তারিক ইসলাম
দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্র বদলে দেওয়া ১৯৪৭ সালের দেশভাগ কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা ছিল না, এটি ছিল এই অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের মনস্তত্ত্ব, ভূগোল এবং ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার এক মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডি। সাড়ে সাত দশক পেরিয়ে এসেও আজ যখন আমরা ভারত, পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশের দিকে তাকাই, তখন দেখতে পাই-ধর্ম, রাজনীতি আর জাতীয়তাবাদের সেই পুরনো ক্ষতগুলো আজও নিরাময় হয়নি। কেন এই অঞ্চলের রাজনীতি আজীবন এক মেরুকরণের বৃত্তে বন্দি হয়ে রইল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই সময়ে, যখন দেশভাগের রূপরেখা তৈরি হচ্ছিল।
সম্প্রতি গবেষক ও লেখক আলতাফ পারভেজের ‘পাকিস্তান আন্দোলন: জিন্নাহ মওদুদী মাদানীদের ভূমিকা-পার্টিশন-বিতর্কের পুনঃপাঠ’ বইটি আমাদের সেই ইতিহাসের এক জটিল ও নির্মোহ আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। আমাদের প্রচলিত ইতিহাসে দেশভাগকে খুব সরলীকরণ করে দেখা হয়-হয় জিন্নাহর একগুঁয়েমি, না হয় কংগ্রেসের চাতুর্য। কিন্তু লেখক এই বইয়ে দেখিয়েছেন, রাজনীতিটা আসলে কতটা বহুমাত্রিক এবং আদর্শিক দ্বন্দ্বে ঠাসা ছিল। তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের মুসলিম সমাজের তিনটি প্রধান ধারা এবং তাদের শীর্ষ তিন নেতার চিন্তাদর্শকে কেন্দ্র করে এই বইয়ের ক্যানভাস তৈরি হয়েছে।
বইটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি কোনো পক্ষ নেয়নি। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ-যিনি ব্যক্তিগত জীবনে আধুনিক ও ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার মানুষ ছিলেন, তিনি কীভাবে সমসাময়িক রাজনৈতিক বাস্তবতায় এবং কংগ্রেসের একক আধিপত্যের আশঙ্কায় ‘মুসলিম জাতীয়তাবাদ’ ও ‘দ্বি-জাতি তত্ত্ব’কে নিজের প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার বানালেন, তার নিখুঁত ব্যবচ্ছেদ রয়েছে এখানে। জিন্নাহর এই ‘ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক কার্ড’ তাত্ত্বিকভাবে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, তা আজ পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতির দিকে তাকালে স্পষ্ট বোঝা যায়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তৎকালীন আলেম ও ইসলামপন্থীদের ভূমিকা। জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদুদী এবং দেওবন্দী ধারার শীর্ষ আলেম মওলানা হুসাইন আহমদ মাদানীর অবস্থান ছিল জিন্নাহর ঠিক বিপরীত মেরুতে। মওদুদী সাহেব জিন্নাহর পাকিস্তান আন্দোলনকে বলতেন ‘মুসলিমদের জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র’, যা তাঁর চোখে খাঁটি ইসলামী রাষ্ট্র ছিল না। অন্যদিকে, মওলানা মাদানী ‘মুত্তাহিদা কওমিয়্যাত’ বা যৌথ জাতীয়তাবাদের তত্ত্ব দিয়ে অখণ্ড ভারতের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, যেখানে ধর্ম নির্বিশেষে সকলের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছিল।
আজকের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এই ঐতিহাসিক বিতর্কগুলোর পুনঃপাঠ কেন জরুরি? কারণ, আমরা যে সময়ে বাস করছি, সেখানে ইতিহাসকে প্রায়শই রাজনৈতিক স্বার্থে বিকৃত বা কাটছাঁট করা হয়। জিন্নাহকে কেউ দেবদূত বানাতে চান, কেউবা খলনায়ক। আলেমদের ভূমিকাকে একরৈখিকভাবে বিচার করা হয়। কিন্তু আলতাফ পারভেজ তৎকালীন চিঠি, বক্তৃতা ও দলিলপত্র ঘেঁটে দেখিয়েছেন যে, প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক ভয়, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং কৌশল কাজ করছিল।
বইটি পড়তে পড়তে পাঠক হিসেবে উপলব্ধি করা যায়, সাতচল্লিশের সেই বিভাজনের রাজনীতি আজও শেষ হয়ে যায়নি। আজ ভারতে যে হিন্দুত্ববাদের উত্থান কিংবা পাকিস্তানে যে ধর্মীয় উগ্রবাদের সংকট, তার বীজ বপন করা হয়েছিল ওই সময়কার রাজনৈতিক অপকৌশল ও জেদের ভেতরই।
জাতীয় ইতিহাসের মোড় ঘোরানো ঘটনাগুলোকে যারা সস্তা আবেগ বা একপেশে প্রোপাগান্ডার বাইরে গিয়ে নির্মোহভাবে বুঝতে চান, তাদের জন্য এই পুনঃপাঠ অত্যন্ত জরুরি। আলতাফ পারভেজের এই গ্রন্থটি আমাদের শেখায়-অতীতকে আড়াল করে বা আংশিক সত্য দিয়ে বর্তমানের সংকট দূর করা সম্ভব নয়। দক্ষিণ এশিয়ায় যদি সত্যিই টেকসই শান্তি ও সহাবস্থান ফিরিয়ে আনতে হয়, তবে সাতচল্লিশের সেই ট্র্যাজেডির মনস্তাত্ত্বিক ও আদর্শিক ভুলগুলোকে স্বীকার করে নেওয়ার সাহস আমাদের দেখাতে হবে।
লেখক: তারিক ইসলাম, সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি।