সরকারি হাসপাতাল কেন মানুষের আস্থা হারাচ্ছে?
গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ
বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকের মৌলিক চাহিদার অন্যতম হিসেবে স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তার কথা বলেছে। কিন্তু বাস্তবতা আজ একটি কঠিন প্রশ্ন সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে রাষ্ট্র কি সত্যিই সবার জন্য মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে পেরেছে, নাকি চিকিৎসা ধীরে ধীরে এমন এক ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে, যেখানে অর্থই চিকিৎসা পাওয়ার প্রধান শর্ত? বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির।
তাদের পক্ষে ব্যয়বহুল বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া প্রায় অসম্ভব। তাই সরকারি হাসপাতালই তাদের একমাত্র ভরসা। কিন্তু সেই হাসপাতালেই যখন চিকিৎসকের সংকট, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি, আধুনিক যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতা, দীর্ঘ অপেক্ষা, শয্যার স্বল্পতা এবং অতিরিক্ত রোগীর চাপে সেবার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন সাধারণ মানুষের অসহায়ত্ব আরও বেড়ে যায়।
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সরকারি হাসপাতালের অসংখ্য চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী প্রতিকূল পরিবেশেও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, স্বাস্থ্যখাতে ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা, সীমিত সম্পদ, পর্যাপ্ত জনবলের অভাব এবং জবাবদিহির ঘাটতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জনমনে অসন্তোষ রয়েছে। কোথাও চিকিৎসক নেই, কোথাও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি অকেজো, কোথাও ওষুধের সংকট, আবার কোথাও অতিরিক্ত রোগীর চাপ সেবার মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে।
এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এগুলো স্বাস্থ্যব্যবস্থার দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যার প্রতিফলন। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। যুক্তরাজ্য, জার্মানি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধরনের হাসপাতাল রয়েছে। তবে সেখানে শক্তিশালী সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা, কার্যকর স্বাস্থ্যবিমা, কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনার কারণে সাধারণ মানুষ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন না।
রাষ্ট্র স্বাস্থ্যসেবাকে কেবল বাজারের ওপর ছেড়ে দেয় না; বরং নাগরিকের অধিকার হিসেবে নিশ্চিত করার চেষ্টা করে। বাংলাদেশে আজও অসংখ্য পরিবার চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে ঋণ নেয়, জমি বিক্রি করে কিংবা চিকিৎসাই বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। আবার যাদের সামর্থ্য আছে, তারা উন্নত চিকিৎসার আশায় বিদেশে যান। এর ফলে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। অথচ দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, জনবল নিয়োগ এবং আধুনিক চিকিৎসা অবকাঠামো গড়ে তুলতে কার্যকর বিনিয়োগ করা গেলে এই পরিস্থিতির অনেকটাই পরিবর্তন করা সম্ভব। এখন আর খন্ডিত উদ্যোগে কাজ হবে না।
স্বাস্থ্যখাতে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবভিত্তিক জাতীয় সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। সরকারি হাসপাতালে শূন্যপদ দ্রুত পূরণ, পর্যাপ্ত নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, আধুনিক যন্ত্রপাতির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, ডিজিটাল উপস্থিতি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, দরিদ্র মানুষের জন্য কার্যকর স্বাস্থ্যবিমা চালু এবং বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার মান ও ব্যয়ের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এসব বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু উঁচু সেতু, প্রশস্ত মহাসড়ক কিংবা বড় বড় স্থাপনা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। প্রকৃত উন্নয়নের মানদন্ড হলো একজন দরিদ্র কৃষক, জেলে, শ্রমিক, রিকশাচালক কিংবা নিম্ন আয়ের মানুষ অসুস্থ হলে তিনি সম্মানজনক, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত চিকিৎসা পাচ্ছেন কি না।
স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিলাসপণ্য নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। তাই স্বাস্থ্যখাতকে অবহেলা, অদক্ষতা ও দীর্ঘদিনের সংস্কারহীনতার গন্ডি থেকে বের করে এনে জনগণের আস্থার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করাই আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। কারণ সুস্থ মানুষই পারে একটি শক্তিশালী, সমৃদ্ধ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।
লেখক: গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ সাবেক ছাত্রনেতা ও উদ্যোক্তা









