হারিয়ে যাচ্ছে নাম খোদাইয়ের শিল্প/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
একসময় মানুষের হাতে থাকা একটি ঝর্ণা কলম শুধু লেখার উপকরণ ছিল না, ছিল আভিজাত্য, রুচি ও ব্যক্তিত্বের প্রতীক। সেই কলমে নিজের নাম খোদাই করা থাকলে তার মূল্য আরও বেড়ে যেত। জন্মদিন, পরীক্ষায় সাফল্য, চাকরিতে যোগদান, বিদায় সংবর্ধনা কিংবা বিশেষ কোনো অর্জনের স্মারক হিসেবে নাম খোদাই করা ঝর্ণা কলম ছিল এক অনন্য উপহার। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই সংস্কৃতির সঙ্গে হারিয়ে যেতে বসেছে একটি পেশাওÑঝর্ণা কলমে নাম খোদাই করার কারিগরদের পেশা।
একসময় শহর থেকে শুরু করে মফস্বলের বড় বাজার গুলোতে দেখা মিলত এসব দক্ষ কারিগরের। ছোট্ট একটি টেবিল, কয়েকটি সূক্ষ্ম যন্ত্র, লুপ বা আতস কাচ এবং অসাধারণ ধৈর্যÑএই ছিল তাঁদের কর্মজীবনের প্রধান উপকরণ। ধাতব কলমের গায়ে নিখুঁতভাবে অক্ষর ফুটিয়ে তোলার কাজটি ছিল এক ধরনের শিল্প। কয়েক মিনিটের মধ্যেই একটি সাধারণ কলম হয়ে উঠত বিশেষ একজন মানুষের স্মৃতিবাহী সম্পদ। আজ সেই দৃশ্য খুব কমই দেখা যায়।
প্রযুক্তির উন্নয়ন, লেখার অভ্যাসের পরিবর্তন এবং বাজার ব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণে ঝর্ণা কলমে নাম খোদাইয়ের ঐতিহ্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। একসময় যাঁদের হাতে প্রতিদিন শত শত কলমে মানুষের নাম লেখা হতো, তাঁদের অনেকেই এখন অন্য পেশায় চলে গেছেন।বর্তমান প্রজন্মের অনেকের কাছে কলম হয়তো শুধুই একটি সাধারণ ব্যবহার্য জিনিস। কিন্তু কয়েক দশক আগেও একটি ভালো কলম ছিল বিশেষ মর্যাদার বিষয়। একজন শিক্ষার্থী ভালো ফল করলে বাবা-মা তাকে একটি ঝর্ণা কলম কিনে দিতেন। কোনো শিক্ষককে সম্মান জানাতে, কোনো প্রিয়জনকে স্মরণীয় উপহার দিতে বা কর্মজীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করতে দেওয়া হতো নাম খোদাই করা কলম।
সেই সময় একটি কলমের সঙ্গে জড়িয়ে থাকত সম্পর্ক ও অনুভূতি। কলমে খোদাই করা নামটি শুধু পরিচয় বহন করত না, বহন করত ভালোবাসা ও সম্মানের স্মৃতি। অনেকেই আজও যতœ করে রেখে দিয়েছেন তাঁদের পুরোনো ঝর্ণা কলম, কারণ সেটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কোনো মুহূর্ত। ঝর্ণা কলমে নাম খোদাই করা সহজ কোনো কাজ ছিল না। এর জন্য প্রয়োজন হতো বিশেষ দক্ষতা ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতার।
একটি ধাতব পৃষ্ঠে অক্ষর বসাতে সামান্য ভুল হলেই নষ্ট হয়ে যেতে পারত দামি কলম। তাই কারিগরদের অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হতো। প্রথমে কলমের ওপর নামের অবস্থান নির্ধারণ করা হতো। এরপর বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে ধীরে ধীরে অক্ষর তৈরি করা হতো। কারও হাতের লেখা ছিল এতটাই সুন্দর যে, গ্রাহকেরা নির্দিষ্ট কারিগরের কাছেই যেতেন নাম খোদাই করাতে। এই পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের অনেকেই বলতেন, এটি শুধু কাজ নয়, এক ধরনের সৃজনশীলতা। একটি নামকে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলার মধ্যেই ছিল তাঁদের আনন্দ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে।
এখন কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত লেজার মেশিন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই যেকোনো লেখা খোদাই করে দিতে পারে। ফলে হাতে খোদাইয়ের প্রয়োজন কমে গেছে। আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা থাকলেও এর কারণে হারিয়ে যাচ্ছে পুরোনো দক্ষতার মূল্য। একজন অভিজ্ঞ কারিগর যে যতœ ও আবেগ দিয়ে একটি নাম খোদাই করতেন, যন্ত্রের নিখুঁত কাজেও সেই মানবিক স্পর্শ অনেক সময় পাওয়া যায় না। একসময় যে পেশায় অনেক মানুষের জীবিকা চলত, এখন সেটি প্রায় বিলুপ্তির পথে। নতুন প্রজন্মও এই কাজ শেখার প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ফলে কয়েক বছর পর হয়তো এই পেশার দক্ষ কারিগর খুঁজে পাওয়াই কঠিন হয়ে যাবে। ঝর্ণা কলমে নাম খোদাইয়ের পেশা হারিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন।
এখন মানুষ মোবাইল ফোনে লিখছে, কম্পিউটারে কাজ করছে। অফিসের নথিপত্র থেকে ব্যক্তিগত যোগাযোগÑসবকিছুই ডিজিটাল হয়ে গেছে। আগের মতো চিঠি লেখা হয় না, ডায়েরি লেখার অভ্যাসও কমেছে। ফলে ভালো কলমের প্রয়োজনও কমে গেছে। বাজারে এখন কম দামের বল পয়েন্ট কলম সহজলভ্য হওয়ায় সাধারণ মানুষ আর ঝর্ণা কলমের দিকে আগের মতো ঝুঁকছেন না। তবে এর মধ্যেও কিছু মানুষ এখনো ঝর্ণা কলমের ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। লেখক, সংগ্রাহক, শিল্পী ও রুচিশীল মানুষের কাছে একটি সুন্দর ঝর্ণা কলম এখনো বিশেষ আকর্ষণের বিষয়।
একটি পেশার বিলুপ্তি মানে শুধু কিছু মানুষের কর্মসংস্থান হারানো নয়; এর সঙ্গে হারিয়ে যায় একটি সময়ের সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার অংশ। ঝর্ণা কলমে নাম খোদাইয়ের পেশার সঙ্গেও জড়িয়ে আছে তেমনই একটি ইতিহাস। এই কারিগররা ছিলেন এক ধরনের শিল্পী। তাঁরা মানুষের নামকে সাধারণ লেখা থেকে স্মৃতির অংশে পরিণত করতেন। তাঁদের হাতের কাজ একটি সাধারণ বস্তুতে যোগ করত ব্যক্তিগত মূল্য।
আজকের দ্রুতগতির জীবনে আমরা অনেক কিছু সহজে পেয়ে যাচ্ছি, কিন্তু হারিয়ে ফেলছি অনেক ঐতিহ্য। মাটির খেলনা, পালকির কারিগর, ঢেঁকি নির্মাতা, বাঁশের শিল্পী কিংবা ঝর্ণা কলমে নাম খোদাইকারীদের মতো অনেক পেশাই সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাওয়া এসব পেশাকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন নতুন উদ্যোগ। হস্তশিল্প মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বিশেষ প্রদর্শনীতে এসব কারিগরদের কাজ তুলে ধরা যেতে পারে। তরুণ প্রজন্মকে এই পেশার সঙ্গে পরিচিত করার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
অনলাইন বাজারেও নাম খোদাই করা ঝর্ণা কলমের চাহিদা তৈরি করা সম্ভব। আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী দক্ষতার সমন্বয় ঘটিয়ে এই পেশাকে নতুনভাবে ফিরিয়ে আনা যেতে পারে। শুধু ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির অংশ হিসেবেও এই ধরনের শিল্প সংরক্ষণ করা জরুরি। ঝর্ণা কলমে খোদাই করা একটি নাম হয়তো আজ আর খুব সাধারণ দৃশ্য নয়, কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য মানুষের স্মৃতি ও আবেগ। সেই নামের পেছনে ছিল একজন কারিগরের নিপুণ হাত, ধৈর্য ও সৃজনশীলতা।
সময়ের পরিবর্তনে অনেক পেশা হারিয়ে যায়, কিন্তু তাদের গল্প হারিয়ে যাওয়া উচিত নয়। কারণ এসব পেশার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে একটি সমাজের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও মানুষের সৃষ্টিশীলতার ইতিহাস। ঝর্ণা কলমে নাম খোদাইয়ের পেশা হয়তো আজ সংকটের মুখে, কিন্তু এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়Ñমানুষের হাতের তৈরি শিল্পের মূল্য কখনো পুরোপুরি শেষ হয় না। প্রয়োজন শুধু তাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করার।
লেখক: সংবাদকর্মী






