সম্পাদকীয়: কৃষকের কান্না ও বিপন্ন কৃষি; ধান আছে, দাম নেই
সাতক্ষীরার দিগন্তজোড়া মাঠজুড়ে এখন সোনালি ধানের নাচন। কৃষকের উঠোন ভরে ওঠার কথা নতুন ধানের ঘ্রাণে। কিন্তু বাস্তবতা বড়ই নির্মম। সাতক্ষীরার বোরো চাষিদের চোখে এখন আনন্দের বদলে অনিশ্চয়তার জল। হাড়ভাঙা খাটুনি আর চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ফলানো ফসল এখন তাঁদের কাছে গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শ্রমিক সংকট, আকাশছোঁয়া মজুরি আর প্রকৃতির প্রতিকূলতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ধানের আশঙ্কাজনক দরপতন। সব মিলিয়ে এক গভীর সংকটে নিমজ্জিত সাতক্ষীরার কৃষি খাত।
মাঠজুড়ে পাকা ধান পাহার দিলেও তা ঘরে তোলার লোক মিলছে না। জেলার সদর থেকে শুরু করে জেলারÑসর্বত্রই শ্রমিকের হাহাকার। যে সুযোগে দিনমজুরদের দৈনিক মজুরি ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এক বিঘা জমির ধান কাটতে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তা বিক্রি করে উৎপাদন খরচ তোলা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এর ওপর মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে কালবৈশাখীর ভ্রুকুটি। পেকে যাওয়া ধান ঝরে পড়ার ভয়ে কৃষক যখন হন্যে হয়ে শ্রমিক খুঁজছেন, ঠিক তখন বাজারে ধানের দাম পড়ে যাওয়াটা কেবল দুর্ভাগ্যজনক নয়, বরং এক ধরনের অবিচার।
কৃষকদের এই সংকটের মূলে রয়েছে বিপণন ব্যবস্থার ত্রুটি এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম যখন আকাশচুম্বী, তখন মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফলানো প্রধান খাদ্যশস্যের দাম নি¤œমুখী হওয়াটা কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়। সিন্ডিকেট ও ফড়িয়াদের কারসাজিতে কৃষকের ন্যায্য পাওনা হাতবদল হয়ে চলে যাচ্ছে সুবিধাবাদীদের পকেটে। সরকার ধান সংগ্রহের ঘোষণা দিলেও তার সুফল প্রান্তিক কৃষকের দ্বারে পৌঁছাচ্ছে না বলেই অভিযোগ উঠছে। সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার প্রক্রিয়াটি আজও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের হস্তক্ষেপমুক্ত হতে পারেনি।
কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবেÑএটি কেবল রাজনৈতিক স্লোগান হয়ে থাকলে চলবে না। সাতক্ষীরার কৃষকদের এই ‘সর্বনাশের’ পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করতে সরকারকে অবিলম্বে ত্রাণকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে সরাসরি কৃষকের কার্ডের মাধ্যমে ধান কেনার পরিমাণ বাড়াতে হবে এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ধান কাটার জন্য ‘কম্বাইন হারভেস্টার’ সহ আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির সহজলভ্যতা বাড়াতে হবে, যাতে শ্রমিক সংকটের মুখে কৃষককে জিম্মি হতে না হয়।
মনে রাখতে হবে, কৃষি আমাদের অর্থনীতির মেরুদ-। সেই মেরুদ- যদি লোকসানের বোঝায় ভেঙে পড়ে, তবে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। সাতক্ষীরার চাষিদের মুখের হাসি ফিরিয়ে আনতে এবং কৃষি খাতকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের কোনো বিকল্প নেই।









