ্রান্তিকর বা মিথ্যা শিরোনাম ব্যবহার করা হয়, যা পাঠকদের প্রতারিত করে। চাঞ্চল্যকর বা ভিত্তিহীন তথ্য প্রচার করে সমাজে বিকৃঙ্খলা বা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়। অনেক সময় অপরাধী ও মাদক কারবারিরাও নামসর্বস্ব পোর্টালের কার্ড ব্যবহার করে অপকর্ম চালাচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অবমূল্যায়ন করা। জাতীয় সংকট, অর্থনীতি, শিক্ষা বা আন্তর্জাতিক খবরাখবরের চেয়ে গসিপ, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা অনৈতিক বিষয়বস্তু বেশি প্রচার পায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর ভিডিও, ছবি বা ফটোকার্ড বানিয়ে টার্গেটেড ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে হেনস্থা করা হয়, যা শিকারি সাংবাদিকতা হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।
পেশাদারিত্ব রক্ষা ও দায়িত্বশীলতা বৃদ্ধিতে পেশাদার সাংবাদিকদের ঐক্য প্রয়োজন। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ও কর্মীদের দায়িত্ববোধ বাড়াতে হবে। ভিউ বাণিজ্যের ফাঁদে না পড়ে যাচাই-বাছাই করে সঠিক তথ্য প্রকাশ করা আবশ্যক। প্রেস কাউন্সিলসহ সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে অনলাইন পোর্টাল ও আইপিটিভিগুলোর সঠিক নিবন্ধন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। ভুঁইফোড় সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে কঠোর আইনি পদক্ষেপ জরুরি।
পাঠক বা দর্শক হিসেবে আমাদেরও ভিউ ও ক্লিকবেট নির্ভর সংবাদ এড়িয়ে চলতে হবে। খবরের সত্যতা যাচাই না করে তা শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। পাঠকদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়াতে হবে, তারা যেন সস্তা ও চটকদার খবর বর্জন করে মানসম্মত ও পেশাদার সংবাদমাধ্যমগুলোর সংবাদ অনুসরণে উদ্বুদ্ধ হন।
সংবাদমাধ্যমের টিকে থাকার জন্য বিজ্ঞাপন বাণিজ্য জরুরি, তবে তা যেন সাংবাদিকতার মূল স্তম্ভ বস্তুনিষ্ঠতা ও সত্যতাকে গ্রাস না করে। সংবাদমাধ্যমগুলোকে বাণিজ্যিক লাভের চেয়ে পেশাগত নৈতিকতা ও সত্যনিষ্ঠাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। ভিউ-বাণিজ্যের এই অন্ধকার বৃত্ত থেকে বের হতে না পারলে গণমাধ্যম তার চতুর্থ স্তম্ভের মর্যাদা ও জনমনে বিশ্বাসযোগ্যতা দুটোই হারাবে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট






