মধ্যপ্রাচ্যে আবারও তীব্র সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনীর (সেন্টকম) দাবি, ইরানের সাম্প্রতিক হামলার জবাবে দেশটির দক্ষিণাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ৯০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুল হামলা চালানো হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, হামলায় কয়েকজন সেনাসদস্য নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। তবে হতাহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। নিহতদের মধ্যে বিমান বাহিনী ও নৌবাহিনীর সদস্য রয়েছেন। হামলায় দক্ষিণাঞ্চলের বান্দার আব্বাস ও বুশেহর এলাকায় উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
হামলার পরপরই ইরানও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি ও মিত্র দেশগুলোর দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়ে পাল্টা জবাব দিয়েছে। এতে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলাটি শুরু হয় স্থানীয় সময় বুধবার (৮ জুলাই) ভোরের আগে, যখন মার্কিন সামরিক বাহিনী একযোগে ইরানের দক্ষিণাঞ্চল ও পারস্য উপসাগরসংলগ্ন একাধিক সামরিক স্থাপনায় বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। হামলার সময় ইরানের বিভিন্ন শহরে একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে ওঠে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, হামলাটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত এবং এতে প্রায় ৯০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়। লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, ড্রোন ঘাঁটি, সামরিক বিমানঘাঁটি, রানওয়ে, সেতু, রাডার স্টেশন, নৌঘাঁটি এবং সামরিক লজিস্টিক অবকাঠামো।
বিশেষ করে বান্দার আব্বাস, সিরিক, কেশম দ্বীপ এবং হরমুজ প্রণালির আশপাশের সামরিক স্থাপনাগুলোতে ব্যাপক হামলা চালানো হয়। মার্কিন বাহিনীর দাবি, এসব স্থাপনা থেকেই সম্প্রতি বাণিজ্যিক জাহাজ ও মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হচ্ছিল।
সেন্টকমের দাবি, এসব হামলার মাধ্যমে ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করাই ছিল উদ্দেশ্য।
মার্কিন দাবি অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলার জবাব হিসেবেই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের বান্দার আব্বাস, সিরিক, কোনারাক ও চাবাহার এলাকায় বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হলেও একাধিক স্থানে বিস্ফোরণ ঘটে। বান্দার আব্বাস ও আশপাশের এলাকায় বিস্ফোরণের পর কয়েক ঘণ্টা আগুন জ্বলতে দেখা যায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়।
খুজেস্তান প্রদেশের আহভাজ শহরের কাছে এক হামলায় অন্তত তিনজন নিহত এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
মার্কিন হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায় ইরান। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানায়, তারা বাহরাইন, কুয়েত ও কাতারে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এরপর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয় এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ও মিত্রবাহিনীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়।
ইরানের সামরিক বাহিনীর দাবি, এই হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, ইরানের ওপর যেকোনো আগ্রাসনের জবাব দেওয়া হবে। তবে এসব হামলায় মার্কিন বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
হামলার পরদিন (৯ জুলাই) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ইরানের সঙ্গে কার্যকর থাকা অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি শেষ হয়ে গেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরান যদি আন্তর্জাতিক নৌপথ বা মার্কিন স্বার্থে আবারও হামলা চালায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র আরও কঠোর সামরিক অভিযান পরিচালনা করবে।
ট্রাম্প বলেন, “ইরান যদি থামে না, তাহলে আমরা কাজ শেষ করব। আমরা দীর্ঘ যুদ্ধ চাই না, কিন্তু আমাদের স্বার্থ রক্ষায় যা প্রয়োজন, তাই করা হবে।” তিনি আরও বলেন, বর্তমান যুদ্ধবিরতি কার্যত শেষ হয়ে গেছে এবং এখন পরিস্থিতি পুরোপুরি ইরানের আচরণের ওপর নির্ভর করছে।
ট্রাম্পের দাবি, ইরান যুদ্ধবিরতির সমঝোতা লঙ্ঘন করেছে। তাই প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র আরও সামরিক অভিযান চালাতে পারে। তবে তিনি একই সঙ্গে বলেন, পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ আবার শুরু হবে বলে তিনি মনে করেন না।
ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, “আমেরিকা ভেবেছে হামলা চালিয়ে ইরানকে ভয় দেখানো যাবে। কিন্তু প্রতিটি হামলার জবাব আরও শক্তভাবে দেওয়া হবে।” একই সঙ্গে তেহরান জানিয়েছে, প্রয়োজনে হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা হবে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে সমঝোতা ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন বলে অভিযোগ করেছে। জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাঈদ ইরাভানি নিরাপত্তা পরিষদের কাছে অভিযোগ জানিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘ সনদ এবং দুই দেশের সমঝোতা ভঙ্গ করেছে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেছেন, “হরমুজ প্রণালি কখন খুলবে, সেই সিদ্ধান্ত ইরানই নেবে। আমাদের ওপর হামলা হলে তার জবাবও দেওয়া হবে।”
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই অভিযোগ করেছেন, ন্যাটোভুক্ত যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ঘাঁটি বা অবকাঠামো ব্যবহার করতে দিয়েছে, তারাও এই যুদ্ধের দায় এড়াতে পারে না। তিনি ন্যাটো মহাসচিবের বক্তব্যেরও সমালোচনা করেন।
অন্যদিকে ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে বলেছেন, ইরান যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করে হরমুজ প্রণালিতে হামলা চালানোর পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রতিক্রিয়া ছিল “একেবারেই প্রয়োজনীয়”।
এ ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয় এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, চলমান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। বর্তমানে সীমিত সংখ্যক জাহাজ ইরানের অনুমোদিত রুট ব্যবহার করে চলাচল করছে, যা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও বিশ্ববাজারে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও। হামলার পরদিনই ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭৯ ডলারে পৌঁছায়। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে।
জাতিসংঘসহ ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। কূটনৈতিক মহলের আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সংঘাত শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে একটি বৃহৎ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলা শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, বৈশ্বিক নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতিতেও নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে।