রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬, ৮ ভাদ্র ১৪৩৩
রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬, ৮ ভাদ্র ১৪৩৩

স্বামীর চেয়েও বেশি ভালোবাসার কথা বললেন নারী, লজ্জায় লাল শাহরুখ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬, ১১:১২ অপরাহ্ণ
স্বামীর চেয়েও বেশি ভালোবাসার কথা বললেন নারী, লজ্জায় লাল শাহরুখ

বলিউড প্রখ্যাত অভিনেতা শাহরুখ খানের বুদ্ধিমত্তা ও ভক্তদের সঙ্গে রসাল আলাপচারিতার কথা সবারই জানা। সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে এক অভিনব পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। সেখানে এক নারী ভক্ত প্রকাশ্যেই শাহরুখ খানকে জানান, তিনি তার নিজের স্বামীর চেয়েও বেশি ভালোবাসেন এই তারকাকে। ভক্তের এ কথা শুনে প্রথমে কিছুটা অপ্রস্তুত হলেও পরে অসাধারণ বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বিষয়টি সামাল দেন এ অভিনেতা।
সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, অনুষ্ঠান চলাকালীন এক নারী হঠাৎ শাহরুখ খানকে লক্ষ্য করে বলেন, আমি আমার স্বামীর চেয়েও আপনাকে বেশি ভালোবাসি।

ভক্তের মুখে এ কথা শুনে প্রথমে লজ্জায় লাল হয়ে যান শাহরুখ। পরে রসিকতা করে বলিউড কিং উত্তর দেন, এসব কথা তো আড়ালে বা একান্তে বলা উচিত ছিল!

তবে এখানেই থেমে থাকেননি তিনি। ভক্তের পারিবারিক পরিস্থিতি ও আবেগের প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, আমি জানি এটি শুধু আপনার ভালোবাসার একটি বহিঃপ্রকাশ এবং আমি আপনার অনুভূতি বুঝতে পারছি। আমি নিশ্চিত যে আপনার স্বামীও বিষয়টি সহজভাবেই নেবেন। আমি আসলে আপনাদের সবাইকে ভালোবাসি—আপনার স্বামী এবং আপনার পরিবারকেও ভালোবাসি। অনেক ধন্যবাদ।

ওই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত হয়ে নিজের জনপ্রিয় কিছু গানের সঙ্গে পারফর্মও করেন শাহরুখ খান। সামাজিক মাধ্যমে তার সেই পারফরম্যান্সের পাশাপাশি ভক্তের সঙ্গে কথোপকথনের এই ভিডিওটিও সমানভাবে সাড়া ফেলেছে।

Ads small one

আন্তর্জাতিক অদ্ভুত সঙ্গীত দিবস: পরিচিত সুরের সীমানা পেরিয়ে নতুন ভাবনার জগতে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬, ৬:২৪ অপরাহ্ণ
আন্তর্জাতিক অদ্ভুত সঙ্গীত দিবস: পরিচিত সুরের সীমানা পেরিয়ে নতুন ভাবনার জগতে
সাকিবুর রহমান বাবলা
মানুষের জীবনে সঙ্গীত শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি অনুভূতি, চিন্তা ও সৃজনশীলতার এক অনন্য ভাষা। তবে আমরা অধিকাংশ সময় এমন সঙ্গীতই শুনি, যা আমাদের পরিচিত, স্বাচ্ছন্দ্যময় এবং অভ্যাসের অংশ। সেই সীমাবদ্ধতার গণ্ডি ভেঙে নতুন সুর ও নতুন অভিজ্ঞতার দিকে মানুষকে আহ্বান জানায় ২৪ আগস্ট পালিত আন্তর্জাতিক অদ্ভুত সঙ্গীত দিবস।
১৯৯৭ সালে নিউইয়র্কের সংগীতশিল্পী ও সুরকার প্যাট্রিক গ্রান্ট এই দিবসের সূচনা করেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, মানুষের সংগীতজগত যত বিস্তৃত হবে, জীবনের অন্যান্য বিষয় সম্পর্কেও তাদের দৃষ্টিভঙ্গি তত বেশি উন্মুক্ত ও ইতিবাচক হবে। তাই তিনি ‘পূর্বধারণা ছাড়া শুনুন’—এই দর্শনকে সামনে রেখে মানুষকে এমন সঙ্গীতের সঙ্গে পরিচিত হতে উৎসাহিত করেন, যা তাদের কাছে নতুন, অপরিচিত কিংবা কিছুটা অস্বাভাবিক।
এখানে ‘স্ট্রেঞ্জ’ বা ‘অদ্ভুত’ বলতে কেবল বিচিত্র শব্দের সমাহারকে বোঝায় না; বরং এমন যেকোনো সঙ্গীতকে বোঝায়, যা শ্রোতার পরিচিত অভিজ্ঞতার বাইরে। এটি হতে পারে পরীক্ষামূলক, অ্যাভান্ট-গার্ড, ইলেকট্রনিক, নয়েজ মিউজিক কিংবা এমন কোনো ঘরানা, যা আগে কখনও শোনা হয়নি। দিবসটি উদযাপনের জন্য খুব অদ্ভুত সঙ্গীত শোনা বাধ্যতামূলক নয়; বরং নতুন কোনো ঘরানার সঙ্গীতের সঙ্গে পরিচিত হওয়াই এর মূল উদ্দেশ্য।
প্যাট্রিক গ্রান্ট ২৪ আগস্ট তারিখটি বেছে নিয়েছিলেন তাঁর প্রেমিকার বাবার জন্মদিনকে স্মরণ করে, যিনি তাঁর শিল্পচর্চার একজন গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা ছিলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দিবসটি জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং ২০০২ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে ইউরোপেও ছড়িয়ে পড়ে। পরে এর নামের সঙ্গে ‘আন্তর্জাতিক’ শব্দটি যুক্ত করা হয়। বর্তমানে বিভিন্ন কনসার্ট, সাংস্কৃতিক আয়োজন, শিক্ষামূলক কর্মসূচি এবং সৃজনশীল উদ্যোগের মাধ্যমে দিবসটি বিশ্বের নানা স্থানে পালিত হয়।
বিজ্ঞানও বলছে, অপরিচিত ও ব্যতিক্রমধর্মী সঙ্গীত মানুষের মস্তিষ্কে বিশেষ প্রভাব ফেলে। পরিচিত ছন্দের বাইরে থাকা সুর মস্তিষ্ককে নতুনভাবে চিন্তা করতে বাধ্য করে এবং নিউরোপ্লাস্টিসিটির মাধ্যমে নতুন স্নায়বিক সংযোগ গঠনে সহায়তা করতে পারে। আবার অপ্রত্যাশিত সুর বা শব্দ মস্তিষ্কে উত্তেজনা ও আবেগীয় প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, যা অনেক সময় শ্রোতাকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের মস্তিষ্ক সবসময় পরবর্তী সুর অনুমান করার চেষ্টা করে; কিন্তু স্ট্রেঞ্জ মিউজিক সেই অনুমানের ধারা ভেঙে দিয়ে মনোযোগ, কৌতূহল ও কল্পনাশক্তিকে আরও সক্রিয় করে তোলে।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই সঙ্গীতের তাৎপর্য গভীর। রুশ সাহিত্যতত্ত্ববিদ ভিক্টর শক্লোভস্কির তত্ত্ব অনুযায়ী, শিল্পের কাজ হলো পরিচিত বিষয়কে নতুনভাবে দেখার সুযোগ তৈরি করা। স্ট্রেঞ্জ মিউজিক ঠিক সেই কাজটিই করে—এটি আমাদের অভ্যস্ত শ্রবণজগতের বাইরে নিয়ে গিয়ে নতুন অনুভূতি ও নতুন উপলব্ধির তরঙ্গের দুয়ার খুলে দেয়।
আন্তর্জাতিক অদ্ভুত সঙ্গীত দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটে পরিচিত সীমানার বাইরে। তাই ২৪ আগস্ট হতে পারে নিজের পছন্দের তালিকার একটু বাইরে গিয়ে নতুন কোনো সুর, নতুন কোনো ধারা কিংবা নতুন কোনো সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতাকে গ্রহণ করার একটি অনন্য সুযোগ। কে জানে, আজকের এই অপরিচিত সুরই হয়তো আগামী দিনের প্রিয় সংগীতে পরিণত হবে।

ফুলবাড়ী কয়লা খনি: উন্নয়ন, নাকি পরিবেশের নতুন সংকট?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৩৮ পূর্বাহ্ণ
ফুলবাড়ী কয়লা খনি: উন্নয়ন, নাকি পরিবেশের নতুন সংকট?

বাহলুল আলম

প্রায় দুই দশক পর আবারও জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী কয়লা খনি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দেশীয় কয়লার সম্ভাবনা নতুন করে বিবেচনার সরকারি বক্তব্যের পর ফুলবাড়ীকে ঘিরে পুরোনো প্রশ্নগুলো আবার সামনে এসেছে। গত ১৬ আগস্ট রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধানে বিকল্প পথ খোঁজার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে বলেন, “এখন আমরা ফুলবাড়ী এবং অন্যান্য স্থানে ওপেন-পিট কয়লা উত্তোলনের দিকে যাচ্ছি।”

এই বক্তব্যের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—ফুলবাড়ীতে কি আবারও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে? যদি নেওয়া হয়, তাহলে এর পরিবেশগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য কতটা? আর উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সেই ঝুঁকি কতটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব?

ফুলবাড়ীর প্রশ্নটি নিছক একটি খনি প্রকল্পের প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের বসতভিটা, কৃষিজমি, ভূগর্ভস্থ পানি, জীবিকা, স্থানীয় প্রতিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং একটি দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক আন্দোলনের ইতিহাস। ফলে এখানে উন্নয়ন ও পরিবেশের প্রশ্নটি একে অপরের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দেখলে পুরো বাস্তবতাটি ধরা পড়বে না। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—কী ধরনের উন্নয়ন, কার জন্য উন্নয়ন এবং সেই উন্নয়নের মূল্য কে বহন করবে? ২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট উন্মুক্ত খনির প্রতিবাদে সংঘটিত আন্দোলনে তিনজন প্রাণ হারিয়েছিলেন। সেই স্মৃতি এবং সম্ভাব্য বাস্তুচ্যুতি ও পরিবেশগত ঝুঁকির আশঙ্কায় স্থানীয়দের মধ্যে আবারও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত ১৯ আগস্ট বিক্ষোভের পর আগামী ২৪ আগস্ট ঢাকায় এবং ২৬ আগস্ট ফুলবাড়ীতে বড় সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়েছে।

উন্মুক্ত বা ওপেন-পিট পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের সবচেয়ে বড় বিতর্কের জায়গা হলো এর সম্ভাব্য উত্তোলন পদ্ধতি। এ জন্য ভূ-পৃষ্ঠের বড় একটি অংশ অপসারণ করতে হয়। ফলে শুধু মাটির নিচের কয়লা উত্তোলনই নয়, এর সঙ্গে ভূমি ব্যবহার, পানির প্রবাহ, কৃষি, বসতি এবং স্থানীয় প্রতিবেশের ওপরও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। এ কারণেই ফুলবাড়ীতে কয়লা উত্তোলনের আলোচনা হলেই পরিবেশগত ঝুঁকি ও মানুষের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

আধুনিক প্রযুক্তি কি সব ঝুঁকি দূর করতে পারে?
দুই দশক আগের তুলনায় খনি ব্যবস্থাপনা, ভূগর্ভস্থ পানি পর্যবেক্ষণ, পানি ব্যবস্থাপনা ও ভূমি পুনর্বাসনে প্রযুক্তির যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা ও কঠোর নজরদারির মাধ্যমে অনেক ঝুঁকি কমানো সম্ভব। কিন্তু ঝুঁকি কমানো আর ঝুঁকি সম্পূর্ণ দূর করা এক বিষয় নয়। উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের ক্ষেত্রে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর, কৃষিজমি, মাটির গুণাগুণ, জলপ্রবাহ, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হবে—তা স্বাধীন ও বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি। শুধু “আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি” ব্যবহারের ঘোষণা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য তথ্য, স্বচ্ছতা ও কার্যকর নজরদারি। বিশেষ করে জানতে হবে—খনির পানি ব্যবস্থাপনায় আশপাশের কৃষি ও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর কী প্রভাব পড়বে? খনন শেষে জমি পুনরুদ্ধার করা হলেও তা কি আগের মতো কৃষি উৎপাদনক্ষম হবে? স্থানীয় প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য কি সত্যিই পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে?

ফুলবাড়ী শুধু কয়লার মজুদের জায়গা নয়; এটি মানুষের বসতি, কৃষিজমি ও জীবিকার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি জনপদ। তাই খনি প্রকল্পের লাভ-ক্ষতির হিসাব শুধু কয়লা, বিদ্যুৎ ও কর্মসংস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। জমি হারানো, কৃষি উৎপাদনের ক্ষতি, পুনর্বাসন, পানি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত ক্ষতির মূল্যও হিসাবের আওতায় আনতে হবে। কারণ একটি পরিবারকে নতুন ঘর দেওয়া গেলেই তার হারানো জমি, পেশা, সামাজিক সম্পর্ক ও প্রজন্মের সঙ্গে গড়ে ওঠা ভূমির সম্পর্ক ফিরে আসে না। সুতরাং পুনর্বাসন শুধু ক্ষতিপূরণ নয়; এটি মানুষের জীবন, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা পুনর্গঠনের বিষয়।

জ্বালানি নিরাপত্তা বনাম পরিবেশ—দুটিকে কি একসঙ্গে দেখা যায় না?
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবন—সবকিছুর জন্য নির্ভরযোগ্য জ্বালানি প্রয়োজন।

 

আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার মূল্য, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতাও দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতায় দেশীয় কয়লার সম্ভাবনা বিবেচনা করা অযৌক্তিক নয়। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও মনে রাখতে হবে, জ্বালানি নিরাপত্তার সংজ্ঞা শুধু “দেশে কয়লা আছে কি না”—এতটা সরল নয়। দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ, সাশ্রয়ী, পরিবেশসম্মত ও স্থিতিশীল জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলাই প্রকৃত জ্বালানি নিরাপত্তার লক্ষ্য হওয়া উচিত। তাই ফুলবাড়ী নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শুধু কয়লা উত্তোলন করা যাবে কি না—এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়। বরং দেখতে হবে, কোন বিকল্পে দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সামগ্রিক ঝুঁকি ও সুবিধার ভারসাম্য সবচেয়ে ভালো।

কয়লা উত্তোলন, কয়লা আমদানি—নাকি নবায়নযোগ্য জ্বালানি?
এখানে তিনটি পথ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। প্রথমত, কঠোর পরিবেশগত ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করে দেশীয় কয়লা উত্তোলনের সম্ভাবনা যাচাই করা। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় পরিবেশগত ঝুঁকি বেশি হলে প্রয়োজন অনুযায়ী কয়লা আমদানির বিকল্প বিবেচনা করা। তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদে কয়লার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌর, বায়ু ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা বাড়ানো। তবে কোনো পথই আবেগের ভিত্তিতে বেছে নেওয়া উচিত নয়। প্রয়োজন তথ্য, বিজ্ঞান, স্বচ্ছতা এবং জনসম্পৃক্ততার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত। জনগণের মতামত কি শুধু আনুষ্ঠানিকতা হবে? ফুলবাড়ী প্রকল্পের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হওয়া উচিত স্থানীয় জনগণের অর্থবহ অংশগ্রহণ।

 

পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন শুধু কাগজে-কলমে সম্পন্ন করলেই হবে না; এর তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য ভাষায় প্রকাশ করতে হবে। স্বাধীন বিশেষজ্ঞ, স্থানীয় জনগণ, কৃষক, পরিবেশবিদ, নাগরিক সমাজ, গবেষক এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। প্রকল্পের সম্ভাব্য সুবিধা যেমন জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে, তেমনি ঝুঁকি ও সীমাবদ্ধতাগুলোও স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। প্রশ্নের উত্তর যদি ইতিবাচক হয়, তবে সেটিও প্রমাণের ভিত্তিতে হতে হবে। আর যদি উত্তর নেতিবাচক হয়, তার কারণও হতে হবে বৈজ্ঞানিক ও অর্থনৈতিকভাবে ব্যাখ্যাযোগ্য।

উন্নয়ন চাই, কিন্তু মানুষের মূল্যে নয় ফুলবাড়ী আমাদের সামনে আসলে একটি বড় জাতীয় প্রশ্ন তুলে ধরেছে—আমরা কেমন উন্নয়ন চাই? উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। জ্বালানি নিরাপত্তাও প্রয়োজন। কিন্তু উন্নয়নের নামে যদি কৃষিজমি, পানি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবন-জীবিকা অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে, তাহলে সেই উন্নয়নের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। আবার পরিবেশ রক্ষার নামে দেশের জ্বালানি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে পুরোপুরি অস্বীকার করাও বাস্তবসম্মত নয়।

 

সুতরাং প্রয়োজন সমন্বিত ও প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত—যেখানে অর্থনীতি থাকবে, কিন্তু পরিবেশ বাদ যাবে না; জ্বালানি নিরাপত্তা থাকবে, কিন্তু মানুষের অধিকার উপেক্ষিত হবে না; প্রযুক্তির ব্যবহার থাকবে, কিন্তু তার কার্যকারিতা স্বাধীনভাবে যাচাইয়ের ব্যবস্থাও থাকবে। ফুলবাড়ী কয়লা খনি নিয়ে সিদ্ধান্ত তাই শুধু একটি খনি প্রকল্পের সিদ্ধান্ত নয়। এটি বাংলাদেশের উন্নয়ন দর্শনের একটি পরীক্ষা। আমরা কি এমন উন্নয়ন বেছে নেব, যার সুফল আজ পাওয়া যাবে কিন্তু পরিবেশগত ও সামাজিক মূল্য দিতে হবে আগামী প্রজন্মকে? নাকি এমন একটি পথ খুঁজব, যেখানে বর্তমানের জ্বালানি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পানি, মাটি, কৃষি ও প্রকৃতিও নিরাপদ থাকবে? উন্নয়ন চাই—কিন্তু কেমন উন্নয়ন? জ্বালানি নিরাপত্তা চাই—কিন্তু কার মূল্যে?

 

ফুলবাড়ীর সিদ্ধান্তে তাই তাড়াহুড়োর চেয়ে প্রয়োজন গভীর গবেষণা, স্বচ্ছতা, জনগণের অংশগ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের বিচার। কারণ একটি খনি হয়তো কয়েক দশক চলে, কিন্তু তার পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব থেকে যেতে পারে বহু প্রজন্ম।

লেখক পরিচিতি: বাহলুল আলম একজন পরিবেশবিদ ও পরিবেশবিষয়ক লেখক। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বাংলাদেশের উপকূলীয় জনপদ, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং প্রান্তিক মানুষের জীবন-জীবিকা ও অধিকার নিয়ে কাজ করছেন। পরিবেশ ও উন্নয়নের পারস্পরিক স ম্পর্ক, জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সহাবস্থান তাঁর লেখালেখি ও কাজের অন্যতম প্রধান বিষয়।

সুন্দরবনের কেওড়া ফল উপকূলীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৩২ পূর্বাহ্ণ
সুন্দরবনের কেওড়া ফল উপকূলীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা

প্রকাশ ঘোষ বিধান, পাইকগাছা (খুলনা): সুন্দরবনের কেওড়া ফল উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের খাদ্যসংস্কৃতি, পুষ্টি এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। এই টক স্বাদের ফল শুধু বন্যপ্রাণীর খাদ্যই নয়, বরং এটি দিয়ে তৈরি আচার, চাটনি ও জ্যাম বিক্রি করে উপকূলীয় নারীরা নিজেদের আর্থিক সচ্ছলতা আনছেন।

 

কেওড়া ফল দিয়ে সুস্বাদু আচার, চাটনি ও জ্যাম তৈরি করা হয়, যা স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে বাড়তি আয় করা সম্ভব। উপকূলীয় এলাকায় ছোট চিংড়ি মাছ ও মসুর ডালের সাথে টক স্বাদের কেওড়া রান্না বেশ জনপ্রিয়। উপকূলীয় এলাকার নারীরা কেওড়া ফল সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।

 

সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ কেওড়া প্রাকৃতিকভাবে উপকূল রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর খাদ্যসংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটসহ সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় জোয়ার-ভাটার লবণাক্ত মাটিতে কেওড়া গাছ দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং এর অনন্য শ্বাসমূল লবণাক্ত পরিবেশে টিকে থাকতে বিশেষ সহায়তা করে। ফাগুনের শেষে ফুল আসার পর চৈত্র থেকে ভাদ্র-আশ্বিন মাস পর্যন্ত এই ফল সংগ্রহের উপযুক্ত সময়, যা উপকূলের প্রান্তিক মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় টক স্বাদের বৈচিত্র্য যোগ করার পাশাপাশি স্থানীয় বাজারের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে।

 

সুন্দরবনসহ উপকূলীয় অঞ্চলে কেওড়ার বাম্পার ফলন হয়েছে। ফলে ফলে ভরে গেছে প্রতিটি গাছ। কেওড়া গাছ মুলতো সুন্দরবন কেন্দ্রিক বৃক্ষ হলেও উপকূলীয় খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরাসহ সুন্দরবন সংলগ্ন বিস্তৃর্ণ এলাকার নদীর চরভরাটি জমিতে সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে অন্যান্য প্রজাতির গাছের সাথে কেওড়া গাছের চারা লাগানো হচ্ছে। সুন্দরবন সংলগ্ন পাইকগাছা উপজেলার শিবসা, ভদ্রা, মিনহাজ, কড়ুলিয়া নদী ও কপোতাক্ষ নদের চরভরাটি জমিতে সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে গত কয়েক বছরের ব্যবধানে প্রচুর পরিমাণে কেওড়া গাছের চারা রোপন করা হয়েছে। এছাড়া এলাকার বিভিন্ন স্লুইস গেটের ধারে প্রাকৃতিক ভাবে জন্মানো বড় বড় কেওড়া গাছ রয়েছে।

 

কেওড়া ফল উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা বয়ে আনতে পারে। কেওড়া গাছ বর্ধনশীল হওয়ায় গাছে দ্রুত ফল ধরে। এক একটা গাছে প্রচুর পরিমাণে ফল ধরে। আশ্বিন মাস পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়। এসময় এলাকার হাট-বাজার গুলোতে কেওড়া ফল কিনতে পাওয়া যায়। প্রতি কেজি কেওড়া ১০ থেকে ১৫ টাকা দরে বিক্রি হয়ে থাকে। কেওড়া গাছের বাণিজ্যিক ব্যবহার উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য বাড়তি আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।

 

উপকূলীয় এলাকার অনাবাদী লবণাক্ত জমিতে কেওড়া গাছ ব্যাপক ভাবে জন্মে। যা উপকূলের প্রান্তিক জনগণের বাড়তি আয়ের উৎস। কেওড়া ফলটি টক স্বাদযুক্ত হওয়ায় বিভিন্ন জায়গায় রপ্তানি করে অনেক পরিবারের রুটি-রুজির ব্যবস্থা হয়। কেওড়া ফলকে ঘিরেও আচার, চাটনি,জেলিসহ বিভিন্ন খাদ্যে গড়ে উঠতে পারে শিল্প। উপকূলীয় অর্থনীতিতে কেওড়া ফল নতুন মাত্রা আনতে পারে।

 

সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় জেলা সমূহের লোকজন কেওড়া ফলের সাথে ছোট চিংড়ি মাছ ও মসুরীর ডাল রান্না করে খেয়ে থাকে। তাছাড়া, কেওড়া ফল হতে আচার ও চাটনী তৈরী করা হয়। কেওড়া ফলেও রয়েছে অনেক গুণ। এ ফল পেটের অসুখের চিকিৎসায় বিশেষতঃ বদহজমে ব্যবহৃত হয়। এই ফলের চাটনি, টক আর ডাল রান্না করে রসনা মেটাচ্ছে অনেকে মানুষ। অন্যদিকে, সুন্দরবনে উৎপন্ন মধুর একটা বড় অংশ আসে কেওড়া ফুল হতে। কেওড়া ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করা হয়, যা একটি মূল্যবান খাদ্যপণ্য। এটি একটি লবণাক্ততা সহিষ্ণু গাছ এবং এর ফল ও পাতা স্থানীয় জনগণের খাদ্য ও অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত হতে পারে।

 

উপকূলীয় কেওড়া ফল বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করা যেতে পারে। এই ফলের বাণিজ্যিকীকরণ সম্ভব হলে তা উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে। বর্তমানে বাজারের কেওড়া ফলের চাহিদা রয়েছে। সুষ্ঠুভাবে এর চাষ ও বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের আয় বাড়ানো যেতে পারে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে।