হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার ‘কস্তুরী হলুদ’
তারিক ইসলাম
বর্ষার রিমঝিম শব্দে প্রকৃতি যখন নতুন রূপ ধারণ করে, তখন আমাদের চারপাশের বুনো ঝোপঝাড়ও সেজে ওঠে এক অনন্য সাজে। শহরের কংক্রিটের দেয়ালে বসে হয়তো প্রকৃতির এই রূপ অনুধাবন করা কঠিন, কিন্তু গ্রামীণ মেঠোপথ কিংবা ছায়াযুক্ত বনের প্রান্তে চোখ রাখলেই দেখা মেলে এক মায়াবী দৃশ্যের। সবুজ ঘাসের বুক চিরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে দৃষ্টিনন্দন কিছু গোলাপী-হলুদ ফুল। সাধারণ মানুষের কাছে এটি ‘শটি’ বা ‘বন হলুদ’ নামে পরিচিত হলেও, উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায় এর নাম ঈঁৎপঁসধ ধৎড়সধঃরপধ। আর প্রসাধন বা আয়ুর্বেদের দুনিয়ায় যা ‘কস্তুরী হলুদ’ নামে সমধিক সমাদৃত।
আদা ও হলুদ পরিবারের এই উদ্ভিদটি একসময় বাংলার গ্রামীণ জনপদে অত্যন্ত সহজলভ্য ছিল। বর্ষার শুরুতে যখন গাছের গোড়া বা কন্দ থেকে সরাসরি এই নজরকাড়া ফুলগুলো প্রস্ফুটিত হয়, তখন যে কেউ এর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হতে বাধ্য। পাপড়ির উপরিভাগের মনোহরী গোলাপী আভা এবং ভেতরের হালকা হলদেটে রঙের মিশ্রণ প্রকৃতিপ্রেমীদের চোখ জুড়িয়ে দেয়। ফুলের পরেই মূলত এর বড় বড় সবুজ পাতাগুলো মেলতে শুরু করে।
তবে কেবল সৌন্দর্যই এই উদ্ভিদের একমাত্র পরিচয় নয়; এর রয়েছে এক বিশাল ওষুধি ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। প্রাচীনকাল থেকেই রূপচর্চায় কস্তুরী হলুদের ব্যবহার সর্বজনবিদিত। সাধারণ হলুদের মতো ত্বকে কোনো কালচে ছোপ না ফেলেই এটি ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে এবং বিভিন্ন চর্মরোগ নিরাময়ে কাজ করে। এছাড়া এর অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট গুণের কারণে আয়ুর্বেদিক ওষুধ তৈরিতেও এর কন্দের চাহিদা ব্যাপক।
দুর্ভাগ্যবশত, নগরায়ণ, বন উজাড় এবং বুনো উদ্ভিদ সম্পর্কে আমাদের অসচেতনতার কারণে এই সম্ভাবনাময় উদ্ভিদটি আজ অবহেলার শিকার। অনেক সময় আগাছা মনে করে এগুলোকে কেটে ফেলা হয়। অথচ সঠিক উপায়ে বাণিজ্যিকভাবে এর চাষাবাদ করা গেলে সুগন্ধি ও প্রসাধন শিল্পে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন হতে পারত। গ্রামীণ অর্থনীতিতে যোগ হতে পারত বাড়তি আয়ের উৎস।
আমাদের চারপাশের এই বুনো সৌন্দর্য এবং ঔষধি উদ্ভিদগুলোকে টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি। শটি বা বন হলুদের মতো প্রাকৃতির এই অমূল্য উপহারগুলোকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে হলে আমাদের যেমন সচেতন হতে হবে, তেমনই প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে এদের সংরক্ষণ ও গবেষণার ব্যবস্থা করা। প্রকৃতির এই নিজস্ব সম্পদগুলোকে যদি আমরা অবহেলা করি, তবে অদূর ভবিষ্যতে হয়তো কেবল ছবির পাতায় কিংবা স্মৃতির পাতায় বন্দি হয়ে থাকবে বাংলার এই কস্তুরী হলুদ।
লেখক: সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি






