মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩

সাতক্ষীরায় অসুস্থ গরু এনে মাংস বিক্রির চেষ্টার সময় ৫ জন আটক

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬, ৮:২২ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরায় অসুস্থ গরু এনে মাংস বিক্রির চেষ্টার সময় ৫ জন আটক

সংবাদদাতা: রোগাক্রান্ত ও পোকাধরা গরু গোপনে জবাই করে মাংস বিক্রির চেষ্টার অভিযোগে ৫ জনকে আটক করেছে সাতক্ষীরা থানা পুলিশ। এ সময় তাদের ব্যবহৃত ১টি পিকআপ ভ্যান, ১টি মোটরসাইকেল এবং ১টি অসুস্থ গরু উদ্ধার করা হয়েছে। আজ বুধবার (২৬ আগস্ট) ভোরে সাতক্ষীরা ১৩নং লাবসা ইউনিয়নের মাগুরা বৌবাজার এলাকায় এই ঘটনাটি ঘটে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভোর আনুমানিক ৪টার সময় একটি লাল-কালো রঙের বোলেরো চার চাকার পিকআপ গাড়িতে (রেজিঃ নং- খুলনা-ল-১১-১৭৪১) করে একটি রোগাক্রান্ত ফ্রিজিয়ান গরু নিয়ে আসা হয়। মাগুরা বৌবাজারের রাস্তার ধারে গরুটি নামানোর সময় স্থানীয় লোকজনের সন্দেহ হয়। গরুটির মুখ দিয়ে ক্রমাগত ফেনা ও লালা ঝরছিল এবং এটি নড়াচড়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিল। পরবর্তীতে স্থানীয় বাসিন্দারা এলাকার সমাজসেবক এম সোহেল আহমেদ মানিকসহ স্থানীয়দের খবর দেন।

খবর পেয়ে স্থানীয় লোকজন দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে মৃতপ্রায় গরুটি দেখতে পান এবং তৎক্ষণাৎ সাতক্ষীরা থানা পুলিশকে অবহিত করেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে গরু নিয়ে ব্যক্তিদের আটক করে। এ সময় তাদের কাছ থেকে ১টি বোলেরো পিকআপ এবং ১টি বাজাজ পালসার মোটরসাইকেল (রেজিঃ নং- সাতক্ষীরা-ল-১১-৭৯৪০) জব্দ করা হয়।

দুপুর ১২:৪০ মিনিটের সময় উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর, সাতক্ষীরা সদরের উপ-সহকারী প্রাণিসম্পদ অফিসার শেখ সালাহউদ্দীন সাতক্ষীরা থানায় উপস্থিত হয়ে গরুটিকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন এবং গরুটি মৃত বলে ঘোষণা করেন।

পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটককৃতরা স্বীকার করেছে যে, তারা পরস্পর যোগসাজশে বিভিন্ন এলাকা থেকে কম দামে মারাত্মক অসুস্থ ও রোগাক্রান্ত গরু সংগ্রহ করে। পরবর্তীতে এসব গরু গোপনে জবাই করে সুস্থ মাংস হিসেবে বাজারে বিক্রি করে সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা করে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করে আসছিল।

আটককৃতরা হলেন সাতক্ষীরার মাছখোলা শিবতলা এলাকার আনসার আলী কারিগরের ছেলে আবুল বাশার কারিগর (৩০), একই এলাকার জিয়ারুল ইসলামের ছেলে তৈয়েবুর রহমান (১৯), একই এলাকার মৃত আরশাদ আলীর ছেলে মোঃ শাহিন ইসলাম (২০), খুলনার ডুমুরিয়া থানার সাহাপুর গ্রামের হাফিজুর শেখ এর ছেলে মোঃ ইব্রাহীম শেখ (২৫) এবং যশোরের কেশবপুর থানার মঙ্গলকোট গ্রামের মতলেব মোড়লের ছেলে মোঃ রবিউল ইসলাম (৩৫)।

এ বিষয়ে এম সোহেল আহমেদ মানিক বাদী হয়ে সাতক্ষীরা থানায় একটি লিখিত এজাহার দায়ের করেছেন। সাতক্ষীরা থানা পুলিশ জানায়, এব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

Ads small one

শ্যামনগরে উপকূলীয় জনপদে খাল পুনঃখননে বদলে  গেল কুলতলী কয়েক শত কৃষক পরিবার

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৪০ পূর্বাহ্ণ
শ্যামনগরে উপকূলীয় জনপদে খাল পুনঃখননে বদলে  গেল কুলতলী কয়েক শত কৃষক পরিবার

পীযুষ বাউলিয়া পিন্টু মুন্সীগঞ্জ (শ্যামনগর): শ্যামনগরে উপকূলীয় জনপদে এক সময় কুলতলী খালটি ছিল এলাকার কৃষক ও প্রকৃতির অন্যতম ভরসা। যেখানে মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের তিনটি কৃষি নির্ভর প্রায় ৭ হাজার বিঘা জমির পানি নিষ্কাশনের একমাত্র পথ। খনন হওয়ার পূর্বে কুলতলী গ্রামের মানুষ আমন মৌসুমে একটি ফসল উৎপাদন করার শেষে কাজের জন্য বাইরে ইটভাটাতে চলে যেতে হতো। খালটি খনন করার পর বদলে গেছে কুলতলী গ্রামের কয়েক শতাধিক পরিবারের জীবন জীবিকার ধরন।  একই জমিতে পানি সাশ্রায়ী একাধিক ফসল উৎপাদন করা সহ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

বর্ষার মৌসুমে পানি ধরে রাখা, শুষ্ক মৌসুমে সেচের চাহিদা মেটানো এবং দেশীয় মাছ ও জলজ প্রাণীর আশ্রয়স্থল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত কুলতলী খাল। সময়ের সঙ্গে নানা কারণে খালটির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। এতে একদিকে কৃষকের সেচসংকট বাড়ে, অন্যদিকে কমতে থাকে খালের জীববৈচিত্র্য। এছাড়াও বর্ষার মৌসুমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।

 

পুনঃখননের পর সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। খালে পানি ধারণক্ষমতা বেড়েছে, তৈরি হয়েছে সেচের নতুন সুযোগ।

এতে শ্যামনগর উপজেলার কুলতলী, ধানখালী এবং জেলেখালী গ্রামে কৃষক পরিবারের মধ্যে দেখা দিয়েছে নতুন আশার সঞ্চার। কৃষকের কাছে খালটি এখন শুধু একটি দেশীয় প্রজাতির মাছের জলাধার নয়, বরং বছরজুড়ে ফসল উৎপাদনের সম্ভাবনার প্রতীক।

 

ধানখালী ও কুলতলী  খালেতে ছিপ বাইতে দেখাযায় পুষ্পারাণী ও মলিনা রানীকে । তাঁর সাথে কথা হলে তিনি বলেন, আগে খালে ছিপ বাইতে দিতে না, জল ব্যবহার করার সুযোগ পেত না মাছ ধরা তো দূরে থাক । প্রয়োজনে বীজতলা সংরক্ষণ করার সহজ ছিল না এই কৃষকের।

খালটি খনন করে অবমুক্ত করে দেওয়ার পর থেকে ছিপ বেয়ে মাছ ধরে পরিবারে মাছের চাহিদা মিটাই। মাছ কেনা লাগে না। বীজতলা সহ পারিবারিক প্রয়োজনেও এই খালি খালের পানি ব্যবহার করার সুযোগ পাচ্ছে স্থানীয় কৃষকরা।

 শ্যামনগর উপজেলার কুলতলী ও ধানখালী খালটি খননের মধ্য দিয়ে সে জমির পানি নিষ্কাশনের ও কৃষি ফসল উৎপাদনের কয়েক হাজার কৃষক পরিবারের শান্তি ফিরে এসেছে। মুন্সিগঞ্জ কুলতলী গ্রামের খালটি ফুলতলা বাউলিয়া বাড়ি ঘেরি ধানখালী ও জেলেখালীর ঘেরির পানি নিষ্কাশনের মধ্যে কুলতলী ২:২ কি: মি দীর্ঘ খালটি পুনঃখননের ফলে পানি সংরক্ষণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

 

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, খালে সংরক্ষিত পানি ব্যবহার করে শুষ্ক মৌসুমেও কৃষিকাজ চালিয়ে  যাচ্ছে। । বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা ও পানির সংকট যখন কৃষির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন খাল পুনঃখনন স্থানীয় কৃষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হয়ে উঠেছে।

 

খালের পানি সংরক্ষণ করে বছরব্যাপী জলবায়ু সহনশীল সবজি ও বিভিন্ন ফসল উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে খালে দেশীয় মাছ ও জলজ প্রাণীর আবাসস্থল সংরক্ষণেরও সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে কৃষির পাশাপাশি স্থানীয় জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষাতেও ভূমিকা রাখবে এই খাল।

 

স্থানীয় কৃষক উদয় মন্ডল বলেন, উপকূলীয় এলাকায় কৃষিকাজ অনেকটাই পানির ওপর নির্ভরশীল। বর্ষার শেষে খালে পানি না থাকলে সেচের জন্য বাড়তি খরচ করতে হয়। আবার লবণাক্ততার কারণে অনেক সময় মিঠা পানির সংকট দেখা দেয়। খালে পানি ধরে রাখা গেলে সেচের ব্যয় কমানোর পাশাপাশি ফসলের আবাদ বাড়ানো সম্ভব হবে।

 

স্থানীয় কৃষক সুবোল মন্ডল  বলেন খালটি দীর্ঘ বছর ধরে দখলদারদের দখলে ছিলো। তা ছাড়াও খালটি প্রায় ভরাট হয়ে গিয়েছিল। খালটি পুনঃখনন করে দখলদারদের হাত থেকে দখল মুক্ত করে, জনসাধারণের জন্য অবমুক্ত করা দেওয়ায় কয়েক হাজার মানুষ উপকৃত হচ্ছে।

স্থানীয় কৃষাণী টুম্পা রানীর এর ভাষ্য, খালটি পুনঃখনন করে অবমুক্ত করায় কুলতলী বিলের কয়েক হাজার বিঘা জমি জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেয়েছে। এবং খালের মিষ্টি পানি ব্যবহার করে এলাকাবাসি সবজি চাষ করছে, মাছ ধরে খাচ্ছে ও খালের পাড়ে ছাগল, গরু ও ভেড়া পালন করছে। এছাড়াও খালের পানি ব্যবহার করে গরমের মৌসুমে কৃষকেরা শতশত বিঘা ধান চাষ করতে পারবে।

অপরদিকে মুন্সিগঞ্জ  ইউনিয়নের জেলে খালির একটি খাল খনন হওয়ার  পরে স্থানীয় ভূমিদস্যদের কপালে খালটি বর্তমানে দখল হয়ে থাকার কারণেই একটি অংশ কৃষক ব্যবহার করতে পারছে না। বিগত কয়েক বছর দেখা গেছে  জেলেখালী কৃষি জমি সহ খালের পানি নিষ্কাশনের পথ গইয়ের খাল নামক খননের দাবি তুলে ধরা হয়েছে। একই সাথে জেলে খালির খালের পানি নিষ্কাশন জন্য দখলদারদের মুক্ত করে জনসাধারণের ব্যবহার উপযোগী করার দাবি জানান এলাকার কৃষকরা।

২৫ নম্বর মথুরাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক মোহাদেচ্ছুর রহমান  বলেন , উপকূলীয় জনপদে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত দিন দিন বাড়ছে। এমন বাস্তবতায় স্থানীয় জলাধার ও খালগুলোকে পুনরুদ্ধার করা কৃষি, পরিবেশ ও মানুষের জীবন-জীবিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অন্তাখালী খালের পুনঃখনন সেই সম্ভাবনারই একটি উদাহরণ। একসময় যে খালটি হারিয়ে যেতে বসেছিল, পুনঃখননের পর সেটিই আবার পানি ধরে রাখার সক্ষমতা ফিরে পেয়েছে। সেই পানিকে ঘিরে কৃষকের মাঠে নতুন ফসলের স্বপ্ন, জলজ প্রাণের নিরাপদ আশ্রয় এবং ভবিষ্যতের টেকসই কৃষির প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে প্রবেশ উন্মুক্ত হলো সুন্দরবন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৩৫ পূর্বাহ্ণ
তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে প্রবেশ উন্মুক্ত হলো সুন্দরবন

প্রকাশ ঘোষ বিধান, পাইকগাছা (খুলনা): দীর্ঘ তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে ১ সেপ্টেম্বর থেকে উন্মুক্ত হচ্ছে সুন্দরবন। প্রজনন মৌসুমে মাছ ও বন্যপ্রাণীর নির্বিঘ্ন বিচরণ নিশ্চিত করতে গত ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে সব ধরনের প্রবেশ ও মাছ ধরার কার্যক্রম বন্ধ রেখেছিল বন বিভাগ।

মাছ ও বন্যপ্রাণীর বংশবৃদ্ধি, বিচরণ ও প্রজনন কার্যক্রমের সুরক্ষায় সুন্দরবনে টানা তিন মাসের জন্য দর্শনার্থী ও বনজীবীদের প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা জারি করে বন বিভাগ। এ সময়েই সুন্দরবন হয়ে ওঠে সতেজ। প্রাণ প্রকৃতিতে ফিরেছে সুন্দরবন।

নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার খবরে সুন্দরবনসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকার জেলেরা প্রস্তুতি শুরু করেছেন। নতুন করে জীবিকার আশায় বুক বাঁধছেন সুন্দরবননির্ভর হাজারো বনজীবী। তবে দীর্ঘ বিরতির পর কাজে ফেরার আনন্দের সঙ্গে তাঁদের মনে রয়েছে অনিশ্চয়তাও। কারণ বনে মাছ-কাঁকড়া আহরণের ঝুঁকির পাশাপাশি রয়েছে বনদস্যু ও জলদস্যুর আতঙ্ক।

এদিকে সুন্দরবন খোলার প্রস্তুতি শুরু করেছে বন বিভাগ। বৈধভাবে জেলে-বাওয়ালিদের পাস-পারমিট দেয়া, নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং বনজীবীদের প্রবেশ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য ও বনজ সম্পদ রক্ষায় নজরদারি জোরদারের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশী-বিদেশী পর্যটকদের জন্যও খুলে দেয়া হবে সুন্দরবনের পর্যটন কেন্দ্রগুলো।

কয়রার মৎস্য ব্যবসায়ী মোঃ কামরুল ইসলাম বলেন, উপকূলের বনজীবীদের এই যাত্রাকে কেবল সাধারণ কর্মসংস্থান বলা চলে না; এটি একপ্রকার জীবনের বাজি ধরা। একদিকে বনে পর্যাপ্ত মাছ পাওয়ার অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে পদে পদে মৃত্যুঝুঁকি। সুন্দরবনের নদী-খালে পা ফেলতেই ওত পেতে থাকে হিংস্র বাঘ। একটু অসাবধান হলেই কিংবা ম্যানগ্রোভের গভীরে কাঠ ও গোলপাতা কাটতে গেলে কার কপালে বাঘের থাবা জোটে, সেই আতঙ্কে প্রতিটি মুহূর্ত কাটান বাওয়ালিরা। প্রকৃতির এই হিংস্রতার চেয়েও এখন বেশি আতঙ্ক ছড়াচ্ছে সুন্দরবনে পুনরায় বনদস্যু বা জলদস্যুদের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার আশঙ্কা।

সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এজেডএম হাছানুর রহমান বলেন, ১ সেপ্টেম্বর থেকে সুন্দরবনে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে জেলেদের পারমিট দেওয়ার জন্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। তারা যাতে নির্বিঘ্নে মাছ ও কাঁকড়া ধরতে পারেন, তার জন্য সর্বাত্মক নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

সাতক্ষীরার জলবায়ু সংকট ও বেঁচে থাকার লড়াই

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:২৬ পূর্বাহ্ণ
সাতক্ষীরার জলবায়ু সংকট ও বেঁচে থাকার লড়াই

মো. মামুন হাসান

সাতক্ষীরা বাংলাদেশের সেই জেলাগুলোর একটি, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন আর দূরের কোনো বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব নয়, বরং প্রতিদিনের বাস্তবতা। উপকূলবর্তী এই জেলার মানুষ প্রতিনিয়ত লড়ছেন লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড় আর ভাঙনের সঙ্গে, আর এই লড়াইয়ের ক্ষতচিহ্ন এখনো দগদগে।

২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলা আঘাত হানে সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকায়। প্রায় পনেরো ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় গোটা উপকূল। সতেরো বছর পার হলেও সেই ক্ষত এখনো শুকায়নি।

একসময় সবুজ বনানী ও কৃষি ফসলে ভরপুর ছিল গাবুরা, পদ্মপুকুরসহ উপকূলীয় অঞ্চল, ধান, পাট, শাকসবজিতে সমৃদ্ধ ছিল পুরো এলাকা। কিন্তু আইলার পর লবণাক্ততায় অনাবাদি হয়ে পড়েছে বিস্তীর্ণ জমি, চারদিকে এখন শুধু মাছের ঘের, সবুজের উপস্থিতি প্রায় নেই বললেই চলে।

এই সংকট শুধু অতীতের নয়, বর্তমানেও প্রবহমান। সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী জেলায় মোট আটশ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে আড়াইশ কিলোমিটারই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। সিডর ও আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত এসব বাঁধে ব্যাপক ভাঙন ও ফাটল দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি জুন মাসের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, শুধু শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলাতেই চল্লিশটি পয়েন্টে প্রায় বিশ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে, যা বর্ষা মৌসুমে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করছে। কপোতাক্ষ, খোলপেটুয়া, ইছামতি ও বেতনা নদীর তীরবর্তী এলাকার লক্ষাধিক মানুষ প্রতি বর্ষা মৌসুমে বাঁধ ভাঙার আশঙ্কায় দিন কাটান।

লবণাক্ততার প্রভাব শুধু কৃষিতেই সীমাবদ্ধ নয়, তা মানুষের সুপেয় পানির অধিকারকেও কেড়ে নিয়েছে। প্রথম আলোর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী শ্যামনগর উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে সুপেয় পানির তীব্র সংকট চলছে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় এই সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। বিষয়টি এতটাই গুরুতর যে সম্প্রতি উচ্চ আদালত পর্যন্ত এই সংকট নিরসনে নেওয়া পদক্ষেপের অগ্রগতি প্রতিবেদন চেয়েছেন। উপকূলের বহু পরিবারকে এখন পানি কিনে ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রায় নতুন সংকট তৈরি করছে। কৃষিকাজে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও তাদের শ্রমের যথাযথ স্বীকৃতি না পাওয়া, যা জলবায়ু সংকটের সামাজিক মাত্রাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

তবে হতাশার মধ্যেও কিছু আশার আলো দেখা যাচ্ছে। রাইজিংবিডির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে সাতাশ কিলোমিটার টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে, যার অগ্রগতি বর্তমানে বাষট্টি শতাংশে পৌঁছেছে। পাশাপাশি জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির অর্থায়নে শ্যামনগরে আরও আড়াই কিলোমিটার স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মিত হচ্ছে। এই উদ্যোগগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে উপকূলবাসীর দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কিছুটা হলেও লাঘব হতে পারে।

সাতক্ষীরার এই সংকট মোকাবিলায় কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।

প্রথমত বেড়িবাঁধ সংস্কারের কাজ কেবল প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ না রেখে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে।

দ্বিতীয়ত সুপেয় পানির সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ও দুর্নীতিমুক্ত পরিকল্পনা প্রয়োজন, কেননা এই খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে সংকট রয়েই যাবে।

তৃতীয়ত লবণাক্ততা সহনশীল ফসলের জাত সম্প্রসারণ এবং কৃষকদের বিকল্প জীবিকার প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে তারা কেবল চিংড়ি ঘেরের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না থেকে বহুমুখী আয়ের পথ খুঁজে পান।

চতুর্থত জলবায়ু অভিযোজনে নারীর ভূমিকাকে স্বীকৃতি দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

সাতক্ষীরার মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করেই বেঁচে থাকতে শিখেছেন, কিন্তু এই লড়াই একা তাদের চালিয়ে যাওয়ার কথা নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের এই সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন সরকার, স্থানীয় প্রশাসন এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সমন্বিত ও আন্তরিক উদ্যোগ, যাতে উপকূলের এই জনপদ আবারও তার হারানো সবুজ ও জীবনের ছন্দ ফিরে পেতে পারে।

লেখক: মো. মামুন হাসান, ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, সাতক্ষীরা।