সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩

শিকড় কাটা প্রগতি: প্রযুক্তি আসুক, তবে মানবিকবিদ্যাকে খুন করে নয়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬, ১২:৪৪ পূর্বাহ্ণ
শিকড় কাটা প্রগতি: প্রযুক্তি আসুক, তবে মানবিকবিদ্যাকে খুন করে নয়

‎তারিক ইসলাম
‎রাষ্ট্র বা সমাজের আধুনিকায়নের প্রধান শর্ত যদি হয় শিক্ষার রূপান্তর, তবে সেই রূপান্তরের অভিমুখ কোন দিকে, তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। সম্প্রতি দেশের উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে এক চরম উদ্বেগজনক সিদ্ধান্তের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বাংলা, ইতিহাস ও দর্শনের মতো মৌলিক ও ঐতিহ্যবাহী অনার্স কোর্সগুলো বাতিল করে সম্পূর্ণভাবে এআই (অৎঃরভরপরধষ ওহঃবষষরমবহপব), সাইবার সিকিউরিটি, আউটসোর্সিং ও অন্যান্য প্রযুক্তি-নির্ভর বিষয় চালুর রূপরেখা তৈরি হচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে এই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত ‘স্মার্ট’ এবং ‘বাজারমুখী’ মনে হলেও, গভীর বিশ্লেষণে এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক ভয়াবহ সাংস্কৃতিক ও মেধাভিত্তিক দেউলিয়াত্বের রূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
‎বিশ্ববিদ্যালয় কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা কেবলই ‘চাকরিজীবী তৈরির কারখানা’ নয়; এটি জ্ঞান সৃষ্টি, মুক্তচিন্তা এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রসূতিগৃহ। আউটসোর্সিং বা সাইবার সিকিউরিটির মতো বিষয়গুলো শিক্ষার্থীদের দ্রুত আয়ের পথ দেখাতে পারে, যা সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য হয়তো লোভনীয়। কিন্তু একটি রাষ্ট্র কি কেবল জিডিপি (এউচ) দিয়ে পরিমাপ করা যায়?
‎বাংলা কেবল একটি ভাষা নয়, এটি আমাদের হাজার বছরের সংস্কৃতি, জাতিগত সত্তা ও সৃজনশীলতার আধার। একে বাদ দেওয়া মানে নিজের শিকড়কে কেটে ফেলা।
‎ইতিহাস মানুষকে অতীত ও বর্তমানের মেলবন্ধন শেখায়। ইতিহাসহীন জাতি অন্ধের মতো চলে, যারা বারবার পুরোনো ভুলের পুনরাবৃত্তি করে।
‎দর্শন মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, ভালো-মন্দের তফাত বোঝায় এবং নৈতিকতার মানদন্ড গড়ে দেয়।
‎এই বিষয়গুলোকে উচ্চশিক্ষা থেকে নির্বাসনে পাঠানো মানে একটি সংবেদনশীল ও বিবেকবান সমাজ ব্যবস্থার কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেওয়া। আমরা হয়তো একদল প্রযুক্তি-দক্ষ ‘শ্রমিক’ পাব, কিন্তু একটি আদর্শ ‘মানুষ’ বা ‘সমাজ’ গড়ার কারিগর চিরতরে হারিয়ে ফেলব।
‎বিশ্বজুড়ে এখন সবচেয়ে বড় বিতর্ক কী নিয়ে? তা হলো-কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা অও-এর নৈতিক ব্যবহার। প্রযুক্তি যত শক্তিশালী হচ্ছে, তার অপব্যবহারের ঝুঁকি তত বাড়ছে।
‎একটি এআই অ্যালগরিদম যেন মানববিদ্বেষী বা বৈষম্যমূলক না হয়, তা নির্ধারণের জন্য প্রযুক্তিবিদের চেয়ে একজন সমাজবিজ্ঞানী বা দার্শনিকের প্রজ্ঞা বেশি প্রয়োজন। সাইবার অপরাধ প্রতিরোধের জন্য শুধু কোডিং জানাই যথেষ্ট নয়, অপরাধীর মনস্তত্ত্ব ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বুঝতে ইতিহাসের পাঠ আবশ্যক।
‎উন্নত বিশ্ব যেখানে বিজ্ঞান ও কলার সমন্বয়ে ‘ঝঞঊঅগ’ (ঝপরবহপব, ঞবপযহড়ষড়মু, ঊহমরহববৎরহম, অৎঃং, ধহফ গধঃযবসধঃরপং) মডেলের দিকে ঝুঁকছে, সেখানে আমরা মানবিকবিদ্যাকে পুরোপুরি উপড়ে ফেলার মতো বিপরীতমুখী ও আত্মঘাতী পথে হাঁটছি।
‎সংস্কার হোক সমন্বিত, ধ্বংসাত্মক নয়।সময়ের প্রয়োজনে প্রযুক্তির সংযোজন অবশ্যই অনস্বীকার্য। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, নতুনকে জায়গা দিতে গিয়ে পুরনো স্তম্ভগুলোকে ভেঙে ফেলতে হবে। আমাদের প্রয়োজন ছিল একটি দূরদর্শী শিক্ষানীতি:
‎সমন্বয়: বাংলা, ইতিহাস বা দর্শনের অনার্স কোর্সগুলো বহাল রেখে তার সাথে বাধ্যতামূলকভাবে ‘ডিজিটাল হিউম্যানিটিজ’, ‘এআই ইথিক্স’ কিংবা ফ্রিল্যান্সিং-এর মৌলিক কারিগরি কোর্স যুক্ত করা যেত।
‎বাজারের স্থায়িত্ব: মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তির বাজার অত্যন্ত পরিবর্তনশীল। আজকের যে প্রযুক্তির জন্য আমরা পাগল, পাঁচ বছর পর তা হয়তো সেকেলে হয়ে যাবে। কিন্তু ইতিহাস, দর্শন ও সাহিত্যের উপযোগিতা চিরন্তন। কেবল নির্দিষ্ট প্রযুক্তি শেখা একটি প্রজন্ম বাজারের সামান্য পরিবর্তনেই খেই হারিয়ে ফেলবে।
‎ইতিহাস ও দর্শনহীন সমাজ হয়ে পড়ে স্মৃতিশক্তিহীন ও বিবেকহীন। আর নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা না থাকলে সেই সমাজ আত্মপরিচয়হীন এক জনসমষ্টিতে পরিণত হয়। প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে গতিশীল ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করতে পারে, কিন্তু জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তোলে সাহিত্য ও শিল্প।
‎বাজারের অন্ধ স্্েরাতে গা ভাসিয়ে আমরা যেন আমাদের মেধা ও মননের আত্মাকে বিসর্জন না দিই। নীতিনির্ধারকদের প্রতি অনুরোধ-প্রযুক্তিকে অবশ্যই বরণ করুন, তবে তা মানবিকবিদ্যাকে কবর দিয়ে নয়, বরং তার পরিপূরক হিসেবে। ভারসাম্যপূর্ণ উচ্চশিক্ষাই কেবল একটি প্রগতিশীল ও আত্মমর্যাদাশীল জাতি উপহার দিতে পারে। ‎লেখক: তারিক ইসলাম, ‎সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি

 

Ads small one

রিজিকে বরকত কমে যাওয়ার পেছনে যে ভুল আমরা প্রতিদিন করছি

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬, ১০:০৭ অপরাহ্ণ
রিজিকে বরকত কমে যাওয়ার পেছনে যে ভুল আমরা প্রতিদিন করছি

গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ

‎অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা, রিজিকের প্রশস্ততা এবং জীবনে বরকত এ তিনটি বিষয়ই মানুষের চিরন্তন প্রত্যাশা। তবে ইসলাম স্পষ্টভাবে শিক্ষা দেয়, প্রকৃত সমৃদ্ধি কেবল অর্থ-সম্পদের প্রাচুর্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং হালাল উপার্জন, আল্লাহভীতি, পিতা-মাতার সন্তুষ্টি এবং মানুষের অধিকার যথাযথভাবে আদায় করার মধ্যেই নিহিত রয়েছে বরকতময় জীবনের প্রকৃত ভিত্তি।

 

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, “তোমার রব নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে।” (সূরা আল-ইসরা: ২৩)। গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আল্লাহ তাআলা তাঁর ইবাদতের নির্দেশের পরপরই পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের আদেশ দিয়েছেন। এর মাধ্যমে ইসলামে পিতা-মাতার মর্যাদা ও তাঁদের সন্তুষ্টির গুরুত্ব সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “আল্লাহর সন্তুষ্টি পিতার সন্তুষ্টির মধ্যে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি পিতার অসন্তুষ্টির মধ্যে।” (জামে তিরমিজি)।

 

তাই যে ব্যক্তি আন্তরিকতার সঙ্গে পিতা-মাতার সেবা করে, তাঁদের সম্মান করে এবং তাঁদের দোয়া অর্জনের চেষ্টা করে, আল্লাহ তাআলা তার জীবনে রহমত ও কল্যাণ দান করেন। অপরদিকে, মানুষের ওপর জুলুম করা, অন্যের অধিকার হরণ করা, লেনদেনে প্রতারণা করা কিংবা অসৎ উপায়ে সম্পদ অর্জন করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, “তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না।” (সূরা আল-বাকারা: ১৮৮)।

 

রাসূলুল্লাহ কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন, “যে ব্যক্তি প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।” (সহিহ মুসলিম)। অর্থাৎ, যে সম্পদ অন্যায় ও অসততার মাধ্যমে অর্জিত হয়, তাতে বাহ্যিক প্রাচুর্য থাকতে পারে, কিন্তু প্রকৃত বরকত থাকে না। আজকের সমাজে অর্থনৈতিক সংকট, পারিবারিক অশান্তি এবং জীবনে বরকতহীনতার অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে।

 

অথচ আত্মসমালোচনা করলে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই আমরা মানুষের হক আদায়ে অবহেলা করি, লেনদেনে সততা বজায় রাখি না, অন্যের সম্পদের প্রতি অন্যায়ভাবে হাত বাড়াই কিংবা পিতা-মাতার যথাযথ খেদমতে শৈথিল্য প্রদর্শন করি। এসব অনৈতিক আচরণ ব্যক্তি ও সমাজ উভয়কেই আল্লাহর রহমত ও বরকত থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে।

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা ও উদ্যোক্তা

 

সাতক্ষীরায় রোগী কল্যাণ সমিতির বার্ষিক সাধারণ সভা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬, ৭:২৭ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরায় রোগী কল্যাণ সমিতির বার্ষিক সাধারণ সভা

সংবাদদাতা: রোগী কল্যাণ সমিতির বার্ষিক সাধারণ সভা-২০২৬ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবার (২৭ জুলাই) বেলা ১১ টায় সদর হাসপাতাল সম্মেলন কক্ষে হাসপাতাল সমাজ সেবা কার্যালয় সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের আয়োজনে সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ আব্দুস সালামের সভাপতিত্বে বার্ষিক সাধারণ সভায় উপস্থিত ছিলেন রোগী কল্যাণ সমিতির সদস্য ও বিশিষ্ট সমাজসেবক ডাঃ আবুল কালাম বাবলা, মোঃ দ্বিন আলী, সাবেক কাউন্সিলর শেখ শফিক উদ দৌলা সাগর, ডাঃ মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন, ডাক্তার মোঃ আব্দুর রহিম, হাকিম রাজু আহম্মেদ, মোঃ হুমায়ুন কবীর, মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী, শেখ সাইফুল ইসলাম, মোঃ তুহিন আলী, মোস্তফা খাইরুল আকবর, মোঃ মাহবুবর রহমান, শেখ নিজাম উদ্দিন প্রমুখ।

রোগী কল্যাণ সমিতি সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে সেবাসমূহ এর মধ্যে রয়েছে হাসপাতালে ভর্তিকৃত গরিব, অসহায় ও অভিভাবকহীন রোগীদের চিকিৎসা স্বার্থে ঔষধ, পথ্য, রক্ত, অপারেশন ও চিকিৎসা সামগ্রী বিতরণ করা হয়। রোগ নির্ণয়ে হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে রোগীকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হয়। গরিব অসহায় ও দুঃস্থ পরিধেয় বস্ত্র ও শীতবস্ত্র সরবরাহ করা হয়।

অসুস্থ গরীব, অসহায় রোগীদের হাসপাতাল ত্যাগের সময় বাড়ী বা অন্য হাসপাতালে গমন বা স্থানান্তর বাবদ যাতায়াত ভাড়া বা এ্যাম্বুলেন্স এর ব্যবস্থা করা হয়।

বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিশু, প্রতিবন্ধী, হিজড়া ব্যক্তি ও প্রবীণদের চিকিৎসা সেবায় অগ্রাধিকার প্রদান।

কাউন্সেলিং এর মাধ্যমে রোগীর মনস্তাত্ত্বিক বিষয় উপলব্ধিসহ সমানুভূতির সাথে আর্থ-সামাজিক সেবা দান, আশ্রয়হীন, ঠিকানাবিহীন ও পরিত্যক্ত শিশু অথবা ব্যক্তির চিকিৎসাসহ প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সমাজসেবা অধিদফতরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

রোগীকে স্বাস্থ্য সচেতনতা বিষয়ে পরামর্শ প্রদানসহ প্রয়োজনে রোগীর গৃহ পরিদর্শন, ফলোআপ ও পরিবারবর্গের সাথে যোগাযোগপূর্বক পরিবার তথা সমাজে পুনঃএকীকরণে সহায়তা প্রদান।

ক্যান্সার, কিডনী, লিভার সিরোসিস, জন্মগত হৃদরোগ, স্ট্রোকে প্যারালাইজড, থ্যালাসেমিয়াসহ জটিল রোগাক্রান্ত ব্যক্তিদের অগ্রাধিকারভিত্তিতে সেবা দান ও সমাজসেবা অধিদফতরাধীন বিভিন্ন চিকিৎসা সহায়তা কর্মসূচির আওতায় সেবা/অনুদান প্রাপ্তিতে সহায়তা করা হয়।

এসময় নতুন সদস্য নেওয়ার ব্যাপারে এবং সাংগঠনিক বিবিধ আলোচনা করা হয়।

রোগী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সভার আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রদান করা হয়। মোট আয় কুড়ি লক্ষ পঁচিশ হাজার পাঁচশত এক টাকা বারো পয়সা। মোট ব্যয় এগারো লক্ষ সাতান্ন হাজার আটাত্তর টাকা সাতচল্লিশ পয়সা ধরা হয়েছে।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন রোগী কল্যাণ সমিতির সদস্য সচিব শারমিন সুলতানা।

সুখের পেছনে ছুটা নয়/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬, ৭:০১ অপরাহ্ণ
সুখের পেছনে ছুটা নয়/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

“সুখ হলো একটি প্রজাপতির মতো। তুমি যত তাকে তাড়া করবে, ততই সে তোমার নাগালের বাইরে চলে যাবে। কিন্তু যদি তুমি শান্তভাবে বসে থাকো, তবে হয়তো সে নিজেই এসে তোমার কাঁধে বসবে।”Ñবিশ্বখ্যাত সাহিত্যিক ন্যাথানিয়েল হথর্নের এই উক্তিটি শুধু একটি সুন্দর উপমাই নয়; এটি মানুষের জীবনবোধের এক গভীর দর্শন। আধুনিক সভ্যতার দ্রুতগতির জীবন, প্রতিযোগিতার চাপ এবং ভোগবাদী মানসিকতার ভিড়ে এই কথাটি যেন আজ আরও বেশি সত্য হয়ে উঠেছে। মানুষ আজ সুখের জন্য যত বেশি ছুটছে, সুখ যেন ততই অধরা হয়ে পড়ছে। মানুষের জীবনের প্রতিটি প্রচেষ্টার কেন্দ্রে থাকে সুখের অনুসন্ধান।

 

শিশুর পড়াশোনা, তরুণের কর্মজীবন, ব্যবসায়ীর বিনিয়োগ, কৃষকের মাঠে পরিশ্রম, শিল্পীর সৃষ্টিকর্ম কিংবা রাজনীতিবিদের জনসেবাÑসবকিছুর পেছনেই কোথাও না কোথাও সুখের আকাক্সক্ষা কাজ করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সুখ কি সত্যিই এমন কিছু, যা কেবল অর্জনের মাধ্যমে পাওয়া যায়? নাকি সুখ এমন এক অনুভূতি, যা আমাদের মনোজগতের গভীরে লুকিয়ে থাকে? আজকের পৃথিবীতে সাফল্যের সংজ্ঞা অনেকটাই বস্তুগত অর্জনের সঙ্গে যুক্ত। কে কত বড় বাড়ির মালিক, কার গাড়ি কত দামি, কে কত অর্থ উপার্জন করেন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কার অনুসারী কতÑএসব দিয়ে অনেকেই সুখের পরিমাপ করতে চান। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলে। পৃথিবীর বহু ধনী মানুষও মানসিক অবসাদ, উদ্বেগ ও একাকীত্বে ভোগেন।

 

আবার সীমিত আয়ের বহু মানুষকে দেখা যায় পরিবার, প্রকৃতি ও আন্তরিক সম্পর্কের মধ্যেই পরম তৃপ্তিতে জীবন কাটাতে। অর্থাৎ সুখের সঙ্গে অর্থের সম্পর্ক থাকলেও সুখের উৎস কেবল অর্থ নয়। অর্থ মানুষের প্রয়োজন পূরণ করে, নিরাপত্তা দেয়, সুযোগ সৃষ্টি করে; কিন্তু মনের শান্তি কিনে দিতে পারে না। একটি নির্দিষ্ট সীমার পর অর্থের পরিমাণ বাড়লেও সুখের পরিমাণ সমানুপাতিকভাবে বাড়ে না। বরং নতুন সম্পদ নতুন দায়িত্ব, নতুন উদ্বেগ এবং নতুন প্রতিযোগিতার জন্ম দেয়। বর্তমান সমাজে সুখকে সবচেয়ে বেশি দূরে ঠেলে দিচ্ছে তুলনার সংস্কৃতি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিন আমরা অন্যের সাজানো জীবন দেখি।

 

কারও বিদেশ ভ্রমণ, কারও নতুন গাড়ি, কারও সাফল্যের গল্প কিংবা বিলাসবহুল জীবনযাপন দেখে নিজের জীবনকে তুচ্ছ মনে হয়। অথচ আমরা ভুলে যাই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ তার জীবনের সেরা মুহূর্তগুলোই প্রকাশ করে; ব্যর্থতা, কান্না, হতাশা কিংবা একাকীত্ব খুব কমই প্রকাশ পায়। এই তুলনা মানুষের মনে অপ্রাপ্তির বোধ সৃষ্টি করে। ফলে নিজের জীবনের ছোট ছোট আনন্দগুলোও আর চোখে পড়ে না। যে মানুষ গতকাল পর্যন্ত নিজের পরিবার, সন্তান কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে আনন্দ পেতেন, আজ তিনি অন্যের জীবন দেখে নিজের সুখকেও অসম্পূর্ণ ভাবতে শুরু করেন। এভাবেই সুখ ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়।

 

মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, মানুষের মন খুব দ্রুত নতুন অবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নেয়। এটিকে বলা হয় হেডোনিক অ্যাডাপটেশন। অর্থাৎ যে জিনিসটি একসময় আমাদের খুব আনন্দ দেয়, কিছুদিন পর সেটিই স্বাভাবিক হয়ে যায়। নতুন ফোন, নতুন বাড়ি, নতুন চাকরি বা পদোন্নতির আনন্দও দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তখন আবার নতুন কিছু পাওয়ার আকাক্সক্ষা তৈরি হয়। এই অন্তহীন চক্রের মধ্যেই মানুষ সুখের পেছনে ছুটতে থাকে, কিন্তু স্থায়ী প্রশান্তি খুঁজে পায় না।বাংলার প্রাচীন দর্শন দর্শনÑসবখানেই সুখের মূল উৎস হিসেবে অন্তরের শান্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বুদ্ধও বলেছেন, আকাক্সক্ষাই দুঃখের মূল কারণ। আকাক্সক্ষা যত বাড়বে, অস্থিরতাও তত বাড়বে। আবার আকাক্সক্ষাকে পুরোপুরি ত্যাগ নয়, বরং নিয়ন্ত্রণ করার মধ্যেই রয়েছে মুক্তির পথ।

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তাঁর বহু রচনায় সুখকে বাহ্যিক অর্জনের পরিবর্তে অন্তরের বিকাশের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁর দর্শনে মানুষ তখনই সত্যিকারের সুখী হয়, যখন সে প্রকৃতির সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে এবং নিজের অন্তরের সঙ্গে সুর মিলিয়ে চলতে পারে। জীবনানন্দ দাশের কবিতাতেও প্রকৃতির নির্জন সৌন্দর্যের মধ্যে যে প্রশান্তির সন্ধান পাওয়া যায়, তা আমাদের শেখায়Ñসুখ সব সময় কোলাহলের মধ্যে থাকে না। আজকের শিশু-কিশোররাও এই অস্থিরতার শিকার। পরীক্ষার ফল, প্রতিযোগিতা, ক্যারিয়ারের চাপ এবং অভিভাবকদের অতিরিক্ত প্রত্যাশা তাদের শৈশবের আনন্দ কেড়ে নিচ্ছে। তারা ভালো মানুষ হওয়ার আগে সফল মানুষ হওয়ার শিক্ষা পাচ্ছে। ফলে সাফল্য এলেও আনন্দ অনেক সময় আসে না।

 

শিক্ষা যদি কেবল প্রতিযোগিতা শেখায়, কিন্তু জীবনকে উপভোগ করতে না শেখায়, তবে সেই শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। একই ছাদের নিচে বসবাস করেও অনেক পরিবারে আন্তরিক আলাপের সময় নেই। সবাই ব্যস্ত নিজের কাজ, নিজের মোবাইল কিংবা নিজের জগৎ নিয়ে। অথচ একটি পরিবারের সবচেয়ে বড় সম্পদ অর্থ নয়; পারস্পরিক ভালোবাসা, সম্মান এবং সময়। যে পরিবারে আন্তরিক সম্পর্ক থাকে, সেখানে সীমিত সম্পদেও সুখের অভাব হয় না। সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, সুখ একটি সামাজিক বিষয়ও।

 

যে সমাজে বৈষম্য কম, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত, স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য, শিক্ষা সবার নাগালে এবং মানুষ একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীলÑসেই সমাজে মানুষ তুলনামূলক বেশি সুখী থাকে। অন্যদিকে দুর্নীতি, বৈষম্য, বেকারত্ব, সহিংসতা ও অনিশ্চয়তা মানুষের মানসিক প্রশান্তিকে নষ্ট করে দেয়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে অর্থনৈতিক অগ্রগতি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু উন্নয়নের লক্ষ্য যদি কেবল মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি হয়, আর মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য, পরিবেশ, সামাজিক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক চর্চা উপেক্ষিত থাকে, তবে সেই উন্নয়ন পূর্ণতা পায় না। উন্নয়নের প্রকৃত মানদ- হওয়া উচিত মানুষের জীবনমান, নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং সুখের অনুভূতি।

সুখের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো কৃতজ্ঞতা। আমরা যা পাইনি, তা নিয়েই বেশি ভাবি; অথচ যা পেয়েছি, তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে ভুলে যাই। সুস্থ শরীর, পরিবারের ভালোবাসা, বন্ধুদের আন্তরিকতা, প্রতিদিনের সূর্যোদয় কিংবা একটি শান্ত সন্ধ্যাÑএসবের মূল্য অনেক সময় আমরা বুঝতে পারি না। অথচ এসবই জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। মানুষ যখন অন্যের উপকার করে, সমাজের জন্য কিছু করে কিংবা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ায়, তখন তার মনে যে আনন্দ জন্ম নেয়, তা কোনো বস্তুগত অর্জনের সঙ্গে তুলনীয় নয়।

 

গবেষণায়ও দেখা গেছে, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ, দান এবং সামাজিক অংশগ্রহণ মানুষের মানসিক প্রশান্তি বৃদ্ধি করে। কারণ মানুষ স্বভাবগতভাবেই সামাজিক প্রাণী; অন্যের সুখের সঙ্গে নিজের সুখও জড়িয়ে থাকে। প্রকৃতিও সুখের এক অনন্য উৎস। অথচ আধুনিক নগরজীবনে মানুষ প্রকৃতি থেকে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। নদী, গাছ, পাখি, খোলা আকাশ কিংবা বৃষ্টির শব্দÑএসবের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কমে যাচ্ছে। প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার মধ্যেও যে গভীর মানসিক প্রশান্তি রয়েছে, তা আজ বৈজ্ঞানিক গবেষণায়ও প্রমাণিত।

 

প্রজাপতির উপমাটি আমাদের আরও একটি শিক্ষা দেয়। প্রজাপতি কখনো কোলাহল পছন্দ করে না। শান্ত পরিবেশেই সে বসে। সুখও তেমনই। অস্থিরতা, লোভ, অহংকার, হিংসা এবং অযথা প্রতিযোগিতার মধ্যে সুখ বেশিক্ষণ থাকে না। সুখ আসে তখনই, যখন মানুষ নিজের ভেতরে শান্তির একটি আশ্রয় গড়ে তুলতে পারে। তাই সুখের জন্য লক্ষ্যহীন হয়ে বসে থাকাও সমাধান নয়। মানুষকে অবশ্যই পরিশ্রম করতে হবে, স্বপ্ন দেখতে হবে, সাফল্যের জন্য চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু সেই চেষ্টা যেন অস্থিরতা, লোভ বা আত্মবিনাশের কারণ না হয়। কাজের প্রতি নিষ্ঠা থাকবে, কিন্তু ফলের প্রতি অতি-আসক্তি থাকবে না। অর্জনের আনন্দ থাকবে, কিন্তু প্রাপ্তির অহংকার থাকবে না। এই ভারসাম্যই মানুষকে প্রকৃত সুখের কাছাকাছি নিয়ে যায়।

 

আমরা যদি সন্তানদের কেবল সফল নয়, সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারি; যদি পরিবারে একসঙ্গে বসে কথা বলার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে পারি; যদি সমাজে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সহযোগিতার মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে পারি; যদি অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি মানসিক সুস্থতা ও মানবিকতাকে গুরুত্ব দিইÑতবেই সুখী সমাজ গড়ার পথে এগোনো সম্ভব। শেষ পর্যন্ত সুখ কোনো গন্তব্য নয়, কোনো পুরস্কারও নয়। সুখ হলো জীবনযাপনের একটি শিল্প। এটি ছোট ছোট মুহূর্তে, আন্তরিক সম্পর্কের উষ্ণতায়, কৃতজ্ঞতার অনুভূতিতে, প্রকৃতির সান্নিধ্যে এবং নিজের সঙ্গে নিজের শান্তিপূর্ণ সম্পর্কের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। প্রজাপতিকে ধরতে দৌড়ালে সে উড়ে যায়। কিন্তু ফুলে ভরা একটি সুন্দর বাগান তৈরি করলে প্রজাপতি নিজেই সেখানে আসে।

 

মানুষের জীবনও ঠিক তেমন। সুখের পেছনে অন্ধভাবে ছুটে বেড়ানোর চেয়ে এমন একটি সুন্দর, সৎ, সংযমী ও মানবিক জীবন গড়ে তোলাই শ্রেয়, যেখানে সুখ নিজেই একদিন নীরবে এসে আমাদের কাঁধে বসবে। তখন সুখ আর ক্ষণিকের অনুভূতি থাকবে না; তা হয়ে উঠবে জীবনযাপনের স্বাভাবিক সঙ্গী।

লেখক: সংবাদকর্মী