সচ্চিদানন্দ দে সদয়
যে সমাজে সাংবাদিকের প্রশ্নে ক্ষমতাবানরা অস্বস্তি বোধ করেন, সেখানে সত্য আড়াল করার প্রবণতা বাড়ে। আর সত্য প্রকাশের জবাব যখন আসে অপমান, হুমকি কিংবা বুলেটের মাধ্যমে, তখন বিপন্ন হয় মানুষের জানার অধিকার, দুর্বল হয়ে পড়ে জবাবদিহি এবং সংকুচিত হয় গণতন্ত্রের পরিসর। সাংবাদিককে ভয় দেখিয়ে সাময়িকভাবে নীরব করা যায়, কিন্তু তাতে অনিয়মের দায় মুছে যায় না, সত্যের প্রয়োজনও ফুরিয়ে যায় না।
সাতক্ষীরায় সাংবাদিকদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য এবং নেত্রকোনায় সাংবাদিক হত্যার ঘটনা তাই শুধু সাংবাদিকসমাজের প্রতিবাদের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্র, প্রশাসন ও সমাজের সামনে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—সত্য বলার অধিকার কি ক্ষমতাবানদের ইচ্ছার কাছে জিম্মি থাকবে, নাকি সাংবাদিকের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে?
এ প্রশ্ন সামনে রেখে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আপত্তিকর মন্তব্য এবং নেত্রকোনায় সাংবাদিক হত্যার প্রতিবাদে রোববার বেলা ১১টায় সাতক্ষীরা নিউমার্কেট চত্বরে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সাতক্ষীরা প্রেস ক্লাবের সহসভাপতি আবুল কালাম আজাদের সভাপতিত্বে এতে বক্তব্য দেন দ্য ডেইলি স্টারের সাতক্ষীরা প্রতিনিধি কল্যাণ ব্যানার্জি, প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি মমতাজ আহমেদ বাপী, সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান, সাংবাদিক মহিদার রহমান, আসাদুজ্জামান সরদার ও আবু সাঈদ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রেস ক্লাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এম বেলাল হোসাইন।
মানববন্ধনে বক্তারা তালা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মিজানুর রহমানের সাংবাদিকদের নিয়ে করা মন্তব্যের প্রতিবাদ জানান। একই সঙ্গে এনায়েত উল্লাহ আব্বাসীর বিতর্কিত বক্তব্যের সমালোচনা করে তা প্রত্যাহারের দাবি তোলেন। নেত্রকোনায় সাংবাদিক হত্যার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তাঁরা জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। তাঁদের বক্তব্যে সাংবাদিকতার মর্যাদা, পেশাগত স্বাধীনতা এবং জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশের অধিকার রক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
সাংবাদিকের কাজ ক্ষমতাবানদের প্রশংসা করা নয়। তাঁর দায়িত্ব তথ্য অনুসন্ধান, অসংগতি চিহ্নিত করা, অনিয়মের প্রশ্ন তোলা এবং জনস্বার্থে সত্য তুলে ধরা। কোনো প্রতিবেদন কারও স্বার্থে আঘাত করতে পারে, কোনো প্রশ্নে বিব্রত হতে পারেন কোনো কর্মকর্তা কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তি। কিন্তু সেই অস্বস্তি থেকে সাংবাদিকদের অবজ্ঞা করা কিংবা পুরো পেশাকে হেয় করার প্রবণতা তৈরি হলে তা উদ্বেগজনক।
তালা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের নিয়ে ঢালাও ও আপত্তিকর মন্তব্য করার যে অভিযোগ উঠেছে, তা যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তির বক্তব্যের সামাজিক প্রভাব রয়েছে। তাঁর কাছ থেকে মানুষ সংযম, পেশাগত শালীনতা ও দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করে। সাংবাদিকদের কোনো প্রতিবেদনে ভুল থাকলে তথ্য-প্রমাণ দিয়ে প্রতিবাদ জানানো, সংশোধন চাওয়া কিংবা আইনসম্মত প্রতিকার নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সাংবাদিকদের সামগ্রিকভাবে অপমান করা কোনো সমস্যার সমাধান নয়।
সাংবাদিকের সমালোচনা করার অধিকার সবার রয়েছে। সাংবাদিকেরাও আইনের ঊর্ধ্বে নন। তাঁদের কেউ অনৈতিক কাজ করলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায় পুরো পেশার ওপর চাপানো যেমন অন্যায়, তেমনি সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে অনিয়ম করাও গ্রহণযোগ্য নয়। পেশাগত স্বাধীনতার সঙ্গে জবাবদিহির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য।
সাতক্ষীরার মানববন্ধনে চিকিৎসাসেবার মান, অনিয়ম ও বাণিজ্যিকীকরণ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বক্তাদের অভিযোগ, চিকিৎসকদের একটি অংশ সেবার চেয়ে ব্যবসাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি। প্রমাণ ছাড়া পুরো চিকিৎসকসমাজকে দায়ী করা যেমন অনুচিত, তেমনি পেশাগত মর্যাদার অজুহাতে চিকিৎসাসেবায় অনিয়মের অভিযোগ উপেক্ষা করাও সমর্থনযোগ্য নয়।
স্বাস্থ্যসেবা মানুষের জীবন ও মৌলিক অধিকারের সঙ্গে যুক্ত। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক উপস্থিত থাকছেন কি না, রোগীরা প্রয়োজনীয় ওষুধ পাচ্ছেন কি না, পরীক্ষা-নিরীক্ষায় অতিরিক্ত অর্থ আদায় হচ্ছে কি না কিংবা চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগের প্রতিকার মিলছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর জানার অধিকার জনগণের রয়েছে। সংবাদমাধ্যম এসব বিষয়ে অনুসন্ধান করবে, তথ্য প্রকাশ করবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাব চাইবে। এটাই তার দায়িত্ব।
কোনো স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত অভিযোগের জবাব দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে তদন্তের ব্যবস্থা করা। সাংবাদিকের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ কিংবা তাঁর পেশাকে হেয় করে স্বাস্থ্যসেবার দুর্বলতা দূর করা যায় না। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমেই মানুষের আস্থা অর্জন করতে হয়। একইভাবে ধর্মীয়, সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় কাউকে অন্যের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার অধিকার দেয় না।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে যা খুশি বলার অবাধ অনুমতি নয়। এ স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধও যুক্ত। একজন নাগরিক নিজের মত প্রকাশ করতে পারেন, অন্যের মতের বিরোধিতা করতে পারেন, এমনকি কঠোর সমালোচনাও করতে পারেন। কিন্তু মতের অমিলের কারণে কাউকে অপমান করা, ভয় দেখানো কিংবা সহিংসতার পরিবেশ তৈরি করা গ্রহণযোগ্য নয়। গণতান্ত্রিক সমাজে সমালোচনা সহ্য করার মানসিকতা জরুরি। সমালোচনার জবাব যুক্তি, তথ্য ও দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে দেওয়াই প্রকৃত শালীনতা।
নেত্রকোনায় দুর্বৃত্তের গুলিতে সাংবাদিক নিহত হওয়ার ঘটনা আরও ভয়াবহ বাস্তবতার দিকে দৃষ্টি ফেরায়। একজন সাংবাদিককে হত্যা করা হলে একটি পরিবার তার প্রিয়জনকে হারায়। একই সঙ্গে সাংবাদিকসমাজে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। অন্য সাংবাদিকেরাও ভাবতে বাধ্য হন, কোনো অনিয়ম প্রকাশ করলে তাঁদেরও কি একই পরিণতি ভোগ করতে হবে?
হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য এবং সাংবাদিকতার সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তবে যে কারণেই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকুক, এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনানুগ বিচার অপরিহার্য। পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে কোনো সাংবাদিককে লক্ষ্যবস্তু করা হয়ে থাকলে বিষয়টি আরও গভীর উদ্বেগের। কারণ, এমন ঘটনা অন্য সাংবাদিকদেরও ভয় দেখানোর ঝুঁকি তৈরি করে।
সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি কিংবা হত্যার ঘটনায় বিচারহীনতা অপরাধীদের সাহস বাড়াতে পারে। এতে শুধু সংবাদমাধ্যম ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের তথ্যও আড়ালে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। মানুষ তখন সরকারি সেবা, স্থানীয় প্রশাসন কিংবা প্রভাবশালী মহলের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
সাংবাদিকের নিরাপত্তা কোনো বিশেষ পেশার বাড়তি সুবিধা নয়; এটি আইনের শাসন ও নাগরিকের তথ্য জানার অধিকার রক্ষার অংশ। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। হামলার অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করে অপরাধীদের পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে বিচারের আওতায় আনতে হবে।
সাতক্ষীরার মানববন্ধন ক্ষোভ ও প্রতিবাদের প্রকাশ। কিন্তু মানববন্ধন শেষ হওয়ার পরও যদি অভিযোগগুলো অনিষ্পন্ন থেকে যায়, তবে প্রতিবাদের উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। তালা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের যথাযথ যাচাই এবং নেত্রকোনায় সাংবাদিক হত্যার নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।
একই সঙ্গে সাংবাদিক সংগঠনগুলোকেও পেশাগত ঐক্য, নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতার প্রশ্নে দৃঢ় থাকতে হবে। সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ এড়িয়ে চলা সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য অপরিহার্য। সাংবাদিকতার স্বাধীনতা রক্ষার লড়াইয়ে পেশাগত সততাই সবচেয়ে বড় শক্তি।
প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও বুঝতে হবে, সংবাদমাধ্যমকে প্রতিপক্ষ মনে করলে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সমস্যার সমাধান হয় না। বরং সাংবাদিকদের সঙ্গে তথ্যভিত্তিক যোগাযোগ, অভিযোগের স্বচ্ছ নিষ্পত্তি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্য দিয়েই আস্থা তৈরি হয়।
শেষ পর্যন্ত বিষয়টি সাংবাদিক বনাম চিকিৎসক, কর্মকর্তা কিংবা কোনো সামাজিক ব্যক্তিত্বের নয়। মূল প্রশ্ন হলো, সমাজে ক্ষমতার ব্যবহার কতটা জবাবদিহিমূলক হবে এবং সাধারণ মানুষ সত্য জানার সুযোগ কতটা পাবে। সাংবাদিকেরা ভুল করলে তাঁদেরও জবাবদিহি করতে হবে। কিন্তু সেই অজুহাতে তাঁদের কণ্ঠরোধ করা যাবে না। সমালোচনা বন্ধ করে ক্ষমতার মর্যাদা রক্ষা করা যায় না; বরং ন্যায়সংগত সমালোচনা গ্রহণ করার মধ্য দিয়েই দায়িত্বশীলতার পরিচয় মেলে।
সাংবাদিককে অপমান করে প্রশ্ন থামানো যায়, গুলি করে একজন সাংবাদিকের জীবন কেড়ে নেওয়া যায়; কিন্তু তাতে সত্যের প্রয়োজন শেষ হয় না। যে সমাজ সত্য প্রকাশের অধিকার নিরাপদ রাখতে পারে না, সে সমাজে অনিয়মের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাই সাংবাদিকের মর্যাদা রক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং অপরাধীদের বিচার করা কোনো গোষ্ঠীর দাবি নয়; এটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার অন্যতম শর্ত।
লেখক: সংবাদকর্মী