বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

ভিউ বাণিজ্যের দৌরাত্ম্য ; সংকটে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬, ৭:০৫ অপরাহ্ণ
ভিউ বাণিজ্যের দৌরাত্ম্য ; সংকটে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা

প্রকাশ ঘোষ বিধান

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইন পোর্টালের যুগে ভিউ বাণিজ্যের দৌরাত্ম্য বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার জন্য একটি মারাত্মক হুমকি। সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা, সত্যতা ও জনগুরুত্বের চেয়ে ভিউ, লাইক ও শেয়ারই এখন প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে সাংবাদিকতার মূল আদর্শ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
অধিক ভিউ পাওয়ার অর্থই হলো বেশি রেভিনিউ বা বিজ্ঞাপন থেকে আয়, আর এই বাণিজ্যিক লোভের কারণেই তথ্যের সত্যতা ও গুণগত মান আজ উপেক্ষিত। ভিউ-বাণিজ্যের অনৈতিক দৌরাত্ম্যের কারণে বর্তমান ডিজিটাল যুগে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা মারাত্মক সংকটের মুখে পড়েছে।

অনলাইন মাধ্যমে ভিউ, ক্লিক ও বিজ্ঞাপনের আয় বাড়ানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতাই হলো ভিউ বাণিজ্য। এই প্রবণতা বস্তুনিষ্ঠ ও স্বাধীন সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় হুমকি। ভিউয়ের পেছনে ছুটতে গিয়ে গণমাধ্যমের মূল দায়িত্ব, অর্থাৎ তথ্যের সত্যতা যাচাই ও জনস্বার্থ রক্ষা, চাপা পড়ে যাচ্ছে। ডিজিটাল ও সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে ভিউ বাণিজ্যের দৌরাত্ম্য বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংবাদ প্রচারের মূল লক্ষ্য যেখানে সত্য উদ্ঘাটন এবং জনমত গঠন, সেখানে ক্লিক বা ভিউনির্ভর প্ল্যাটফর্মগুলোতে চটকদার শিরোনাম ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশের প্রবণতা বাড়ছে।

ভিউ বাণিজ্যের প্রভাব ও সংকটে চটকদার শিরোনাম দেখে বিভ্রান্তিতে পাঠক। পাঠক টানতে শিরোনামে অতিরঞ্জিত তথ্য বা মিথ্যা উত্তেজনার আশ্রয় নেওয়া হয়, যা ভেতরের খবরের সাথে মেলে না। পেশাদারিত্বের সংকটে শিকারি সাংবাদিকতা বাড়ছে। ব্যক্তিগত আক্রমণ, ভিত্তিহীন খবর বা ট্রল করার মাধ্যমে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়। পেশাদার সাংবাদিকদের পাশাপাশি অনেক ভুঁইফোঁড় ও অপেশাদার অনলাইন পোর্টালের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। লাভের আশায় যারা শুধু ভিউ বা অনৈতিক সুবিধা আদায়ের জন্য কাজ করে।

সংবাদের মূল বিষয়ের সাথে মিল না রেখে শুধু পাঠক বা দর্শককে আকৃষ্ট করতে অতিরঞ্জিত বা মিথ্যা শিরোনাম ব্যবহার করা হচ্ছে। সংবাদের ভেতরের চেয়ে ক্লিক-বেইট বা বিভ্রান্তিকর শিরোনামকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, যা হলুদ সাংবাদিকতা হিসেবে পরিচিত। তথ্য যাচাই না করেই শুধুমাত্র ভাইরাল করার উদ্দেশ্যে মনগড়া সংবাদ প্রকাশ করা হয়। ভিউ বাণিজ্যের ফলে সমাজে অনেক সময় ভুয়া তথ্য ও গুজব ছড়িয়ে পড়ে, যা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে। ভিউ বাণিজ্যের লোভে নেতিবাচক প্রভাব চটকদার শিরোনাম ও হলুদ সাংবাদিকতা বাড়ছে।

নামসর্বস্ব কিছু অনলাইন বা আইপিটিভির কারণে প্রকৃত ও পেশাদার সাংবাদিকতা তার মর্যাদা হারাচ্ছে। ভিউয়ের নামে গুজব ও চাঁদাবাজি রোধে গণমাধ্যমের জন্য উপযুক্ত আইনি কাঠামো ও নীতিমালা প্রয়োজন। দর্শক ও পাঠকদের চটকদার খবরের বদলে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ভিউয়ের দাসত্ব থেকে বেরিয়ে গণমাধ্যমকে গুণগত মান ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের ওপর জোর দিতে হবে।

ভিউ বাণিজ্যের নেতিবাচক প্রভাবে চটকদার শিরোনাম সংবাদের ভেতরের মূল বিষয়ের সাথে মিল না রেখে আকর্ষণীয়, বিভ্রান্তিকর বা মিথ্যা শিরোনাম ব্যবহার করা হয়, যা পাঠকদের প্রতারিত করে। চাঞ্চল্যকর বা ভিত্তিহীন তথ্য প্রচার করে সমাজে বিকৃঙ্খলা বা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়। অনেক সময় অপরাধী ও মাদক কারবারিরাও নামসর্বস্ব পোর্টালের কার্ড ব্যবহার করে অপকর্ম চালাচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অবমূল্যায়ন করা। জাতীয় সংকট, অর্থনীতি, শিক্ষা বা আন্তর্জাতিক খবরাখবরের চেয়ে গসিপ, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা অনৈতিক বিষয়বস্তু বেশি প্রচার পায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর ভিডিও, ছবি বা ফটোকার্ড বানিয়ে টার্গেটেড ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে হেনস্থা করা হয়, যা শিকারি সাংবাদিকতা হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।

পেশাদারিত্ব রক্ষা ও দায়িত্বশীলতা বৃদ্ধিতে পেশাদার সাংবাদিকদের ঐক্য প্রয়োজন। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ও কর্মীদের দায়িত্ববোধ বাড়াতে হবে। ভিউ বাণিজ্যের ফাঁদে না পড়ে যাচাই-বাছাই করে সঠিক তথ্য প্রকাশ করা আবশ্যক। প্রেস কাউন্সিলসহ সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে অনলাইন পোর্টাল ও আইপিটিভিগুলোর সঠিক নিবন্ধন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। ভুঁইফোড় সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে কঠোর আইনি পদক্ষেপ জরুরি।
পাঠক বা দর্শক হিসেবে আমাদেরও ভিউ ও ক্লিকবেট নির্ভর সংবাদ এড়িয়ে চলতে হবে। খবরের সত্যতা যাচাই না করে তা শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। পাঠকদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়াতে হবে, তারা যেন সস্তা ও চটকদার খবর বর্জন করে মানসম্মত ও পেশাদার সংবাদমাধ্যমগুলোর সংবাদ অনুসরণে উদ্বুদ্ধ হন।

সংবাদমাধ্যমের টিকে থাকার জন্য বিজ্ঞাপন বাণিজ্য জরুরি, তবে তা যেন সাংবাদিকতার মূল স্তম্ভ বস্তুনিষ্ঠতা ও সত্যতাকে গ্রাস না করে। সংবাদমাধ্যমগুলোকে বাণিজ্যিক লাভের চেয়ে পেশাগত নৈতিকতা ও সত্যনিষ্ঠাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। ভিউ-বাণিজ্যের এই অন্ধকার বৃত্ত থেকে বের হতে না পারলে গণমাধ্যম তার চতুর্থ স্তম্ভের মর্যাদা ও জনমনে বিশ্বাসযোগ্যতা দুটোই হারাবে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

Ads small one

প্রসঙ্গ: খোলপেটুয়া নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন ও হামলা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬, ১১:০১ অপরাহ্ণ
প্রসঙ্গ: খোলপেটুয়া নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন ও হামলা

সম্পাদকীয়

সাতক্ষীরার শ্যামনগরে খোলপেটুয়া নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে বাধা দেওয়ায় গ্রামবাসীদের ওপর হামলার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও নিন্দনীয়। সোমবার দিবাগত রাতে উপজেলার ঘোলা ত্রিমোহনী এলাকায় নদীভাঙন ঠেকাতে গিয়ে যেভাবে স্থানীয় ইউপি সদস্যসহ ১০-১২ জন গ্রামবাসী আহত হয়েছেন, তা প্রমাণ করে বালু খেকো সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কতটা বেপরোয়া রূপ নিয়েছে। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, দুর্যোগপ্রবণ ও ভাঙনকবলিত হওয়ায় সরকারিভাবে চলতি বছরে খোলপেটুয়া নদীর কোনো অংশকেই বালুমহাল ঘোষণা করা হয়নি। অর্থাৎ, যা ঘটছিল তা সম্পূর্ণ বেআইনি। এই অবৈধ কর্মকা-ের প্রতিবাদ করায় খোদ নিজ ভূমিতেই গ্রামবাসীদের রক্তাক্ত হতে হলো, যা কোনো সভ্য সমাজে মেনে নেওয়া যায় না।

পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের তথ্য অনুযায়ী, এই বালু সিন্ডিকেটের পেছনে রয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক চক্র। রাতের আঁধারে ড্রেজার বসিয়ে বালু চুরির এই মহোৎসব যখন ভাঙনকবলিত এলাকার মানুষের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়, তখন নিজেদের ভিটেমাটি রক্ষায় গ্রামবাসীদেরই ঢাল হয়ে দাঁড়াতে হয়।

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গ্রামবাসীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে অবৈধ বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত নৌযানসহ তিন শ্রমিককে আটকে প্রশাসনের হাতে সোপর্দ করেছিল। কিন্তু এর পরের ঘটনা আরও হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

শ্যামনগরের মতো উপকূলীয় অঞ্চলগুলো এমনিতেই জলবায়ু পরিবর্তন ও আইলা-আম্পানের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতি বছর নদীভাঙনে হাজার হাজার মানুষ সর্বস্বান্ত হচ্ছে। সেখানে আইন অমান্য করে খোলপেটুয়া নদী থেকে বালু তোলা মানে হলো পুরো এলাকাকে ইচ্ছাকৃতভাবে নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার মুখে ঠেলে দেওয়া। এই বিধ্বংসী কর্মকা-ের বিরুদ্ধে যেখানে প্রশাসনের স্বতঃস্ফূর্ত অভিযান চালানোর কথা, সেখানে গ্রামবাসীদের ধরে দেওয়া অপরাধীদের মুচলেকায় ছেড়ে দেওয়া কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।

আমরা বলতে চাইÑঅবিলম্বে এই অবৈধ বালু উত্তোলনের মূল হোতা ও হামলাকারী রাজনৈতিক নেতাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। মুচলেকা দিয়ে পার পাওয়ার এই সস্তা সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে খোলপেটুয়া নদী রক্ষা এবং উপকূলীয় মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে কঠোর ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে। পরিবেশ ও মানুষের জীবন নিয়ে এই রাজনৈতিক-প্রশাসনিক তামাশা অবিলম্বে বন্ধ হোক।

ফোনের ওপাশে নীরবতা/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬, ১০:৫৪ অপরাহ্ণ
ফোনের ওপাশে নীরবতা/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

সকাল গড়িয়ে দুপুর। ডেস্ক থেকে বারবার তাগাদা আসছেÑ“খবরটা কখন পাঠাচ্ছেন?” ঘটনাস্থল থেকে ছবি এসেছে, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে, ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক তথ্যও সংগ্রহ করা হয়েছে। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখনও বাকি। সেটি হলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য। ধরা যাক, একটি বেইলি সেতু ভেঙে পড়েছে। এটি নিছক একটি অবকাঠামোগত দুর্ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের চলাচল, জননিরাপত্তা, সরকারি দায়বদ্ধতা এবং উন্নয়ন কর্মকা-ের মান নিয়ে প্রশ্ন। ফলে একটি দায়িত্বশীল সংবাদ প্রকাশের জন্য সড়ক, সেতু কিংবা স্থানীয় প্রশাসনের বক্তব্য অপরিহার্য। ফোন করা হলো সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীকে। একবার, দুইবার, তিনবার, চারবার। কোনো সাড়া নেই। এরপর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীকে ফোন করা হলো। সেখানেও একই অবস্থা।

 

সড়ক ও জনপথ বিভাগের আরেক কর্মকর্তার নম্বরে কল গেল। তাতেও কোনো উত্তর নেই। এ দৃশ্য বাংলাদেশের সাংবাদিকদের কাছে নতুন নয়। বরং এটি এক ধরনের নিত্যদিনের বাস্তবতা। একটি বক্তব্যের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, অসংখ্য ফোনকল, বার্তা পাঠানো, পরিচিতজনের মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টাÑএসব যেন সংবাদ সংগ্রহের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। অনেকেই মনে করেন, কোনো ঘটনা ঘটেছে, তার ছবি তুলে বা দু-একজনের বক্তব্য নিয়ে সংবাদ লেখা যায়। বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়। পেশাদার সাংবাদিকতার মূল ভিত্তিই হলো ভারসাম্য ও বস্তুনিষ্ঠতা। একটি ঘটনার অভিযোগ, সমালোচনা বা ক্ষোভ তুলে ধরার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও প্রকাশ করতে হয়। ধরা যাক, একটি সেতু ভেঙে পড়েছে।

 

স্থানীয় মানুষ বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। কেউ বলছেন, সংস্কারের অভাব ছিল। কিন্তু প্রকৃত অবস্থা কী? সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী কী বলছেন? কোনো সংস্কার পরিকল্পনা ছিল কি না? দুর্ঘটনার কারণ কী? বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া সংবাদ অসম্পূর্ণ থেকে যায়।ফলে একজন সাংবাদিক যতক্ষণ পর্যন্ত কর্তৃপক্ষের বক্তব্য না পান, ততক্ষণ তাঁর কাজও পুরোপুরি শেষ হয় না। সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব নিঃসন্দেহে অনেক। তাঁরা সভা, পরিদর্শন, প্রশাসনিক কাজ কিংবা বিভিন্ন জরুরি বিষয়ে ব্যস্ত থাকেন। সব সময় ফোন ধরা সম্ভব নাও হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন কর্মকর্তা যদি একাধিকবার ফোনকল পাওয়ার পরও কোনো প্রতিক্রিয়া না দেন, পরেকলব্যাক না করেন কিংবা একটি খুদে বার্তারও উত্তর না দেন, তাহলে সেটিকে কি শুধু ব্যস্ততা বলা যায়? প্রযুক্তির এই যুগে যোগাযোগের অসংখ্য মাধ্যম রয়েছে।

 

সরাসরি ফোন না ধরতে পারলেও পরে ফোন করা যায়, বার্তার উত্তর দেওয়া যায় কিংবা দপ্তরের অন্য কাউকে তথ্য দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া যায়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সাংবাদিকদের ফোনকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এমন প্রবণতা শুধু সাংবাদিকদের জন্য নয়, সামগ্রিকভাবে জনসেবার ধারণার জন্যও উদ্বেগজনক।একজন সাংবাদিক যখন কোনো কর্মকর্তাকে ফোন করেন, তখন তিনি ব্যক্তিগত কৌতূহল মেটানোর জন্য ফোন করেন না। তিনি জনগণের পক্ষ থেকে প্রশ্ন করেন। তাঁর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ জানতে চায়, কী ঘটেছে, কেন ঘটেছে এবং এর সমাধান কী। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় জবাবদিহি একটি মৌলিক মূল্যবোধ। সরকারি কর্মকর্তা জনগণের করের টাকায় বেতন পান এবং জনগণের সেবা দেওয়ার জন্যই নিয়োজিত থাকেন। ফলে তাঁদের কর্মকা- সম্পর্কে প্রশ্ন উঠলে তার উত্তর দেওয়াও দায়িত্বের অংশ।

 

ঢাকা কিংবা বড় শহরের সাংবাদিকদের তুলনায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদের চ্যালেঞ্জ আরও বেশি। অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের সীমিত সম্পদ নিয়ে কাজ করতে হয়। নিজস্ব যানবাহন নেই, প্রযুক্তিগত সুবিধা সীমিত, আবার সংবাদ সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। ঘটনাস্থলে পৌঁছে তথ্য সংগ্রহের পর যখন একটি বক্তব্যের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়, তখন তা শুধু সময়ের অপচয় নয়; পেশাগত হতাশারও কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অথচ পাঠক যখন সংবাদ পড়েন, তখন তিনি জানেন না এর পেছনে কত শ্রম, কত ফোনকল কিংবা কত প্রত্যাখ্যানের গল্প লুকিয়ে আছে।বাংলাদেশে অবকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল সেবা এবং প্রশাসনিক আধুনিকায়নের অনেক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

 

সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের ওয়েবসাইট রয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপস্থিতি রয়েছে, ডিজিটাল যোগাযোগের নানা ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে, প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পাশাপাশি যোগাযোগের সংস্কৃতিরও উন্নয়ন জরুরি।একজন কর্মকর্তা যদি সাংবাদিকের ফোন ধরতে অনীহা দেখান, তাহলে সেই প্রযুক্তিগত অগ্রগতি জনগণের কাছে কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটি প্রশ্নসাপেক্ষ।

 

বাংলাদেশে তথ্য অধিকার আইন রয়েছে। আইন অনুযায়ী জনগণ তথ্য জানার অধিকার রাখে। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, তথ্য পাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায়Ñসরাসরি ফোনে কথা বলাÑসেটিই সবচেয়ে কঠিন হয়ে ওঠে। তথ্য অধিকার কেবল আইনের বইয়ে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; এর বাস্তব প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে।একজন সাংবাদিক যদি দিনের পর দিন তথ্য পাওয়ার জন্য দৌড়ঝাঁপ করেন, তাহলে সাধারণ নাগরিকের অবস্থাটা কী হতে পারে, সেটিও ভাবার বিষয়। এ কথাও সত্য যে সব সরকারি কর্মকর্তা সাংবাদিক বিমুখ নন। অনেক কর্মকর্তা আছেন, যারা দ্রুত ফোন ধরেন, তথ্য দেন, প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা প্রদান করেন এবং সংবাদ প্রকাশে সহযোগিতা করেন।

 

তাঁদের কারণে গণমাধ্যম ও প্রশাসনের মধ্যে একটি ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এমন কর্মকর্তারাই প্রমাণ করেন যে সাংবাদিকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা মানেই কোনো পক্ষপাতিত্ব নয়; বরং এটি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির পরিচয়। সাংবাদিক বান্ধব প্রশাসন মানে সাংবাদিকদের প্রতি বিশেষ সুবিধা দেওয়া নয়। এর অর্থ হলো তথ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে সহযোগিতামূলক মনোভাব রাখা। যখন কোনো কর্মকর্তা দ্রুত তথ্য দেন, তখন গুজব কমে, বিভ্রান্তি দূর হয় এবং সঠিক তথ্য দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।

 

অন্যদিকে তথ্য না দিলে বা যোগাযোগ এড়িয়ে গেলে নানা ধরনের অনুমান, গুজব ও ভুল ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি হয়। এতে প্রশাসন এবং জনগণÑউভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হয়তো একজন কর্মকর্তার কাছে একটি ফোনকল খুব সাধারণ বিষয়। কিন্তু একজন সাংবাদিকের কাছে সেটিই হতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের শেষ অংশ। একটি কল রিসিভ করা, কয়েক মিনিট সময় দেওয়া কিংবা পরে কলব্যাক করাÑএই ছোট ছোট কাজগুলোই গণমাধ্যম ও প্রশাসনের মধ্যে আস্থার সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে পারে।

 

প্রথমত, সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ বিষয়ে আরও সচেতনতা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, জরুরি জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট ঘটনার ক্ষেত্রে দ্রুত তথ্য দেওয়ার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, প্রতিটি সরকারি দপ্তরে নির্দিষ্ট মুখপাত্র বা তথ্য কর্মকর্তা সক্রিয় রাখা দরকার, যাতে সাংবাদিকরা দ্রুত তথ্য পেতে পারেন। চতুর্থত, কর্মকর্তাদের মধ্যে এই উপলব্ধি তৈরি করতে হবে যে সাংবাদিকের ফোন কোনো ব্যক্তিগত অনুরোধ নয়; এটি জনগণের জানার অধিকার বাস্তবায়নের একটি অংশ। ভেঙে পড়া বেইলি সেতুর খবর হয়তো একদিনের সংবাদ। কাল অন্য কোনো ঘটনা শিরোনাম হবে। কিন্তু একটি বক্তব্যের জন্য সাংবাদিকের বারবার ফোন করা, আর ফোনের ওপাশে দীর্ঘ নীরবতাÑএই অভিজ্ঞতা প্রতিদিনের।

 

সংবাদপত্রের পাতায় প্রকাশিত একটি ছোট খবরের পেছনে কত মানুষের শ্রম, কত প্রতিকূলতা এবং কত অদৃশ্য সংগ্রাম থাকে, তা পাঠকের চোখে ধরা পড়ে না। কিন্তু সেই সংগ্রামের অন্যতম বড় অংশ হলো তথ্যের জন্য অপেক্ষা। গণমাধ্যম ও প্রশাসন পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়। উভয়ের লক্ষ্যই জনগণের সেবা করা। তাই একটি গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও স্বচ্ছ রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে প্রশাসনকে আরও উন্মুক্ত হতে হবে, আর সাংবাদিকদের প্রশ্নকে দেখতে হবে জনগণের প্রশ্ন হিসেবের্।ফোনের ওপাশের সেই নীরবতা ভাঙার সময় এখনই। কারণ তথ্যপ্রবাহের পথ যত সহজ হবে, গণতন্ত্রও তত শক্তিশালী হবে।

লেখক: সংবাদকর্মী

 

প্রাণসায়ের খাল রক্ষায় আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নের দাবিতে সাতক্ষীরায় আলোচনা সভা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬, ৮:১১ অপরাহ্ণ
প্রাণসায়ের খাল রক্ষায় আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নের দাবিতে সাতক্ষীরায় আলোচনা সভা

সংবাদদাতা: সাতক্ষীরা শহরের বুক চিরে বয়ে চলা ঐতিহ্যবাহী প্রাণসায়ের খাল রক্ষায় আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন ও এর বর্তমান অবস্থা নিয়ে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (১০ জুন) বিকেলে সাতক্ষীরা সদরের মিল বাজারস্থ সুন্দরবন ফাউন্ডেশন কার্যালয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) এই সভার আয়োজন করে।

সভায় বক্তারা বলেন, প্রাণসায়ের খাল কেবল একটি জলাধার নয়, এটি সাতক্ষীরা শহরের ঐতিহ্য ও ফুসফুস। অথচ চরম দখল ও দূষণের কারণে এই ঐতিহ্যবাহী খালটি আজ অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে। খালের দুই পাড়ে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ এবং যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো শহরে তীব্র জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হবে এবং পরিবেশ মারাত্মকভাবে বিনষ্ট হচ্ছে।

দেশ টিভির সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধি শরিফুল্লাহ কায়সার সুমনের সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনায় সভায় বক্তব্য ও উপস্থিত ছিলেন অ্যাডমিন অফিসার শেখ আব্দুর রহমানের, বেলার খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল, বেলার প্রধান কার্যালয়ের অ্যাডভোকেট আসাদুল্লাহ আল গালিব, খুলনা বেলা রিসার্চ অফিসের শাফায়েত উল্লাহ, বেলার ক্যাম্পেইন অফিসার মোজাফফর ফয়সাল, অ্যাওয়ারনেস ক্যাম্পেইন অফিসার সামির রহমান এবং রিসার্চ অফিসার রাইসুল হাসান সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শেখ আফজাল হোসেনের।

সাংবাদিকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নিউজ টোয়েন্টিফোরের জেলা প্রতিনিধি আমিনা বিলকিস ময়না। এছাড়াও প্রাণসায়ের খালের তীরবর্তী সুবিধাবঞ্চিত মানুষ, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি ও ইয়ুথ সদস্যরা সভায় অংশ নেন।

শহরের পরিবেশ ও ঐতিহ্য রক্ষায় সভা থেকে অবিলম্বে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তিন দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলো হলো- খালের দুই পাশের সব অবৈধ স্থাপনা অবিলম্বে উচ্ছেদ করা, খালে বাসা-বাড়ি বা বাজারের বর্জ্য ফেলা কঠোরভাবে বন্ধ করা এবং খালটি পূর্ণাঙ্গভাবে খনন করে এর স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটা ও পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনা।

বক্তারা বলেন, “প্রাণ-সায়ের খাল বাঁচলে, বাঁচবে আমাদের সাতক্ষীরা শহর। এই খালকে বাঁচাতে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং নিজেদেরও খাল দূষণমুক্ত রাখার শপথ নিতে হবে।”