রক্তে লেখা প্রতিরোধের ইতিহাস
শেখ সিদ্দিকুর রহমান
’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান থেকে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলন বাংলার ইতিহাসে ছাত্রসমাজ বারবার সময়ের সন্ধিক্ষণে নেতৃত্ব দিয়েছে। ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান কিংবা গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রাম প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে তরুণ সমাজের ভূমিকা ছিল দৃশ্যমান। ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং সাম্প্রতিক ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলন এই তিনটি অধ্যায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে গভীরভাবে আলোচিত।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান : স্বাধিকার আন্দোলনের জাগরণ
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালির রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ এবং গণতান্ত্রিক দাবির এক বিস্ফোরণ। আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ ১১ দফা দাবি উত্থাপন করে। ধীরে ধীরে শ্রমিক, কৃষক, শিক্ষক ও সাধারণ মানুষ এই আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত হন। ঢাকার রাজপথে ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামানের মৃত্যু আন্দোলনকে আরও বেগবান করে। “আসাদের শার্ট” হয়ে ওঠে প্রতিবাদের প্রতীক। গণআন্দোলনের চাপে শেষ পর্যন্ত আইয়ুব খান ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। এই আন্দোলন পরবর্তীতে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের ভিত্তি তৈরি করে। ১৯৬৯ সালের আন্দোলনের মূল বৈশিষ্ট্য ছাত্রসমাজের ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্ব গণমানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণ রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি স্বাধিকার আন্দোলনের ভিত্তি নির্মাণ
১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান : স্বৈরাচারবিরোধী গণজাগরণ
১৯৯০ সালের আন্দোলন ছিল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দীর্ঘদিনের সামরিক শাসন ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ছাত্রসংগঠন, রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ জনগণ একযোগে আন্দোলনে নামে। তৎকালীন সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ঢাকার রাজপথে মিছিল, সমাবেশ এবং হরতালের মধ্য দিয়ে আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। নূর হোসেনের আত্মত্যাগ আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক হয়ে ওঠে। তাঁর বুকে লেখা ছিল “স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক।” অবশেষে প্রবল গণচাপের মুখে রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন ঘটে এবং দেশে গণতান্ত্রিক ধারার নতুন অধ্যায় শুরু হয়। ১৯৯০ সালের আন্দোলনের তাৎপর্য বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ সুগম ছাত্র-জনতার ঐক্যের শক্তি প্রকাশ নাগরিক অধিকার ও মতপ্রকাশের দাবির উত্থান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গণআন্দোলনের প্রভাব
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলন : নতুন প্রজন্মের ক্ষোভ ও প্রত্যাশা
২০২৪ সালের আন্দোলন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে ব্যাপক আলোচিত একটি অধ্যায়। মূলত সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আন্দোলনের সূচনা হয়। পরবর্তীতে তা বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দেয়। ছাত্ররা দাবি করে, মেধা ও সমতার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, অবস্থান কর্মসূচি এবং সড়ক অবরোধ দেখা যায়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থার তথ্যমতে, সংঘর্ষ, গুলি ও সহিংসতায় বহু মানুষ আহত এবং কয়েকশত নিহত হন। এসব ঘটনায় দেশজুড়ে উদ্বেগ ও শোকের সৃষ্টি হয়। সরকারি পক্ষ থেকে বলা হয়, জননিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দায়িত্ব পালন করেছে। একইসাথে পরিস্থিতি শান্ত করতে সংলাপ ও প্রশাসনিক পদক্ষেপও গ্রহণ করা হয়।
আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের এই আন্দোলনের পেছনে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১. চাকরির সীমিত সুযোগ দেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণের সংখ্যা বাড়লেও কর্মসংস্থানের সুযোগ তুলনামূলক সীমিত। ফলে চাকরিতে প্রতিযোগিতা অত্যন্ত তীব্র হয়ে ওঠে। ২. মেধাভিত্তিক প্রত্যাশা ছাত্রসমাজের একটি বড় অংশ মনে করে, নিয়োগে স্বচ্ছতা ও সমতা নিশ্চিত করা জরুরি। ৩. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব ফেসবুকসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম আন্দোলন সংগঠিত ও দ্রুত বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ৪. আবেগ ও ক্ষোভের বিস্তার কিছু স্থানে সংঘর্ষ, আহত ও মৃত্যুর ঘটনার পর আন্দোলন আরও আবেগপ্রবণ রূপ নেয়। এছাড়া রাজনৈতিক দলগুলো বিগত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচন মেনে না নেওয়ায় চরম ক্ষোভে ছাত্রদের আন্দোলনে তারা সংযুক্ত হয়।
আহত ও নিহতের বেদনা
প্রতিটি গণআন্দোলনের মতো ২০২৪ সালের ঘটনাপ্রবাহেও সাধারণ পরিবারগুলো গভীর কষ্টের মুখোমুখি হয়। অনেক শিক্ষার্থী আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। কেউ চোখ হারিয়েছেন, কেউ স্থায়ী শারীরিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে। আবু সাঈদসহ নিহতদের পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া। রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিকদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা যে কোনো মতবিরোধ যেন সংলাপ, সহনশীলতা ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান করা যায়।
তিন গণঅভ্যুত্থানের তুলনামূলক প্রেক্ষাপট : বিষয়: ১৯৬৯, ১৯৯০, ২০২৪। নেতৃত্ব-ছাত্রসমাজ, ছাত্র ও রাজনৈতিক জোট, ছাত্রসমাজ ও সাধারণ জনগণ। মূল দাবি: স্বাধিকার, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, কোটা সংস্কার ও সমঅধিকার, আন্দোলনের ধরন, গণবিক্ষোভ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ক্যাম্পাসভিত্তিক থেকে দেশব্যাপী বিস্তার। প্রতীক, আসাদ, নূর হোসেন ও আবু সাঈদ। তরুণ শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধ ফলাফল, স্বাধীনতার ভিত্তি, গণতান্ত্রিক ধারা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, জাতীয় পর্যায়ে নীতিগত আলোচনা।
উপসংহার
বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্রসমাজ সবসময় পরিবর্তনের অগ্রভাগে থেকেছে। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান স্বাধীনতার স্বপ্ন জাগিয়েছে, ১৯৯০-এর আন্দোলন গণতন্ত্রের পথ খুলেছে এবং ২০২৪ সালের আন্দোলন নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা ও নাগরিক সচেতনতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আলোচিত হয়েছে। তবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো সহিংসতা নয়, শান্তিপূর্ণ সংলাপ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াই একটি জাতিকে সামনে এগিয়ে নেয়। রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজ সব পক্ষের দায়িত্ব হলো এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে তরুণদের কণ্ঠ শোনা হবে এবং একইসাথে দেশের স্থিতিশীলতা ও শান্তি বজায় থাকবে। লেখক: সাবেক ব্যাংকার









