সাতক্ষীরা: সম্পদের প্রাচুর্য, উন্নয়নের বঞ্চনা
গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ
সাতক্ষীরার নাম উচ্চারিত হলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সুন্দরবন, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, সাদা সোনা খ্যাত চিংড়ি, খাঁটি মধু আর সুস্বাদু হিমসাগর আমের ছবি। এসব আমাদের গর্ব, সম্পদ এবং জাতীয় অর্থনীতিতে অবদানের গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়। কিন্তু এত প্রাকৃতিক সম্পদ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সাতক্ষীরার সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ, স্বাবলম্বী ও উন্নত জীবনযাপনের সুযোগ পাচ্ছেন, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা ও জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও সাতক্ষীরার মানুষের জীবনে রয়েছে নানা সংকট। জলবায়ু পরিবর্তন, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, সুপেয় পানির অভাব ও দুর্বল অবকাঠামো উপকূলীয় জনজীবনকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। আইলা ও আম্পানের মতো দুর্যোগের ক্ষত এখনো বহু মানুষের স্মৃতিতে অমলিন। দুর্যোগের পর ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রামে অনেক পরিবার হারিয়েছে জীবিকার নিশ্চয়তা, কৃষিজমির উৎপাদনক্ষমতা ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ।
সুন্দরবন দেশকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা দেয়। কিন্তু সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার মানুষের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি। সুন্দরবন শুধু বনজ সম্পদের আধার নয়, এটি উপকূলীয় পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকবচ। অথচ এ বনের ওপর নির্ভরশীল বহু মানুষ জীবিকার তাগিদে প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নেন। তাই বন সংরক্ষণের পাশাপাশি তাঁদের বিকল্প কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা ও জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
সাতক্ষীরার অন্যতম বড় সমস্যা সুপেয় পানির সংকট। উপকূলীয় অনেক এলাকায় লবণাক্ততা ও নিরাপদ পানির সীমিত প্রাপ্যতা মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ, জলাবদ্ধতা ও নদীভাঙন কৃষি, মৎস্যচাষ এবং বসতবাড়ির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধানে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, কার্যকর পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং নিরাপদ পানির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
সাতক্ষীরার চিংড়ি শিল্প, কৃষি ও ফলমূল উৎপাদনে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এ সম্ভাবনাকে টেকসই অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ন্যায্য মূল্য, আধুনিক প্রযুক্তি, সংরক্ষণাগার, সহজ শর্তে অর্থায়ন এবং বাজারজাতকরণের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। চিংড়ি শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি কৃষিজমি, মিঠাপানি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্ব দিতে হবে।
কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা ও স্থানীয় শিল্পের অপর্যাপ্ত বিকাশের কারণে অনেক তরুণ কাজের সন্ধানে অন্য জেলায় পাড়ি জমাচ্ছেন। যে জেলায় কৃষি ও মৎস্যসম্পদের এত সম্ভাবনা, সেখানকার তরুণদের জন্য স্থানীয়ভাবে সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। কৃষিভিত্তিক শিল্প, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ফল সংরক্ষণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের প্রসার ঘটানো গেলে সাতক্ষীরার অর্থনীতি আরও গতিশীল হতে পারে।
টেকসই উন্নয়নের জন্য যোগাযোগব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মানোন্নয়নও অপরিহার্য। প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ যেন সহজে চিকিৎসাসেবা পান, শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন এবং কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছাতে পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। উন্নয়নকে শুধু প্রকল্পের সংখ্যা দিয়ে বিচার করলে চলবে না; দেখতে হবে, এসব উদ্যোগের সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা পৌঁছাচ্ছে।
সাতক্ষীরার মানুষ করুণা বা অনুদান চান না, তাঁরা চান তাঁদের ন্যায্য অধিকার। তাঁরা চান নিরাপদ বসতি, সুপেয় পানি, টেকসই বেড়িবাঁধ, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, মানসম্মত শিক্ষা এবং সম্মানজনক কর্মসংস্থান। জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এ জেলার মানুষের জীবনমান উন্নয়নকে তাই বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
সাতক্ষীরা শুধু সুন্দরবন, চিংড়ি, মধু কিংবা হিমসাগর আমের পরিচয় নয়; সাতক্ষীরা সম্ভাবনাময় মানুষেরও জেলা। যথাযথ পরিকল্পনা, কার্যকর বিনিয়োগ ও দায়িত্বশীল বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ জেলাকে জলবায়ু-সহনশীল, উৎপাদনমুখী ও স্বাবলম্বী অঞ্চলে পরিণত করা সম্ভব।
সাতক্ষীরা দীর্ঘদিন ধরে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা ও অর্থনীতিতে অবদান রেখে চলেছে। এবার এ জেলার মানুষের নিরাপত্তা, অধিকার ও উন্নয়ন নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে পালন করতে হবে।
লেখক: গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ, সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রনেতা, সমাজকর্মী ও উদ্যোক্তা।






