সুন্দরবন রক্ষায় ‘লং মার্চ ফর ফরেস্ট’: চরের বনায়নে বীজ সংগ্রহের ডাক
নিজস্ব প্রতিনিধি: প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর জলবায়ু পরিবর্তনের এই কঠিন সময়ে সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকার মানুষের জীবন ও জীবিকা আজ সংকটের মুখে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবিলায় সুন্দরবন আমাদের প্রধান প্রাকৃতিক আশ্রয়। তবে এই সুন্দরবনের স্বাভাবিক পুনর্জন্ম প্রক্রিয়া আজ হুমকির মুখে, কারণ সুন্দরবন সংলগ্ন নদী থেকে ভেসে আসা বনজ ফল ও বীজ সংগ্রহ করে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছে স্থানীয় মানুষ। একটি বীজের স্বাভাবিক বিকাশ বন্ধ হওয়া মানে শুধু একটি গাছের ক্ষতি নয়, বরং উপকূলের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার ওপর বড় আঘাত।
সুন্দরবনের এই প্রাকৃতিক পুনর্জন্ম প্রক্রিয়া রক্ষা ও নদীর চরে ভেসে আসা বনজ বীজ সংগ্রহ বন্ধের দাবিতে মঙ্গলবার (৩০ জুন ২০২৬) বেলা ১১টায় সাতক্ষীরার শ্যামনগরে অনুষ্ঠিত হলো এক ব্যতিক্রমী ‘লং মার্চ ফর ফরেস্ট’ ও স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচি।
‘গ্রীন কোয়ালিশন’ এবং ‘শ্যামনগর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবী এসোশিয়েশন’-এর যৌথ উদ্যোগে এবং বারসিক ও অ্যাগ্রোইকোলজি ফান্ডের সহযোগিতায় এই কর্মসূচি পরিচালিত হয়। উপজেলার জেলা পরিষদ ডাকবাংলো সংলগ্ন নীলডুমুর বাজার থেকে শুরু হয়ে লং মার্চটি বুড়িগোয়ালিনী এলাকার বনবিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জ কর্মকর্তার কার্যালয় অভিমুখে যাত্রা করে।
লং মার্চে অংশগ্রহণকারীরা প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, “সুন্দরবন আমাদের মায়ের মতো আগলে রাখে। মায়ের এই ঋণ শোধ করতে এবং উপকূলকে বাঁচাতে আমাদের নিজেদেরই এগিয়ে আসতে হবে। বন্যজ বীজ সংগ্রহ ও চরের বনায়ন সেই লড়াইয়েরই অংশ।”
কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীরা জানান, সুন্দরবনের নদী ও জোয়ারের মাধ্যমে ভেসে আসা বনজ বীজ নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রাকৃতিকভাবে ম্যানগ্রোভ বনায়ন সৃষ্টি করে। এসব বীজ নির্বিচারে সংগ্রহ করা হলে বনের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে বনপ্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করে। এই সংকট উত্তরণে কর্মসূচির পক্ষ থেকে চার দফা দাবি সংবলিত একটি স্মারকলিপি সাতক্ষীরা রেঞ্জ কর্মকর্তা মোঃ মশিউর রহমানের কাছে এবং পরবর্তীতে বেলা ১২টায় শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছাঃ শামছুজ্জাহান কনক এর নিকট প্রদান করা হয়।
দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে: সুন্দরবন থেকে ভেসে আসা বনজ বীজ সংগ্রহ বন্ধ করা। বন টহল ফাঁড়ির কর্মকর্তা, সিপিজি, ডিসিটি, ভিটিআরটি ও ভিসিএফ সদস্যদের মাধ্যমে নিয়মিত নজরদারি বৃদ্ধি। জনসচেতনতা তৈরিতে আলোচনা সভা, লিফলেট বিতরণ ও মাইকিং কার্যক্রম চালু রাখা। সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পুনর্জন্ম সংরক্ষণে স্থানীয় জনগণ ও যুব সমাজকে সম্পৃক্ত করা।
লং মার্চে পরিবেশ রক্ষার প্রত্যয় নিয়ে একাট্টা হয়েছিলেন স্থানীয় পরিবেশকর্মী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিনিধি এবং নানা বয়সী সাধারণ মানুষ। কর্মসূচিতে গ্রীন কোয়ালিশন, সাতক্ষীরা-এর সভাপতি আবু আফফান রোজ বাবু এবং শ্যামনগর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবী এসোসিয়েশনের সভাপতি মো. সাইফুদ্দিন সিদ্দীক নেতৃত্ব দেন।
লং মার্চ ও সংহতি সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র সাংবাদিক কল্যাণ ব্যানার্জী, সাতক্ষীরা জেলা গ্রীন কোয়ালিশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংবাদিক এম. বেলাল হোসাইন, বনজীবী নারী নেত্রী শেফালী বিবি, বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান গাজী আব্দুর রউফ, মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান নিপা চক্রবর্তী, সাংবাদিক জাহিদ সুমন, বিলাল হোসেন, আব্দুল আলিম, বন্ধুসভার সহ-সভাপতি রাহাদ খাঁন বাপ্পা, বারসিকের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো. শাহীন ইসলাম, স. ম. ওসমান গনী, জান্নাতুল নাঈমসহ স্থানীয় পরিবেশকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীবৃন্দ।
সমাপনী সমাবেশে বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই পারে সুন্দরবনকে সুরক্ষিত রাখতে। সুন্দরবন থেকে ভেসে আসা প্রতিটি বীজ যেন এক একটি নতুন জীবনের প্রতীক, যা আগামী দিনে উপকূলকে দেবে এক নিরাপদ ও সবুজ বেষ্টনী।












